ইউজার লগইন

চুপি চুপি যাদের আসার কথা

জানালাটা অনেকদিন থেকেই খুলে রাখা - ঘরখানিতে আলো নেই - শুধুই আঁধারের সম্ভাষণ - মন ভাঙানিয়া গান নেই - আছে আতর গোলাপের আয়োজন - তবু তারা আসেনা - চুপি চুপি যাদের আসার কথা ছিল - কেন যেন তারা আসেনা.
ফুলের স্তবকে চারদিক ভরে গেছে - নন্দন কাব্যে ঝংকার উঠেছে - তবু তারা আসে না - বাতাসে শুধু সুরেলা আহ্বান - চাতক চোখগুলিতে অধীর প্রতীক্ষা - তবু তাদের দেখা নেই.
'৫২ তে তাদের দেখা গিয়েছিল - তারা ভাষার কথা বলছিল - মায়ের কথা বলছিল - সাধাসিধে মানুষগুলো - জনারণ্যে মিশে ছিল - কিংবাকে জানে - পুরোটা অরণ্যজুড়ে হয়ত তারাই ছিল - রাজকীয় বহর নয় - তবু যেন তারা রাজাই ছিল - ছোট ছোট প্ল্যাকার্ড তাদের হাতে - বড় বড় কথাগুলো কি সহজেই না বলছিল - শান্ত সৌম্য মানুষগুলো - অথচ কন্ঠ যেন বজ্র নির্ঘোষ - ছাপোষা বালক-বৃদ্ধ - তবু কোথাও ছিল না একবিন্দু আপোষ - বরাবর ভাবি আমি - কেমনতর মিছিল ছিল সেটা - কেমনতর মানুষই বা ছিল তারা - মৃত্যু তাদের সন্নিকটে ছিল - জানত তারা নিশ্চয় - তবু মৃত্যু মুখেই পা তাদের বাড়ছিল - সেদিন নাকি গুলি চলেছিল - মিছিলে নাকি মানুষ মরেছিল - এ তো ইতিহাসের কথা - গ্রন্থকীটের অর্থহীন বাতুলতা - আমি ভিন্ন কথা বলি - যে হৃদয় অকুন্ঠে মৃত্যুকে উপহাস করে - ভাষার তরে যে সত্তা প্রাণ দেয় অকাতরে - মৃত্যুর সাধ্য কি তাকে গ্রাস করে - পিচ ঢালা রাস্তায় সেদিন রক্তের দাগ ছিল নিশ্চয় - প্রাণহীন কিছু দেহ হয়ত নিয়েছিল ভূমিশয্যা - ঘাতকের অক্ষম কিছু বুলেট হয়ত বিঁধে ছিল ইতিহাসের পাতা - তবু মৃত্যুকে উপহাস - দেবালয়ে লিখা রয় বীরের গাঁথা.

সন '৭১ - সাধাসিধে মানুষগুলো আবার ফিরে এসেছিল - এবার তারা ছিল অজস্র - হয়ত অগুনতি - জাতভেদ যায়নি করা - ছিল না তাদের পৃথক পরিচয় - কোথা থেকে এসেছিল তারা - আবার লুকালোই বা কোথায় - সে এক বিস্ময়.

আমি দেখেছি তাদের - যতটা না টিভি স্ক্রিনে - যতটা না বইয়ের পাতায় - তারচেয়ে বেশি কল্পনায় - ওই দেখো অলস লাঙ্গল - পড়ে আছে ক্ষেতের আইল ঘেঁষে - কোথা গেল তার রূপকার - কারখানার অতিকায় যন্ত্রগুলি - পড়ে আছে নিশ্চল - কোথা গেছে শ্রমিকের বজ্রমুষ্ঠি - কামারের হাপরে আগুন নিভে গেছে - কোথা গেল লৌহ দাহক - গৃহকোণে পড়ে আছে ফাঁকা শ্লেট - খাতার ভাঁজে ময়ুর পালক - মায়ের কোল খালি করে কোথা হারিয়েছে আজ অবুঝ বালক - জটিল তত্ত্বে বিভোর ছিল যে গ্রন্থকীট - তার আসনও শুন্য কেন - এ তত্ত্ব ব্যাখ্যার অতীত - সারারাত অন্ত্যমিল খুঁজেছে যে কবি - সে ও নাকি আজ আগুনপাখি - এত লোক গেল কই - কোন সে দানব নিয়েছে তাদের গ্রাসী - হঠাৎ শুনেছি যুদ্ধের দামামা সর্বনাশী - ও কি কবি - হাতে কলম কোথায় - এ যে দেখছি এল.এম.জি. - বালকের হাতে পেয়ারা কোথায় - খোলা পিন গ্রেনেড - এ কী অদ্ভুত প্রাণবাজি - মালকোচা লুঙ্গি আছে - আছে ফুল আর হাফ প্যান্ট - কারো গায়ে শার্ট আছে - কারো বা উদোম শরীর - কে ছাত্র - কে কৃষক - কে বৃদ্ধ - কে যুবক - চিনতে পারিনা আলাদা করে - এ যে যোদ্ধার শিবির.

পরিশিষ্ট : সময়ের প্রয়োজনে এসেছিল তারা - দূরদেশ থেকে নয় - আমাদের মাঝ থেকে - আমাদেরই ঘর হতে তাদের উত্থান - কারও ভাই - কারও বোন্ - কারও সন্তান - কারও বা জনক - বেতনভূক সৈনিক ছিল না তারা - ছিল না পেশাদার মার্সেনারি - তবু লড়েছিল তারা - যুদ্ধ শেষে তাদের কেউ কেউ ফিরে এসেছে - কারও বা ঠাঁই হয়েছে প্রাণপ্রিয় এই মৃত্তিকার তলে - নববধুর মত টুকটুকে লাল একটা স্বাধীনতা সূর্য আমাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তারা আবার আত্মগোপন করেছে - প্রতিটি বছর আমরা তাদের আহ্বান করি - মিনার আর স্তম্ভের প্রাণহীন কাঠামোতে ফুলের পসরা সাজাই - সুললিত ছন্দে স্তবকীর্তন করি - কিন্তু কেন জানি না - তারা আসে না - একবারও সাড়া দেয় না - তারা একটা দেশের কথা বলেছিল - আমরা তাকে বিঘা কাঠায় বিভাজন করে ফেলেছি - অভিন্ন জাতীয়তার স্বপ্ন দেখেছিল - আমরা স্বার্থান্ধ দলীয়করণে মেতেছি - আত্মত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিল তারা - আমরা উল্টোটাই করছি - তাই কি তাদের অভিমান - চুপি চুপি যাদের আসার কথা - তাই কি তারা আসে না ?

তবু বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে - আবার তারা আসবে - খুব ক্রান্তিকালে - যখন তাদেরকে খুব বেশি প্রয়োজন - তারা আসবে - হয়ত একদিন - একজন কবি তার কলমটা আবার নামিয়ে রাখবে - এক গ্রন্থকীট চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াবে - একটা লাঙ্গল আবার হয়ত মানচিত্র আঁকবে - একটি পেশীবহুল হাত আন্দোলনের প্রতীক হবে - হয়ত একদিন - এক অবুঝ বালক আবার একটি পিন খোলা গ্রেনেড হাতে নেবে.....

আমি খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি - সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে অপেক্ষা করছি সে দিনটির জন্য.

সব ক’টা জানালা খুলে দাও না
আমি গাইব গাইব বিজয়েরই গান
ওরা আসবে চুপি চুপি…
যারা এই দেশ টাকে ভালবেসে
দিয়ে গেছে প্রাণ ||
চোখ থেকে মুছে ফেল অশ্রুটুকু
এমন খুশির দিনে কাদঁতে নেই ||
হারানো স্মৃতির বেদনাতে
একাকার করে মন রাখতে নেই
ওরা আসবে চুপি চুপি…
কেউ যেন ভুল করে গেয়নাকো
মন ভাঙ্গা গান
সব ক’টা জানালা খুলে দাও না
আজ আমি সারা নিশি থাকব জেগে
ঘরের আলো সব আধাঁর করে ||
ছড়িয়ে রাখ আতর গোলাপ
এদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে
ওরা আসবে চুপি চুপি…
কেউ যেন ভুল করে গেয়নাকো
মন ভাঙ্গা গান
সব ক’টা জানালা খুলে দাও না..

গীতিকার - নজরুল ইসলাম বাবু (মরহুম)
সুরকার - আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল
মূল শিল্পী - সাবিনা ইয়াসমীন।

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


যুদ্ধদিনের একেকটা গান আসলেই তুলনাহীন।

তানবীরা's picture


অনেকেই বলেন এগুলো মুকতিযুদধের গান নয়। এরশাদ টাইমের গান। সত্যি। কিনতু সময়ের ওপরতো আমাদের হাত ছিল না। তাই এখনো এ গান গুলো, শিরা উপশিরা ধমনীতে অন্য অনুভব নিয়ে আসে।

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


কথা সইত্য!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

হাসান আদনান's picture

নিজের সম্পর্কে

কিছু মানুষ জন্মায় - একাকিত্বের বীজমন্ত্র নিয়ে - জীবন তাদেরকে খেলায় - নাকি তারা জীবন কে নিয়ে খেলে - বোঝা দায় - সম্পর্ক - সেটা বন্ধুত্বের হোক - হোক ভালবাসার কিংবা রক্তের - তারা এড়িয়ে চলে - কিংবা কে জানে - বন্ধনে জড়ানোর যোগ্যতা হয়ত প্রকৃতি তাদের কে দেয়নি - অর্থহীন জীবন - মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠা - তারপর অঘুমো বিভীষিকাময় মুহূর্ত গুলো - তবু কাউকে ডাকা নয় - ডাকার জন্য যে প্রণোদনা লাগে তারা তা হারিয়ে ফেলেছে - শুধু ভোরের প্রতীক্ষা - যদিও জানে - ভোর আসবে না - এসব মানুষের জীবনে ভোর আসেনা- আসতে নেই - প্রসারিত কোনো হাতেই এরা হাত রাখে না - বিশ্বাস এদের নড়ে গেছে শুরুতেই - যেন সিজোফ্রেনিয়ার রোগী - এক বিচিত্র জগৎ - কোনো বন্ধন নেই - ভুল হলো- একটি বন্ধন আছে - থাকে - বিধাতার সাথে - সে বন্ধনে কখনো প্রার্থনা থাকে - কখনো ঘৃণা - কখনো অসম লড়াই - আর কখনো সীমাহীন - ব্যাখ্যাতীত অভিমান (আমি হয়ত এমনই একজন )

hasan_adnan'র সাম্প্রতিক লেখা