ইউজার লগইন

কয়েকটি সাদা গ্ল্যাডিওলাস ও একটি অনাকাঙ্খিত বৃষ্টির গল্প

38.JPG

তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা তুমি আমার নিভৃত সাধনা,
মম বিজনগগনবিহারী...........
আমি আমার মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা-
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম বিজনজীবনবিহারী.................

বাইরে মুষলধারে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। পাঁচদিন ধরে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। হাতে তুর্যর ছবির ফ্রেমটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর গানটা শুনছে অনিতা। গানটা তুর্যর অনেক পছন্দের। তুর্য কাছে থাকলে নিশ্চয় ফুল ভলিয়ামে গানটা ছেড়ে দিয়ে অনিতাকে নিয়ে ভিজতো। কি করছে এখন সে? সে-ও কি অনিতার মতো বৃষ্টিটা অনুভব করছে? ইস্‌ একটানা পাঁচদিন ধরে সে ভিজছে। ওর তো ঠান্ডা লেগে যাবে! ওর আবার অল্পতেই ঠান্ডা লেগে যায়। এখনো কি ওর ঠান্ডা লাগে? এখনো কি মাথায় ক'ফোঁটা বৃষ্টি পড়লেই আট-দশটা হাঁচি দেয় সে? কে এখন তাকে আদা চা করে দেয়? জ্বর এলে কে মাথায় পানি ঢেলে দেয়.....আলতোভাবে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়? এখনো কি সে বৃষ্টির দিনে ভুনা খিচুড়ি খেতে পছন্দ করে? কেমন আছে তুর্য এখন?......খুব জানতে ইচ্ছে করে অনিতার।

একাকীত্বের অভিশপ্ত প্রেতাত্মাটা আবার চেপে বসেছে অনিতার ঘাড়ে। বুকফাটা কষ্টের মধ্যেও কৃত্রিম মুচকি হাসিটাকে ঠোঁটের কোণে ধরে কোনোরকমে ভালো থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে পরিচিতজনদের সঙ্গে।.....জীবনটা যেন এখন তপ্ত মরুভূমি। এক পশলা শীতল বৃষ্টির আবির্ভাব কি আদৌ হবে?

অনিতার দু'চোখ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে। বর্ষার মতো করেই জল ঝরতে থাকে। সেলফোনটা একটানা বেজেই চলছে। অনিতার মনে হলো হয়তো তুর্য ফোন করেছে। রিসিভ করলেই বলে উঠবে, "কি করছো তুমি? রান্না? জলদি রান্না শেষ করো। দেখছো না তোমার-আমার হয়ে আকাশের আনন্দাশ্রু? আমি আসছি, দুজন মিলে আকাশের আনন্দাশ্রুজলে বিলীন হবো...........একসাথে"
-"না, না, তা কি করে হয়!! এ সময়........"
-"কেন হবে না? আগে আমরা দুজন ভিজতাম। এখন তিনজন ভিজবো। দেখো আমাদের সোনামণির কিছুই হবে না।"
কি পাগলই না ছিল তুর্যটা। অনিতা ছাড়া তুর্য যেন ছিল অচল। কিন্তু এখন? কি করে থাকছে সে অনিতাকে ছাড়া?

তুর্যর সবকিছুই ভালো লাগতো অনিতার। প্রতি রাতেই অনিতাকে শোনাতো ছোট্ট প্রিয়ন্তীকে কিভাবে মানুষের মতো মানুষ করবে, যার মাঝে থাকবে সততা, অসীম সহনশীলতা আর মানুষের জন্য অকৃত্রিম ভালোবাসা.......আরো কত কি!
আচ্ছা, তুর্য কি এখনো প্রিয়ন্তীর অসুখের সময় সারারাত নির্ঘুম পায়চারি করে? তার কি জানতে ইচ্ছে করে না...কেমন আছে তার প্রিয় মানুষ দুজন? তার কি বলতে ইচ্ছে করে না, "অনিতা, আজ তুমি জলপাই রঙের শাড়িটা পরবে....কপালে ছোট্ট একটা টিপ, দুই হাত ভর্তি চুড়ি আর খোপায় বেলী ফুলের মালা..?"

অনেক জানতে চাওয়া রয়ে গেছে তার কাছে অনিতার। অনেক অভিমান তার ওপর। কেন অনিতাকে এভাবে ছেড়ে চলে গেলো? আর যদি যাবার-ই ছিল, তবে কেন এত ভালোবেসেছিল অনিতাকে? কেন স্বপ্ন দেখিয়েছিলো?
আজ অনিতার কি হলো....? সকাল থেকে প্রতিটা মূহুর্তে শুধু তুর্যকে ভাবছে। আজ ১৫-ই জুন....তাদের বিয়ে বার্ষিকী। বিয়ের আট বছর আর ভালোবাসার বারো বছর। বারো বছর আগে এই দিনেই তাদের প্রথম দেখা...ভালো লাগা। তুর্য বলতো, আমাদের ভালোবাসার দিন এবং বিয়ের দিন একই হবে। হয়েছিলোও তাই।

অনিতা বারান্দা থেকে আয়নার সামনে গেলো। নিজেকে দেখলো অনেকক্ষণ। এই কি সেই অনিতা, তুর্যর অনিতা! যাকে দেখলে যে কেউ দ্বিতীয়বার চোখ তুলে দেখতো! গত পাঁচ বছরে কত বুড়িয়ে গেছে। নির্ঘুম দু'চোখের নিচে পড়েছে কালি। আজ অনিতা সাজবে। তুর্যর মনের মতো করে সাজবে। দুই হাত ভর্তি চুড়ি, কপালে টিপ, খোঁপায় বেলী ফুলের মালা আর জলপাই রঙের শাড়ি।
অনিতা অনেকক্ষণ ধরে সাজালো নিজেকে। প্রিয়ন্তীকেও তৈরী করলো। তারপর মা-মেয়েতে বের হলো একজনের অদেখা, আরেকজনের দেখা সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে দেখা করতে।

ছোট্ট প্রিয়ন্তী কখনো দেখেনি তার বাবাকে। কিন্তু বাবার সমস্ত ভালোলাগা-মন্দলাগা সব তার মুখস্ত, মায়ের মুখে শুনতে শুনতে। আজ সে গভীর আগ্রহে মায়ের সঙ্গে চললো বাবার সঙ্গে দেখা করতে। এতদিন পর মা রাজি হলেন তার বাবার সঙ্গে তাকে দেখা করানোর জন্য।
ছোট্ট প্রিয়ন্তী ঠিক করে রেখেছে বাবাকে দেখামাত্রই দৌড়ে কোলে উঠে অনেক আদর করবে। চুমু দিয়ে ভরিয়ে দেবে বাবার সারা মুখ। বাবার সঙ্গে খেলবে কত খেলা!
দুজনে পথ থেকে কিনলো সুন্দর একগোছা সাদা গ্ল্যাডিওলাস। বাবার পছন্দের ফুল।
কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে মা তাকে এ কোথায় আনলেন!! এখানে তো কোনো বাড়ি নয়। এখানে অনেকগুলো চারিদিকে ঘেরা দেয়া উঁচু মাটির স্থান। এগুলো কি? তার ছোট্ট মাথায় কিছুই ঢুকছে না।

একটা ঘেরা দেয়া জায়গায় মা আর মেয়ে এসে দাঁড়ালো। অনিতা ফুলগুলো সেখানে রেখে বললো,"মা, এটাই তোমার বাবার ঘর।"
ছোট্ট প্রিয়ন্তী কিছুই বুঝতে পারেনা। মা তো বলেছে বাবা ছোট্ট সুন্দর একটা বাড়িতে থাকে। এখানে যে কোনো বাড়ি নেই!!
মায়ের চোখে বৃষ্টির চেয়েও বেশি পানি ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে। কেন জানি কি ভীষণ এক অজানা কষ্টে ছোট্ট প্রিয়ন্তীর দুচোখ বেয়েও মায়ের মতো ঝরঝর করে ঝরছে জলের ধারা.........

সময় দ্রুত বহমান। কারো পাওয়া না পাওয়ায় তার কিছুই যায় আসে না। কারো একাকীত্বে তার নেই পিছুটান। কারো নীল কষ্টে সে নীল হয় না। ভবিষ্যতের দেয়ালে শাবল চালিয়ে এক একটা ইট অতীতের গর্ভে ফেলে সময় কেবলই দৌড়ায়। কিন্তু এই সময় কারো চোখের পানি মোছার দায়িত্ব নেয় না.........

images_7b7ecbbe4965d18534262ff1176230b5.gif
38.JPG

প্রিয়'s picture


সুন্দর।

লাবণী's picture


অজস্র ধন্যবাদ প্রিয় আপু Smile
শুভেচ্ছা রইলো!
ভালো থাকবেন Smile

রায়েহাত শুভ's picture


মন খারাপিয়া...

লাবণী's picture


হুমম!! Sad

আশরাফুল আলম's picture


শিরোনামটা গল্পের চেয়েও সুন্দর...

লাবণী's picture


অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই!
ভালো থাকবেন Smile

তানবীরা's picture


শিরোনামটা গল্পের চেয়েও সুন্দর...

লাবণী's picture


শুভ সন্ধ্যা তানবীরাপু Smile
মন্তব্যে কৃতজ্ঞতা!

লীনা দিলরুবা's picture


ভালো লেগেছে।

১০

লাবণী's picture


অ-নে-ক ধন্যবাদ লীনাপু Smile
ভালো থাকবেন Smile

১১

উচ্ছল's picture


ভালো লেগেছে কিন্তু সাথে সাথে মন খারাপও হলো। Sad

১২

লাবণী's picture


মন খারাপ করে দিলাম? Sad এই নিন কোক

অজস্র ধন্যবাদ!
ভালো থাকবেন Smile

১৩

জেবীন's picture


আজকে জানতে পারলাম, সকালে আমার এক বান্ধবীর বর মারা গেছেন, কি ভাবে এখনো জানতে পারিনি। ওরা দু'জন বন্ধু ছিলো সেই ইন্টারের সময় থেকে। এতোটা সময় যাকে নিয়েই বেড়ে ওঠা সেই মানুষটাকে ছাড়া কি করে চলবে ও, ভাবতেই কষ্ট লাগছে।

১৪

লাবণী's picture


কি বলবো বুঝতে পারছি না, জেবীন আপু! Sad
অনেক বেশি মন খারাপ হয়ে গেল Sad Sad

১৫

শাফায়েত's picture


আপনার লেখনী খুবই চমৎকার। গল্পটাকে গল্প মনে হচ্ছিলো না। মনে হচ্ছিলো কয়েকটা বাস্তব মূহুর্তের ফ্ল্যাশব্যাক। আরো বড় বড় লেখা চাই আপুমনি। আপনাকে দিয়ে লেখালেখির কাজটা বেশ ভালো মতোই হবে বলে মনে হয়। Smile

১৬

লাবণী's picture


অনুপ্রেরণার জন্য অনেক কৃতজ্ঞতা শাফায়েত!
ভীষণ ভালো লাগলো!
ভালো থাকবেন Smile

১৭

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


ভাল লেখাগুলো সব কেন এত মন খারাপ করা হয়?! Sad(

১৮

লাবণী's picture


Sad বিষণ্ণ ভাই, মন খারাপ করে দেওয়ার জন্য দুঃখিত!

সুন্দর মন্তব্যে কৃতজ্ঞতা সহ ধন্যবাদ জানবেন! Smile
ভালো থাকবেন Smile Smile
শুভরাত্রি-----

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

লাবণী's picture

নিজের সম্পর্কে

আমার আমি.......