ইউজার লগইন

যুদ্ধ শান্তি

কোনো যুদ্ধ কি সমর্থনযোগ্য? বৃহত্ত্বর জাতীয়তাবাদী প্রেক্ষাপটে ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে মুক্তির আকাঙ্খায় জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রগুলোতে সময়ের সাথে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটেছে। ঔপনিবেশিক শাসকদের নিজস্ব সুযোগ সুবিধা বিবেচনা করে তাদের কুটনৈতিকেরা যেভাবে লাল-নীল-সবুজ পেন্সিলে সীমারেখা এঁকে অসভ্য উননাগরিকদের বসতিবিভাজন করেছিলেন, মানচিত্রের বিভাজন রেখাগুলো রক্ত আর লাশের স্তুপে স্পষ্ট হয়েছে তবে উননাগরিকেরা কয়েক দশক পরেও আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার অর্জন করেন নি, সম্পূর্ণ নাগরিক হয়ে উঠতে পারেন নি।
চিহ্নিত সীমানার এপাশে ওপাশে খুব বেশী সাংস্কৃতিক বিভাজন ছিলো না, প্রতিবেশী মানুষের অনায়াস গতায়ত ছিলো। ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতার বদলে নাব্যতার সুবিধা পেতে নদীর দু-পারকে নিজের অধিকারভুক্ত রেখে পাশ্ববর্তী মানুষগুলোকে অদৃশ্য পাহাড়ের সাথে বেধে রাখা ঔপনিবেশিক সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতপরিস্থিতি তৈরী করে রেখেছে।
আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ, প্রাচীন নগরীর সাথে বর্ধিষ্ণু গঞ্জের নগর হয়ে ওঠার সংগ্রাম, অসম উন্নয়নের প্রেক্ষিতে সামষ্টিক ক্ষোভের রাজনৈতিক প্রকাশ। প্রতিটি জাতিসত্ত্বার নিজস্ব বিকাশের শর্ত পূর্ণ হতে যদি তাদের বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক ভূখন্ড প্রয়োজন হয়, তাদের স্বাধীকার- স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে সমর্থন করতে হবে।
দুর্বল জাতিসত্ত্বার আত্মনিয়ন্ত্রনের রাজনৈতিক আন্দোলন শক্তিশালী জাতিসত্ত্বার দৃষ্টিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী- সার্বভৌমত্ববিনাশী রাজনৈতিক অভিলাষ। প্রাচীন নগরীর হর্তা-কর্তারা কামানের গোলায় বর্ধিষ্ণু নগরের জনরোষ দমান, এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবনতা দমন করতে শক্তিশালী সেনাবাহিনী পাঠান। সে সেনাবাহিনীতে বর্ধিষ্ণু নগরীর সন্তানেরাও থাকে, তারাও সগোত্রে গোলাবর্ষণ করেন। অসংখ্য নাগরিক পরিচয়ে ক্রমাগত পিষ্ট হতে থাকা আধুনিকতা সহনশীল নৃশংসতার পক্ষপাতি।
কোনো যুদ্ধই সমর্থনযোগ্য না। শেষ পর্যন্ত কল্পিত সার্বভৌম রেখার এপাশে ওপাশে মানুষেরাই মরে যায়। বীর কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহী যে পরিচয়ই দেওয়া হোক না কেনো, তারা আমাদেরই স্বজন, আমাদের আত্মজ।

স্বাধীনতা অথবা স্বাধীকার, সংস্কৃতি চর্চার অবারিত সুযোগ না কি নিজের সংস্কৃতি অক্লেশে, অনায়াসে অন্য সংস্কৃতির উপরে চাপিয়ে দেওয়ার স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা- প্রতিবেশী মানুষদের সৌহার্দ্য বজায় রাখার পথ খুঁজছে সময়।

আমাদের শৈশবের সাথে লেপ্টে আছে রক্তের দাগ। প্রতিদিন রাতের খবরে ইরান-ইরাক- আফগানিস্তান- লেবানন-বৈরুত-শ্রীলংকার লাশের টালি রেখা আঁকা শেষ হওয়ার পর আমরা রাতের খাওয়া শেষে ঘুমাতে যেতাম। প্রতিদিন সকালের সংবাদপত্রে রক্তের কালচে দাগ এড়িয়ে আমরা খেলার সংবাদ পড়তাম।

তামিলদের সাথে সিংহলীদের অনতিক্রম্য সাংস্কৃতিক ব্যবধান ছিলো এমনটাও বলা কঠিন তবে আমার তামিল সহপাঠিনী আমার সিংহলী সহপাঠিনীকে ঘৃণা করতো। তাদের কখনও পাশাপাশি দাঁড়াতে কিংবা হাসি বিনিময় করতে দেখি নি আমি। শুধুমাত্র জাতীগত পরিচয়কে কেন্দ্র করে প্রায় অপরিচিত দুইজন মানুষ পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস পুষে রাখছে কিংবা স্পষ্ট ঘৃণা কিংবা অপছন্দ প্রকাশ করছে।

আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী উন্মাদনাকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে যদি অসংখ্য জাতীয়তাকেন্দ্রীক রাষ্ট্র কিংবা রাজ্য গড়ে উঠে পৃথিবীর সব জায়গায়, আদিম গোত্রকেন্দ্রীক সমাজ ব্যবস্থার বাইরে এটা কি নতুন কোনো সমাজ কাঠামো নির্মাণ করতে পারবে? এসব সংস্কৃতিক সুষমতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সার্বভৌম অঞ্চলগুলো কি আদৌ নিজেদের জনসংখ্যার সকল নাগরিক চাহিদা পুরণ করতে সক্ষম হবে? সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখার যুদ্ধযাত্রার আয়োজনের খরচ যদি শূণ্যও ধরে নেই, এইসব বিচ্ছিন্ন ভৌগলিক অঞ্চলগুলো কি অর্থনৈতিক বিবেচনায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারবে? সকল স্বাধীনতা আন্দোলন কি "ইকোনমিক্যালী ফিজিবল" বিকল্প?

বৃহত্বর কোনো ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামো যেখানে প্রতিটি সংস্কৃতি অবারিত বিকশিত এবং চর্চিত হতে পারে, সকল নাগরিক সমান নাগরিক সুবিধা এবং অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে এবং যে রাষ্ট্রকাঠামো অর্থনৈতিক বিবেচনায় স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে,এমন রাষ্ট্রকাঠামোর বিপরীতে ক্ষুদ্রতর ভৌগলিক পরিসরে যার অর্থনৈতিক পরিণতি সংশয়াচ্ছন্ন- সেখানে স্বাধীন সার্বভৌম অঞ্চল তোলার আন্দোলন কোনটা অধিকতর যৌক্তিক- এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।

ধর্ম- সংস্কৃতি- জাতীয়তাবাদ প্রশ্নের মীমাংসা না হওয়ায় অসংখ্য স্বপ্ন- সম্ভাবনার কবর খুঁড়ে সার্বিয়া-বসনিয়া-ক্রোয়েশিয়া বিচ্ছিন্ন হয়েছে। কয়েক প্রজন্ম একই রাষ্ট্রের কাঠামোতে বসবাস করে সেসব আন্তঃগোত্র সম্পর্ক নির্মিত হয়েছিলো, অর্থনৈতিক এবং হৃদয়বৃত্তিক কারণে যেভাবে সাংস্কৃতিক সম্মিলনের প্রেক্ষাপট তৈরী হয়েছিলো, সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার ঝোঁক সকল সম্পর্ক ভেঙে নতুন বাস্তবতা নির্মাণ করেছে। গণকবর খুঁড়ে লাশের পরিচয় অনুসন্ধানে ব্যস্ত করণিক কালচে হাড়ে নাম ঠিকানা লিখে রাখছে।

আফগানিস্তান- ইরাক- সিরিয়া- লিবিয়া- অসংখ্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় , আন্তঃগোত্রীয় এবং আন্তঃধর্মীয় সংঘাত, জাতিগত সহিংসতার ভেতরে আমাদের বসবাস। প্রতিটি বেসামরিক মৃত্যু একই রকম হৃদয়বিদারক। এমন নৃশংস প্রেক্ষাপটে নতুন একটি যুদ্ধের সম্ভাবনায় জাতীয়তাবাদ মাপার সূচক অনুসন্ধান হৃদয়বিহীন বীভৎসতা।

কাশ্মীরের স্বাধীনতার আকাঙ্খা, বেলুচিস্তানের জনগণের স্বাধীনতা এবং স্বাধীকারের আকাঙ্খার সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক স্বাধীকারের আকাঙ্খার কোনো ভিন্নতা নেই। প্রতিটি আকাঙ্খার নৈতিক ন্যায্যতা আছে। আমরা পাহাড়ে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছি, ৪ ব্যাটলিয়ন সৈন্য পাঠিয়ে জুমচাষের জমি থেকে অধিবাসীদের উচ্ছেদ করে অভিবাসীদের প্রতিষ্ঠিত করেছি আমরা। অবহেলিত পার্বত্যাঞ্চলের উন্নয়ন মূলতঃ আমাদের সেনা আগ্রাসনের মসৃণ পথ নির্মাণ। সেনা ছাউনিগুলোর ভেতরে ত্বরিৎ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার লক্ষে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেসব পদক্ষেপ গ্রহনের আগে পাহাড়ের আদিবাসীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো প্রয়োজন মনে করে নি রাষ্ট্র। তাদের মতামত এবং আকাঙ্খাকে বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা না দেখিয়ে আমরা পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলেছি।

ভারত- পাকিস্তান যুদ্ধে কোনো পক্ষকে সমর্থনের কোনো যৌক্তিকতা আমি দেখছি না। গণমাধ্যমে লাশের স্তুপ দেখে বেড়ে উঠেছি আমি, সেসব লাশের খোলা চোখে অসংখ্য স্বপ্ন আর আকাঙ্খা ছিলো। যুদ্ধ অমানবিক নৃশংসতা। একদল মানুষকে অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ দিয়ে কয়েকটি শব্দ শিখিয়ে দিলে এরা সেসব শব্দের ভিত্তিতে প্রতিটি হত্যাকান্ডের বৈধ্যতা খুঁজে পাবে। রাষ্ট্র- স্বাধীনতা- সার্বভৌমত্ব- এবং এমন নানাবিধ শব্দের আড়ালে এরা আসলে প্রশিক্ষিত খুনী।

কাশ্মীর, বেলুচিস্তান কিংবা প্যালেস্টাইনের সংঘাত সেসব স্থানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে ঔপনিবেশিক শাসকদের অবাস্তবায়িত প্রতিশ্রুতির উপজাত। শাসনক্ষমতার দক্ষতা বাড়াতে যেভাবে মানচিত্রগুলোকে বিভিন্ন বর্গে সজ্জিত করা হয়েছিলো, সাধারণ নাগরিক কেন্দ্রের সাথে নিজের আনতি নির্ধারণ করেছে সময়ের সাথে, তবে কোনো সীমান্ত রেখাই চুড়ান্ত নয়, ফলে নতুন সীমানা চিহ্নিত হয়েছে, পুরোনো সীমান্তরেখার স্মৃতির সাথে নতুন সীমান্তরেখার স্মৃতির বিক্ষোভ সহিংসতায় প্রকাশিত হচ্ছে।

অখন্ড বাংলার মুসলীম লীগ যখন পূর্ব পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেছে, সে স্বপ্নের মানচিত্র আদতে ১৯০৫ এর পূর্ব বাংলা অসম নিয়ে গঠিত শাসনাঞ্চলের স্মৃতিময় মানচিত্র, ১৯৪৭ এর দেশভাগ সে মানচিত্রের রেখা অনুসরণ করে নি। প্রাপ্ত বয়স্ক ভোটারের অনুপাতে নতুন নতুন বর্গচিহ্নিত হয়েছে, ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা এড়াতে ইউনিয়ন পরিষদ বিনিময় হয়েছে, বিভ্রান্তি এবং বিশৃঙ্খলার ভেতরে এক রাজধানী থেকে প্রাদেশিক রাজধানীতে জাহাজভর্তি কাগজ এসেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা ব্রিটিশ স্বায়ত্বশাসনের স্মৃতি ধরে রেখেছেন। ব্রিটিশ প্রতিশ্রুতির স্মৃতি ধরে রেখেছেন প্যালেস্টাইনের বাসিন্দারা। কাশ্মীর কিংবা উত্তর পশ্চিম রণাঙ্গনের মানুষেরাও মূলত একই ধরণের প্রতিশ্রুতির স্মৃতি ধরে বেঁচে আছেন। বিশ্ব বদলে গেছে। নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতায় প্রাচীন স্মৃতি নতুন নতুন সংঘাতের প্রেক্ষাপট নির্মাণ করছে। নৃশংসতার দৃশ্যায়ন নতুন ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। দুর্বলের প্রতি সহানুভুতি, ন্যায় প্রতিষ্ঠার দুর্দম আকাঙ্খা ছোটোখাটো জঙ্গী সংগঠনের জন্ম দিচ্ছে প্রতিদিন।

সকল মানুষের সংস্কৃতি চর্চার অধিকার অক্ষুন্ন রাখার সার্বজনীন অঙ্গীকার এবং সকল জাতি ও রাষ্ট্রের চিন্তানায়কদের সচেতন ঐক্যমত অকারণ প্রাণক্ষয় রোধ করতে পারে। সহিংস স্বাধীকার আন্দোলন, সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখতে চলমান সেনা আগ্রাসন এবং সহানুভুতিশীল মানুষের বিবেচনাবোধহীন জঙ্গীবাদী ক্ষোভ প্রশমণ সম্পর্ক- সম্ভাবনা খুন করছে প্রতিদিন। এসব ক্রোধ-ক্ষোভ-বিক্ষোভের শিকার লাশগুলোর ভার বহন করছে খুন হয়ে যাওয়া মানুষের স্বজনেরা।

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.