ইউজার লগইন

মাস্টার থিসিসের আইডিয়া এবং সংশ্লিষ্ট গালগল্প

মাস্টার থিসিস নিয়ে একটু এক্সাইটেড ফীল করছি। আচ্ছা এক্সাইটেডের বাংলা কি হবে এই ক্ষেত্রে? উত্তেজিত কথাটা যাচ্ছে না। অন্য এক অর্থের হাতছানি দিচ্ছে। এই এক্সাইটেড মানে একটা কিছু শুরু করার উত্তেজনা। একটা কিছু যেটাকে নিয়ে আগামী ছয়টা মাস কাটাতে হবে। যেটার পরিকল্পনায় করা প্রতিটি ভুল পরবর্তীতে কাউন্ট হবে। প্রতিটি সঠিক সিদ্ধান্তও কাউন্ট হবে। খানিকটা উত্তেজিত বোধ না করে উপায় কি?

আগের লেখায় খানিকটা বলেছিলাম থিসিসের আইডিয়া সম্পর্কে। কাল বেলা সাড়ে বারোটার দিকে যখন হেঁটে হেঁটে ক্যাম্পাসের একমাত্র কপি-শপটার দিকে যাচ্ছিলাম আইডিয়া প্রিন্ট আর স্পাইরাল বাইন্ডিং করাতে, তখন মনে হচ্ছিল সিথ্রিপিও কিংবা কে-টুএসও-দের মতো আমার যদি একটা নিজস্ব প্রটোকল ড্রয়েড (সহযোগী রোবট) থাকতো, তাহলে সেটা নিশ্চই প্রফেসরের কাছ থেকে আইডিয়া অনুমোদন করানোর সম্ভাবনা উল্লেখ করার এমন দারুণ সুযোগ ছাড়তো না। স্টার ওয়ার্সের যে কয়টা ন্যারেটিভ ম্যাগনেট রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে প্রটোকল ড্রয়েডদের সুযোগ পেলেই যেকোন মিশনে তার প্রভুর সাফল্য লাভের সম্ভাবনা কত কম তা পটাপট উল্লেখ করে দেয়ার বিষয়টা আমার খুবই পছন্দের। ন্যারেটিভ ম্যাগনেট বলতে মূলত সেই সব বিষয়গুলো বুঝিয়েছি যেগুলো পাঠক বা দর্শককে একটা গল্পের সাথে চুম্বকের মতো ক্রমাগত টানতে থাকে।

তবে গল্প বলার ধরণে যে বিশাল পরিবর্তনটা এখন এসেছে সেটাও আমি পছন্দ করি ভীষণ। হালের ওয়েস্টওয়ার্ল্ড নামক টিভি সিরিজটার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে উদাহরণ হিসেবে। ইদানীং এই একটা ট্রেন্ড খুব চালু হয়েছে। এখন আর গল্প বলা বা দেখানো হয় না। গল্পের একটা পৃথিবী বানিয়ে দেয়া হয়। সেখানকার চরিত্রগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো চলাফেরা করে। প্রত্যেক পাঠক বা দর্শক নিজেদের মতো করে সেই গল্পের জগতকে উপভোগ করতে পারে। এই ট্রেন্ডটাকে বলা হচ্ছে স্টোরি ওয়ার্ল্ডিং। প্রায় সবখানেই স্টোরি টেলিং সরে গিয়ে ধীরে ধীরে জায়গা করে দিচ্ছে স্টোরি ওয়ার্ল্ডিংকে। সবচেয়ে বেশি ঘটছে ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে (ভিআর)

যদিও গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে একটা আর্গুয়েবলি এক্সেপটেড সত্য হচ্ছে, ভিআর-এর জনপ্রিয়তার নেপথ্য কারিগর হচ্ছে ভিডিও গেমস্। আর্গুয়েবলি এক্সেপটেড মানে হলো যার পক্ষে-বিপক্ষে দুই দিকেই তথ্য-প্রমাণ রয়েছে কিন্তু বিজ্ঞানীরা শেষ পর্যন্ত বিগ পিকচারটির দিকে তাকিয়ে একটা সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। তবে ভিআর-এর ক্ষেত্রে ভিডিও গেমস্ হচ্ছে আইসবার্গের টিপ। টাইটানিকের কথা নিশ্চই মনে আছে? সিনেমায় দেখানো গল্প অনুযায়ী, সময়মতো যদি দুই নাইটগার্ড ওই টিপটা দেখে জাহাজের ক্যাপ্টেনকে সতর্ক করতে পারতো তাহলেই জ্যাক আর রোজকে বিচ্ছিন্ন হতে হতো না। সলিল সমাধিও ঘটতো না হাজার দুয়েক মানুষের।

যাহোক্ বলছিলাম ভিআর-এর অন্যান্য উপযোগিতার কথা। সিরিয়াসলি; ইদানীং ভিআর কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া, প্রশিক্ষণ ইত্যাদির মতো ক্ষেত্রগুলোতে ব্যপকহারে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাও আবার সফলভাবে। যেসব জায়গায় মানুষের পক্ষে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ এবং খুব বেশি ব্যয়সাধ্য, সেখানে ভিআর ব্যবহার করে গণহারে যাওয়ার বা অভিজ্ঞতা নেয়ার সুযোগ তৈরি করা আজকাল কঠিন কিছুই না। এতে করে জানমালের ওপর ঝুঁকিও কমে, আবার ব্যয়ও হয় যৎসামান্য। এটাই ভিআর-এর সবচেয়ে বড় উপযোগ। বিষয়টা একটু জটিল মনে হচ্ছে কি? আচ্ছা সহজ একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছি।

যেমন, আমি যদি এখন নায়াগ্রা জলপ্রপাতের ওপর বসে এক মগ কফি আর একটা ধূম্রশলাকা পান করতে কেমন লাগে তা জানতে চাই তাহলে আমাকে কি করতে হবে? নানাবিধ ভিসা জটিলতার সম্মুখীন তো হতে হবেই, তার ওপর আছে নায়াগ্রার চূড়ায় চড়ার শারীরিক শ্রম। সেটাকে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে কমিয়ে আনতে গেলে পোড়াতে হবে ফসিল ফুয়েল। অথচ এই সব কাজ বাসায় বসে একটা মাত্র হেডসেট, যেটাকে ভিআর-এর ভাষায় বলা হচ্ছে এইচএমডি (হেড-মাউন্টেড ডিসপ্লে; যেমন অকুলাস রিফট্, গুগল কার্ডবোর্ড ইত্যাদি), ব্যবহার করে অনায়াসে করে ফেলা সম্ভব। নোজপিসের মাধ্যমে নাকে কফির গন্ধ এবং হ্যাপটিক গ্লোভসের মাধ্যমে কফি-মগ বা সিগারেট স্পর্শের অনুভুতিও লাভ করা সম্ভব। রইলো বাকি সত্যিকারের কফি বা সিগারেট পান করার বিষয়টুকু কেবল!

শিক্ষাক্ষেত্রে ভিআর খুলে দিয়েছে অবারিত সুযোগের দুয়ার। ভিআর আমাদেরকে এখন এমন সব শিক্ষা উপকরণ দিতে সক্ষম যেগুলো বইয়ের পাতায় আঁটানো সম্ভব না। কিছু একটা করার মাধ্যমে শেখার কথা বলছি। যেটাকে আদর করে কন্সট্রাকটিভ লার্নিং নামে ডাকেন শিক্ষা-বিজ্ঞানীরা। এর একটা দারুণ উদাহরণ হচ্ছে স্ট্যানফোর্ডের ওশান এসিডিফিকেশন স্টাডি। মানুষ প্রতিদিন ৩৮.২ বিলিয়ন টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন করে নানা উপায়ে। তার ৩০ শতাংশ আবার বেলাশেষে গিয়ে সমুদ্রের জলে মেশে। এভাবে চলতে থাকলে খুব সম্ভবত আমাদের নাতি-পুতিদের সময় থেকেই সাগরের মাছ হারিয়ে যাবে চিরতরে। শুধু মাছ নয়, আরও অনেক কিছুই হারিয়ে যাবে সেই সাথে। সমুদ্রের প্রাণ বৈচিত্রে চলে আসবে বিপুল পরিবর্তন। 'স্ট্যানফোর্ড ওশান এসিডিফিকেশন এক্সিপিরিয়েন্স' নামক গবেষণাকর্মটি মূলত এই বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে করা। বিষয়টা এখনও খুব বেশি মানুষ জানে বলে মনে করা হয় না। তবে যারা জানেন এবং যারা এ বিষয়ে কিছু করার ক্ষমতা রাখেন, অন্তত জনসচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে, তাদের অনেকেই এটাকে 'গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর ইভিল টুয়িন' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

যাহোক বলছিলাম কন্সট্রাক্টিভ লার্নিং এর কথা। কেমন হতো যদি সাগরের তলদেশে গিয়ে এসিডিফিকেশনের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়-ক্ষতি নিজ চোখে দেখে আসা যেতো? নিজের চামড়ায় সেই অনুভূতি নিয়ে আসা যেতো? এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই মেরিন সায়েন্টিস্ট ফিও মেচেলি দিনের পর দিন কাটিয়েছেন ইতালির ইস্কিয়া দ্বীপে। যেখানে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট একটি ভলকানিক জানালা দিয়ে ক্রমাগত কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ ঘটছে। আর তা মিশে যাচ্ছে সমুদ্রের পানিতে। সাগরের নিচে ফিও মিচেলির সময় কেটেছে প্রবাল প্রাচীর আর স্থানীয় জীববৈচিত্রের ছবি, ভিডিও ইত্যাদি সংগ্রহ করে। পুড়িয়েছেন অজস্র অক্সিজেন-ট্যাংক সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে গিয়ে। দিনশেষে তুলে এনেছেন ইস্কিয়া সংলগ্ন সাগরের তলদেশের একটি পরিপূর্ণ চলচ্চিত্র। যেটাকে ব্যবহার করে স্ট্যানফোর্ড একটা ত্রিমাত্রিক শিক্ষা উপকরণ তৈরি করেছে যা অকুলাস রিফট্ বা এইচটিসি ভাইভের সাহায্যে ব্যবহার করা সম্ভব। একবার মাথায় ওই হেডসেটগুলোর একটা চাপিয়ে ফাইলটা চালিয়ে দিলে স্বয়ং ফিও মিচেলির একটি অ্যাভাটার আপনাকে নিয়ে যাবে ইস্কিয়া দ্বীপের সাগরের তলদেশে। আপনাকে হাতে ধরে ধরে দেখাবে সেখানকার প্রাণবৈচিত্র এবং তাদের বর্তমান অবস্থা। তারপর সময়কে ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে দেখাবে, একই জায়গার অবস্থা আজ থেকে ৫০ বছর পর কি দাঁড়াবে এবং ১০০ বছর পর কি দাঁড়াবে। সাগরের পানিতে অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশে সেটা কিভাবে সেখানকার প্রাণব্যবস্থা ধ্বংস করবে। আপনি ওই ভলকানিক জানালার যত কাছে যাবেন, তত ধীরে ধীরে সময় এগিয়ে যেতে থাকবে ৫০ থেকে ১০০ বছর ভবিষ্যতের দিকে। ভলকানিক জানালার উপর দাঁড়িয়ে আপনি দেখতে পাবেন আপনার নিজের শরীরের চামড়া-মাংস-হাড়ও ধীরে ধীর উবে যাচ্ছে কর্পূরের মতো। পরিবেশে অতিরিক্ত মাত্রায় কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশে থাকার কারণে।

এখন এই রকম একটা সক্রিয় শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করে যদি পৃথিবীর মানুষকে ওশান এসিডিফিকেশন সম্পর্কে সচেতন করে তোলা যায়, তাহলে বিষয়টা ঠেকানো কতোটা সহজ হবে একবার ভেবে দেখেন। হয়তো ভাবছেন গরীব আমজনতা যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, তাদের আবার সচেতনতা, তাও আবার হেডসেটের মাধ্যমে! আ মরে যাই। আচ্ছা, এ বিষয়ে কথা বলবো সব শেষে। তার আগে চলুন দেখি ভিআর আর কি কি ভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়।

ওশান এসিডিফিকেশনের মতো ভিআর-এ ব্যবহারযোগ্য অসংখ্য শিক্ষা উপকরণ এখন আমাদের হাতে আছে। সেগুলো ব্যবহার করে এলিমেন্টারি স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর কথা ভাবা হচ্ছে। কিছু কিছু জায়গায় কাজও শুরু হয়ে গেছে। কোনো পাঠ্যবইয়ে এ ধরনের শিক্ষা উপকরণ সংযোজন কিন্তু সম্ভব না।

এরপর রয়েছে শিক্ষকদেরকে অনেকরকম সুপারপাওয়ার দেয়ার সম্ভাবনা। এটা বুঝতে হলে জানতে হবে ভিআর কিভাবে কাজ করে। আশির দশকের প্যাক-ম্যান গেমের মতোই, এটা প্রথমে মানুষের বডি মুভেমন্ট (যেকোন রকম শারীরিক নড়াচড়া) ট্র্যাক করে। ইদানীং খুব ভাল ভাল যন্ত্র বের হয়েছে এই কাজের জন্য। যেমন মাইক্রোসফটের কাইনেক্ট। এই যন্ত্রটা কোনো সেন্সর ছাড়াই মানুষের শরীরের ২৪ টা পয়েন্ট ৩০ ফ্রেম পার সেকেন্ড স্পীডে ট্র্যাক করতে পারে। যতক্ষণ খুশি ততক্ষণ। তারচেয়েও বড় কথা, ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত পুরো ডাটাই সহজে সংরক্ষণ এবং পরে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। আসছি কাইনেক্টের কর্মপন্থা কেন আলাদা করে উল্লেখ করলাম, সেটাতেও পরে।

বডি ট্র্যাকিংয়ের পর আসছে দ্বিতীয় পর্যায় যেখানে ভিআর নতুন করে সেই বডিটা আঁকে। প্যাক-ম্যান আমাদের মুভমেন্ট ট্যাক করতো প্রথমদিকে কম্পিউটার 'কী' এবং পরের দিকে জয়স্টিকের মাধ্যমে। ট্র্যাকিংয়ের পর তার প্রোগ্রামে সিগন্যাল পাঠাতো আমাদের আঙুল কী-বোর্ডের রাইটঅ্যারোতে নাকি লেফটঅ্যারোতে হিট করেছে, কিংবা আমাদের কব্জি ডানে নাকি বামে মুভ করেছে- সে ব্যপারে। সেই অনুযায়ী সে ডানে বা বামে একটা করে পিক্সেল আঁকাতো। আর আমাদের গেম-ক্যারেক্টার সেইদিকে সরে যেতো। ভিআর এই কাজটাকেই করে এক বিশাল স্কেলে। প্রথমে সে দেখে আমাদের শরীরটা কোনদিকে যাচ্ছে, তারপর সে অনুযায়ী শরীরটাকে আঁকে এবং সবশেষ পর্যায়ে (এটা হচ্ছে তৃতীয় পর্যায়) গিয়ে সে সেই নতুন করে আঁকা ছবিটা যেটা আসলে একটি ঘটমান চলচ্চিত্র, সেটা প্রদর্শন করে দর্শককে বা বলা যায় ব্যবহারকারীকে। এবং এই চক্র ক্রমাগত ঘুরতে থাকে। সেকেন্ডে নূন্যতম ৬০ থেকে ৭৫ বার। ব্যবহারকারী যদি এক পা সামনে যায়, তাহলে ভিআর ছবিটা নতুন করে আকাঁয় যেখানে সবকিছু এক পা পেছনে পড়ে থাকে। ব্যবহারকারী যদি ডানে তাকায় তাহলে ভিআর সবকিছু এমনভাবে আঁকে যাতে ব্যবহারকারী তার ডানে কি ঘটছে তা দেখতে পায়।

তাহলে ভিআর ব্যবহার করে শিক্ষকদের সুপারম্যান বানানো সম্ভব কিভাবে? বলছি। ভিআর যখন বডি মুভমেন্ট ট্র্যাক করে একটা নতুন ছবি আঁকে, ঠিক সেই সময়ই কিন্তু সেটাকে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা সম্ভব। যেমন, গবেষণায় দেখা গেছে শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীদের সাথে বেশি বেশি আই-কন্ট্রাক্ট করতে পারেন তাহলে শিক্ষার্থীরা বেশি মনোযোগি হয় তার প্রতি। তবে এই ক্ষেত্রে একটা সমস্যা হলো, ৬০ জনের একটা এক ঘন্টার ক্লাসে গড়ে একজন ছাত্রের সাথে এক মিনিটের বেশি আই-কন্ট্রাক্ট করা সম্ভব না। এ জায়গাতেই উন্নতি করা সম্ভব ভিআর-এ। মনে রাখতে হবে ভিআর-এ শিক্ষক আর ছাত্র সবাই একটা কাল্পনিক পরিবেশের মধ্যে আছে। যার অর্থ হলো সবাই আসলে আছে নিজের নিজের বাসা কিংবা অফিসেই; কিন্তু হেডসেট এবং অন্যান্য যন্ত্র তাদেরকে একটা কাল্পনিক ক্লাসরুমে একত্রিত করেছে। যেখানে একজন পড়াচ্ছেন এবং একদল শিক্ষার্থী পড়ছে। বা বলা যায় একজন শিক্ষক লেকচার দিচ্ছেন, অন্যরা তা শুনছে। সবার একটা করে অ্যাভাটার সেই ক্লাসরুমটায় উপস্থিত, যারা বাস্তব জগতে সেই ব্যক্তিটি যা করছেন তাই উপস্থাপন করছে ক্লাসরুমে। বাস্তবে কেউ মাথা নাড়ালে তার অ্যাভাটার ক্লাসরুমে মাথা নাড়ছে, বা হাত নাড়ালে হাত নাড়ছে, বা নাক চুলকালে নাক চুলকাচ্ছে- এমন আর কি।

এখানে শিক্ষকের যে চলচ্চিত্রটা প্রতিনিয়ত ভিআর-এ আঁকা হচ্ছে, সেটাকে একটু পরিবর্তন করে প্রত্যেক ছাত্রের সাথে আই-কন্ট্রাক্টের মাত্রা যেকোন হারে বাড়ানো সম্ভব। সম্ভব অন্যান্য হিউম্যান সাইকোলজি গবেষণায় পাওয়া শিক্ষাক্ষেত্রে উপকারী আবিস্কারকে কাজে লাগানোও। যেমন মিমিক করা। গবেষণায় পাওয়া গেছে, আপনি যদি কাউকে মিমিক করেন তাহলে সে আপনাকে অন্যদের তুলনায় বেশি নিকটবর্তী এবং স্মার্ট ভাববে। একজন শিক্ষকের পক্ষে ক্লাসের ৬০ জন ছাত্রকে মিমিক করা বাস্তবে হয়তো সম্ভব না কিন্তু ঠিক আগের মতো উপায়ে ভিআর-এ খুবই সম্ভব। এই যে বাস্তবকে একটুখানি পরিবর্তন করে ভিআর-এ প্রয়োগ করা হচ্ছে একে বলে টিএসআই (ট্রান্সফর্মড সোশ্যাল ইন্টারঅ্যাকশন, বাংলায় পরিবর্তিত সামাজিক মিথস্ক্রিয়া)। আর ভিআর ব্যবহার করে শিক্ষক-ছাত্র সব মিলিয়ে পুরো ক্লাস একটা কাল্পনিক ক্লাসরুমে একত্রিত হওয়াকে বলা হচ্ছে সিভিই (কোলাবোরেটিভ ভার্চুয়াল এনভায়রনমেন্ট, বাংলা অর্থ দাঁড়াচ্ছে অনেকটা- সম্মিলিত কাল্পনিক পরিবেশ)। সিভিই-তে টিএসআই ঠিকমতো কাজে লাগানো গেলে অনেক অসাধ্যই সাধন করা সম্ভব। যেমন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আই-কন্ট্রাক্ট বাড়ানো, মিমিক করার হার বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা অমনোযোগী তাদের বিভিন্ন উপায়ে মনোযোগী করে তোলা ইত্যাদি। এভাবেই শিক্ষকদেরকে যেমন একেকজন সুপারম্যান করে তোলা সম্ভব, তেমন পুরো ক্লাসের সম্মিলিত ফলাফলেও আনা সম্ভব বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সবাইকে সমানভাবে দক্ষ এবং স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ করে তোলা সম্ভব যেকোন বিষয়ের ওপর। যদি সবগুলো উপাদানকে আমরা ঠিক ঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারি।

উপাদানের কথা যেহেতু এলোই, আসুন দেখি আমাদের গ্রেডিং সিস্টেমের বর্তমান অবস্থা। এখনকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গ্রেডিং সিস্টেমগুলোতে সাধারণত কয়টি ডাটা পয়েন্ট থাকে? দুইটা পরীক্ষা, দুইটা প্রজেক্ট আর হয়তো একটা প্রেজেন্টেশন। যেসব ক্লাস একটু বিস্তৃত, সেখানে হয়তো আরও দু'টো প্রজেক্ট কিংবা থাকে একটা বাড়তি পরীক্ষা। এই পাঁচ থেকে আটটা ডাটা পয়েন্ট দিয়ে মূলত একজন শিক্ষার্থীর পুরো সেমিস্টারের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হয়। একজনের জীবনের একটা খারাপ দিন কিন্তু এখানে বিশাল নেতিবাচক ভূমিকা ফেলতে সক্ষম। আবার কেউ কেউ শুধু ডাটা পয়েন্টগুলোতে ভাল করার কৌশল শিখেই ভাল গ্রেড নিয়ে বের হয়ে যেতে পারে। আদতে কোর্সের মূল বিষয়ের প্রায় কোনোকিছু না শিখেই। এই সংকটগুলো মোকাবেলায় ভিআর ব্যবহার করা কি সম্ভব না?

খুবই সম্ভব। এখন আমাদের আছে থ্রি-ডি স্ক্যানার- কাইনেক্ট। এটা কিভাবে কাজ করে তা একটু আগে উল্লেখ করেছিলাম মূলত এখনকার এই আলোচনায় ব্যবহারের জন্য। যাহোক্ পাইথন বা ম্যাটল্যাবে (কম্পিউটার কোডিংয়ের সফটওয়্যার) লেখা একটা ১৫ লাইনের কোড দিয়ে কিন্তু গ্রেডিং সংক্রান্ত সংকট মিটিয়ে ফেলা সম্ভব পুরোপুরি। যদি এমন একটা কোড লেখা হয়, যেখানে মানুষের বডি মুভমেন্ট কি বলছে সেটা বিশ্লেষণের ব্যবস্থা থাকে, যেমন- কোন মুভমেন্ট নির্দেশ করছে ছাত্র অমনোযোগী, কোন মুভমেন্ট নির্দেশ করছে সে কিছু বুঝছে না, কিংবা কোনটি নির্দেশ করছে সে ঠিকমতো বুঝতে পেরেছে বিষয়টা; তাহলেই সেমিস্টার শেষে কাইনেক্টে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে শিক্ষার্থীদেরকে স্বয়ংক্রিয় গ্রেড দিয়ে দেয়া সম্ভব। স্ট্যানফোর্ডের ভার্চুয়াল ল্যাব এটা করেও দেখিয়েছে। এ ধরনের প্রোগ্রাম লেখাও সম্ভব, এবং তা দিয়ে একজন ছাত্রের বডি মুভমেন্ট বিশ্লেষণ করে সে সেমিস্টার শেষে কি গ্রেড পাবে তা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সঠিকভাবে বলে দেয়াও সম্ভব।

রইলো বাকি এ ধরনের গ্রেডিংয়ের ব্যাপারে ছাত্র ও শিক্ষক সমাজের মনোভাব কি সেটা খতিয়ে দেখা। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কেউ সেভাবে কোনো কাজ করেছে বা করছে বলে জানা যায় না। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কপি-শপ থেকে এই আইডিয়াটাই প্রিন্ট করে নিয়ে গিয়েছিলাম প্রফেসরের সাথে আলাপ করতে। গিয়ে জানতে চেয়েছিলাম, একটা সোশ্যাল রিসার্চ ডিজাইন করে ভিআর-এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গ্রেডিং সম্পর্কে ছাত্র ও শিক্ষক সমাজের মতামত কি তা পরীক্ষা করে দেখলে কেমন হয়? আমার নিজস্ব প্রিন্টার নেই। তাই প্রত্যেকবার কিছু প্রিন্ট করতে হলে পাহাড়ের ওপরের ওই দোকানটায় যেতে হয়।

প্রফেসর আইডিয়া পছন্দ করেছে, আমাকে দ্রুতই একটা 'এক্সপোজে' লিখে জমা দিতে বলেছে। তাই শুরুর দিকে বলছিলাম মাস্টার থিসিস নিয়ে খানিকটা এক্সাইটেড ফীল করছি। বছরান্তের স্টার ওয়ার্স ফ্র্যাঞ্চাইজির একটা করে মুভি রিলিজের উপলক্ষ ছাড়া তো আজকাল প্রায় আর কোনো কারণেই উত্তেজিত বোধ করা হয় না। সে কারণেই বোধহয় এ উত্তেজনাটা ভালো লাগছে। খারাপ লাগছে না।

যাহোক্ শেষ করি দারিদ্র আর ভিআর-এর মধ্যে একটা যৌক্তিক যোগসূত্র টানার প্রচেষ্টা দিয়ে। না, আজ থেকে ২০ বছর আগে কারো হাতে মোবাইল ছিল না কিন্তু আজ হাতে হাতে মোবাইল ও ফেসবুক- টাইপের ক্লিশে বক্তব্য দেবো না। আমার আগের লেখায় যেটা বলেছিলাম সেটাই আবার বলবো। মানুষ মূলত দুই প্রকার। একদল দাতা, একদল গ্রহীতা। বিজ্ঞানীরা বাই ডিফল্ট দাতা শ্রেণীভূক্ত। তারা নিজেদের শ্রেণীগত জন্মের শুরু থেকেই আমাদেরকে প্রতিনিয়তই কিছু না কিছু দিয়েছেন, এখনও দিচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও দিয়ে যাবেন। তাদের আবিস্কারকে বাস্তবে কতটুকু কাজে লাগানো যায়, সেটা পরখ করে দেখার দায়িত্ব বড় বড় প্রতিষ্ঠানের। রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্ভব হলে তো ভাল। নাহলে পৃথিবীর বড় বড় রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো প্রতিষ্ঠানও এখন আমাদের আছে। তাই ওশান এসিডিফিকেশন বা জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র বা অশিক্ষা- কোনকিছুকেই আমরা এখন ভয় পাই না। গুগল, ফেসবুক, স্যামসাং, সনি সবাই তাদের মেজর রিসোর্সটা এখন ভিআর-এর উন্নয়নে ঢালছে। প্রতিযোগিতাটা এখন এদের মধ্যে কোন প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে আমাদের মাথায় হেলমেট পড়াবে সেটা নিয়ে। দেখা যাক কি হয়!

বিস্তর গালগল্প হলো আমার থিসিস আইডিয়া এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়বস্তু নিয়ে। ভবিষ্যতে এসব বিষয়ে আরও আলোচনা করার আশা রাখি। সে পর্যন্ত ভাল থাকেন সবাই। শুভকামনা।

---

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

more efficient in reading than writing. will feel honored if I could be all of your mate. nothing more to write.