চন্দ্রালোকের ছায়া-৫

চন্দ্রালোকের ছায়া-৩
চন্দ্রালোকের ছায়া-৪
“তুমি তাহলে জগিং শুরু করেছ?” হিরাগি বলল।
“হুম।“
“ জগিং করলে তো মোটা হবার কথা না, দিন দিন এরকম মোটা হয়ে যাচ্ছ কেন?”
“কি করব, সারা বিকেল যে শুয়ে শুয়ে কাটাই। আমি হাসতে হাসতে বলি। কারণ আসল সত্যটা হল, আমি অসম্ভব শুকিয়ে গেছি।“
“বিশ্বাস কর, এই সব জগিং-টগিং দিয়ে তোমার কাজ হবে না, বুঝেছ।“ তারপর সে বলল, “কিন্তু আমি একটা ভালো পরামর্শ দিতে পারি। সেটা হল-আমার বাসার কাছে একটা নতুন একটা খাবারের দোকান খুলেছে, ওখান তেম্পুরা দিয়ে ভাতটা ওরা ফাটাফাটি করে। এক্কেবারে জিভে জল এসে যাওয়া ব্যাপার স্যাপার। চলো ওখানে তোমাকে নিয়ে যাই। তুমি আমার সাথে এখুনি যাবে...।“
যদিও হিতোশি আর হিরাগির মধ্যে বিস্তর পার্থক্য, একজনের সাথে অন্যজনের কোন মিল নেই, তবুও একটা জায়গায় ওদের ভীষন মিল, সেটা হল-দুজনেই আসলে খুব নরম এবং ওদের ভালোবাসা প্রকাশের ধরণও এক। এমন ভাব কথা বলবে, যেন মনে হবে খুব নির্লিপ্ত এবং আসল ব্যাপারে উদাসীন।
আসলে এভাবেই ওরা বড় হয়েছে। ওদের ভালোবাসার ধরণটাই এমন যে, অনায়াসে ওরা ছোট্ট একটা সাধারণ ঘন্টাকে রুমালে জড়িতে নিতে পারে।
“ইস! আমিও খেতে চাই।“ ইচ্ছাটা জানালাম ওকে।
হিরাগির পরনে যে মেয়েদের স্কুল ইউনিফর্মটা, সেটা আসলে ইউমিকোর। ইউমিকো মারা যাবার পরে, হিরাগি এই স্কুল ইউনিফ র্মটা পরেই ওর স্কুলে যায়, যদিও হিরাগির স্কুলে ইউনিফর্ম পরে যাবার কোন বাধ্যবাধকতা নেই।
দুপক্ষই মানে হিরাগি এবং ইউমিকোর বাবা-মা, ওনেক অনুরোধ করেছিলেন, এমন কি কেঁদেওছিলেন-হিরাগি যাতে এসব না করে। তারা বলেছিলেন, “এভাবে মেয়েদের পোষাকে তোমাকে দেখে ইউমিকো কখনই খুশী হবে না।“ হিরাগি হাসিমুখে ওদের কথা শুনেছে কিন্তু ওদের কথাগুলো স্রেফ উপেক্ষা করে গেছে।
আমি ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ইউমিকোকে ভুলতে চাওনা অথবা তোমার মাঝে ওকে তোমার মাঝে বাঁচিয়ে রাখতে চাও বলেই কি এটা পরছ? “না,আসলে সেরকম কিছু নয়, আমার কাছে যে কোন বস্তুগত জিনিষই শুধুই বস্তুগত। এসব বস্তুগত জিনিষ তো আর কোন মৃতকে ফিরিয়ে আনতে পারেনা। এটা পরলে আমি একটু বেশী ভালো বোধ করি, তাই পরি।“ হিরাগি উত্তর দিয়েছিল।
“তুমি সারাজীবনই এটা পরে থাকতে চাও নাকি?” আমি প্রশ্ন করি।
তার মুখটায় একটু বিষন্নতার ছায়া পড়ল যেন, বলল- “আমি জানি না।“
“তোমাকে নিয়ে লোকজন কি কিছুই বলে না? আর তোমার স্কুলের সবাই বা কি বলে শুনি?”
“ না, সবাই জানে আমি এরকমই। আর তাছাড়া আমি কিন্তু সবারই অনেক সহানুভূতি পাচ্ছি। আর মেয়েদের কথা বলছ? ওরা তো আমার জন্য পাগল হয়ে আছে!!! হতেই হবে কারণ আমি মেয়েদের স্কার্ট পরে আছি মানে, মেয়েরা ভাবছে, আমি ওদের খুব ভালো বুঝি।“
আমি হেসে ফেললাম। “তাহ লে তো ভালোই, কি বল?” আমি কফিশপের কাঁচের জানালা ভেদ করে বাইরে তাকাই। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে মানুষের ভিড়, ক্রেতাদের আসা-যাওয়া এবং তাদের উচ্চকিত কণ্ঠস্বর শুনি।অনেক লোকের পদচারণায় পুরো ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সন্ধ্যাটা হয়ে উঠেছে, প্রাণবন্ত আর আনন্দঘণ। দোকানে দোকানে ডিসপ্লে করা হয়েছে স্প্রিং এর কাপড় আর তার সাথে বাহারী আলোকসজ্জা।
এসব দেখতে দেখতে আমি খুঁজে পাই, হিরাগির মেয়েদের স্কার্ট পরা আর আমার জগিং করার মানে। হিরাগির, ইউমিকোর পোষাক পরা আমার জগিং করার উদ্দেশ্যটা আসলে এক। আমি হিরাগির মত অদ্ভূত না বলেই,যন্ত্রণা ভুলতে বেছে নিয়েছি জগিং। আর সবাই যা করে, সে রকম সাধারণ কিছু করা হিরাগির ধাত নয় বলে, সে বেছে নিয়েছে নাবিকদের পোষাকের মত দেখতে মেয়েদের স্কুল ইউনরফর্ম, যা ওকে একটু ভিন্নতা দিয়েছে।
দুঃখ বেদনায় দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া হৃদয় নিয়ে এই কষ্টের জীবনটা পাড়ি দেবার জন্য এ্টা একটা উপায়, এর বেশী কিছু নয়। এসব করে আমরা আমাদের মনটাকে অন্যদিকে নিতে চাইছি। এভাবে আমরা আসলে আমাদের যে সময়টা স্থবির হয়ে আছে, সেই সময় পার করছি।
গত দুমাস ধরে, আমি আর হিরাগি, অবচেতনভাবে একে অপরের চেহারায়, আচরণের পরিবর্তনগুলো, নিজেদের অনুভূতিগুলো লক্ষ্য করেছি-যা আগে কখনই করার প্রয়োজন পড়েনি। দুজনেরই একই দশা। আমাদের দুজনকে দেখলেই আমরা বলে দিতে পারি, আমাদের জীবনে যা ঘটে গেছে সেই ক্ষতিটাকে ভুলে যেতে কি পরিমাণ লড়াই করছি। কিছুতেই মনে করতে চাইনা সে দিনের স্মৃতি কিন্তু যখনই মনে পড়ে যা্য, আমরা যেন সেই দুঃসহ স্মৃতির ভারে স্তব্ধ হয়ে পড়ি। মনে হয়, আমরা যেন ভীষন অন্ধকারে নিজেদের নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকাটুকু দেখতে পাই।
২
আমি উঠে দাঁড়াই। “ বাইরে ডিনার করতে গেলে, সেটা বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিতে হবে।“ তোমার কি অবস্থা? বাড়িতে ডিনার না করলে কি অসুবিধা হবে?
হিরাগি বলল, “না! কোন অসুবিধা নেই। বাবা অফিসের কাজে বাইরে আছেন।“
তাহলে তো তোমার মা বাড়িতে একা। তোমার মনে হয় বাড়ি ফিরে যাওয়াই উচিত।
না, ঠিক আছে। এখনো ডিনারের অনেক দেরী আছে, কাজেই মা এত তাড়াতাড়ি রান্না করবেন না। তার চেয়ে মা’র জন্য কিছু কিনে নিয়ে যাব, হঠাত বাইরের ডিনার দেখে মা অবাক হবেন এবং ছেলের উপর খুশী হবেন, মা’র মন ভালো হয়ে যাবে।
আসলেই খুব সুইট একটা আইডিয়া, আমি বলি।
“মা’কে এরকম চমকে দিলে তিনি নিশ্চই খুশী হবেন তাই না?” শুনে হিরাগি খুব আন্তরিকভাবে হাসল। হঠাতই আমার এই ছেলেটার আসল বয়স মনে পড়ল। কি বাচ্চা একটা ছেলে!
৩
এক শীতে হিতোশি আমাকে বলেছিল, আমার একটা ছোট ভাই আছে, ওর নাম হিরাগি। সেইদিনই প্রথম আমি হিরাগির কথা জানলাম। সে সময়টা আমরা স্কুলের পেছনে, পাথরের সিঁড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে উপ্রে উঠছিলাম। ছাই রঙ আকাশে ছিল তুষারপাতের পূর্বাভাস। হিতোশির হাত জোড়া কোটের পকেটে ঢোকানো ছিল। ওর নিশ্বাসে ছিল, ধোঁওয়ার মত সাদা মেঘ।
হিতোশি ব লছিল, “কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিন্তু হিরাগি আমার চেয়েও বড় হয়ে গেছে।
“তোমার চেয়েও বড়?” আমি হাসি।
“তাই বা কেমন করে বলি.........হিতোশি একটু দাঁড়িয়ে ভাবে, তারপর বলে, বাড়িতে কিন্তু ও একদম ছেলেমানুষ। গতকাল বাবার হাতের এক টুক রো কাঁচ দিয়ে ওর হাতটা একটু ছড়ে যায়, ও তো রীতিমত রেগে গিয়ে চিতকার চেঁচামচি করে, হইচই বাঁধিয়ে দিল। ম নে হচ্ছিল, ওর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। কথাটা মনে পড়তেই, মনে হল-কালকে ও যে কাণ্ডটা ক রল, তাতে কিছুতেই ওকে মেলানো যায় না।“
“বয়স কত ওর?” কতই আর হবে... পনেরো বোধ হয়।
“ও কি তোমার মত দেখতে? আমার খুব দেখতে ইচ্ছা করছে ওকে।“
“দেখতে চাও ভালো ক থা, কিন্তু আমি কিন্তু আগেই তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি, ও কিন্তু ভীষন অদ্ভূত একটা ছেলে। আমার ভাই হিসেবে ওকে নিয়ে বেশী কিছু ভেব না। এখন তো আমার ভয় হচ্ছে, ওকে দেখে না জানি, আমাকে আবার অপছন্দ করে বস।“ ও সত্যিই কিন্তু একটু ক্ষেপাটে গোছের।“ বলেই হিতোশি এক্কেবারে প্রকৃতই বড়ভাইয়ের মত করে একটা হাসি দিল।
“ ওহ! তাহলে যতদিন না তুমি বিশ্বাস করছ যে, তোমাকে আমি ভীষন ভালোবাসি এবং তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না, ত ত দিন পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হবে তোমার ছোট ভাইয়ের সাথে পরিচিত হতে তাই না?”
“ না, আমি তোমার সাথে একটু মজা করলাম। সব ঠিক আছে। আর তোমার ওর সাথে দেখা করতেও কোন অসুবিধা নেই। তুমিও একটুখানি অদ্ভূত আছ আর হিরাগি ভালো মানুষদের পছন্দ করে।“
“ভালো মানুষ?”
“হুম, ভালো মানুষ, বলে – হিতোশি গাঢ় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর ঠোঁটে হাসি।
ওভাবে তাকালে বরাবরই আমার খুব লজ্জা লাগে। সিঁড়িগুলো ভীষন খাঁড়া। আমি দ্রুত উঠতে থাকি। আমার ভয় লাগে। স্কুলের সাদা বিল্ডিংটার জানালাগুলোতে কালিগোলা আকাশের ছায়া পড়ে আছে।
আমার মনে আছে, সেদিন সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ বেয়ে ওঠার সময় আমার সঙ্গে ছিল, আমার কালো জুতা জোড়া, আমার হাঁটু পর্যন্ত সাদা মোজা। খস খস শব্দে আমার স্কুল ইউনিফর্মের কালো স্কার্টটাও অনুভব করতে পারছি যেন!!!
৪
বাহিরে রাতের বাতাসে যেন ছড়িয়ে আছে বসন্তের সুবাস। হিরাগির পরনে নাবিকের মত পোষাকটা লুকিয়ে আছে ওর শীত কোটের আড়ালে, যে ব্যাপারটা আমাকে একটু স্বস্তি দিচ্ছে। ডিপার্টমেন্ট স্টোরের জানালা ভেদ করে উজ্জ্বল সাদা আলো জমে ওঠা ভিড়কে আলোকিত করছে। ভিড়ের ভেতর মুখগুলোতে সাদা আলোর উজ্জ্বল ঝিলিক। বাতাসে বসন্তের সুবাস ছড়ালে কি হবে, এখনো বেশ শীত। আমি আমার কোতের পকেট থেকে হাত মোজা জোড়া বের করলাম।
“তেম্পুরার দোকানটা আমার বাসার কাছে। তাই আমাদের একটু হাঁটতে হবে।“ আমরা ব্রীজটা পার হয়ে তারপর যাই, কি বল?”
আমি চুপ করে ছিলাম। আনমনে উরারা’র সাথে দেখা হওয়ার কথা ভাবছিলাম। সেদিনের পর থেকে আমি রোজ সকালে দৌড়ে ব্রীজ পর্যন্ত গেছি কিন্তু উরারাকে আর পাইনি। আমি বাস্তবে ফিরলাম, হিরাগি হঠাত যখন বলে উঠল-
“কিচ্ছু চিন্তা করো না। আমি তোমাকে গাড়ি করে বাড়ি পৌঁছে দিয়ায়ে যাব।“ আমার মৌণতাকে হিরাগি ভুল ভেবেছিল, ভেবেছিল-আমি বুঝি বাড়ি ফেরা নিয়ে চিন্তিত।
“না না ঠিক আছে, কোন সমস্যা নাই। তাড়াহুড়োর কিছু নেই। আমি ভাবছিলাম, মানে তোমাকে মানে তুমি...আমি দ্বিধা ভরে বলি।
তোমাকে দেখে আমার হিতোশির কথা মনে পড়ছিল খুব। অবশ্য এ ক থাটা আমি ওকে বলি না। হিরাগিকে এখন এতটাই হিতোশির মত লাগছিল যে, ও যে হিরাগি সেটা আলাদা করে বলে দিতে ইচ্ছা করছিল না।
ওর নরম করে কথা বলার ভঙ্গি, ওর কিছু কিছু রিফ্লেকশন, আমার প্রতি ওর মমত্ববোধ, ওর উদারতা, সব সব কিছু হিতোশিকে মনে ক রিয়ে দিচ্ছিল প্রচণ্ডভাবে। কিন্তু তার প রো কোথায় যেন একটা সেতু দুজন মানুষকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রেখেছে। এই কোথায় যেন স ম্পূর্ণ আলাদা হওয়ার ব্যাপার টা এতটাই স্বচ্ছ যে, আমি চট করে আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়ি, আমার বার বার হিতোশির কথা মনে পড়ে যায়, ওকে হারানোর অসহ্য বেদনা মনে পড়ে যায়।
আমি যেন, এসব আড়াল করে একটা যুতসই উত্তর দেবার জন্যই বলে উঠলাম, “সেদিন কি হয়েছে জান? স কালে জগিং করতে গিয়ে ব্রীজের উপরে এক অদ্ভূত মানুষের সাথে দেখা হল। আমি আসলে ঐ মানুষ টার কথা ভাবছিলাম।
“একজন মানুষ মানে একজন ছেলে?” হিরাগি হাসে। “এত সকালে জগিং কিন্তু বিপদ্দজনকও হতে পারে।“
“না, না তুমি যা ভাবছ, মোটেও তা নয়। মানুষটি একজন নারী। মানুষটি এমন যে ভুলে যাওয়া সহজ নয়।“
“তুমি সম্ভবত আবার তার সঙ্গে দেখা হোক, তাই চাইছ...।“
“হুম।“ এটা সত্যি, কিছু কারনে আমি ভয়ংকর ভাবে উরারার সাথে দেখা করতে চাই। উরারা’র চাহনিতে যেন আমার হৃদস্পন্দন থেমে গিয়েছিল। সে আমার সাথে খুব ভদ্র আচরণ করেছিল, তার মুখে লেগে ছিল হাসি। কিছু ক্ষণের মধ্যেই সে নিজের ভেতর ফিরে গিয়ে আবার একা হয়ে গিয়েছিল। আমি যদি তার বর্ণনা দেই, তাহলে বলতে হবে যে, তার অবয়বে কিসের যেন একটা ছায়া ছিল যাতে মনে হচ্ছিল, কোন অশুভ শক্তি যেন মানুষে পরিণত হয়েছে। যার ভেতর রয়েছে মানুষের সব সূক্ষ্ণ অনুভূতি ও বেদনা কিন্তু সে অনুভূতি প্রকাশের যেন কোন অনুমতি নেই। এরককম চেহারা কিছুতেই ভোলা যায় না। আমি অনুভব রেছিলাম, আমার দুঃখ বা বেদনা আসলে তার কাছে কিছুই না। আমার ধারণা আরো খারাপ কিছু অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য।
চলবে......





কিরাম আছেন শাপলা'পু? লেখা এখনো পড়ি নাই। ভাবলাম এখন একটু আপনার সঙ্গে আলাপ করি। আপনে আমাকে পুরা ভুলে গেছেন!!!
মন্তব্য করুন