ইউজার লগইন

শেষ দৃশ্যের আগে......!!؟

8dd8f975c45035058a310a8f15bc9ea4-d35pery.jpg

তাদের কখনো দেখা হয়নি...চোখের তারায় চোখ রাখা হয়নি.....রেস্টুরেন্টে বসে গরম চায়ের পেয়ালায় চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে ভালোবাসার উষ্ণতা প্রকাশ করা হয়নি...। তবুও তারা সমান্তরালে অবিরাম স্বপ্ন বুনেছে.....

মেঘের পর্দার ফাঁকে উকি দেয় ম্লান রোদ।
এমন দুপুরকে মন খারাপ করা দুপুর বললেও যথার্থ হয়। চয়ণ আরো জোরে পা চালায়। রুবা আজ চয়ণকে তার স্বপ্নকন্যার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে।

কী অদ্ভূত! ইন্টারনেটের যুগে ছ'মাস প্রেম হয়েছে না দেখে। সত্যিই অবিশ্বাস্য! আসলে আমরা শুধু রক্ত মাংসের মানুষটিকে ভালোবাসি না। ভালোবাসা আপন গভীরতায় নিজের মধ্যে একটি মোহাবেশ রচনা করে। সেই মোহের দ্বারা যাকে আমরা ভালোবাসি তাকে নিজের মনের মতো করে কল্পনা করি। যে রূপ তার নেই, মনের মাধুরী মিশিয়ে তার ভেতর তা কল্পনা করি। তার যে গুণের অভাব, মানসপটে সেই গুণে তাকে বিভূষিত করি।

রুবার কাছে শুধুমাত্র গল্প শুনেই নুপূরকে ভালোবেসেছে চয়ণ। চোখে দেখেনি। নুপূর দেখতে কালো না ফর্সা, বেটে না লম্বা....কিছুই জানে না সে। তবে মনের গহীনে নুপূরের আদল নিজের মতো করে গড়ে নিয়েছে। সেখানে নুপূর হাসে....যেন অবিরল ধারায় বর্ষা ঝরে, সেখানে নুপূর হাওয়ায় আঁচল উড়ায়......যেন সে এক মেঘবালিকা।

সেই দিনটির কথা মনে পড়ে। বাইরে প্রচন্ড কুয়াশা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে চয়ণ। কুয়াশা ভেদ করে ট্রেন চলছিল মাঝারি গতিতে। ইউনিভার্সিটি শাটল ট্রেন, তাই বেশি জোরে চালানো হয় না। চয়ণের ঠিক সামনের সিটে বসা একটি মেয়ে। দু-তিনবার অনিচ্ছাকৃতভাবে চোখ পড়েছিল চয়ণের। মেয়েটি অন্ধের মতো এক দৃষ্টিতে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল। বগির পেছনে বড় ভায়েরা নিত্যদিনর মতো গান করছিল….."ঢাকা টু খুলনা, একটু ভালোবাসো না….আর নেই ভাবনা, নিয়ে যাবো পাবনা" অথবা "আমার একটা মোবাইল ছিল দেখলো না-তো কেউ, মোবাইলে টাকা নাই তাই প্রেম করলো না-তো কেউ।" এই গানগুলো প্রায় প্রতিদিনই শুনে চয়ণ। যতোবারই শুনে ততোবারই হাসি
পায় চয়ণের আর মনে মনে ভাবে যে লিখেছে সে খুবই জিনিয়াস, কেউ না হেসে পারে না। সামনে বসা মেয়েটি হাসছে কিনা তা দেখার জন্য তাকায়। মেয়েটি হাসছে না, কিন্তু হাসি চেপে যে ধরে রেখেছে তা বুঝা যাচ্ছিল।

স্টেশনে ট্রেন থামলো। চয়ণ ট্রেন থেকে নামতে পা বাড়াতেই পেছন থেকে মেয়েলি কন্ঠে ডাক শোনা গেল। কে কাকে ডাকলো তা দেখার জন্য পেছনে তাকাতেই চয়ণ দেখলো সামনের সিটে বসা মেয়েটি তাকে ডাকছে।
-"সমাজবিজ্ঞান ভবন কিভাবে যেতে হবে কাইন্ডলি একটু বলবেন?"
-"শিউর!!....মেইন গেইট দিয়ে ঢুকে সামনে গিয়ে মোড় পাবেন। তারপর ডানদিকে গিয়ে একটু সামনে বামেই সমাজবিজ্ঞান ভবন।"
এই ছিল শুরু.....তারপর রুবার খুব ভালো বন্ধু হয়ে যায় চয়ণ।

নুপূরের স্বপ্ন চয়ণ দেখেছে রুবার মাধ্যমেই। পরিচয় হওয়ার পর থেকে রুবার মুখে নুপূরের গল্প শুনতে শুনতে ওর প্রতি এক অন্ধ আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছে। রুবা নূপুরের গল্প চয়ণকে...চয়ণের গল্প নূপুরকে বলে দুজনের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে দিয়েছে। এই শহরের কোন্‌ প্রান্তে নুপূরের আবাস সে সম্পর্কে কোনো হদিস দেয়নি.....রুবার সাফ কথা, সময় হলে পরিচয় করিয়ে দেব।

একদিন পাবলিক লাইব্রেরির সিঁড়িতে.....পাশাপাশি দুজন। বাদামের খোসা ম্লান চোখ বুজে ছিল রুবার জামার কোলে। চয়ণ বলল, "জারুল আমার প্রিয়। নদীর বুকে বাঁশি বাজানো প্রিয় দুপুর। নৌকার পাটাতনে শুয়ে আকাশ দেখা.....ধান ক্ষেতের আল ধরে ছুটে যাওয়া.....খোলা মাঠে ঘুড়ি উড়ানো বিকাল........এসব প্রিয় মুহূর্ত সারাক্ষণ বুকে রাখি...."
-"আমারও খুব ইচ্ছা করে কাউকে কিছু না বলে একদিন সবুজ একটা গাঁয়ে হারিয়ে যাই..."
-"অদ্ভূত!!"
-"কেন? অদ্ভূত কেন?"
-"অদ্ভূত না! তুমি জন্ম নিয়েছ শহরে, বড় হয়েছ শহরে....তারপরও না দেখা গ্রাম তোমাকে এতো টানে? অবশ্য কথিতভাবে গ্রাম কেউ কেউকে এভাবে টানে।"
-"কথিত নয় চয়ণ.......আমি যাকে ভালোবাসি তার চোখে গ্রামের সবুজ, সরলতা খেলা করে। নগরের কূটকৌশল তাকে ছুঁতে পারে না- এটাই আমাকে খুব ছুঁয়ে যায়।"
-"তোমার মানুষটাকে তো দেখালে না, রুবা.."
-"যেদিন তোমার নূপুরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো, সেদিন আমার মানুষটির সাথেও পরিচয় করিয়ে দেবো।"
রুবার সবকিছুতেই চমক।
এরপর দুজনে ঘুরাঘুরি করে কিছু বইপত্র কিনলো। রুবার হাতে চয়ণ বইগুলো তুলে দিয়ে বলে..."নূপুরকে এগুলো দিতে আপত্তি নেই তো?".....রুবা হাসে।

***

রুবার মনটা আজ খুব বিষন্ন। কাঁপা পায়ে রিকসায় উঠলো। রিকসাওয়ালা বললো, "কই যাবেন?"
-"সামনে……"
রুবা নিজেই জানে না এই মুহূর্তে সে কোথায় যাবে। কার কাছে গচ্ছিত রাখবে নিজের ব্যক্তিগত কষ্টগুলো…..এখন কোথায় গেলে নিজের কষ্টগুলো ভুলতে পারবে? সাগর পাড়ে? ওয়ার সিমেট্রির নির্জনতায়?
রিকসাওয়ালা আবার জিজ্ঞেস করলো, "কোথায় যাবেন?" এবার রুবা উত্তর দিল, "ডিসি হিল।" রিকসা থেকে নামতেই গেটে দারোয়ান জিজ্ঞেস করলো, কই যাইবেন?
-"ভেতরে গাছের ছায়ায় বসবো।"
-"ঐখানে বসার নিয়ম নাই।"
-"কোথায় বসার নিয়ম আছে?"
-"জানিনা"
রুবার ইচ্ছে করছে আকাশ ফাটিয়ে কাঁদতে। কাঁদতে পারা নাকি সুস্থতার লক্ষণ। কিন্তু সে কাঁদতে পারছে না। কেন কাঁদবে? সে তো একাই সবকিছুকে জটিল করে ফেলেছে। একাই স্বপ্নান্তরের গল্পগুচ্ছ রচনা করেছে।

রুবা পরদিন একটা সেলফোনের নাম্বার দিল চয়ণকে..."রাত ন'টায় পাঁচ মিনিটের জন্য কথা বলতে পারো, নূপুরের সাথে।"
তারপর অস্থির পায়চারি চয়ণের। রাত ন'টা কিছুতেই আসেনা। কে যেন ঘড়িটার টুটি চেপে ধরেছে....বেটা আস্তে আস্তে টিক টিক আওয়াজ তুলে এগুচ্ছে তো এগুচ্ছে। ন'টা বাজতেই কল....ওপাশে রিং বাজার গান শোনা যায়....তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে লিখা...ওই যে সুদূর নীহারিকা.....। মিষ্টি একটা কন্ঠ "হ্যালো" বলে। চয়ণ বিবশ হয়ে পড়ে....কথা বলতে ভুলে যায়। ওপাশে..."হ্যালো, কে বলছেন?"
চয়ণ বলে..."আমি......বইগুলো পছন্দ হয়েছে?"
-"হ্যাঁ,জীবনানন্দ আপনার প্রিয়?"
-"হ্যাঁ...তোমার?"
-"আমারও"
-"আমাদের কবে দেখা হবে...নূপুর?"
- "রুবা যেদিন বলবে..."
-"তার আগে কি পসিবল না?
-"না, রুবা আমার খুব কাছের বন্ধু। তাছাড়া ওকে কষ্ট দিতে চাই না। ওর মাধ্যমে আপনাকে পেয়েছি, তাই ওর কথা রাখতে চাই।"
-"যেদিন তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে...তোমার পরনে থাকবে একটা কলাপাতা রঙের শাড়ি, কপালে বড় একটা চাঁদের মতো টিপ........"
এই যা! কেটে গেল! তারপর অনবরত চেষ্টা। কিন্তু একবারের জন্যও সেই কাঙ্খিত সংযোগ পাওয়া গেল না। যতোবারই কল করে ততোবারই বলে, "দুঃখিত, এই মুহূর্তে মোবাইল সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না........

তারপর অনেকদিন রুবার দেখা নেই।

শিল্পকলায় একদিন বিকালে আর্ট এক্সিবিশনে একা একা ছবি দেখছিল চয়ণ। ওখানেই পেয়ে যায় রুবাকে...."কি ব্যাপার রুবা..অনেক দিন তোমার দেখা নেই...!!"
-"গ্রামে গিয়েছিলাম।"
-"তাই নাকি!"
-"হুম...তুমি কি নূপুরের সাথে দেখা করতে চাও? তাহলে আগামী রোববার সকাল এগারোটায় আমাদের পাড়ার রাস্তার মোড়ে অপেক্ষা করো...আমি নূপুরকে নিয়ে আসবো....."
চয়ণ একটা খুশীর চিৎকার দিয়ে উঠে.."চলো, আজ তোমাকে খাওয়াই।"
রুবার চোখে সম্মতি।
তারপর চয়ণের সময় যেন কিছুতেই যেতে চায় না। কারণ রোববার আসতে আরো দু'দিন কাটাতে হবে। দিনের পর রাত, সকাল, দুপুর আবার রাত। এরপর স্বপ্নমাখা ভোর। অপেক্ষার ঘরে এখন শেষ দৃশ্য। চয়ণ পায়ে হেঁটেই পথটুকু পার হয়। এখানেই একদিন রাস্তায় রুবার সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল। আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিয়ে বলেছিল এদিকেই থাকে।

পৌঁছেই রুবাকে কল দেয়..কিন্তু সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। চয়ণের অস্থিরতা বাড়তে থাকে। শেষ বেলা পর্যন্ত অস্থির পায়চারি করতে থাকে.......।
গোধূলি সন্ধ্যায় পাড়ায় একটি মৃতদেহ আসে। ধর্ষিত এক তরুণী......পরনে কলাপাতা রঙের শাড়ি। চয়ণ মরা মাছের চোখ দিয়ে চিনতে পারে রুবাকে......
সেই থেকে এই পথে ঊন্মাদ এক তরুণকে প্রায় ছুটোছুটি করতে দেখা যায়........
***
8dd8f975c45035058a310a8f15bc9ea4-d35pery.jpg

তাদের কখনো দেখা হয়নি...চোখের তারায় চোখ রাখা হয়নি.....রেস্টুরেন্টে বসে গরম চায়ের পেয়ালায় চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে ভালোবাসার উষ্ণতা প্রকাশ করা হয়নি...। তবুও তারা সমান্তরালে অবিরাম স্বপ্ন বুনেছে.....

মেঘের পর্দার ফাঁকে উকি দেয় ম্লান রোদ।
এমন দুপুরকে মন খারাপ করা দুপুর বললেও যথার্থ হয়। চয়ণ আরো জোরে পা চালায়। রুবা আজ চয়ণকে তার স্বপ্নকন্যার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে।

কী অদ্ভূত! ইন্টারনেটের যুগে ছ'মাস প্রেম হয়েছে না দেখে। সত্যিই অবিশ্বাস্য! আসলে আমরা শুধু রক্ত মাংসের মানুষটিকে ভালোবাসি না। ভালোবাসা আপন গভীরতায় নিজের মধ্যে একটি মোহাবেশ রচনা করে। সেই মোহের দ্বারা যাকে আমরা ভালোবাসি তাকে নিজের মনের মতো করে কল্পনা করি। যে রূপ তার নেই, মনের মাধুরী মিশিয়ে তার ভেতর তা কল্পনা করি। তার যে গুণের অভাব, মানসপটে সেই গুণে তাকে বিভূষিত করি।

রুবার কাছে শুধুমাত্র গল্প শুনেই নুপূরকে ভালোবেসেছে চয়ণ। চোখে দেখেনি। নুপূর দেখতে কালো না ফর্সা, বেটে না লম্বা....কিছুই জানে না সে। তবে মনের গহীনে নুপূরের আদল নিজের মতো করে গড়ে নিয়েছে। সেখানে নুপূর হাসে....যেন অবিরল ধারায় বর্ষা ঝরে, সেখানে নুপূর হাওয়ায় আঁচল উড়ায়......যেন সে এক মেঘবালিকা।

সেই দিনটির কথা মনে পড়ে। বাইরে প্রচন্ড কুয়াশা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে চয়ণ। কুয়াশা ভেদ করে ট্রেন চলছিল মাঝারি গতিতে। ইউনিভার্সিটি শাটল ট্রেন, তাই বেশি জোরে চালানো হয় না। চয়ণের ঠিক সামনের সিটে বসা একটি মেয়ে। দু-তিনবার অনিচ্ছাকৃতভাবে চোখ পড়েছিল চয়ণের। মেয়েটি অন্ধের মতো এক দৃষ্টিতে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল। বগির পেছনে বড় ভায়েরা নিত্যদিনর মতো গান করছিল….."ঢাকা টু খুলনা, একটু ভালোবাসো না….আর নেই ভাবনা, নিয়ে যাবো পাবনা" অথবা "আমার একটা মোবাইল ছিল দেখলো না-তো কেউ, মোবাইলে টাকা নাই তাই প্রেম করলো না-তো কেউ।" এই গানগুলো প্রায় প্রতিদিনই শুনে চয়ণ। যতোবারই শুনে ততোবারই হাসি
পায় চয়ণের আর মনে মনে ভাবে যে লিখেছে সে খুবই জিনিয়াস, কেউ না হেসে পারে না। সামনে বসা মেয়েটি হাসছে কিনা তা দেখার জন্য তাকায়। মেয়েটি হাসছে না, কিন্তু হাসি চেপে যে ধরে রেখেছে তা বুঝা যাচ্ছিল।

স্টেশনে ট্রেন থামলো। চয়ণ ট্রেন থেকে নামতে পা বাড়াতেই পেছন থেকে মেয়েলি কন্ঠে ডাক শোনা গেল। কে কাকে ডাকলো তা দেখার জন্য পেছনে তাকাতেই চয়ণ দেখলো সামনের সিটে বসা মেয়েটি তাকে ডাকছে।
-"সমাজবিজ্ঞান ভবন কিভাবে যেতে হবে কাইন্ডলি একটু বলবেন?"
-"শিউর!!....মেইন গেইট দিয়ে ঢুকে সামনে গিয়ে মোড় পাবেন। তারপর ডানদিকে গিয়ে একটু সামনে বামেই সমাজবিজ্ঞান ভবন।"
এই ছিল শুরু.....তারপর রুবার খুব ভালো বন্ধু হয়ে যায় চয়ণ।

নুপূরের স্বপ্ন চয়ণ দেখেছে রুবার মাধ্যমেই। পরিচয় হওয়ার পর থেকে রুবার মুখে নুপূরের গল্প শুনতে শুনতে ওর প্রতি এক অন্ধ আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছে। রুবা নূপুরের গল্প চয়ণকে...চয়ণের গল্প নূপুরকে বলে দুজনের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে দিয়েছে। এই শহরের কোন্‌ প্রান্তে নুপূরের আবাস সে সম্পর্কে কোনো হদিস দেয়নি.....রুবার সাফ কথা, সময় হলে পরিচয় করিয়ে দেব।

একদিন পাবলিক লাইব্রেরির সিঁড়িতে.....পাশাপাশি দুজন। বাদামের খোসা ম্লান চোখ বুজে ছিল রুবার জামার কোলে। চয়ণ বলল, "জারুল আমার প্রিয়। নদীর বুকে বাঁশি বাজানো প্রিয় দুপুর। নৌকার পাটাতনে শুয়ে আকাশ দেখা.....ধান ক্ষেতের আল ধরে ছুটে যাওয়া.....খোলা মাঠে ঘুড়ি উড়ানো বিকাল........এসব প্রিয় মুহূর্ত সারাক্ষণ বুকে রাখি...."
-"আমারও খুব ইচ্ছা করে কাউকে কিছু না বলে একদিন সবুজ একটা গাঁয়ে হারিয়ে যাই..."
-"অদ্ভূত!!"
-"কেন? অদ্ভূত কেন?"
-"অদ্ভূত না! তুমি জন্ম নিয়েছ শহরে, বড় হয়েছ শহরে....তারপরও না দেখা গ্রাম তোমাকে এতো টানে? অবশ্য কথিতভাবে গ্রাম কেউ কেউকে এভাবে টানে।"
-"কথিত নয় চয়ণ.......আমি যাকে ভালোবাসি তার চোখে গ্রামের সবুজ, সরলতা খেলা করে। নগরের কূটকৌশল তাকে ছুঁতে পারে না- এটাই আমাকে খুব ছুঁয়ে যায়।"
-"তোমার মানুষটাকে তো দেখালে না, রুবা.."
-"যেদিন তোমার নূপুরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো, সেদিন আমার মানুষটির সাথেও পরিচয় করিয়ে দেবো।"
রুবার সবকিছুতেই চমক।
এরপর দুজনে ঘুরাঘুরি করে কিছু বইপত্র কিনলো। রুবার হাতে চয়ণ বইগুলো তুলে দিয়ে বলে..."নূপুরকে এগুলো দিতে আপত্তি নেই তো?".....রুবা হাসে।

***

রুবার মনটা আজ খুব বিষন্ন। কাঁপা পায়ে রিকসায় উঠলো। রিকসাওয়ালা বললো, "কই যাবেন?"
-"সামনে……"
রুবা নিজেই জানে না এই মুহূর্তে সে কোথায় যাবে। কার কাছে গচ্ছিত রাখবে নিজের ব্যক্তিগত কষ্টগুলো…..এখন কোথায় গেলে নিজের কষ্টগুলো ভুলতে পারবে? সাগর পাড়ে? ওয়ার সিমেট্রির নির্জনতায়?
রিকসাওয়ালা আবার জিজ্ঞেস করলো, "কোথায় যাবেন?" এবার রুবা উত্তর দিল, "ডিসি হিল।" রিকসা থেকে নামতেই গেটে দারোয়ান জিজ্ঞেস করলো, কই যাইবেন?
-"ভেতরে গাছের ছায়ায় বসবো।"
-"ঐখানে বসার নিয়ম নাই।"
-"কোথায় বসার নিয়ম আছে?"
-"জানিনা"
রুবার ইচ্ছে করছে আকাশ ফাটিয়ে কাঁদতে। কাঁদতে পারা নাকি সুস্থতার লক্ষণ। কিন্তু সে কাঁদতে পারছে না। কেন কাঁদবে? সে তো একাই সবকিছুকে জটিল করে ফেলেছে। একাই স্বপ্নান্তরের গল্পগুচ্ছ রচনা করেছে।

রুবা পরদিন একটা সেলফোনের নাম্বার দিল চয়ণকে..."রাত ন'টায় পাঁচ মিনিটের জন্য কথা বলতে পারো, নূপুরের সাথে।"
তারপর অস্থির পায়চারি চয়ণের। রাত ন'টা কিছুতেই আসেনা। কে যেন ঘড়িটার টুটি চেপে ধরেছে....বেটা আস্তে আস্তে টিক টিক আওয়াজ তুলে এগুচ্ছে তো এগুচ্ছে। ন'টা বাজতেই কল....ওপাশে রিং বাজার গান শোনা যায়....তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে লিখা...ওই যে সুদূর নীহারিকা.....। মিষ্টি একটা কন্ঠ "হ্যালো" বলে। চয়ণ বিবশ হয়ে পড়ে....কথা বলতে ভুলে যায়। ওপাশে..."হ্যালো, কে বলছেন?"
চয়ণ বলে..."আমি......বইগুলো পছন্দ হয়েছে?"
-"হ্যাঁ,জীবনানন্দ আপনার প্রিয়?"
-"হ্যাঁ...তোমার?"
-"আমারও"
-"আমাদের কবে দেখা হবে...নূপুর?"
- "রুবা যেদিন বলবে..."
-"তার আগে কি পসিবল না?
-"না, রুবা আমার খুব কাছের বন্ধু। তাছাড়া ওকে কষ্ট দিতে চাই না। ওর মাধ্যমে আপনাকে পেয়েছি, তাই ওর কথা রাখতে চাই।"
-"যেদিন তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে...তোমার পরনে থাকবে একটা কলাপাতা রঙের শাড়ি, কপালে বড় একটা চাঁদের মতো টিপ........"
এই যা! কেটে গেল! তারপর অনবরত চেষ্টা। কিন্তু একবারের জন্যও সেই কাঙ্খিত সংযোগ পাওয়া গেল না। যতোবারই কল করে ততোবারই বলে, "দুঃখিত, এই মুহূর্তে মোবাইল সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না........

তারপর অনেকদিন রুবার দেখা নেই।

শিল্পকলায় একদিন বিকালে আর্ট এক্সিবিশনে একা একা ছবি দেখছিল চয়ণ। ওখানেই পেয়ে যায় রুবাকে...."কি ব্যাপার রুবা..অনেক দিন তোমার দেখা নেই...!!"
-"গ্রামে গিয়েছিলাম।"
-"তাই নাকি!"
-"হুম...তুমি কি নূপুরের সাথে দেখা করতে চাও? তাহলে আগামী রোববার সকাল এগারোটায় আমাদের পাড়ার রাস্তার মোড়ে অপেক্ষা করো...আমি নূপুরকে নিয়ে আসবো....."
চয়ণ একটা খুশীর চিৎকার দিয়ে উঠে.."চলো, আজ তোমাকে খাওয়াই।"
রুবার চোখে সম্মতি।
তারপর চয়ণের সময় যেন কিছুতেই যেতে চায় না। কারণ রোববার আসতে আরো দু'দিন কাটাতে হবে। দিনের পর রাত, সকাল, দুপুর আবার রাত। এরপর স্বপ্নমাখা ভোর। অপেক্ষার ঘরে এখন শেষ দৃশ্য। চয়ণ পায়ে হেঁটেই পথটুকু পার হয়। এখানেই একদিন রাস্তায় রুবার সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল। আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিয়ে বলেছিল এদিকেই থাকে।

পৌঁছেই রুবাকে কল দেয়..কিন্তু সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। চয়ণের অস্থিরতা বাড়তে থাকে। শেষ বেলা পর্যন্ত অস্থির পায়চারি করতে থাকে.......।
গোধূলি সন্ধ্যায় পাড়ায় একটি মৃতদেহ আসে। ধর্ষিত এক তরুণী......পরনে কলাপাতা রঙের শাড়ি। চয়ণ মরা মাছের চোখ দিয়ে চিনতে পারে রুবাকে......
সেই থেকে এই পথে ঊন্মাদ এক তরুণকে প্রায় ছুটোছুটি করতে দেখা যায়........
***

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


ফিনিশিং এ এসে শকড হইলাম!

লাবণী's picture


শুভ দুপুর শান্ত ভাই Smile
পাঠের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ!
আপনাকে শকড করতে পেরে ভালো লাগছে মজা

মীর's picture


সুন্দর গল্প। প্রিয়তে নিলাম।

আপনার বর্ণনাভঙ্গিতো, যাকে বলে দুর্দান্ত একদম। পেশাদার সাহিত্যিক হওয়ার সব মশলাই আপনার মধ্যে মজুদ আছে। বাদামের খোসার ম্লান চোখ বুজে পড়ে থাকার বর্ণনা এত চমৎকার লেগেছে যে কি আর বলবো!

ওয়ার সিমেট্রি, ডিসি হিল আর সাগরপাড়ের কথা পড়ে নস্টালজিকও হইলাম খানিকটা। ওয়ার সিমেট্রিতে বদমাইশগুলা ক্যান যে মানুষকে বসতে দেয় না! সবসময় মেজাজ খারাপ হয় এইজন্য।

আর শাটল ট্রেনের ছেলেরা পেছন থেকে গানও গায় নাকি? ইয়াক! আমাগো ক্যম্পাসের বাসগুলিতে ছেলেদেরকে কখনো কোনোরূপ গানটান গাইতে দেখি নাই।

লাবণী's picture


আপনার মতো এতো সুন্দর গল্পকারের কাছ থেকে এত্ত প্রশংসা পেয়ে আমার মাথা ঘুরে ঘুরে অবস্থা----- Nail Biting
================================
প্রিয়তে নিয়েছেন জেনে সম্মানিত বোধ করছি...কৃতজ্ঞতা Smile
================================
বসতে না পারার দুঃখে আমি এই ওয়ার সিমেট্রিতে মাত্র দুই বার গিয়েছি...তা-ও দ্বিতীয়বার অনিচ্ছাকৃত! আমাদের শাটল ট্রেনের গানের কথা কি আর বলবো! না শুনলে এর মজা টের পাবেন না......! আপনি ঝুলে ঝুলে গেলেও বোর হবেন না গ্যারান্টি দিচ্ছি Smile

রায়েহাত শুভ's picture


Sad

লাবণী's picture


কোক খান!! মন ভালো হয়ে যাবে। বেশি গরম পড়ছে তো!!!
পাঠের জন্য ধন্যবাদ Smile

শওকত মাসুম's picture


হঠাৎ নাটকীয় হওয়াটা কেমন যেন লাগে

লাবণী's picture


ভাগন্তিস
ইয়ে...কেমন লাগে?!!
ধন্যবাদ মাসুম ভাই Smile

বিষাক্ত মানুষ's picture


এইটা হইলো ! Stare

১০

লাবণী's picture


ই-ইয়ে...কি হইলো?! Sad

১১

নরাধম's picture


শেষের দৃশ্যটা এরকম করার কি দরকার ছিল? মাইনাস!

১২

লাবণী's picture


Crying টিসু

১৩

সাঈদ's picture


Sad

১৪

লাবণী's picture


সবাই দেখি মন খারাপ করে ফেল্লো!! Sad

১৫

মেসবাহ য়াযাদ's picture


বাহ Big smile

১৬

লাবণী's picture


উরি! এতক্ষণ পর একজন হাসে Smile
থ্যাংকুশ মেসবাহ ভাই Smile

১৭

নয়ন's picture


এমন করেই মোহটা ভেঙ্গে দিলেন!?!
ট্র্যাজিক এন্ডিং!
----------------------------------------
গল্পে ভালোলাগার পরশ বুলিয়ে দিলাম!

১৮

লাবণী's picture


হায় আল্লাহ্‌! কারে দেখা যায়!!??
ও নয়ন ভাইটি, আপনার খবর সবর নাই ক্যান?
কেমন আছেন?
পাঠের জন্য ধন্যবাদ ভাইটি Smile

১৯

মীর's picture


এই গল্পটা আবার পড়লাম। আসলেই ভালো হইসে। আপনারে একটা লিংক দিতে ইচ্ছা করতেসে।

২০

নীড় সন্ধানী's picture


শেষ অংশটা বাদ দিলে গল্পটা বেশ সুন্দর। ছবিটাও। এই ছবিটা কি আপনার?
শেষ অংশের ব্যাপারে বলি, ওরকম একটা ফিনিশিং পাঠকের গল্পের আমেজটা ক্ষুন্ন করেছে। লেখক হিসেবে আপনার সে স্বাধীনতা অবশ্যই আছে, আমি কেবল পাঠকের অনুভুতিটা বললাম। Smile

ইয়ে, ছোট্ট একটু ভুল আছে গল্পে। ডিসি হিলে বসতে কোন বাধা নেই। আপনি বোধহয় ওয়ার সিমেট্রি লিখতে চেয়েছেন। ওয়ার সিমেট্রিতে বসা নিষেধ। ওটা ঠিক করে দিয়েন।

২১

মৃন্ময় মিজান's picture


শুরুতেই মনে হইছিল রুবা-ই নূপুর। এজন্য এই লাইনটায় খটকা তৈরি হইছিল "রুবা নূপুরের গল্প চয়ণকে...চয়ণের গল্প নূপুরকে বলে দুজনের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে দিয়েছে।" নূপুরের অস্তিত্বই যেহেতু নাই এই লাইনটা গল্পকারের বলার কথা না...হয়তো রুবা বলতে পারে চয়নকে যে তার গল্প নূপুরের কাছে করেছে। (নাকি এটা বুঝানোর জন্যই লাইনটা ব্যবহার করা হইছে ? Tongue )

গল্পের গঠন-বর্ণন-সমাপ্তি সবই ভাল লেগেছে। অনেক অনেক সুন্দর।

আরো ভাল ভাল গল্প আপনার কাছ থেকে পাব এই প্রত্যাশা রইল।

২২

তানবীরা's picture


হঠাৎ নাটকীয় হওয়াটা কেমন যেন লাগে
তোমার গলপে এটা সব সময়ি হয়

২৩

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


রুবা আর নুপুর যে এক তা আন্দাজ করতে পেরেছিলাম।

কিন্তু শেষের শক টা একটু বেশি হয়ে গেল, মন খারাপ করে দিলেন।

২৪

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


আপু,
কেমন আছেন?
কতদিন আপনারে দেখি না..

আপনার নতুন কোন লেখা পড়তে ইচ্ছে করতেছে খুব..

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

লাবণী's picture

নিজের সম্পর্কে

রঙিন রোদের জ্বালাতন সহ্য করা আশ্রয়হীন পাখির মতো শুধু ডানায় ভর করে দিগন্তের পর দিগন্ত পাড়ি দিয়ে একসময় আমরা হয়ে পড়ি পথহীন দিকভ্রান্ত পথিক। পায়ের তলায় এসে মাথা কুটতে থাকে পথেরা। ক্লান্ত জীবনে নিঃশব্দের মতো সন্ধ্যা নামে...রাত আসে। জোৎস্না রাতের উজ্জ্বলতায় চেয়ে দেখি বৃষ্টি ভেজা চতুর্দশীর মতো তারায় সেজে আছে আকাশ। শুধু ভাবি...সুবিস্তৃত অসীম আকাশের কোনো এক কোণে কি একটু আশ্রয় পাওয়া যাবে না?