ইউজার লগইন

দিন যায় কথা থাকে

নিয়মমতো অক্টোবরের শেষ রোববারে ঘড়ির কাটা ঘুরে গেলো। অফিসিয়ালি এখন হেমন্ত আর এখানে শীতকালীন সময়সীমা শুরু হয়ে গেলো। উত্তর গোলার্ধের খুব কাছের দেশগুলোতে নভেম্বর থেকে শুরু করে তারপর পুরো টানা প্রায় ছয় মাস অন্ধকারে লোকজন বাড়ি থেকে বেরোবে আবার অন্ধকারে বাড়িতে ঢুকবে। সূর্য্যি মামা শীতনিদ্রায় যাবেন। যদিও বিশেষ দিনক্ষন দেখে সূর্য মামা কখনো কখনো এখানে উঁকি দিবেন তবে সেটাও বয়ে আনবে দুঃসংবাদ। বেশির ভাগ সময় দেখা যায় এরপরই বরফ পড়তে শুরু করে। সেই বরফে পড়ে যেয়ে কারো কারো হাত পা ভাঙ্গবে, আর প্যাচপ্যাচে কাঁদাতো আছেই। নিকষ কালো অন্ধকারের ভার সহ্য করতে না পেরে কেউ কেউ ডাক্তারের শরনাপন্ন হবেন, এন্টিডিপ্রেসন মেডিসিনের জন্যে। হিম হিম ঠান্ডা পড়ছে, তাপমাত্রা দুই অঙ্ক থেকে এক অঙ্কে নামা শুরু করেছে, মাঝে মাঝে রাতে শুণ্যের নীচেও নামছে।

শীতের আগমনে সেই কাঁচা খেজুরের রসের গন্ধ, ঠান্ডা খেজুরের রস খেতে খেতে সোয়েটার পরা গায়েও কেঁপে কেঁপে ওঠা, স্কুলের ফাইন্যাল পরীক্ষা শেষ হওয়ার সুবাদে গ্রামে বেড়াতে যাওয়া, সেই বেড়ানোকে উপলক্ষ্য করে গ্রামে সদ্য বন্ধুত্ব হওয়া নাম না জানা তুতো ভাইবোনদের সাথে ফসল ভরা জমিতে বেড়াতে যাওয়া। জমি থেকে টেনে তোলা শিশির ধোয়া ধনেপাতা দিয়ে তাজা কূল আর তেঁতুল মাখা ভর্তার গন্ধ, চারদিকে হলুদ সর্ষের চাদর বিছানো, কাঁচা সর্ষে শাকের গন্ধ, মাটি তোলা নতুন আলু আর মটরশুটি। জমি থেকে তুলে আনা টমেটো – ধনেপাতা দিয়ে ছোট মাছের চর্চরি। ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা আর পাখি শিকারীদের ভীড়। বন্দুক কিংবা এয়ারগান নিয়ে এদিকে একজনতো অন্যদিকে অন্যজন। তেল ভরা বালিহাঁস আর ভুনা খিচুড়ি।

গ্রাম্য সেসব তুতো ভাইবোনদের আজ আর নামও মনে নেই। সামনে দেখলেও কেউ চিনিয়ে না দিলে চিনবো কি না জানি না। অথচ সেসময় এই শহর থেকে গ্রামে বেড়াতে আসা তুতো ভাইবোনদের মনোরঞ্জন করার কি চেষ্টাই না তারা করতো। নানুর বাড়ির আশপাশের বাড়িতে থাকা মায়ের কাজিনদের ছেলেমেয়ে ওরা। নানুর বাড়িতে থাকার সেই তিন চার দিনে তাদের সাথে খুব বন্ধুত্ব হয়ে যেতো। শ্যাওলা পড়া পুকুর ঘাট, গাছে গাছে জড়াজড়ি করে থাকা গ্রাম্য জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া এবড়ো থেবড়ো পায়ে চলা মেঠো পথ, এ বাড়ি ও বাড়ির আঙ্গিনা ডিঙিয়ে কোন মাঠে গিয়ে মিশেছে। সেই মাঠ আবার মিশেছে আকাশের সাথে। প্রত্যেক বাড়ির সামনে বিরাট বিরাট উঠোন, সীমের মাচা, লাউয়ের মাচা, পাশেই গরুর ঘর। কি শান্ত অলস যেনো পটে আঁকা ছবি। প্রায় শুকিয়ে আসা খালের পাড়ে বাঁধা নৌকা, মসজিদের পিছন দিকে জঙ্গল। ঐদিকে যেতে হয় না। জায়গাটা নষ্ট। সেখানে ওনারা থাকেন। তাদের রাগিয়ে দিলে আর উপায় নেই। রেগে গিয়ে কবে তিনারা জানি কার কার ঘাড় মটকে দিয়েছিলেন, পরে অনেক খোঁজাখুজি তাদেরকে পাওয়া গেছে মধ্য পুকুরের মাঝে বসা অবস্থায়। এগল্পটা যখন হচ্ছে, তখন নাম না জানা কিছু পাখি ডেকে উঠবে মাঝে মাঝেই। অতি প্রাকৃতিক সেই গল্পগুলোকে তখন পাখির গা ছমছমানো ডাকে সত্যি মনে হতে শুরু হবে।

পুরো পরিবেশটাই রোজকার জীবনের সাথে এতো অবাস্তব আর স্বপ্নসম যে মনে হয় সেখানে যে কারো সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যেতে পারে। বন্ধুত্ব করার জন্যে সামাজিক স্ট্যাটাস মিলানোর, স্কুল কিংবা ক্লাস মিলানোর, গান নাটক সিনেমার রুচি মেলানোর কোন দরকার পড়ে না। প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে যখন তাদের সাথে মিশে যেতাম, তখন গায়ে ধূলো মেখে, সেই পরিবেশে হাডুডু, দারিয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, বউচি, এক্কা দোক্কা খেলতে আর বাধো বাধো লাগতো না। গোল্লাছুটের সময় অন্য পক্ষের খেলোয়ারকে টানাটানি করতেও আর খারাপ লাগতো না, মাটিতে বসে পড়াটাও স্বাভাবিক লাগতো। সেই শীতেও ঘেমে নেয়ে লাল হয়ে উঠতাম এক একজন। নানুর বাড়ি থেকে আবার বাসায় ফিরে এলে দাদু আর আব্বু বলতেন, নানুর বাড়ি যেয়ে একেবারে “কালা” হয়ে ফিরেছি। এখন অবশ্য বুঝতে পারি, মাকে খোঁচা দেয়ার ব্যাপার হয়তো ছিল সেখানে। কিন্তু আমাদের কাছেতো সেই শীতেও কলাগাছের ভেলায় চড়ে পুকুরের পানিতে ঘন্টার পর ঘন্টা ঝাপাঝাপি করার আনন্দটাই মূখ্য ছিল, কে কাকে কোথায় খোঁচায়, তা দিয়ে আমাদের কি আসে যায়। ঢাকা এলে প্রথম কয়েকদিন গ্রামের খেলার সাথীদের কথা বেশ মনে পড়ত। তারপর নতুন বই, নতুন ক্লাশ আবার অতি দ্রুত ভুলে যেয়ে চেনা গন্ডীতে মিলে যেতাম। এই শীতের শুরুতে সেসব দিন খুব মনে পড়ছে। আহা সেই নাতিশীতোষ্ণমন্ডলের দিন এই কনকনে উত্তর গোলার্ধে আমি কোথায় পাবো? কিন্তু জনম জনম তারে আমি খুঁজিব।

তানবীরা
৩০/১০/২০১২

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

শর্মি's picture


চলেন গ্রামে যাইগা। Smile

তানবীরা's picture


হ যাইগা Big smile

অতিথি's picture


আপনার উত্তর গোলার্ধে অবস্থান এখনই জানলাম। স্বদেশের সুখস্মৃতি মনোমুগ্ধকর । হয়তো বাইরে অবস্থানের কারণেএকজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে এই অনুভূতির মাত্রা বেশ তীব্র।
ঝরঝরে গদ্যে লেখা স্মৃতিকথা বেশ ভালো লেগেছে। আবারো শুভেচ্ছা।

তানবীরা's picture


অতিথি হওয়ার কারণে সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে মনতব্যের ভাষায়ও অনুভূতির মাত্রা বেশ তীব্র।
পড়ার জন্য আমার আনতরিক ধণ্যবাদ জানবেন Big smile

রায়েহাত শুভ's picture


আহারে! আপনার সাথে সাথে আমারো পুরো শৈশবটা টাইনা আনলেন চোখের সামনে...

তানবীরা's picture


বুড়া হইতাছিতো Sad(

উচ্ছল's picture


ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা...... Big smile

তানবীরা's picture


আমার মনে হয় যেখানে যে বেলাটা কেটেছে সেই বেলাটাকেই মিস করবো। দেশে আসলে হয়তো ভিন দেশ মিস করবো "আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক"

গ্রিফিন's picture


খিয়ালৈ করিনাই বৈদ্যাসি আপায় পুস্টাইছেন। ছুডুকালের কথাবাত্র ভাল্লাগ্লো Smile

১০

তানবীরা's picture


দুনিয়ার সব আপাই বৈদ্যাসি। যারা ঘরে আছেন তারাও, আর যারা ঘর ছেড়ে গেছেন তারাও Sad(

১১

রাসেল আশরাফ's picture


ধুর!!! মনটা উদাস করে দিলেন।

পুরাপুরি মিললো কেমনে? আমি গ্রামে যাওয়ার আগে গ্রামের কথা প্র্যাকটিস করে যেতাম মনে মনে। এই বার দেশে গিয়ে গ্রামে যাওয়া হয় নাই। সাপের ভয়ে। এখন মনে হচ্ছে গেলেই ভাল করতাম। Sad Sad

১২

তানবীরা's picture


আমি পারত বাদ দেই না। আমার খুব ভাল লাগে গ্রামে যেতে। আমি গ্রামের কথা জানি, প্র্যাকটিস লাগে না Big smile দাদুর সাথে এক ঘরে ঘুমিয়েছি একুশ বছর Big smile

১৩

মীর's picture


খারাপ বলেন নাই। ওই অন্ধকার উত্তরে কোথায় পাবেন কুয়াশাঢাকা শাহবাগ, টিএসসি, সড়কদ্বীপ কিংবা ছবির হাট? আমাদের এখানে তো এখনই বিকাল হলে সবকিছু আস্তে আস্তে মায়াবী হয়ে উঠতে শুরু করে। ঘরে, অফিসে কোথাও তখন আর বসে থাকতে ভালো লাগে না।

আর ঠিক সন্ধ্যে নামার মুখে যখন শুকনো পাতা, পুরোনো কাগজ জড়ো করে আগুন জ্বালানোর দিন আসবে, তখন আনন্দে বোধহয় বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে উঠবে Day Dreaming

১৪

টুটুল's picture


মীরের লগে পুরাই একমত Smile

১৫

তানবীরা's picture


কাটা ঘায়ে সোডার ছিটা Sad( Puzzled

১৬

মীর's picture


কাটা ঘায়ে সোডার ছিটা দিলে কি হয়?

১৭

রাতের শহর's picture


Smile ভালো লাগলো এরকম একটি প্রানবন্ত বর্ণনার জন্য .... .... তবে ভাই ..... দেশ ইজ দেশ ..... যেখানে আত্মার সাথে লেপ্টে থাকা অপাংতেয় শিহরন জাগানো অনুভূতি একমাত্র দেশই দিতে পারে .... .... শুভেচ্ছা রইল ।।

১৮

তানবীরা's picture


হাহাহাহাহাহাহা। আত্মার সাথে লেপ্টায় না??? শুভেচ্ছা রইল Big smile

১৯

শওকত মাসুম's picture


কতো কিছু মনে করাইয়া দিলা বাজি

২০

তানবীরা's picture


সেইটাইতো দিন যায় কথা থাকে Puzzled

২১

অনিমেষ রহমান's picture


চমতকার লিখেছেন।
Smile Smile

২২

তানবীরা's picture


ধইন্যা পাতা

২৩

সাঈদ's picture


ডিসেম্বরে তীব্র শীতের মধ্যে ২ দিন গ্রামে গিয়ে থাকতে চাই ।

২৪

তানবীরা's picture


ভাল মনদ খাওয়ার সময় আমাকে মনে কইরেন Puzzled

২৫

আসমা খান's picture


অসম্ভব ভালো লাগলো। ছেলেবেলা যেন সামনে এসে দাড়ালো। গ্রামের বাড়িতে যেতে খুব ইচ্ছে করে। এমন লেখাই পড়তে চাই।

২৬

তানবীরা's picture


হাহাহাহাহাহা, এমন রাননাই আশা করছেন বউমার কাছে? Smile

২৭

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


শীতের ভোরে কুসুম গরম রোদ আর ভাপা পিঠা! এর আর কোন তুলনা হয় না! Big smile

২৮

তানবীরা's picture


হুম, শিকারের মাংস দিয়ে ছিটা পিঠাও অনেক স্বাদ Puzzled

২৯

শাপলা's picture


আহা! মন কেমন করা লেখা। তবে আমি বেশ খুশী। একেবারে দেশে ফিরব মনে হচ্ছে। সেই সিদ্ধান্তের দিকেই এগুচ্ছি।

৩০

তানবীরা's picture


আশাকরছি দেশে ফিরে গিয়েও এই খুশি অটুট থাকবে Smile

৩১

রাতের শহর's picture


আ..আ..আ.. হি.. হি..হি.. হু..হু..হু.. করনের দিন আইসা গেল বইল্যা.. আর আফসোস কইরেন না বিজ্ঞ জনেরা ,

শীত তো আমার ঘরের দরজায় বইয়া পাহাড়া দিতাছে ... গত দুই দিন যাবৎ হালকা পাতলা বৃষ্টি হইতাছে.... প্রতিটা ফোটায় ভর কইরা শীত নামতাছে ... টের পান নাই আপনারা ?? পাইবেন সময় আসুক...
কেউ বাড়ি গেলে .. ভাঁপা পিঠা দাওয়াত দিয়েন Tongue Tongue ... যামুনে ..

ভালবাসা রইল সবার জন্য আগমনী শীতের বার্তা নিয়ে .... ..

৩২

তানবীরা's picture


আপনার জন্যও ঐ যে ভালবাসা না কিতা কয় সেইটা রইলো Sad

৩৩

আরাফাত শান্ত's picture


দিন যায় অনেক কথা থাকে সব কথা বলাই হয় না। আপনে অনেক গুলা কথা দারুনভাবে বলছেন। ভালো থাকেন আপু শুভকামনা!

৩৪

তানবীরা's picture


ঈদের লেখা কবে আসবে!!! ঈদতো বাসি হয়ে গেলোরে শান্ত

৩৫

অতিথি's picture


আপু আপনার কয়েকটা লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। এমন সাবলীল করে লিখেছেন যেন আপনার সামনে বসে শুনছি।

৩৬

মীর's picture


পুরো পরিবেশটাই রোজকার জীবনের সাথে এতো অবাস্তব আর স্বপ্নসম যে মনে হয় সেখানে যে কারো সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যেতে পারে। বন্ধুত্ব করার জন্যে সামাজিক স্ট্যাটাস মিলানোর, স্কুল কিংবা ক্লাস মিলানোর, গান নাটক সিনেমার রুচি মেলানোর কোন দরকার পড়ে না।

৩৭

মীর's picture


এই সময় লেখাটা খুব দরকার ছিল। আমার জন্য আরকি Smile

৩৮

Jafrin Rezwana's picture


অসাধারণ লেখা আপু। লেখাটা টুইটারে শেয়ার করা যায় না?

৩৯

Jafrin Rezwana's picture


অসাধারণ লেখা!!! এটা টুইটারে শেয়ার করা যাচ্ছে না কেন?

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

তানবীরা's picture

নিজের সম্পর্কে

It is not the cloth I’m wearing …………it is the style I’m carrying

http://ratjagapakhi.blogspot.com/