ইউজার লগইন

১২ ডিসেম্বর ১৯৭১

আগেরদিন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র রাশিয়ার প্রতিনিধি ভোরেন্টসভকে হুঁশিয়ার করে বলেন,

পরদিন (১২ ডিসেম্বর) মধ্যাহ্নের আগে ভারতকে অবশ্যই যুদ্ধ বিরতি মেনে নিতে বাধ্য করতে হবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেই প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

কিন্তু কিসিঞ্জার নিশ্চয়ই জানতেন, রণাঙ্গনে আসন্ন বিজয় দৃষ্টে ভারত এই চরমপত্র অগ্রাহ্য করবেই। কাজেই মার্কিন প্রশাসন ঐ দিনই কোন এক সময়ে তাদের আসন্ন হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত পাকিস্তানকে জানিয়ে দেন-উপমহাদেশে তখন অবশ্য ১২ই ডিসেম্বর। এই সংবাদের সঙ্গে সঙ্গে CGS লে. জেনারেল গুল হাসান টেলিফোনযোগে পশতু ভাষায় নিয়াজীকে জানিয়ে দেন,

পরদিন অর্থাৎ ১৩ই ডিসেম্বরের মধ্যাহ্নে পাকিস্তানী বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য ‘উত্তর ও দক্ষিণ উভয় দিক থেকে বন্ধুরা এসে পড়বে।

দক্ষিণের বন্ধু তথা সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগর অবধি আসার জন্য মার্কিন নাগরিক উদ্ধারের যে অজুহাত ব্যবহার করে সেই মার্কিন ও অন্যান্য পাশ্চাত্য নাগরিকদের উদ্ধারকর্ম তিনটি ব্রিটিশ রয়েল এয়ারফোর্সের বিমান কর্তৃক ১২ তারিখেই সম্পন্ন হয়। গুল হাসানের সংবাদের পর ঢাকার সামরিক কর্তৃপক্ষ নিজেদের প্রতিরক্ষার আয়োজন নিরঙ্কুশ করার জন্য চব্বিশ ঘণ্টার জন্য কারফিউ জারী করে ঘরে ঘরে তল্লাশী শুরু করে।

এদিন রাতে প্রাদেশিক সরকারের বেসামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী আল-বদর ও আল-শামসের কেন্দ্রীয় অধিনায়কদের ডেকে পাঠান সদর দফতরে। তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় গোপন শলা-পরামর্শ। এই বৈঠকে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা প্রণয়ন করা হয়। ফরমান আলী তাদের হাতে তুলে দেন বুদ্ধিজীবীসহ বিশেষ বিশেষ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের নামের তালিকা। বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা হিসাবে সেই রাতেই আলবদর বাহিনী সাংবাদিক নিজামউদ্দিন আহমদ, আ.ন.ম. গোলাম মোস্তফাকে তাঁদের বাসভবন থেকে অপহরণ করে। তাঁরা আর কখনও ফিরে আসেননি।

পাকিদের শেষ লড়াইয়ের প্রস্তুতি সত্ত্বেও রণাঙ্গনে তাদের পশ্চাদপসরণের ধারা তখনও অপরিবর্তিত। ১২ই ডিসেম্বর সকাল আটটায় নরসিংদীর উপর পাকিস্তানী দখলের অবসান ঘটে। বিকেলে ভারতের আর একটি ইউনিট (৪ গার্ডস্‌) ডেমরা ঘাট থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে এসে হাজির হয় । সূর্যাস্তের আগে জামালপুর ও ময়মনসিংহের দিক থেকে জেনারেল নাগরার বাহিনী টাঙ্গাইলে প্যারাস্যুট ব্যাটালিয়ানের সঙ্গে যোগ দিয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মিত্রবাহিনী টাঙ্গাইলের মির্জাপুর, কালিয়াকৈর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছত্রীসেনা নামিয়ে রাতে প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে কাদেরিয়া বাহিনী। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। ফলে ঢাকা অভিযানের সর্বাপেক্ষা সম্ভাবনাপূর্ণ পথের সদ্ব্যবহার শুরু হয়।

দিনাজপুর অঞ্চলের মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী খানসামা থানা আক্রমণ করে। যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর ১৫ জন ও সাত মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাদের হাতে এক মেজরসহ পাকবাহিনীর ১৯ জন ধরা পড়ে। তবে এদিনই দিনাজপুরের বিরল থানায় বহলা গ্রামে ঘটে গণহত্যার নৃশংস ঘটনা। ১২ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর একটি দল প্রবেশ করে ওই গ্রামে। ঐ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণের মুখে পিছু হটার এক পর্যায়ে কাঞ্চন ক্যাম্পের খান সেনারা অনুপ্রবেশ করে ওই গ্রামে। তারা গ্রামবাসীকে গ্রাম ছেড়ে যাবার নির্দেশ দেয়। খান সেনাদের নির্দেশ মত তল্পিতল্পা নিয়ে গ্রামবাসীরা গ্রাম ছাড়ার উদ্যোগ নেয়। এই সময় খান সেনারা মাইকযোগে আবার তাদের এক হবার নির্দেশ দেয়। তখন মাগরিবের নামাজের সময়। অনেকে নামাজের কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে। সকলে নামাজের কাতারে দাঁড়ালে ব্রাশ ফায়ার করা হয় পিছন থেকে। এতে ঘটনাস্থলে শহীদ হন ৩৭ জন।

এদিন নীলফামারী , গাইবান্ধা, নরসিংদী, সরিষাবাড়ী, ভেড়ামারা, শ্রীপুর হানাদারমুক্ত হয়। দক্ষিণে ভারতীয় নৌবাহিনী সপ্তম নৌবহরের আসন্ন তৎপরতা সর্ব উপায়ে বিঘ্নিত করার জন্য চালনা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ছোট বড় অবশিষ্ট সকল জাহাজ ও নৌযান, উপকূলীয় অবকাঠামো, কক্সবাজার বিমানবন্দর প্রভৃতি ধ্বংস বা অকেজো করে ফেলে।

এদিকে, নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিন অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ভারতকে পাকিস্তান ছেড়ে যেতে বলেন। সাংবাদিকদের সাথে আলাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,

পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মাতৃভূমি রক্ষায় শেষ পর্যন্ত লড়ে যেতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।

অন্যদিকে, সেদিন মাওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ব্যাপকভাবে সমর্থন দেয়ার জন্য ভারত সরকার ও ভারতীয় জনগণকে ধন্যবাদ জানান। তিনি তাঁর দলের সদস্যদের এবং সমর্থকদের বাংলাদেশ সরকার, আওয়ামী লীগ, মুক্তিবাহিনীর পৰে একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেন। বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন,

মুক্তিসংগ্রামে জয়লাভের আর দেরি নেই।

দিল্লীতে কুজনেটসভ এবং মস্কোতে ডি. পি. ধরের যুগপৎ আলোচনার ফলে দ্রুতগতিতে উভয় সরকার মার্কিন ও চীনা হস্তক্ষেপের হুমকি মোকাবিলায় যুগ্ম ভূমিকা গ্রহণে সক্ষম হন। সপ্তম নৌবহরের আগমন-সংক্রান্ত খবর তখনও (এবং ১৩ই ডিসেম্বরের সন্ধ্যা পর্যন্ত) ভারতে কেবল স্বল্প সংখ্যক নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে সীমিত। তবু মার্কিন প্রশাসনের হুমকির প্রকাশ্য জবাব দান এবং ভারতের জনসাধারণকে আসন্ন বিপদ ও কঠোর সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে ১২ই ডিসেম্বর দিল্লীতে বিশেষভাবে আয়োজিত এক জনসভায় ইন্দিরা গান্ধী ‘সম্মুখের অন্ধকার দিন’ ও ‘দীর্ঘতর যুদ্ধের সম্ভাবনা’ সম্পর্কে সতর্ক করেন।সেই সঙ্গে সাধারণ পরিষদের সাম্প্রতিক আহ্বানের জবাবে এবং পরোক্ষভাবে মার্কিন চরমপত্র প্রত্যাখ্যান করে জাতিসংঘ মহাসচিক উ থানকে এক বার্তায় ইন্দিরা জানান,

ভারত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং ভারতীয় সৈন্য স্বদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রস্তুত আছে, একমাত্র যদি পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ মীমাংসায় পৌঁছুতে সম্মত হয়

দোহাইঃ স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, মূলধারা’৭১, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর,উইইকিপেডিয়া , ইদিনাজপুর, জনকন্ঠ, ইত্তেফাক ইত্যাদি।

পোস্টটি ১৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

সাঈদ's picture


স্যালুট মানিক ভাই ।

রাসেল আশরাফ's picture


টিপ সই

টুটুল's picture


প্রতিদিন পড়ছি...

স্যালুট বস...

রায়েহাত শুভ's picture


পড়ছি...

তানবীরা's picture


প্রতিদিন পড়ছি

গ্রিফিন's picture


বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নুরুজ্জামান মানিক's picture

নিজের সম্পর্কে

ঢাবি হতে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর । আগ্রহের বিষয় কবিতা-দর্শন-বিজ্ঞান । ১৯৯০'র দশকের শুরু থেকে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেনীর জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক ,পাক্ষিক ও মাসিক সাময়িকী সমুহে প্রবন্ধ-উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ-প্রতিবেদন-ফিচার লিখছি । ব্লগিং করি-
http://www.amrabondhu.com/user/manik
http://www.sachalayatan.com/user/manik061624
http://mukto-mona.com/banga_blog/?author=23
http://www.somewhereinblog.net/blog/nuruzzamanmanik
http://nmanik.amarblog.com/
http://www.nagorikblog.com/blog/109
http://prothom-aloblog.com/users/base/nuruzzamanmanik
http://www.mukto-mona.com/Articles/n_manik/index.htm
http://www.satrong.org/Nuruzzaman%20Manik.htm