ইউজার লগইন

মৎসকন্যা

laabony_1303722045_1-mirrorm.jpg
পুরোপুরি নারীর শরীর নয়, আবার পুরোপুরি মাছও নয়.....এই হলো মৎসকন্যা।

সাগরগর্ভে কোনো জনহীন দ্বীপের কাছাকাছি পাথরের উপরে অথবা জল থেকে জেগে উঠা পাহাড়ের পাথরের খাঁজে পরিষ্কার দিনের আলোয় এই বিচিত্র প্রাণীটির দেখা মেলে। তার হাতে থাকে একটি আয়না। দীর্ঘ সোনালী কেশগুচ্ছ ছেয়ে থাকে পিঠময়।
সমুদ্রবক্ষের বহু অজ্ঞাত রহস্যের সন্ধানদাতা এবং প্রথম আবিষ্কর্তা হলো সমুদ্রচারী নাবিকেরা। সাগরের বুকে কোনো নির্জন দ্বীপ অতিক্রম করবার সময় মৎসকন্যাও সম্ভবত তাদের চোখে ধরা পড়ে। কখনো সাগরজলে ভাসমান অবস্থায়....কখনো পাথরে উপবিষ্ট অবস্থায়। জাহাজের সাড়া পাবার সঙ্গে সঙ্গেই মৎসকন্যা সাগরজলে অদৃশ্য হয়ে গেছে।

সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বিলাতের 'টাইমস' পত্রিকায় মি.মনরো নামের এক ভদ্রলোকের স্বচক্ষে দেখা একটি রহস্যময় প্রাণীর বিবরণ প্রকাশিত হয়। স্কটল্যান্ডের সমুদ্রের ধারে বেড়াবার সময় এক নির্জন স্থানে একটি পাথরের উপরে তিনি প্রাণীটিকে দেখতে পান। মি.মনরো দাবি করেন, জীবটির কোমর থেকে নিচের অংশ একটি বিরাট মাছের মতো, কিন্তু উপরের অংশ অবিকল মেয়েদের মতো। মাথায় দীর্ঘ সবুজ চুলের গুচ্ছ, দেহের রং আশ্চর্য রকমের ফর্সা। প্রাণীটি সমুদ্রের মুকুরে দৃষ্টি নিবন্ধ রেখে আপন মনে চুল আঁচরাচ্ছিল। পায়ের শব্দ পেয়ে পলকের মধ্যে জলের তলায় আত্মগোপন করে।

এই বিবরণ প্রকাশের কিছুদিন পরেই মিস ম্যাকাই নামে জনৈকা ভদ্রমহিলার একটি চিঠি উক্ত 'টাইমস' পত্রিকাতেই ছাপা হয়। চিঠি থেকে প্রকাশ পায়, তিনি স্কটল্যান্ডের সমুদ্রের ধারে আকস্মিকভাবে একটি অদ্ভুদ প্রাণীর দর্শন পেয়েছেন। প্রাণীটির দেহের নিচের অংশ মাছের মতো। কোমর থেকে উপরের অংশ মেয়েদের মতো। মাথার চুল পাতলা এবং চুলের রং সবুজ বলে তার মনে হয়েছে। তীরসংলগ্ন একটি পাথরের উপর বসে প্রাণীটি চুলে চিরুনি বুলোচ্ছিল।

১৬২৫ খ্রিঃ হেনরী হাডসন নামে জৈনক নাবিকের কাছ থেকে প্রথম এ ধরনের একটি প্রত্যক্ষ দর্শনের বিবরণ পাওয়া গিয়েছিল। তিনি মৎসকন্যাটিকে জলে ভেসে যেতে দেখেছিলেন। কিন্তু কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখাতে পারেননি বলে সে সময় মিঃ হেনরী হাডসনের বিবরণ কেউ আমল দেয়নি।

একাধিক স্থানে এই বিচিত্র প্রাণীটি বহুকাল ধরে অনেকেরই দৃষ্টিগোচর হয়ে আসছে। বিশেষকরে পূর্বভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি অঞ্চলে প্রাণীটি বহু নাবিকের চোখে পড়ে। মজার ব্যাপার হলো, যারাই এই জীবটিকে প্রত্যক্ষ করেছেন, তাদের সবারই বিবৃতি প্রায় একই রকম। সাগরের সেই নির্জন অংশ, সেই সেই চিরাচরিত পাথরের আশ্রয়, তেমনি কেশচর্চা-প্রসাধন ইত্যাদি।

১৭০১ খ্রীঃ কর্ণওয়াল ও স্কটল্যান্ডের উপকূলে দুজন জেলে বঁড়শি দিয়ে মাছ ধরছিল। সেই সময় তারা একটি মৎসকুমারীকে বঁড়শিতে গেঁথে জল থেকে খানিকটা তুলে ধরেছিল। জেলেদের বর্ণনায়, মৎসকুমারীটির হাত, মুখ, কাঁধ সবই অবিকল মেয়েদের মতো। চুল ঘাড় পর্যন্ত। কিন্তু তার শরীরের নীচের অংশ কেমন তা তারা বলতে পারল না। কেন না সেই অংশ ছিল জলের নীচে। জেলেদের একজন তার কোমর থেকে ছোরা তুলে নিয়ে মৎসকুমারীটিকে লক্ষ্য করে ছুঁড়েছিল। আঘাত পেয়ে সে সরবে কেঁদে ওঠে। যন্ত্রণায় ছটফট করে তখনি বঁড়শি ছিঁড়ে জলে পড়ে যায়। এরপর আর তাকে দেখা যায়নি...

laabony_1303976841_1-201.gif.jpeg

১৭৭৫ খ্রীষ্টাব্দে গ্রীক দ্বীপপুঞ্জের কাছে ধরা পড়ে একটি মৎস্যকন্যা। হৈ চৈ পড়ে গেলো চারিদিকে। দেখাবার জন্য লন্ডনে নিয়ে আসা হলো প্রাণীটিকে। বিবরণ দিতে গিয়ে এ সম্পর্কে Annual Reviewer পত্রিকা লিখল: প্রাণীটির শরীরের আকৃতি মেয়েদের মত। রীতিমতো শ্বেতাঙ্গিনী, চোখ দুটি নীলাভ। নাক মুখ ছোট, ঠোঁট পাতলা- অনেকটা কড মাছের মতো। ঝকঝকে সাদা দাঁতের সারি- সুন্দরভাবে সাজানো। চোয়াল আর কাঁধ সুগঠিত। কান মানুষের মতোই অনেকটা, তবে সেই সঙ্গে জলের মধ্যে নিঃশ্বাস নেবার উপযুক্ত বাড়তি খানিকটা অংশ কুঁকড়ে আছে। মাথায় চুল নেই, তার বদলে রয়েছে ছোট ছোট মাংসপিন্ড!! দূর থেকে দেখলে ওগুলোকেই কোঁকড়ানো চুল বলে মনে হয়। মাথার দুপাশের দুটি কানকো বেশ খানিকটা ঝুলে আছে। হঠাৎ দেখলে মনে হয় টুপিপরা।

মৎস্যকন্যাটির শরীরে কোন ডানা দেখা গেলো না। তবে মানুষের মতো শিরদাঁড়া আছে। হাতে আঙ্গুল আছে কিন্তু নখ নেই। কোমর থেকে নিচের অংশ কড মাছের মতই দেখতে আর শরীরের দুপাশে সমুদ্রে সাঁতার কাটার উপযুক্ত পর পর রয়েছে তিন জোড়া ডানা।
মৎস্যকন্যা যে একটি বিশেষ বাস্তব প্রাণী এবারে তা প্রমাণ হয়ে গেলো।

laabony_1303976888_2-2121059750_311dc03a2c.jpg
রূপকথার যাদুকর অ্যান্ডারসনের গল্পের মৎস্যকন্যা মূর্তি ডেনমার্কের জাতীয় প্রতীক

এই ঘটনার কিছুদিন পরেই জীববিজ্ঞানীরা অদ্ভূত এই প্রাণীটি সম্পর্কে যুক্তি গ্রাহ্য রায় প্রকাশ করলেন। তাঁরা জানালেন, মৎস্যকন্যা বা মৎস্যকুমারী বলে যে অত্যাশ্চর্য প্রাণীটি বহু শতাব্দীকাল থেকে মানুষের কৌতূহল ও বিস্ময় উদ্রেক করে আসছে। সত্যিকারের মৎস্য বা মানবকন্যার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। মৎস্যকন্যারা হয় স্টেলার্স সি কাউ নতুবা ডুগং। উভয়ই অতিকায় সামুদ্রিক জীব।

প্রাণী দুটির একটি আবিষ্কার করেছিলেন বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী জর্জ স্টেলার। ১৭৪১ সালে সমুদ্রযাত্রাকালে প্রশান্ত মহাসাগরের কাছে এক দ্বীপে তিনি প্রাণীটিকে ধরেন। সেই প্রথম প্রাণীটি মানুষের হাতে ধরা পড়ে। পরে আবিষ্কর্তার নামানুসারেই তার নামকরণ হয় স্টেলার্স সী কাউ।

laabony_1303977127_4-images.jpeg
স্টেলার্স সী কাউ

নামকরণ থেকেই জন্তুসদৃশ প্রাণীটির পরিচয় কিছুটা অনুমান করা চলে। রীতিমত ভীতিজনক চেহারা এদের। লম্বায় প্রায় কুড়ি ফিটের মতো। ওজনও সেই অনুপাতে- কম বেশী একশ মণ। ল্যাজের অগ্রভাগ অর্ধচন্দ্রাকারে পেছনের দিকে বাঁকানো। ঊর্ধদেহের দুপাশে একজোড়া ডানা বা ফ্লিপার ঝোলানো। তাদের মাথার দিকে থাকে মোটা চুলের ঝালর। মাংসপিন্ড দিয়ে তৈরি ডানাজোড়া দেখতে অনেকটা মানুষের হাতের মত। ডানা দুটির কাছ থেকেও প্রাণীটি হাতের কাজই পেয়ে থাকে। অল্প জলে কিংবা নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে এগুলোর সাহায্যেই তারা অত বড় শরীরটাকে হিঁচড়ে নিয়ে চলে।

সী কাউ বিশালদেহী হলেও মূলতঃ তৃণভোজী প্রাণী। এদের স্নেহপ্রবণতা প্রবাদের মত। বাচ্চাকে সর্বদা বুকে জড়িয়ে রাখা স্বভাব। অভ্যাসবশে বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে এরা প্রায়ই অল্প জলে ল্যাজের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ায়। বিজ্ঞানীদের অভিমত, সী কাউদের এই বিশেষ অবস্থায় দূর থেকে দেখতে পেয়ে নাবিকরা বিভ্রমে পড়ে যায়। তাদের দেখার সঙ্গে মনের কল্পনা মিশে তৈরি হয় নানান কাহিনী। মৎস্যকন্যার গল্প এভাবেই তৈরি হয়ে চলেছে প্রাচীনকাল থেকে।

ডুগং নামের প্রাণীটিও বিচিত্র। লম্বায় এরা দশ থেকে কুড়ি ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। ওজন দশ মণেরও বেশি। বিরাট শরীরের তুলনায় মাথাটি নিতান্তই ক্ষুদ্রাকৃতির। দেহ সী কাউ-এর মতোই প্রান্তের দিকে বাঁকানো এবং ঘন কালো লোমে আবৃত। এরাও তৃণভোজী। সমুদ্রের ঘাস শ্যাওলা খেয়ে জীবনধারণ করে। কাঁধ ঘাড় বুকের অংশবিশেষ দেখতে অনেকটা মেয়েদের মতো।

laabony_1303977099_3-dugong_image_by_barry_ingham_75dpi.jpg
সমু্দ্র প্রাণী ডুগং

সমু্দ্রের এই বিশেষ প্রাণীটি অনেক দেশেই পরিচিত। আমাজনবাসীরা মনে করে ডুগং দেখা শুভ লক্ষণ। মালয় দেশে ডুগং অন্যতম সুখাদ্যের মধ্যে গণ্য।

বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝমাঝি পর্যায়ে অনুমান ও সন্দেহের এক বিচিত্র রহস্যময় জগতে আজও মৎস্যকন্যারা বিচরণ করছে মানুষের অপরিমেয় কৌতূহলকে জাগ্রত রেখে।

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রায়েহাত শুভ's picture


ভুলে গেছি, ডুগং আর সী-কাউ এরা ম্যামাল না?

লাবণী's picture


জী ভাইয়া! এরা ম্যামাল! Smile
ধন্যবাদ Smile

শর্মি's picture


আচ্ছা মৎস্যবালক পাওয়া যায়নাই কোথাও? আপ্সুস!

লাবণী's picture


আফসোস!
মৎস্যবালক পাওয়া গেলে হয়তো আমরা তাঁদের বিয়ের দাওয়াত পেতাম Big smile

লীনা দিলরুবা's picture


অনেক কিছু জানলাম।

লাবণী's picture


ধন্যবাদ লীনাপু Smile
ভালো থাকবেন Smile

তানবীরা's picture


আচ্ছা মৎস্যবালক পাওয়া যায়নাই কোথাও? আপ্সুস! Tongue

অনেক কিছু জানলাম।

লাবণী's picture


আফসোস!
মৎস্যবালক পাওয়া গেলে হয়তো আমরা তাঁদের বিয়ের দাওয়াত পেতাম! Big smile

ধন্যবাদ তানবীরাপু Smile
ভালো থাকবেন Smile

প্রিয়'s picture


অনেক কিছু জানলাম।

১০

লাবণী's picture


পাঠের জন্য ধন্যবাদ প্রিয় আপুটি Smile
ভালো থাকবেন Smile

১১

লাবণী's picture


পাঠের জন্য ধন্যবাদ প্রিয় আপুটি Smile
ভালো থাকবেন Smile

১২

আরাফাত শান্ত's picture


ব্যাপক জানলাম!

১৩

লাবণী's picture


ধন্যবাদ আরাফাত শান্ত Smile
ভালো থাকবেন Smile

১৪

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


কয়দিন আগে 'পিরাটেস অব কারিবান ৪'এ মৎসকন্যার কান্ডকারখানা দেইখা হাসতে হাসতে শেষ!! Big smile

১৫

লাবণী's picture


৩ পর্যন্ত দেখা হয়েছিল! Smile তাই ৪ এর কথা বলতে পারছি না!
ধন্যবাদ বিষণ্ণ ভাই Smile

১৬

শাফায়েত's picture


অনেক কিছু শিখলাম। আপনে কি বাচ্চাদের স্কুলের টিচার নাকি?

১৭

লাবণী's picture


নাআআআআআ!!!!

১৮

সাঈদ's picture


কত কি যে জানার আছে !!!!

১৯

লাবণী's picture


আসলেই!! Smile
ধন্যবাদ ভাইয়া Smile

২০

জেবীন's picture


১৭৭৫ খ্রীষ্টাব্দে গ্রীক দ্বীপপুঞ্জের কাছে ধরা পড়ে সেই মৎস্যকন্যার কোন ছবি রাখা যায় নাই? গেলে বুঝা যে কি জিনিসা আসলে! ডুগং আর সী কাউ দেখে মানুষ লাগবে কেন, মাথার গড়নই তো মানুষের মত না। দূর থেকে দেখে মানুষ কতো কি বিভ্রমে পড়ে!

লেখা পড়ে ভালোই জানা গেলো Smile

২১

লাবণী's picture


না আপু। সেই ছবি তো কোথাও পেলাম না!
আমিও ভাবছি---আসলেই এমন কিছু ছিল কিনা!
থ্যাঙ্কুশ আপুনি Smile
ভালো থাকবেন Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

লাবণী's picture

নিজের সম্পর্কে

রঙিন রোদের জ্বালাতন সহ্য করা আশ্রয়হীন পাখির মতো শুধু ডানায় ভর করে দিগন্তের পর দিগন্ত পাড়ি দিয়ে একসময় আমরা হয়ে পড়ি পথহীন দিকভ্রান্ত পথিক। পায়ের তলায় এসে মাথা কুটতে থাকে পথেরা। ক্লান্ত জীবনে নিঃশব্দের মতো সন্ধ্যা নামে...রাত আসে। জোৎস্না রাতের উজ্জ্বলতায় চেয়ে দেখি বৃষ্টি ভেজা চতুর্দশীর মতো তারায় সেজে আছে আকাশ। শুধু ভাবি...সুবিস্তৃত অসীম আকাশের কোনো এক কোণে কি একটু আশ্রয় পাওয়া যাবে না?