ইউজার লগইন

আঁধার বীজতলা

স্বচ্ছল একটি পরবার - তিনটি সন্তান তাদের - দুটি পুত্র - একটি কন্যা - বড় দুটি বেশ মেধাবী - ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবার সম্ভাবনা প্রবল - তাদের কথা ভাবলেই কর্তার বুক চওড়া হয়ে যায় - সমস্যা কনিষ্ঠ পুত্রকে নিয়ে - একটু যেন হাবাগোবা - ওকে দিয়ে কিছু হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ - তাই সিদ্ধান্ত হয় - মাদ্রাসাই তার উপযুক্ত স্থান - যতটুকু পারে পড়ুক বেচারা - আর তালেগোলে যদি কোরআনের হাফেজ হয়ে যায় - তবে তো সোনায় সোহাগা - নিজে তো বেহেশতি হবেই - সাথে টেনে নেবে পুরো পরিবারটাকেই - দুনিয়া - আখিরাত – দু’খানেই সফলতা - নিশ্চিদ্র বাস্তববাদী পরিকল্পনার রূপকার কর্তা একধরনের আত্মতুষ্টিতেই যেন ভোগেন.

রাজধানীর একটি অভিজাত পাড়া - নতুন একটি মসজিদ - মসজিদ বললে কম বলা হয় - আধুনিক স্থাপত্যের চরম উৎকর্ষের একটি নমুনা যেন - সুউচ্চ মিনারে অপূর্ব কারুকাজ - প্রশস্ত প্রবেশদ্বার - সুশোভিত মিম্বর - ইতালিয়ান টাইলসের চোখ ধাঁধানো ফ্লোর - রীতিমত শাহী অজুখানা - কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণী ব্যবস্থা - সব মিলিয়ে অসাধারণ - কিন্তু সমস্যা এক জায়গাতে - ইমাম সাহেব একটু কেমন যেন - জ্ঞানী মানুষ - সুন্দর খুতবা করেন - সুমধুর তার তেলাওয়াত - কিন্তু ওই যে - একটু একগুঁয়ে - আল্লাহওয়ালা জেদী লোক - মসজিদ কমিটির কথা শুনতে চান না - মিলাদ কিংবা মাহফিল - তারাবীহ কিংবা ইফতার - জুম্মা কিংবা জানাজা - কোথাও তার সমঝোতা নেই - ইসলামী তরিকার বাইরে তিনি পা দিতে চান না - এত টাকা দিয়ে যে কমিটি মসজিদ করে দিল - তাদের সামান্য (?) আব্দারগুলো ও তিনি চোখে দেখেন না - এত নীতিবাগীশ মানুষ নিয়ে কি চলা যায় - কমিটি তাই নতুন ইমাম খুঁজছে - একটু সাদাসিধা - একটু নতজানু - নিরব বেতনভোগী - আপোষকামী একটা মানুষ হলে ভালো হয়.

জাতীয় পর্যায়ের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে - মুখ্য গৌণ সব মন্ত্রীই উপস্থিত - আছেন বহু মান্যবর - অভ্যাগত অতিথি - আর সাদাসিধে দর্শকেরা - দীর্ঘ অনুষ্ঠানসূচী - জমজমাট আয়োজন - লাইভ টেলিকাস্ট অনুষ্ঠানের আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে - ওভারস্মার্ট সঞ্চালকের হাতে মাইক - মুখে কোরআন তেলাওয়াতের ঘোষণা - মাইকের পেছনে এখন পাঞ্জাবি পরিহিত সাদাসিধে একটি ছেলেকে দেখা যাচ্ছে - সঞ্চালক তার কানে কানে কি যেন বলছেন - বোধহয় সংক্ষিপ্ত সূরা বেছে নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন - সংবিধানের পাতায় কোথায় যেন ভুল করে 'ইসলাম' শব্দটা ঢুকে পড়েছিল - তাই এই বিড়ম্বনা - নয়তো সংক্ষিপ্ত কেন - পুরো তেলাওয়াতটাই বাদ দেয়া যেত.

বনানীর একটি বাসা - ধনাঢ্য এক ব্যক্তি মারা গেছেন - মৃতদেহ করালে শায়িত - আপাদমস্তক সাদা কাপড়ে ঢাকা - থমথমে পরিবেশ - করালের পাশে একদল অল্পবয়েসী হাফেজ এক সুরে তেলাওয়াত করে চলেছে - পাশের মসজিদ থেকে সামান্য সম্মানীর বিনিময়ে তাদের ডেকে আনা হয়েছে - মৃতের বড় ছেলের বয়স পনের - এই মুহুর্তে ড্রয়িং রুমে বসে আছে - শোকাভিভূত - কিছুটা যেন স্তম্ভিত - তেলাওয়াতের জাদুকরী সুর তাকে আপ্লুত করছে - ইচ্ছে করছে - বাবার জন্য সেও দু' ছত্র পড়ে - কিন্তু ওই মহাগ্রন্থের একটি হরফ ও যে তার জানা নেই.

এই যে খন্ড খন্ড অসম্পূর্ণতা - এর সবই কি বিছিন্ন ঘটনা ? মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ - অথচ ধর্ম যেন ছিড়ে যাওয়া তসবির একটি লুকিয়ে পড়া দানা বিশেষ - আমরা ইসলামকে আটকে ফেলেছি সাধু ভাষার কিছু পুস্তকে - সেই পুস্তক গুলিও আবার সুনির্দিষ্ট প্রকাশনী থেকে ছাপা হয় - সুনির্দিষ্ট লাইব্রেরি ঘরে তারা সুলভ হয় - তাদের গন্তব্য ও হয় সুনির্দিষ্ট কিছু বুক সেলফ - তাই ইসলাম ওই সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠির একচেটিয়া সম্পদ.

আমরা হচ্ছি মুক্তপ্রাণ উদারপন্থী - উর্বর মস্তিস্ক - ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী - নামাজের সানা জানি - সুরা ফাতেহা আর দরুদ ও জানি - এর বেশি কিই বা লাগে - এর বেশি কেনই বা খুঁজি - আধুনিকতাকে যখন দাঁড় করিয়েছি ইসলামের প্রতিদ্বন্দ্বী - তখন বেশি খোঁজাখুঁজি করলে ধর্মনিরপেক্ষ কিভাবে থাকি?

১৪০০ বছর আগে মহাগ্রন্থ এসেছিল - যে গ্রন্থের ভার নেবার ক্ষমতা ছিল না সুদৃঢ় পর্বতের - তার ভার আমরা চাপিয়েছি আমাদের দুর্বল মেধার ক্ষীণদেহী সন্তানের আরষ্ট কাঁধে - আমাদের সেরা কবিরা কত অপূর্ব কবিতা উপহার দিয়েছেন - কিন্তু চেয়ে দেখুন - নজরুল আর ফররুখের পর আর কেউ সেভাবে ইসলামের কথা লিখেননি - মীর মোশাররফের বিষাদ সিন্ধুর পরে মৌলিক (?) ইসলামী সাহিত্য কোথায় - জাতীয় দৈনিক গুলোতে খোঁজেন - 'মেরাজের ঘটনা' - 'রোজার মায়্সালা' - 'ইসলামে নারীর অধিকার' - 'যাকাতের তাৎপর্য' - এর বাইরে লিখা কোথায় ? ইসলামের সুবিশাল মহিমার কতটুকু ছাপ আমাদের জাতীয় জীবনে আছে বলুন তো?

ফেসবুকে ঢুকলেই শ্লোগান - 'মৌলবাদ নিপাত যাক' - জাতীয় দৈনিকে ইসলামী দলগুলোর মুন্ডুপাত - ব্লগে ব্লগে ধর্ম নিরপেক্ষতার জয়গান - কিন্তু কই - নিজেদের ধর্মের জন্য তো আমাদের কোনও অবদান নেই - বুকে হাত দিয়ে বলুন - আপনার বাবা আপনাকে যা শিখিয়ে গেছেন - আপনার সন্তানকে আপনি কি তা দিয়ে যেতে পারছেন? মৌলবাদের যদি উত্থান ঘটেই থাকে তবে তা ঘটেছে আমার আপনার উদাসীনতার কারণে - ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে আমাদের নাস্তিকতা আর নৈতিকতার অবনমনের ফলে.

আমরা একটা গোত্রের উপর মৌলবাদের দায় চাপিয়ে দিতে পারি - কিন্তু নিজেদের বিবেকের কাছে কি পরিষ্কার থাকতে পারব - পৃথিবীর সর্বত্র যেখানে মহাগ্রন্থ কুরআনের গোপন রহস্যগুলি আবিষ্কারের জন্য সেরা মস্তিস্কগুলি প্রাণপ্রাত করছে - আমরা সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে ধর্মকে একঘরে করে রাখছি.

আমরা ইসলাম চর্চা করব না- ইসলামী শিক্ষক গবেষক তৈরী করব না - ইসলামী মূল্যবোধ কে অবহেলা করব - অথচ আশা করব ইসলাম কে কেন্দ্র করে কোনও গোড়ামি যেন গড়ে না ওঠে - যেখানে জ্ঞানের আলো নেই - সেখানেই অন্ধকারের বীজ রোপিত হয় - সরকারী প্রশাসন যন্ত্র যতই সক্রিয় হোক না কেন - আইনের খড়গ - পুলিশের লাঠি - যতই উদ্যত হোক না কেন - মৌলবাদ বাড়তেই থাকবে - যতদিন না আঁধার বীজতলাতে ধর্মীয় জ্ঞানের আলোক রশ্মি আপতিত হয়.

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

শাশ্বত স্বপন's picture


সমস্যা কনিষ্ঠ পুত্রকে নিয়ে - একটু যেন হাবাগোবা - ওকে দিয়ে কিছু হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ - তাই সিদ্ধান্ত হয় - মাদ্রাসাই তার উপযুক্ত স্থান - যতটুকু পারে পড়ুক বেচারা - আর তালেগোলে যদি কোরআনের হাফেজ হয়ে যায় - তবে তো সোনায় সোহাগা - নিজে তো বেহেশতি হবেই - সাথে টেনে নেবে পুরো পরিবারটাকেই - দুনিয়া - আখিরাত – দু’খানেই সফলতা - নিশ্চিদ্র বাস্তববাদী পরিকল্পনার রূপকার কর্তা একধরনের আত্মতুষ্টিতেই যেন ভোগেন.।

আমরা ইসলাম চর্চা করব না- ইসলামী শিক্ষক গবেষক তৈরী করব না - ইসলামী মূল্যবোধ কে অবহেলা করব - অথচ আশা করব ইসলাম কে কেন্দ্র করে কোনও গোড়ামি যেন গড়ে না ওঠে - যেখানে জ্ঞানের আলো নেই - সেখানেই অন্ধকারের বীজ রোপিত হয় - সরকারী প্রশাসন যন্ত্র যতই সক্রিয় হোক না কেন - আইনের খড়গ - পুলিশের লাঠি - যতই উদ্যত হোক না কেন - মৌলবাদ বাড়তেই থাকবে - যতদিন না আঁধার বীজতলাতে ধর্মীয় জ্ঞানের আলোক রশ্মি আপতিত হয়.।

তবে যাই বলুন, ধর্মের মধ্যেই জামেলা আছে, মানে গোঁড়ায় গলদ আছে। নইলে এত বিভাজন,এত ধর্মীয় দল বা গ্রুপ--সুন্নী-শিয়া-ইসমাইলিয়া...,মাজার গ্রুপ,পীরের গ্রুপ ,,, কিভাবে হয়

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


জানার অভাবে ধরতে পারেন।

যারা জানে তারা আজকাল আর কিছুই বলে না।
আর যারা বলে, কিছুই না জেনে বলে ফলে ভুল বলে।

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


অসাধারণ একটা পোস্ট।

Star Star Star Star Star

তানবীরা's picture


ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে আমাদের নাস্তিকতা আর নৈতিকতার অবনমনের ফলে.

লাইনটা বুঝি নাই, যদি একটু ব্যাখা করতেন।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

হাসান আদনান's picture

নিজের সম্পর্কে

কিছু মানুষ জন্মায় - একাকিত্বের বীজমন্ত্র নিয়ে - জীবন তাদেরকে খেলায় - নাকি তারা জীবন কে নিয়ে খেলে - বোঝা দায় - সম্পর্ক - সেটা বন্ধুত্বের হোক - হোক ভালবাসার কিংবা রক্তের - তারা এড়িয়ে চলে - কিংবা কে জানে - বন্ধনে জড়ানোর যোগ্যতা হয়ত প্রকৃতি তাদের কে দেয়নি - অর্থহীন জীবন - মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠা - তারপর অঘুমো বিভীষিকাময় মুহূর্ত গুলো - তবু কাউকে ডাকা নয় - ডাকার জন্য যে প্রণোদনা লাগে তারা তা হারিয়ে ফেলেছে - শুধু ভোরের প্রতীক্ষা - যদিও জানে - ভোর আসবে না - এসব মানুষের জীবনে ভোর আসেনা- আসতে নেই - প্রসারিত কোনো হাতেই এরা হাত রাখে না - বিশ্বাস এদের নড়ে গেছে শুরুতেই - যেন সিজোফ্রেনিয়ার রোগী - এক বিচিত্র জগৎ - কোনো বন্ধন নেই - ভুল হলো- একটি বন্ধন আছে - থাকে - বিধাতার সাথে - সে বন্ধনে কখনো প্রার্থনা থাকে - কখনো ঘৃণা - কখনো অসম লড়াই - আর কখনো সীমাহীন - ব্যাখ্যাতীত অভিমান (আমি হয়ত এমনই একজন )

hasan_adnan'র সাম্প্রতিক লেখা