সরকার/প্রশাসন কি যথেষ্ট সচেতন?
দু'চারদিন আগে বাসায় ফোন করে এমন একটা ব্যাপার জানলাম যে অনেকক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়েছিলাম। আমার বাবা-মা'র পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা হয়েছিলো। সেখানে যা আচরণ করা হলো সেটাই এই লেখার বিষয়বস্তু। তবে সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে বাবার কিছু বর্ণনা না দিলেই নয়।
বাবার বয়েস সত্তরের কাছাকাছি। দুর্ভাগ্যবশতঃ, দু'বছর আগে তাঁর বাম পা'টি কেটে ফেলতে হয়, হাঁটুর উপরে ইঞ্চি আটেক পর্যন্ত। গত দেড় বছর ধরে চলছে তাঁর রিহ্যাবিলিটেশন, তবে এই বয়েসে রিহ্যাবিলিটেশনের উন্নতি এত ধীরে হয় যে এখনও যখন তিনি ওয়াকার ধরে বিছানা থেকে নেমে মাত্র পাঁচফুট দূরের টয়লেটে যান, মা একপাশে দাঁড়িয়ে থাকেন, বা একটু ধরে থাকেন যাতে কোন অঘটন না ঘটে।
বাসার ছোটখাটো চলাফেরার কাজ চললেও সমস্যা হয় বাবাকে যখন ডাক্তার দেখাতে নিতে হয়। তিনতলার সিঁড়ি ভেঙে কে উনাকে পাঁজাকোল করে নামাবে, এসব সমস্যার কারণে মাসে মাসে হওয়া উচিত চেক-আপটা এখন প্রতি তিনমাসে একবারে গিয়ে ঠেকেছে। বাবাও এতেই খুশী, অন্যের কাঁধে ভর করে বা লোকজনকে বেশ কষ্ট দিয়ে গত দেড় বছর ধরে বার বার নিচে নামার আয়োজনে তিনিও কিছুটা বিরক্তই। আরেকটা তথ্য, আশপাশের আর দশজন মানুষের মতোই বাবার মুখে সাদা দাড়ি, মাথায় টুপি থাকে। এই বয়েসী মুসলিম বাংলাদেশী প্রায় সবারই সম্ভবতঃ একই অবস্থা।
কিছুদিন আগে বাবা-মা পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। বাবার একজন ছাত্র আবেদনপত্র নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে যায়। সম্ভবতঃ নিয়মটা হলো, আবেদনপত্র আর ফি জমা দিলে কিছুদিন পর পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য থানা থেকে একজন আসেন, তিনি আবেদনপত্রের ছবির সাথে আবেদনকারীকে মিলিয়ে দেখেন, অন্যান্য তথ্যাদিরও যাচাই করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা গেলো মহাত্মন পাসপোর্ট অফিসার বেঁকে বসলেন!
তিনি দাবী করলেন এই দাড়ি-টুপিওয়ালা বৃদ্ধকে সরাসরি পাসপোর্ট অফিসে আসতে হবে।
তাকে বাবার শারীরিক অবস্থার কথা বলা হলো, কাতর কন্ঠেই জানানো হলো যে উনাকে বাসা থেকে বের করা বেশ কষ্টের। তারপর তাকে এও বলা হলো, মা'র ক্ষেত্রে যখন পাসপোর্ট অফিসে না গেলেও চলছে, তাহলে বাবার বেলায় কেন লাগবে।
অফিসার নাকি নির্বিকারভাবে বলেছে, "দাড়ি-টুপিওয়ালাদের এখন সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধী, জঙ্গী, টেরোরিস্ট -- এসব নানান সমস্যার কারণে এখন নাকি সরকারী নিয়ম হয়েছে দাড়ি-টুপিওয়ালাদের বেলা স্পেশাল ব্যবস্থা নিতে হবে!"
তাকে বলা হলো, বাবার পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য তো পুলিশ বাসায় যাবেই। সেই যাওয়া আর এখন বাবার পাসপোর্ট অফিসে আসা তো একই ব্যাপার!
কিন্তু মহাত্মন হিমালয় পর্বতের মতোই অটল রইলেন। সরকারী নির্দেশ, জঙ্গী, টেরোরিস্ট, যুদ্ধাপরাধী -- এই শব্দগুলো দিয়ে নানান বাক্যের তুবড়ি ছুটিয়ে করে বাবার ছাত্রটিকে যা বোঝালেন, তা হলো, যতই পা না থাকুক বা হাঁটতে না পারুক, লাভ নেই; উনাকে পাসপোর্ট অফিসেই নিয়ে আসতে হবে। তা নাহলে এ্যাপ্লিকেশন গ্রহন করা হবেনা! "ভদ্রলোকের এক কথা।"
সেই দুপুরেই অসহ্য গরমের ভেতর বাবাকে ট্যাক্সি করে নিয়ে যাওয়া হলো পাসপোর্ট অফিসে, তবে যাবার পর দেখা গেলো ট্যাক্সি থেকে তাঁর নামতেও হলোনা। মহাত্মনেরা অফিস থেকে বেরিয়ে এসে ট্যাক্সির জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলেন বাবাকে, ব্যস, বললেন, নিয়ে যাও, আর কোন সমস্যা নাই!
এটা হ্যারাসমেন্ট! এটা অসভ্য রকমের অযৌক্তিক একটা হ্যারাসমেন্ট।
যেখানে ব্যক্তির যাচাই করার জন্য বাসায় গিয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশনের সিস্টেম আছে, সেখানে এভাবে একজন নাগরিককে সম্পূর্ণ অকারণে সন্দেহ করা, নাজেহাল করা -- রাস্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এরকম নোংরা আচরণ জনগণকে শুধু ক্ষুব্ধই করে তুলবে।
ভাবলাম, সরকার কি আসলেই এরকম কোন নিয়ম করেছে? আওয়ামী লীগ সরকারের নামে বিরোধীরা এই কথাটা বলে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে টুপি-দাড়িওয়ালাদের ওপর নাকি অত্যাচার বেড়ে যায়, সরকার কি সেই আগুনে ঘি ঢালছে?
নাকি সরকার সম্পর্কে এমন নেগেটিভ একটা ধারনা তৈরী করার জন্য একদল কুচক্রী উল্টো সাবোটাজ টাইপের কাজ করে যাচ্ছে? বিশেষ করে বাবাকে ট্যাক্সিতে বসে থাকা অবস্থাতেই এক নজর দেখে যখন মহামান্য অফিসার খুশী হয়ে গেলেন, তখন কোনভাবেই ভাবা যায়না যে তারা কিছু চেক করার জন্য বাবাকে অফিস পর্যন্ত যেতে বাধ্য করেছেন। একটাই সম্ভাবনা, মানুষকে অযথা হয়রানি/নাজেহাল করা।
সরকার বা প্রশাসন কি ব্যাপারটা নিয়ে যথেষ্ট সচেতন?





কি জানি কথাটা কতটা সত্য! আমার পরিবারের কয়েকজন সরকারী বিভিন্ন পদে চাকুরী করছে এইরকম কিছু জানা হয় নাই। তবে আপনার বাবাকে নিয়ে যেটা হলো সেটি শুনে খুব খারাপ লাগলো, সমবেদনা জানানো ছাড়া আর কি ই বা বলার আছে।
কথাটা আমার বিশ্বাস হয়নি ... বাংলাদেশ আমেরিকা না যে একজন মানুষের মুখে দাড়ি আর মাথায় টুপি দেখলেই তাকে নিয়ে নানান আজগুবি চিন্তা শুরু করে দেবে, বিশেষ করে মানুষটি যখন প্রায় সত্তরের কাছাকাছি বয়েসের ... এরকম আচরণ এক ধরনের সেল্ফ ডিনায়াল ছাড়া কিছুই হবার না, আমাদের দেশের মানুষ নিশ্চয়ই এই দেশের সংস্কৃতি জানে
সেজন্যই আমি প্রশ্নটা রাখছি, প্রশাসন কি আসলেই সচেতন যে এ ধরনের কান্ড দেশে ঘটছে? কে জানে, হয়তো যে ব্যাটা ঝামেলা করেছে সে জামাতি, সে জানে প্রতিদিন যদি পাঁচজন মানুষকে এভাবে হয়রানি করা হয়, তাহলে সরকারের কর্মকান্ডকে একটা ধর্মবিরোধী ইমেজ দেয়া যাবে
এটা হ্যারাসমেন্ট! এটা অসভ্য রকমের অযৌক্তিক একটা হ্যারাসমেন্ট।
দায়িত্বপ্রাপ্তদের খেয়াল করা উচিত।
পরে এইটা নিয়েও জল ঘোলা করা হতে পারে!
সেটাই, এসব ঘটনা সাবোটাজ হওয়ার চান্স আছে, সরকার/প্রশাসনকে আরো সচেতন হতে হবে
বস, এ ব্যপারে আমার জানা তথ্যগুলো বলি :
পাসপোর্ট ফরম জমা দেবার ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রার্থীকে স্ব-শরীরে পার্সপোর্ট অফিসে হাজিরা দেবার সরকারি নিয়ম। এ নিয়ম সবার জন্য সমান। ক্ষমতা বা পয়সার দাপটে কেউ মানে, কেউ মানেনা। আপনার চ্যানেল থাকলে হাজিরা না দিলেও চলে।
বাসায় গিয়ে দেখাটাও সরকারি নিয়ম। তবে এটি শুধু কাগজে কলমেই নিয়ম। আরেকটা অলিখিত নিয়ম হচ্ছে- আপনার বাসায় না গেলেও আপনার পক্ষে রিপোর্ট দেবে- যদি আপনার চ্যানেল থাকে বা আপনি তাদের টাকা-পয়সা দিয়ে দেন। সাধারণত একজনের জন্য ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা নেয় এবং এটা দিলে আপনি যেই হোন না কেনো আপনার পাসপোর্ট পাবার ক্ষেত্রে পজেটিভ রিপোর্ট চলে যাবে।
তবে আপনার বাবার ক্ষেত্রে যেটা করেছে- সেটা অসম্মানজনক, অশোভন, অমানবিক। সম্ভবত ভদ্রলোক (!) যা চাইছিলেন, তা দিতে আপনার পরিবার ব্যর্থ হয়েছে। ভদ্রলোকের (!) প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছুই বলার নেই...
বস্, তাই নাকি?
তবে আমার পয়েন্ট সেটাই, নিয়ম যদি হয় প্রার্থীর উপস্থিত থাকার তাহলে তারা সেটা বললেই পারতো। এবং সেক্ষেত্রে মাকেও নিয়ে যেতে বললেই হতো।
কিন্তু তা না করে তারা জঙ্গী/টেরোরিস্ট -- এসব অসভ্যতামি করছে, যেটা আমার কাছে মনে হয়েছে একটা অস্বস্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা।
এটা চরম রকমের বাড়াবাড়ি, মেনে নেয়া না গেলেও কিচ্ছু করার নাই আমাদের মত সাধারণের পক্ষে।
সেইটাই, সাধারন বলেই কথা
এই লেখাটা পত্রিকায় ছাপানো উচিত। ওই সুভদ্রলোকের নামসহ
সরকার/প্রশাসনের কেউ মেসেজটা পেলেই হয়
পুলিশের ভিতরে কতো দাড়িওয়ালা টুপিওয়ালা বিদ্যমান এবং তারওপরে জঙ্গীদের প্রতি ভালোবাসা বিদ্যমান পুলিশের অভাব আছে বলেওতো কোনদিন শুনি নাই।
যতোসব ভেকধারী বক
আমার তো মনে হইছে উল্টা ভেক ... জঙ্গীপ্রেমীরাই এসব বানাচ্ছে ... বাংলাদেশে বসে আমেরিকান আচরণ আর কি!
আপনাদের মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। সমবেদনা অথবা নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। আমার বাবারও একই ধরণের অভিজ্ঞতা আছে; শুধু শারীরিক ভোগান্তি হয়নি বলে আমরা গায়ে মাখিনি। আসলে ব্যাপারটা ভাববার মতো।
নিয়মকানুন সব সময়েই কিছু থাকে, সময় সময় বাড়তি কিছু যোগ হয়। যে সুযোগ নিতে চায়, সে সব পরিস্থিতিকেই ক্যাশ করার চেষ্টা করে। আতঙ্ক ও দুঃখের কথা হলো, এই মানুষগুলো দানব হয়ে যায়।
হ্যাণন সেটাও হতে পারে, যেটা মেসবাহ ভাই বললেন।
তবে জঙ্গী ইস্যুকে যে একদল "কামিল" অপব্যবহার করছে এই সত্যটাও টের পেলাম।
দাড়ি-টুপিওয়ালা লোকজন ভয়ে আছে - কথাটা সত্য। সমাজে দাড়ি-টুপিওয়ালা লোকজন কমে যাচ্ছে - এটাও সত্য।
ইয়াংদের বেলায় হতে পারে, তবে আমি জানিনা এটা বয়স্কদের ক্ষেত্রে কতটা সত্য। কারণ, এ দেশে ষাটের বেশী বয়েসে গেলে পাঁড় নাস্তিককেও দেখেছি হঠাৎ টুপি-দাড়ি-তসবি নিয়ে ঘুরছেন, আর সাধারন মানুষের বেলা তো বলাই বাহুল্য।
সহমর্মিতা জানানোর পাশাপাশি এটাও মনে হলো...সব ক্রিয়ারই বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। ইসলামিক টেররিস্টরা সেটা বুঝার মতো বুদ্ধি রাখে না
"প্রতিক্রিয়া"র কথাটা ঠিক এই ঘটনার সাথে যায়না, কারণ এটা জাপান বা আমেরিকায় হয়নি, বাংলাদেশে হয়েছে, যেখানে বয়স্কদের টুপি-দাড়ি রাখাটা প্রায় সংস্কৃতির মতো।
যে লোক এই অসভ্যতামিটা করছে, গিয়ে দেখেন তার আত্মীয়দেরও যারা ষাটের উপরে তাদের সবার একরকম অবস্থা।
ব্যাপারটা ননমুসলিম সোসাইটিতে হলে প্রতিক্রিয়া বলে না হয় মেনে নেয়া যেত।
আমি খুব আশাবাদী একজন ছেলে।এই বিদেশভূইয়ে যখন আমার কোন দেশীভাই দেশ নিয়ে আফসোস করে কেন তাদের দেশ আমেরিকা ইউরোপ বা নিদেন পক্ষে কোরিইয়া হলো না তখন শুধু এইটুকু বলি একদিন সব ঠিক হইয়ে যাবে আমরাও সব নিয়মের মধ্যে যাবো।
কিন্তু এই ধরনের কিছু শুনলেই আসলেই মন খারাপ হইয়ে যায় বার বার মনে হয় আমরা বোধহয় আর পারবো না।
দেশের বয়াপারে হতাশার প্রসঙ্গের সাথে এই ঘটনাটার তেমন সম্পর্ক আছে কিনা বুঝছিনা ... তবে আমাদের দেশের মানুষ ক্ষমতা পেলে একটু বেশীই যে ফলানোর চেষ্টা করে সেটা হরহামেশা টের পাই
সেলুকাস !!
হুমমম
আমি অবাক হইনি। এদেশে এরকমই হয়।
কারণ বাংলাদেশে নিরীহ মানুষ এবং হয়রানি এই দুই জিনিস সবসময় সহাবস্থানে থাকে। প্রায় সব সরকারী অফিসে হয়রান হওয়া আমাদের জাতীয় দায়িত্বের মতো।
পাসপোর্ট অফিসের লোকজন দালাল পছন্দ করে। দালাল লাগালে হয়রানি কম হতো বোধহয়। সরাসরি আবেদন করলে নগদ লেনদেনে ওদের অসুবিধা। সে কারনেও হয়রানি হতে পারে।
কেউ কেউ বলছেন ওই অফিসারের নাম ছাপাতে। কিন্তু লাভ নাই। থানার ঘুষের ভাগ নাকি হেডকোয়ার্টার পর্যন্ত যায়। এখানেও।
হ্যাঁ, ঘুষের ভাগ একেবারে পিরামিডের উপর পর্যন্ত যায় ... কিছুদিন আগে তো পিরামিডের উপরের অংশের আয়তন বেড়ে ১০% হয়ে গেছিলো
এখন কত পারসেন্ট কে জানে?
সবাইকে সহানুভুতি জানানোর জন্য ধন্যবাদ। লেখাটা কিছুটা বিরক্তি থেকে লিকেছিলাম, তাই এটায় আমি আসলে নিজেদের ভোগান্তিটা বেশী ফোকাস করে ফেলেছি
কিন্তু আসলে পয়েন্ট করতে চাইছিলাম সরকারে বসে কিছু লোক যে রটনাগুলোর পক্ষে প্রমাণ জুগিয়ে যাচ্ছে তাদের ব্যাপারে সরকার/প্রশাসনের হর্তাকর্তারা কতটা সচেতন? এই প্রমাণ জুগিয়েরা কি "অত্যুৎসাহী উগ্রবাদী" নাকি "কুচক্রী সাবোটাজকারী", এই প্রশ্নটা নিয়ে কি তারা আসলেই কিছু ভাবছেন?
মন্তব্য করুন