ইউজার লগইন

শিক্ষার মাণ

প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিবছর নতুন বই দেওয়া হচ্ছে। সারা দেশের প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থীর জন্যে অন্তত ৫ কোটি বই মুদ্রন এবং বিতরণের দায়িত্ব পালন করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড । তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এসব পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষণসহায়িকাগুলো তাদের ওয়েবসাইট থেকেও নামানো যায়।

প্রতিটি পাঠ্যবইয়ের সম্পাদনা পরিষদে অন্তত ৪ জন শিক্ষকের নাম লিপিবদ্ধ আছে। বইয়ের শুরুতে শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানের ক্ষুদ্র বক্তব্য এবং বইয়ের শেষের পাতায় কোনো এক অজানা কারণে এ বছর প্রধানমন্ত্রীর ছবি সংযোজিত হয়েছে।

হাশেম খান, কাইয়ুম চৌধুরী এক সময় এইসব পাঠ্যবই অলংকরণের কাজ করতেন। এই মুহুর্তে তাদের ওয়েবসাইট থেকে বই ডাউনলোড করা যাচ্ছে না। তবে সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী পুরোনো বইয়ের অলংকরণে সামান্য পরিবর্তন করা হয়েছে। অশালীন কিংবা সমাজবিরোধী এবং নৈতিকতাপরিপন্থি বিবেচনায় মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের প্রতিনিধিদের আপত্তির প্রেক্ষিতে বইয়ের নারী শিশুর পোশাক শরীয়তসম্মত করা হয়েছে। সম্ভবত পুরুষ শিশুটিকেও হ্যাফপ্যান্টের বদলে টাকনু পর্যন্ত প্যান্ট কিংবা লুঙ্গি পরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মাদ্রাসা শিক্ষক প্রতিনিধি দলের ধারণা বেআব্রু শিশু শিক্ষার্থীদের নৈতিকবিচ্যুতি ঘটাতে পারে এবং এমন ধারণাকে আমলে নিয়ে যারা শিশুর পোশাক পরিচ্ছদ সংশোধন করলেন- এই দুই দলের মানসিক সুস্থতা বিষয়ে তীব্র সংশয় থাকলেও সেসব নিয়ে বাড়তি শব্দ ব্যয় করা উচিত হবে না। যারা শিশুদের যৌনসামগ্রী ভাবছে, যারা শিশুদের আপাদমস্তক কাপড়ে মুড়ে ভাবছে তারা ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণ করছে এবং যারা ধারণা করছে পাঠ্যবইয়ের ছবি দেখে শিশুদের যৌনকামনা জাগ্রত হবে- এই মানুষগুলোর সাথে কোনো ধরণের যৌক্তিক আলোচনা সম্ভব না।
পাঠ্যপুস্তকদে শরীয়তসম্মত ছবি ব্যবহারের সরকারী যুক্তি হলো এর মাধ্যমে তারা ক্বাওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। ক্বাওমী মাদ্রাসা এখনও বাংলাদেশের শিক্ষার মূল ধারার সাথে সংযুক্ত না এবং দেশের প্রতিটি বিভাগে এবং কোনো কোনো জেলায় একাধিক ক্বাওমী মাদ্রাসাবোর্ড বিদ্যমান- যারা শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের নিজস্ব রীতি অনুসরণ করছে এবং তারা অন্তত সরকারপ্রবর্তিত শিক্ষা পাঠ্যক্রমকে গ্রহনযোগ্য ভাবেন না এখনও। ভবিষ্যতে কোনোদিন হয়তো তারা আরও বেশী সংশোধিত পাঠ্যক্রমকে নিজেদের আদর্শের প্রতিফলন হিসেবে গ্রহনযোগ্য ভাবতেও পারে- কিন্তু এখনও বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের শিক্ষা বিষয়ক ধারণাতে ক্বাওমী মাদ্রাসার আদর্শ সম্পূর্ণ প্রতিফলিত হচ্ছে না। আমরা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতি বাদ দিয়ে আস্তে ধীরে তাদের আদর্শের দিকে বিচ্যুত হচ্ছি। বর্তমানের প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা সমাপনের প্রান্তিক যোগ্যতায় আস্তিকতা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যদিও রাষ্ট্র শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে কেনো সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের বিশ্বাসী একদল নাগরিক তৈরী করতে চায় সেটার কোনো স্পষ্ট জবাব অন্তত আমার কাছে নেই।
২০১২ সালের শিক্ষানীতি অনুমোদন করেছে বর্তমানের ক্ষমতাসীন সরকার এবং সম্পূর্ণ সময়টাতেই শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন নাহিদ সাহেব। পিএসসি- জেএসসি নাম দিয়ে শিশুপীড়ন, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলকে রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে প্রচারের জন্যে যোগ্যতা মূল্যায়নে শিথিলতা- প্রশ্নফাঁস এবং পরীক্ষায় দুর্নীতি অস্বীকার এবং মৌন সহযোগিতা সবকিছুর দায় নাহিদ সাহেবের কাঁধে অর্পন করা যায় কিন্তু প্রান্তিক যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়টা এককভাবে নাহিদ সাহেব্দের স্কন্ধে ছিলো না।
প্রান্তিক যোগ্যতার ধারাবাহিক বিচ্যুতি ৪ দশকের বিভিন্ন ভ্রান্তির ফলাফল। ৮৭ এর শিক্ষানীতি- ৯২ কিংবা ৯৭ এর শিক্ষানীতি ২০১০ এর শিক্ষানীতি , ৭৮ থেকে যে ধরণের সংযোজন বিয়োজন ঘটছে- সব কিছু নাহিদ সাহেদের কাঁধে অর্পন করা ঠিক হবে না।
আমাদের শিক্ষানীতি আস্তিকমনস্ক হয়ে উঠেছে আমাদের শিক্ষানীতিপ্রণয়কদের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে। সেখানে মজিদ খান আছেন, কবীর চৌধুরী আছেন, সেখানে জাফর ইকবাল আছেন-
কুদরত ই খুদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ প্রণীত হয়েছিলো বাংলাদেশের সংবিধানের মূলনীতি দেশের নাগরিকদের ভেতরে জাগিয়ে তোলার জন্যে- আমাদের সংবিধান কাঁটাছেড়া হয়েছে, জাতী ও রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের বিবর্তন ঘটেছে, আমরা ইসলামমনস্ক হয়েছি। এই অধঃপতন আমাদের সামষ্টিক অধঃপতন, কোনো একক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে লাভ হবে না।

শিক্ষানীতিতে মোটাদাগে শিক্ষার উদ্দেশ্য বিবৃত হলেও শিক্ষাকে স্পষ্ট সংগায়িত করা হয় নি। শিক্ষা আসলে কি? শিক্ষানীতি বিষয়ে গবেষণা করেছেন যারা তারা শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য এবং সরকারী হস্তক্ষেপের গুরুত্ব চিহ্নিত করতে উল্লেখ করেছেন উপযুক্ত শিক্ষাপাঠক্রম অনুসরণ করলে শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য পুরণ হবে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর শিক্ষানীতিতে যে ধরণের আদর্শ নাগরিক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট সে তুলনায় ভিন্ন। উন্নত বিশ্বে বিজ্ঞানমনস্ক, স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে সক্ষম, ধর্ম- বর্ণ ও গোত্র বিষয়ক কোনো ধরণের আসক্তি কিংবা প্রেজ্যুডিসবিহীন নাগরিককে আদর্শ নাগরিক বিবেচনা করা হয়েছে অন্য দিকে বাংলাদেশের শিক্ষানীতিপ্রণেতারা ধর্মভীরু একদল মানুষকে আদর্শ মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

বাংলাদেশের শিক্ষানীতি কি স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে সক্ষম এমন একদল মানুষ নির্মাণ করতে পারবে ভবিষ্যতে? স্বাধীন চিন্তা- সচেতনতা শব্দগুলো যে ধরণের ভাষিক দক্ষতা দাবী করে- বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক প্রণেতারা কি শিক্ষার্থীদের ভেতরে এমন ভাষিক দক্ষতা তৈরী করতে আগ্রহী? তারা কি সেভাবে তাদের পাঠ্যপুস্তকের বিষয়গুলোকে সাজিয়েছেন? ৩ বছর আগে আমার বই প্রথম ভাগে বর্ণমালা পরিচয়ে প্রতিটি স্বরবর্ণ দিয়ে আলাদা আলাদা শিশুকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। এমন একজন শিশু ঔছন চাকমা- আমার বইয়ের প্রথম পাতায় ঔছন চাকমা নিজের পরিচয় সমেত হাজির হওয়ার পর সম্পূর্ণ বইয়ে তার কোনো উপস্থিতি ছিলো না। এই বছরের আমার বই প্রথমভাগে ঔছন চাকমা আছে কি না বলা কঠিন।
আমার বই প্রথম ভাগের সাথে ইংরেজী শিক্ষা প্রথমভাগ এবং গণিত প্রথম খন্ডও পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনের প্রান্তিক যোগ্যতা হিসেবে বলা হয়েছে শিক্ষার্থীরা পাচ খন্ডের বাংলা ও ইংরেজী বই পড়ে ছোটো ছোটো স্বয়ংসম্পূর্ণ বাক্যে নিজেদের পরিচয় দিতে পারবে এবং নিজেদের ভাবনাকে প্রকাশ করতে পারবে। প্রথম বইয়ে আমার নাম -------, আমি প্রথম শ্রেণীতে পড়ি, আমার বাবার নাম ---, আমার মায়ের নাম ---, আত্মপরিচিতিমূলক এসব বাক্য বাংলা ও ইংরেজীতে দেওয়া আছে- তবে এরপর ভাবনা নির্মাণের কোনো উদ্যোগ সেসব পাঠ্যবইয়ে অনুপস্থিত। বিভিন্ন পাঠ উপস্থাপনের পর গল্পটা নিজের ভাষায় বলো জাতীয় নির্দেশনা আছে কিন্তু নিজের ভাষায় বলার দক্ষতা শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক কিভাবে যাচাই করবেন সে সম্পর্কে ঘোষণা নেই। পিএসসির অবমূল্যায়িত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী যোগ্যতা যাচাইয়ের বাইরে দাতা সংস্থার উদ্যোগে পঞ্চম শ্রেণী উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের ফলাফল ভয়াবহ। অর্ধেকের বেশী শিশু অন্তত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পর্যায়ের ন্যুনতম যোগ্যতা অর্জন করে নি।

ভাষা শব্দের সংকলন না, শব্দ ভাষার অংশ কিন্তু শব্দগুলোর আন্তঃসম্পর্ক ভাষার ভাবনা নির্মাণ করে। শব্দগুলো পাশাপাশি সাজিয়ে ভাবনাকে ভাষা দেওয়া কিংবা নিজের ধারণার স্পষ্টতা দেওয়া একটা ধারাবাহিক প্রয়াস এবং ক্রমাগত চর্চায় এই দক্ষতা অর্জন করতে হয়। হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলা ভাষার শব্দের অন্তঃসম্পর্ক, আন্তঃসম্পর্ক এখনও স্পষ্ট না। আমাদের সাহিত্যিক অর্জন থেকে আমরা এখনও ভাষা ব্যবহাররীতি নির্ধারণ করতে পারি নি। আমাদের কোনো ব্যকরণ নেই। বাংলা একাডেমী ব্যকরণ প্রণয়নের লক্ষ্যে গত ৪০ বছরে কোনো পরিকল্পনা গ্রহন করে নি। আমাদের কোনো বানান রীতি নেই। জাতীয় দৈনিকগুলো এক ধরণের বানানরীতি অনুসরণ করছে, বাংলা একাডেমী এক ধরণের বানানরীতি অনুসরণ করছে- একটা গোলোযোগপূর্ণ অবস্থা সেখানে। এই ডামাডোলে লিখিতভাবে গুছিয়ে নিজের ভাবনা প্রকাশের দক্ষতা অর্জনের সম্ভাবনা ক্ষীণ।

মাণ ভাষা, প্রমিত ভাষা, বানানরীতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভিন্ন একটা রাজনৈতিক বিতর্ক আছে। সেসব বিতর্ক সাহিত্যিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে কিংবা আমাদের জাতিস্তত্বার পরিচয়কে আক্রান্ত করছে বিষয়ক এবং প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিচলিত কিংবা বিভ্রান্ত না করেও এই রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যহত রাখা যায়।

বিতর্ক তখনই গুরুত্বপূর্ণ যখন কোনো একটি লক্ষ্যপুরণের পথ নির্ধারণে আমাদের ভেতরে মতদ্বৈততা থাকে এবং সকল পক্ষ অন্তত চুড়ান্ত লক্ষ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা রাখে। আমাদের বিতর্ক, আক্ষেপ , ঠাট্টা এবং প্রতিবাদ এখনও শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে নি। আমরা কি কি বৈশিষ্ঠ্য দেখে একজনকে শিক্ষিত চিহ্নিত করি আমরা নিশ্চিত না, তবে সরকার অন্তত পিএসসি, জেএসসি পরীক্ষায় ন্যুনতম এ+ পাওয়াকে শিক্ষিতের বৈশিষ্ঠ্য নির্ধারণ করেছে। আমি এই ধরণের শিক্ষিত হয়ে ওঠার সংজ্ঞাকে অস্বীকার করছি কারণ এত এত শিক্ষার্থী এখনও নিজের ধারণা প্রকাশের যোগ্যতা অর্জন করে নি।

পোস্টটি ২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.