ইউজার লগইন

অনির্দিষ্টকালের ট্রিবিউট

আজকের লেখাটার শুরু এই সময়ে না। এক বছর আগে। সেই লেখাটায় যাওয়ার আগে এই কথাটা বলে নিতে ইচ্ছে হলো। সে সময়ের জীবনের সাথে এখনকার জীবনের অনেক কিছুই মিলবে না। তবে মূল সুরটায় কোথায় যেন মিল আছে। সে সময়ও মধ্যরাতে হঠাৎ হঠাৎ লিখার ইচ্ছে চেপে ধরতো। এখনও ধরে। সে সময়েও সেসব ইচ্ছেকে চাপা দিয়ে দেয়ার একটা প্রবল তাড়না যথাসময়েই হাজির হতো। এখনও হয়। মাঝে মাঝে তাড়নাগুলো লিখার ইচ্ছের কাছে হেরে এ ধরনের কিছু একটা হয়ে বের হয়। বের হওয়ার পর বেগুনী রংয়ের ফুলের খামারের পরাগরেণুর মতো ক্ষুদ্র কণার আকারে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। অষ্টাদশ শতাব্দীর কোনো সোনালী গোধূলির আলো মাখা পথে ড্রিন্ডল পরে হেঁটে যাওয়া কিশোরীর চিবুক ছুঁয়ে থাকা গোছাটার সবচেয়ে বড় চুলটা ঠিক যেখানটায় প্রতি মুহূর্তে একবার করে গিয়ে আছড়ে পড়ার চেষ্টায় দিন কাটায়, তার আশেপাশে ঘুরে-ফেরে।

সে সময়টায় ঘোর ভাঙানোর জন্য আশপাশ থেকে ফিসফিস করে আমাজন ফায়ার টিভি স্টিক, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন, লার্নিং এনভায়রনমেন্টে ফেসবুক ব্যাবহার, সাইবার বুলিং এবং কোয়ানটিটেটিভ রিসার্চ মেথডেরা আমাকে ডাকতে থাকে আর আমি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সাঁতরে তীরে ওঠার যুদ্ধ চালাই। হুট করে এক সময় বাস্তবে ফিরে আসি। রবার্টের বলা একটা কথা মনে পড়ে যায়, ইউ হ্যাভ দ্য লাউডেস্ট হুইসপার অব দ্য ওয়ার্ল্ড।

ইলমিনাউ শহরের রোদ ঝলমলে সবুজ দুপুরগুলোকে মাঝে মাঝে গ্রাস করে নেয় কালো মেঘেরা। সে সময় আমার বুকে দামামা বাজে, চোখে প্লাবন ডাকে আর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় অনির্দিষ্টকালের জন্য। অনেক হাতড়ে একটা সিগারেট বানাই। ওটাকে জ্বালিয়ে বাইরে এমনভাবে তাকিয়ে থাকি যেন আমার কোনো অস্তিত্ব এই মহাবিশ্বের কোথাও কখনো ছিল না। তারপর এক সময় নিজেই হেসে ফেলি। এত আবোল-তাবোল ভাবনা মানুষ কিভাবে ভাবে?

এসপিএসএস মস্তিষ্কের প্রায় ৭৫ শতাংশ অকুপাই করে রেখেছিল যখন এই লেখাটা প্রথমবার লেখা হয়েছিল। নিজেকে মনে হচ্ছিলো একটা ল্যাপটপ আর মস্তিষ্কটাকে তার প্রসেসর। র‍্যামের ওপর চাপ বাড়ছিল কারণ সে সময় থেকেই ধূমপানের হার আবার বেড়ে গিয়েছিল। তখনও যেমন, এখনও তেমন; সময়ের সাথে তাল মেলানোটা কখনও সহজ, কখনও কঠিন- কিন্তু কখনোই অসাধ্য হয় নি, হচ্ছে না।

ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা বলতে আসলে একক কোনো জায়গা ছিল না। একেক সময় একেকটা জায়গা প্রিয় হয়ে দাঁড়াতো। ফার্স্ট ইয়ারের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল আইবিএ ক্যান্টিন।

সেকেন্ড ইয়ারের পুরো সময়টাই সকালের নাস্তা হিসেবে মধুর ঝালফ্রাই খেয়ে কাটিয়েছি। কেন-কিভাবে প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর ক্যাম্পাসে ছুট লাগাতাম, খুব ঠাহর করে বলতে পারছি না। আবছা যে কথাটা মনে আসছে, সেটা হচ্ছে- ভালবাসার মানুষটার টানে। সে প্রতিদিন ভোরবেলা, সাতটা-সাড়ে সাতটার মধ্যে ক্যাম্পাসে চলে আসতো। অনেকটা দূর থেকে। আমাকেও তাই সে সময়ের আগে ক্যাম্পাসে হাজির থাকতে হতো।

আজ সন্ধ্যায়ও একটা সিনেমায় ঠিক এমন একটা দৃশ্য দেখছিলাম। বেকাস্। ২০১২ সালের সিনেমা। দুই কুর্দি শিশুর গল্প। সেই গল্পটায় যাওয়া ঠিক হবে না। শুধু এটুকু বলি, ভোর ছয়টায় প্রেমিকার সাথে দেখা করতে হবে বলে ওই দুই শিশুর মধ্যে বয়সে যেটা একটু বড়, সেটা একটা পরিপূর্ণ রাত পার করে দিলো এক সেকেন্ডও না ঘুমিয়ে! ঠিক যেভাবে একসময় আমি রাত পার করতাম।

তারপর মধুতে গিয়ে মোস্তফা কিংবা রিয়াজকে ঝালফ্রাইয়ের অনুরোধ জানানো, বেশি করে পেয়াঁজ আর কাঁচা মরিচ দিয়ে। তবে কানাইকে পারতপক্ষে আমি খাবারের অর্ডার দিতে চাইতাম না। দেখলেই মনে হতো, ব্যাটার হাইজিন লেভেল খুবই খারাপ। যদিও আমার স্বভাব কোনোকালেই খুঁতখুতে ছিল না, তবে কানাইয়ের ব্যাপারটা ছিল বিশাল ব্যাতিক্রম। ওকে নিয়ে যেসব ডার্টি কৌতুক চালু আছে, তার ১০ ভাগ সত্যি হয়ে থাকলেও কপালে দুর্গতি আছে। জীবনে যে মাঝে মাঝে ওর বানানো চা পান করতে হয়েছে সেজন্য কখনও না কখনও ভুগতে হবে।

তারপর আইবিএ লনের কামরাঙা গাছটার সাথে একবার খুব সখ্যতা হলো। সে সময় অনেকদিন পর্যন্ত আমার প্রিয় গান ছিল- মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলেম। সে দিনগুলোতে আমরা দু'জন সারাটা দিন হাতে হাত রেখে কামরাঙা গাছটার নিচে বসে থাকতাম। আমার ক্লাসে যাওয়াটা কখনোই নিয়মতান্ত্রিকতায় বাঁধা ছিল না। যেসব কারণে ক্লাসে যাওয়া হতো, সেগুলোর তালিকা করা যায় চাইলে। যেমন মিড-টার্ম, কুইজ, প্রেজেন্টেশন, কিংবা একই সময় ওরও যদি ক্লাস থাকতো কিংবা নেহায়েত কোনো কারণ থাকতো; তাহলেই কেবল ক্লাসে যাওয়া হতো। এছাড়া না।

তবে ওর কাছে ক্লাস করাটা খাদ্যগ্রহণ, বিশ্রাম বা প্রার্থনার মতো জীবনের আর পাঁচটা নর্মাল কাজের একটা ছিল। সেই ও-ও একবার বেশ অনেকদিনের জন্য আনমনা হয়ে পড়লো। শুধু আমার সাথে বসে থাকে, আর সারাদিন আমি যা যা করি, ঠিক সেগুলোই করে, তারপর প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমি ওকে বাসায় রেখে আসি। বাসার সামনে নামিয়ে দেয়ার পর পাঁচ মিনিটও পার হয় না। আমি দেখি মোবাইলের স্ক্রীনে ওর নাম্বারটা ভেসে উঠেছে। তারপর থেকে রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত কানে একটা হেডফোন লাগিয়ে সারাটা সময় তার আমার সাথে জড়িয়ে থাকা চাই। খাওয়া-দাওয়া, বাসায় কারও সাথে কথা বলা, টিভি দেখা- কোনোকিছুর সাথে সে নেই। আমার অবস্থাও অবশ্য ভিন্ন ছিল না। সেই নেশাগ্রস্থ সময়টাতে কামরাঙা গাছটা আমাদের দু'জনেরই সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল।

তৃতীয় বর্ষে পড়ার কোনো একটা পর্যায়ে আইবিএ গ্যারেজ আমার প্রিয় জায়গা হয়ে গেল। জীবনের এ পর্যায়ে এসে অবশ্য আমার একার একটা প্রিয় জায়গা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডির ভেতরে। এর আগ পর্যন্ত প্রতিটি জায়গাই ছিল যৌথ পছন্দের। যে তিনটি জায়গার কথা বলেছি, ওগুলোর রাজত্বকাল দীর্ঘ ছিল বলেই উল্লেখ করেছি। ওগুলো ছাড়াও অল্প সময়ের জন্য রাজত্ব করা জায়গার সংখ্যা ছিল অনেক।

তৃতীয় বর্ষে উঠে মূলত চাকুরীর সুবাদে জীবনে নতুন একটা প্যাটার্ণ যোগ হয়েছিলো। সেটা ছিল প্রতি সন্ধ্যায় অফিস শেষে ক্যাম্পাসে আরেক দফা ঢু দেয়া। তবে সে দফায় একা। একজন সঙ্গীর সাথে সারাদিন ঘুরে যাবার পরও, সন্ধ্যায় আবার একা ক্যাম্পাসে ঘুরতে চলে যেতাম আমি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যে আমাকে কতোটা জোরালোভাবে মুঠোবন্দী করেছিল, সেটা বুঝতে পারি এখন এসে। সে সময় ঘোরের মধ্যে ঘুরে বেড়াতাম।

তবে, ওই যে তৃতীয় বর্ষের কোনো একটা সময় থেকে একটু আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম, ওর কাছ থেকে; সেখান থেকেই মূলত আমার একটা আলাদা সত্বার জন্ম হয়েছিল।

তারপর একবার প্রিয় হয়ে উঠলো মুহসীন হলের হট্টমন্দির নামের রুমটা। সমমনা ও সমবয়সী ছেলেদের সাথে আড্ডার একটা দারুণ জায়গা ছিল সেটা। তৃতীয় বর্ষে জন্ম নেয়া আলাদা সত্বাটা এখানে এসে বিকাশে পেল ভরহীনতা।

ততোদিন আমার মাস্টার্স প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কাজের ক্ষেত্রগুলোও এক প্রকার অভিজ্ঞতার জালে আটকা পড়ে সহজবোধ্য, অর্থাৎ সহজে করে ফেলা যায় বা আমি করে ফেলতে পারি- এমন হয়ে উঠেছে।

এর ফলে সুবিধা যেটা পাচ্ছিলাম, সেটা হচ্ছে- বিশ্ববিদ্যালয় শেষের পরে ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না সেটা বুঝতে পারার দরুণ এক প্রকার রিলাক্স মোডে থাকার সুযোগ।

মনের সুখে ওর সাথে ঝগড়া করছিলাম সে দিনগুলোতে। ঝগড়ার মধ্যে কথা না বলা দিনগুলোতে ব্যাপক লাগামছাড়া ঘোরাঘুরি হচ্ছিল। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মধ্য রাতে খুব বাইক ছুটিয়ে মাওয়া ফেরী ঘাটে ইলিশ খেতে যাওয়া হচ্ছিল।

সে সময়টায় ক্যাম্পাসে আমার প্রিয় জায়গাটা ছিল মূলত গ্যারেজ। গ্যারেজটাকে যদি আমরা প্রশান্ত মহাসাগর হিসেবে ধরি, তাহলে আমি যেখানটায় সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে বসতাম ওই জায়গাটার নাম দেয়া যায় মারিয়ানা ট্রেঞ্চ। আমরা ফোনে কাউকে ওই জায়গার কথা বোঝাতে বলতাম, গ্যারেজের গভীরে আছি। সবচেয়ে গভীরে।

তবে, শুধু যে ঝগড়াই হচ্ছিল, তা নয়। মাঝে মাঝে আশুলিয়া কিংবা বেড়িবাঁধ এলাকায় হোন্ডায় করে ঘুরতেও যাওয়া হচ্ছিল। আমার সে সময়ের হোন্ডাটার নাম ছিল কপ্টার। ওই হোন্ডাটাকে ও একটুও পছন্দ করতো না। তবে আমি ভীষণ পছন্দ করতাম। ওটাকে নিয়ে আমাদের দু'জনের মধ্যে নিত্য বচসা চলতো।

সে আমার পিঠে গাল ঠেকিয়ে বসে, আমাকে দু'হাতে জড়িয়ে, আমারই বাহনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে করতে, আমার সাথে ঘুরে বেড়াতো। সে সময় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল। আমাদের চলার পথের শেষ স্টপেজ ছিল উদ্যান। সেখানে একটা চা আর একটা বিড়ি খেয়ে আমরা বাড়ির পথে পা বাড়াতাম, অর্থাৎ বাইক ছোটাতাম।

যাহোক, এসপিএসএস-এর মস্তিষ্কের ৭৫ শতাংশ অকুপাই করে রাখার কথা বলছিলাম। ঘটনাটা ঘটছিল যখন লেখাটা প্রথমবার লেখা হয়েছিল। এখনকার কথা আলাদা। রিসার্চ পেপার জমা দিলাম গত পরশু একটা। ২৬ তারিখ ডেডলাইন আরেকটার। আজ যাচ্ছে ১৭ তারিখ। মাথার ৭৫ শতাংশ এখনও অকুপাইড। শুধু চিন্তার বিষয়বস্তুটা ভিন্ন।

এর মধ্যেই জীবন ঘটে চলছে নিরন্তর। ভাল-মন্দ মিলিয়ে। ছোটবোনটা গতকাল আকাশের তারার মতো ফুটফুটে একটা কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে। সেই পিচ্চিটা আবার জন্মের পরপরই গালে আঙুল ঠেকিয়ে ছবির জন্য পোজ দিয়েছে। ওর যে কি নাম রাখি, বুঝতেই পারছি না একদম।

সময়ও ছুটে চলছে নির্মম গতিতে। ইলমিনাউ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সময় আর খুব বেশিদিন নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন বহুমুখী উপায়ে আটকে রেখেছিল, এ বিশ্ববিদ্যালয়টা তা করে নি। আবার এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পছন্দের জায়গাগুলোর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে ভিন্ন ছিল।

তবে বিচ্ছেদের পর অনেকটা সময় পার হয়ে যাওয়ার কারণে সম্ভবতঃ এখন আমি বুঝতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের সদস্যদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমার প্রথম প্রেমটা হয়ে গিয়েছে। নতুন আর কেউই কখনও পারবে না, ওর মতো করে আমাকে স্পর্শ করতে।

---

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রশীদা আফরোজ's picture


"তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী
অবাক হয়ে শুনি কেবল শুনি..."

মীর's picture


রশীদা আপু, থ্যাংক ইউ Smile

জাকির's picture


অবাক পড়ছিলাম...

মীর's picture


ধন্যবাদ সালমান শাহ Smile

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


ভাগ্নি কেমন আছে? মীরমামা বলে ডাকাডাকি করে?

মীর's picture


ভাগ্নি ভাল আছে। এখন কেবল গোটা কয়েক দুর্বোধ্য শব্দ উচ্চারণ করতে পারে Laughing out loud

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

more efficient in reading than writing. will feel honored if I could be all of your mate. nothing more to write.