ইউজার লগইন

সর্বংসহা............

Glass WInged Butterfly.jpg
==============================
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার বিষন্ন আলোটুকুও ঢেকে পড়েছে কুয়াশার চাদরে। ঘরের পুব পাশের জানালাটা দিয়ে আকাশের বেশ খানিকটা চোখে পড়ে। দৃষ্টির লাঙ্গল চষে বেড়ায় আকাশের বুক চিরে। হঠাৎ কেন জানি বুকের মধ্যে আকুলি-বিকুলি করে উঠে বোবা কষ্ট। যে কষ্ট ফোঁটা ফোঁটা শিশির বিন্দুর মতো জমাট বেঁধে আছে বুকে। কখনো অবসরে অগোচরে সে বরফ গলে পড়ে অশ্রু হয়ে।
বাতাসের স্পর্শে শিরশির করে উঠে শরীর। আচম্বিতে মনে পড়ে মেয়েটা এখনো বাড়ি ফেরেনি।

ইদানীং কেমন যেন বদলে গেছে মেয়েটা। আইএ পাশ করার পর আলেয়া চেয়েছিল মেয়ে বিএটাও পাশ করুক। যত কষ্টই তার হোক, তবুও মেয়েটা স্বাবলম্বী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করুক। তার মতো পরগাছা হয়ে যেন ওকে না বাঁচতে হয়। কিন্তু মেয়ে কথা শুনলো না। মাকে না বলেই হুট করে বাচ্চাদের স্কুলে চাকরী নিয়ে নিল। এখন হয়তো আলেয়া মেয়েকে নিয়ে আলাদা সংসার বাঁধতে পারে। মেয়ে এখন চাকরী করে। ওর রোজগারে দুটো জীবন চলবে নিশ্চয়ই। কিন্তু মেয়ের বিয়েও তো দিতে হবে....আনমনে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে আলেয়ার বুক ফেটে।

হাত বাড়িয়ে সুইচ টেপে। বিদ্যুৎ নেই। বিশাল এই ছায়াচ্ছন্ন বাড়িটিতে প্রায়ই তাকে একা থাকতে হয়। সন্ধ্যার নৈঃশব্দ্য গ্রাস করেছিল তার বর্তমানকে। বহু কষ্টে চিন্তার জাল ছিড়ে হাত বাড়িয়ে জলচৌকির আড়াল থেকে হারিকেন বের করল। একটা ন্যাকড়া বের করে দ্রুত হাতে চিমনি পরিষ্কার করলো সে। চাচাজান এখনই বাড়ি ফিরবেন। সন্ধ্যাবেলায় ঘরে বাতি না জ্বালালে খুব রাগ করেন তিনি।
হারিকেন জ্বালিয়ে উঠে দাঁড়াতেই মেয়ে বাড়ি ফিরল। হাতের কাজ সারতে সারতে আলেয়া দুর্বল কন্ঠে মেয়ের কাছে জানতে চায়, "তর ফিরতে এত দেরী অয় ক্যা?".....মেয়ের চাপা উত্তর,"কাম থাহে...তাই দেরী অয়। প্রত্যেক দিন একই প্যাঁচাল পাড়ো ক্যা মা?" বুকের মধ্যে কষ্টগুলো নড়েচড়ে ওঠে। নিরুচ্চারে বলে, হায়রে মেয়ে। তুই বুঝলি না কত ক্ষত, কত গ্লানি জমে আছে এই বুকে।

মেয়েটা রাতে কিছু খেল না। চাচাজান খেয়ে বিছানায় গেছে। আলেয়া খেতে বসে। কিন্তু খাওয়ায় রুচি হয়না। হাত ধুয়ে সব গুছিয়ে তেলের বাটি হাতে নিয়ে সে উঠে পড়ে। চাচাজান অপেক্ষায় আছে। হাড় জিরজিরে হাত-পায়ে তেল মালিশ করতে হবে। মাঝ মাঝে দাবীটা আরো বেশি। হঠাৎ কেমন জানি গা গুলিয়ে ওঠে আলেয়ার।
হেঁসেলে কয়লার আগুন এখনও দগদগে। তেলের বাটিটা আগুনের আঁচে দিয়ে সে নিজেও বসে আগুন ঘেঁষে। চুলার আগুনের উষ্ণতাটুকু তাকে জড়িয়ে রাখে একান্ত আপনজনের মতো। ভুলিয়ে দেয় বর্তমানের সমস্ত গ্লানি। উদাসীন-অন্যমনস্ক মন ফিরে যায় অনেক পেছনে। তখন তার বয়স পনেরো ছুঁই ছুঁই। লম্বা-চওড়া শরীরের গড়ন। বয়সের তুলনায় তাই বড় দেখাত তাকে। মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। ছেলে দুটো যোগ দিয়েছে মুক্তিবাহিনীতে। উৎকন্ঠিত বাবা-মা সবসময় আগলে রাখে কিশোরী বাড়ন্ত মেয়ে আলেয়াকে। মনে আতঙ্ক, এই বুঝি রাজাকার বাড়ি চিনিয়ে দিল পাক-হানাদারদের। দরজায় মৃদু টোকা। চঞ্চল হয়ে উঠে আলেয়া….."বাপজান, মনে অয় ভাইজান আইছে।" আলেয়ার বাবা মেয়েকে ভেতরে ঠেলে দেয়, "তুই তর মা-রে নিয়া ভিতরে যা, আমি দেহি।" আলেয়ার দৃঢ় জবাব, "না বাপজান। তুমি দরজা খোল। মরলে তিন জনেই মরমু"......মহের শেখ কাঁপা হাতে দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকে বড় ছেলে। তার সাথে একজন আহত মুক্তিযোদ্ধা। বাবাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সে বলল, "অর পায় কুত্তাগুলা গুলি করছিল। ডাক্তার দিয়া গুলি বাইর করাইছি। এহন কয়দিন বিশ্রাম লাগবো। অরে তোমরা যত্ন কইরো, বাবা। মনে করবা ও তোমাগো নিজের ছাওয়াল। আমি গেলাম"……বলেই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলো।

ছেলের মুখ মনে করেই বাবা-মা গভীর মমতায় তাকাতো আহত ছেলেটির মুখের দিকে। দুর্দিনে যতখানি সম্ভব আদর যত্নও করলো। ভায়ের কথা ভেবে এগিয়ে আসে বোনও। দিন-রাত অক্লান্ত সেবা। দুর্বল হাতে সেও আঁকড়ে ধরে আলেয়ার হাত….কখনো রোগ-যন্ত্রণার ঘোরে, কখনোবা কৃতজ্ঞতায়। দখল হতে থাকে বুকের নরম ভিটা। গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় নিজেকে সে সমর্পণ করে আগল খুলে। তাদের যুগল চোখে স্বপ্ন রচিত হয় স্বাধীনতার ভবিষ্যত সংসারের। পরের রাতে আবার বাড়তে থাকে জ্বরের তীব্রতা। তাঁর দু’হাতে একখানা তপ্ত হাত ভোর রাতে শীতল হয়ে আসে।

বাবা-মা বুঝছিল অতি শীঘ্র মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। কিন্তু সেই দুর্দিনে পশ্চিমপাড়ার মিয়া বাড়ির হাবা ছেলে মন্টু ছাড়া আর কোন পাত্র পাওয়া গেল না। বিয়ে হয়ে গেল আলেয়ার। স্বাধীন দেশে বাবার পরিচয় নিয়ে জন্ম নিল মেয়ে। কিন্তু আলেয়ার ভালোবাসা বড়োই পল্কা। আধপাগল নির্জীব স্বামীটিকেও সে ধরে রাখতে পারল না এক বছরের বেশি। আলসারে ভুগে মারা গেল লোকটা। কদিন পরেই শুরু হলো দেবর-ভাসুরদের অত্যাচার। ভাইরা যে যতটুকু পারল বাড়ি দখলে নিল। মন্টু পাগলা মইরা গ্যাছে। অর আর ভাগ কি?! অর তো ছাওয়াল নাই। মাইয়াডা বিয়া দিলে যাইবোগা। সম্পত্তির ভাগ দিয়া অরা করব কি?

অত্যাচারে স্বামীর ভিটায় থাকা হলো না তার। আশ্রয় পেল পাশের বাড়ির চাচা শ্বশুরের কাছে। বিত্তশালী-বিপত্নীক বৃদ্ধের সংসার দেখাশোনার দায়িত্ব নিল আলেয়া। বিনিময়ে জুটল মা-মেয়ের থাকা খাওয়া ব্যবস্থা। মেয়েকে লেখাপড়া শেখালো। চাচাজান বলেছেন, মেয়েটার বিয়েও দেবেন। বাবার নিশ্চিত সেবা-যত্ন দেখে চাচার ছেলেরা খুশী মনে বিদেশ চলে যায়। বিদেশ থেকে তারা টাকা পাঠায় বান্ডিল বান্ডিল।
দিন কাটে….সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বলে…..আলেয়ার বুকে জমে রাতভর জ্বালার যন্ত্রণা।

======================================
(অফটপিকঃ ১০১ টা কারণে নিয়মত হতে পারছিনা বলে ১০১ বার দুঃখিত Sad )

পোস্টটি ৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নিকোলাস's picture


দিন কাটে….সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বলে

"আবার সকালও আসে... "
ভালো লাগলো...

লাবণী's picture


অসংখ্য ধন্যবাদ নিকোলাস!
শুভেচ্ছা নিন Smile

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


আরও ভাল হবে আশা করেছিলাম,
গল্পের গঠন অতটা শক্ত হয়নি।

অফটপিক টা অসাম! Big smile

লাবণী's picture


ধন্যবাদ বিষণ্ণ ভাই Smile
====================
অফটপিকে দুঃখের কথা বললাম। আর আপনার কাছে অসাম লাগছে! মীরাক্কেল দেখে দেখে পোলা পাইনের মাথা-ই নষ্ট হইয়া গেলো!!
সব-ই অসাম!!

রায়েহাত শুভ's picture


আপনার অন্য গল্পগুলোর মতো সুন্দর হয়ে ওঠেনি...

১০১টা কারণ ফারণ মানি না জানায়ে গেলাম

লাবণী's picture


হেহে! যাক! এই সুবাদে জেনে নিলাম অন্য গল্পগুলো সুন্দর ছিল!
ধন্যবাদ শুভ ভাই Smile
==========================
Sad প্লীজ ১০১টা কারণ ফারণ মানেন!

তানবীরা's picture


ভালো লাগলো

লাবণী's picture


নৃত্য জেনে ভীষণ খুশী হলাম আপি। অনেক ধন্যবাদ তানবীরাপু।
ভালো থাকুন।

জোনাকি's picture


আপনি কি বিবাহ করিয়া ফেলিয়াছেন?

১০

মীর's picture


সম্ভবত। এইজন্য উহার আর কোনো খোঁজ মিলিতেছে না। আমিও বিষয়টি কিছুদিন যাবত পর্যবেক্ষণ করিতেছি।

১১

লাবণী's picture


মীর মামু, আমি নিখোঁজ হাওয়ার পেছনে অন্য কারণ! বিয়া সাদি ঝুলাইয়া রাখছি! Smile

১২

মেসবাহ য়াযাদ's picture


আমি নিখোঁজ হাওয়ার পেছনে অন্য কারণ! বিয়া সাদি ঝুলাইয়া রাখছি!

এই ভাবে ঝুলাইয়া রাখছেন ক্যান ? বৃষ্টিতে ভিজে আর রোদে শুকিয়ে কী যে অবস্থা হৈছে বেচারা বিয়া-শাদীর Big smile

১৩

লাবণী's picture


আম্মাআআআআআআআআআআআআআআআআআআ-------------------------------------------- টিসু
এগুলা মনে করিয়ে দেবেন না মেসবাহ ভাই। তার সাথে ঝগড়া শুরু হয়ে যাবে!

১৪

মেসবাহ য়াযাদ's picture


টক-মিষ্টি-ঝাল ঝগড়া কিন্তু খারাপ না Wink

১৫

লাবণী's picture


তা অবশ্য ঠিক! গতদুই দিন ধরে আমাদের কি তুমুল ঝগড়া!!! আজ আবার মিটমাট!! Smile

১৬

লাবণী's picture


না-তো Shock ! বিশ্বাস করো বু!!!!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

লাবণী's picture

নিজের সম্পর্কে

রঙিন রোদের জ্বালাতন সহ্য করা আশ্রয়হীন পাখির মতো শুধু ডানায় ভর করে দিগন্তের পর দিগন্ত পাড়ি দিয়ে একসময় আমরা হয়ে পড়ি পথহীন দিকভ্রান্ত পথিক। পায়ের তলায় এসে মাথা কুটতে থাকে পথেরা। ক্লান্ত জীবনে নিঃশব্দের মতো সন্ধ্যা নামে...রাত আসে। জোৎস্না রাতের উজ্জ্বলতায় চেয়ে দেখি বৃষ্টি ভেজা চতুর্দশীর মতো তারায় সেজে আছে আকাশ। শুধু ভাবি...সুবিস্তৃত অসীম আকাশের কোনো এক কোণে কি একটু আশ্রয় পাওয়া যাবে না?