ইউজার লগইন

একটা ভ্রান্ত কথা মনে পড়বার অপেক্ষায়

নির্মলেন্দু গুণ একজন দারুণ কবি! এই কবির কবিতা আমার আপাদমস্তক ভালো লাগে। আজ অন্তর্জালে ঘুরে ঘুরে শুধু কবিতা পড়ছি সকাল থেকে। মন ভালো নেই। আকাশটারও মনে হয় একই অবস্থা। এখন পর্যন্ত এক টুকরো রোদও উঠতে দেখলাম না কোথাও। কাশেম ভাইএর দোকানে হয়তো কিছু বিমর্ষ ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। খুব বেশি উচ্চবাচ্য না করে চা-সিগারেট টানছে। আমি নিরাবেগ শুয়ে কবিতার পাতা উল্টে যাচ্ছি। চোখে পড়লো নির্মলেন্দু গুণের 'যাত্রা-ভঙ্গ' কবিতাটি-

"হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে,
মন বাড়িয়ে ছুঁই,
দুইকে আমি এক করি না
এক কে করি দুই৷

হেমের মাঝে শুই না যবে,
প্রেমের মাঝে শুই
তুই কেমন করে যাবি?
পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া
আমাকেই তুই পাবি৷

তবুও তুই বলিস যদি যাই,
দেখবি তোর সমুখে পথ নাই৷

তখন আমি একটু ছোঁব,
হাত বাড়িয়ে জাড়াব তোর
বিদায় দুটি পায়ে,
তুই উঠবি আমার নায়ে,
আমার বৈতরনী নায়ে৷

নায়ের মাঝে বসব বটে,
না-এর মাঝে শোব৷
হাত দিয়েতো ছোঁব না মুখ,
দু:খ দিয়ে ছোঁব৷

তুই কেমন করে যাবি?"

কবিতাটা সুন্দর। ছন্দবদ্ধ ধনুক থেকে ছুঁড়ে দেয়া তীরের মতোন। কোথায় যেন এসে বিদ্ধ হয়। হয়তো খুব সামান্য আঘাত, কিন্তু অনুভূতিতে ঠিকই ধরা পড়ে।

আরেকটা কবিতা পড়লাম। সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়। জীবনানন্দ দাশ। ইনি না থাকলে আমার জন্য অনেক সময় বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে যেতো। এই কবিতার একটি মজার ব্যপার হচ্ছে, কেবল শব্দগুলো পর পর পড়ে গেলেই একটা সুর তৈরি হয়। আর কথাগুলো নিয়ে ভাবতে চাইলে তো, সহজেই পার করে দেয়া যায় যেকোন ডিউরেশনের মন খারাপ হয়ে থাকা সময়। অদ্ভুত বিষয় না? এমন অনুভূতি আমি জীবনানন্দ দাশের আরো অনেক কবিতাতেই পেয়েছি। উনার প্রতি আমার একপ্রকার অবসেশন কাজ করে।

"চোখদুটো ঘুমে ভরে
ঝরা ফসলের গান বুকে নিয়ে আজ ফিরে যাই ঘরে!
ফুরায়ে গিয়েছে যা ছিল গোপন- স্বপন কদিন রয়!
এসেছে গোধূলি গোলাপীবরণ-এ তবু গোধূলি নয়!
সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়,
আমাদের মুখ সারাটি রাত্রি মাটির বুকের পরে!

চোখদুটো যে নিশি ঢের-
এত দিন তবু অন্ধকারের পাই নি তো কোনো টের!
দিনের বেলায় যাদের দেখি নি-এসেছে তাহারা সাঁঝে;
যাদের পাই নি ধুলায় পথের-ধোঁয়ায়-ভিড়ের মাঝে-
শুনেছি স্বপনে তাদের কলসী ছলকে, কাঁকন বাজে!
আকাশের নীচে- তারার আলোয় পেয়েছি যে তাহাদের!

চোখদুটো ছিল জেগে
কত দিন যেন সন্ধ্যা-ভোরের নট্‌কান রাঙা মেঘে!
কত দিন আমি ফিরেছি একেলা মেঘলা গাঁয়ের ক্ষেতে!
ছায়াধূপে চুপে ফিরিয়াছি প্রজাপতিটির মতো মেতে
কত দিন হায়! কবে- অবেলায় এলোমেলো পথে যেতে
ঘোর ভেঙে গেল, খেয়ালের খেলাঘরটি গেল যে ভেঙে

দুটো চোখ ঘুম ভরে
ঝরা ফসলের গান বুকে নিয়ে আজ ফিরে যাই ঘরে!
ফুরায়ে গিয়েছে যা ছিল গোপন-স্বপন কদিন রয়
এসেছে গোধূলি গোলাপীবরণ-এ তবু গোধুলি নয়!
সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়-
আমাদের মুখ সারাটি রাত্রি মাটির বুকের পরে।"

কবিতালাপ শেষ। মন ভালো না থাকলেও, আমাদেরকে দৈনন্দিন কাজগুলো ঠিকই করতে হয়। সময় ও স্রোত কারো জন্য থেমে থাকে না। সময়টা অন্তত থামিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা গেলে ভালো হতো। মাঝে মাঝে থামিয়ে রাখতাম। নিজেও থেমে থাকতাম।

আর শীতকালটা যায় না কেন? অসহ্য লাগতে লাগতে এখন অসহ্য'র সীমাই পার হয়ে গেছে। এরপরে আর কত? আর ক'দিন এভাবে চললে তো মানুষ দিয়ে খড়ি বানানো যাবে।

বনানী ব্রীজটা দেখতে সুন্দর না একটুও। লেক শোর নামের হোটেলটাও না। আজকাল কোনোকিছু কেন সুন্দর লাগে না? পৃথিবীটা কি যেকোন ভাবেই হোক, আরেকটু সুন্দর হতে পারতো না? পারতো হয়তো। কিন্তু মানুষ নামের কিছু অল্পবয়সী জীব সেটা হতে দিচ্ছে না। ১৪ কোটি বছরের পুরোনো স্থানীয় বাসিন্দারা কোনোদিন আওয়াজ করে নাই আর দু'দিনের জীবগুলো সব চিৎকার শুরু করেছে ধরাধামে এসেই!

অসহ্য লাগছে সিম্পলি। মনে হচ্ছে শাবল দিয়ে রাজধানীর সবগুলো রাজপথ খুঁড়ে ফেলি। সড়কদ্বীপগুলো ভেঙ্গে ফেলি এবং বিল্ডিংগুলো জ্বালিয়ে দিই। আমি যদি একজন হালক্ হতাম, তাহলে আজ অবশ্যই এ কাজগুলো করতাম।

পৃথিবীটা আমাদের কারো জন্য ভালো জায়গা না। এই উপলব্ধিটা অবশ্য একটা অসার উপলব্ধি। একটু পরেই হয়তো মনে পড়বে, "মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে..."। কিন্তু এটাও সত্য যে; যতক্ষণ না ওই ভ্রান্ত কথাটা মাথায় এসে আমাকে পুরোপুরি অন্ধ করে দিচ্ছে, ততক্ষণ এ পৃথিবীটাকে ভালো লাগছে না এক ফোঁটাও।
---

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

শাশ্বত স্বপন's picture


দুটি কবিতা আমার প্রিয়, ১ম টা আমি আবৃত্তি করি নানা প্রোগ্রামে।

আর শীতকালটা যায় না কেন? অসহ্য লাগতে লাগতে এখন অসহ্য'র সীমাই পার হয়ে গেছে। এরপরে আর কত? আর ক'দিন এভাবে চললে তো মানুষ দিয়ে খড়ি বানানো যাবে।
মীর ভাই, শীত সুন্দর--পড়ুন আমার লেখা--পাতা ঝরার গান

আরাফাত শান্ত's picture


সেকেন্ডটা পড়ি নাই আগে। আর গুনের কবিতাওয়ালা একটা গেঞ্জী ছিলো আজিজ থেকে কেনা। ইউনিতে পড়ে যেতাম লোকজন ভাবতো প্রেমে টেমে পড়ছি বা খুজতেছি।

ভালও লাগলও খুব!

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


Big smile Big smile Big smile

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


দুইটা কবিতাই ভাল্লাগছে।
দুইটা দুই রকমের সুন্দর।
প্রথমটা একবার পড়লেই ভাল লাগে আর পরেরটা যত বেশি পড়া হবে তত বেশি ভাল লাগবে।

আইচ্ছা ভাই, আপ্নে দুইদিন পরপর এত ডুব দেন ক্যান কন তো?!

রাসেল আশরাফ's picture


পৃথিবীটা আমাদের কারো জন্য ভালো জায়গা না। এই উপলব্ধিটা অবশ্য একটা অসার উপলব্ধি। একটু পরেই হয়তো মনে পড়বে, "মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে..."। কিন্তু এটাও সত্য যে; যতক্ষণ না ওই ভ্রান্ত কথাটা মাথায় এসে আমাকে পুরোপুরি অন্ধ করে দিচ্ছে, ততক্ষণ এ পৃথিবীটাকে ভালো লাগছে না এক ফোঁটাও

তোমার দ্বারাই সম্ভব এমন কথা বলা। কেটে যাক এই ছটফট করা মনের ভাব খুব তাড়াতাড়ি। এই কামনা।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়। জীবনানন্দ দাশ। ইনি না থাকলে আমার জন্য অনেক সময় বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে যেতো। এই কবিতার একটি মজার ব্যপার হচ্ছে, কেবল শব্দগুলো পর পর পড়ে গেলেই একটা সুর তৈরি হয়। আর কথাগুলো নিয়ে ভাবতে চাইলে তো, সহজেই পার করে দেয়া যায় যেকোন ডিউরেশনের মন খারাপ হয়ে থাকা সময়। অদ্ভুত বিষয় না? এমন অনুভূতি আমি জীবনানন্দ দাশের আরো অনেক কবিতাতেই পেয়েছি। উনার প্রতি আমার একপ্রকার অবসেশন কাজ করে।

এই কথাগুলি ঠিক আমারও মনের কথা!

ঢাকা শহর ছেঁড়ে আমিও পালাতে চেয়েছিলাম, অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও কিন্তু ছুটি পাচ্ছি না!

নাহীদ Hossain's picture


গুন এর কবিতা ভাল লাগছে ... Smile

মনে হচ্ছে শাবল দিয়ে রাজধানীর সবগুলো রাজপথ খুঁড়ে ফেলি। সড়কদ্বীপগুলো ভেঙ্গে ফেলি এবং বিল্ডিংগুলো জ্বালিয়ে দিই। আমি যদি একজন হালক্ হতাম, তাহলে আজ অবশ্যই এ কাজগুলো করতাম।

আমিও আছি আপনের সাথে। চলেন শুরু করি ...

টুটুল's picture


কিতা অইছে?

রায়েহাত শুভ's picture


শীতকালেরে কইষা গালি দেওনে সুপার লাইক...

আর বিষণ্ণ থাইকেন্না ম্যান। আমাদের বিষণ্ণতায় ফাকিং লাইফ ডাজন্ট গিভ আ ড্যাম Sad

১০

জ্যোতি's picture


কি হয়েছে? মন খারাপ কেন? আমার ভীষণ ভীষণ ভীষণ মন খারাপ। মনটারে কত যে ফেলে দিলাম, তাও আবার আমার কাছে ফিরে আসে। আজব!
বনানী ব্রিজ আমি দেখিনি। অার জ্বালানী-পোড়ানি কিন্তু ভালু না।
ভালো থাকবেন। থাকতেই তো হবে।
আরেকটা কথা। ১ম কবিতাটা খুব পছন্দের আমার। Smile আর ২ য় টা আগে পড়িনি। Sad

১১

তানবীরা's picture


Sad(

১২

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


ভাই গেলেন কই???!

মিস্যু তো.. Sad

১৩

রশীদা আফরোজ's picture


নির্মলেন্দু গুণের কবিতাটা কম বয়সে বেশি ভালো লাগতো। তখন এটা পড়লেই দুঃখ-দুঃখ, ভেজা-ভেজা বিষাদের ভেতর নিজেকে লুকিয়ে ফেলতাম বহুক্ষণ।
জীবনানন্দের কবিতাটা কম বয়সে যত ভালো লাগতো, এখন অনেক বেশি ভালো লাগে। আগে কবিতাটা এক ধরনের ঘোর তৈরি করতো, আর এখন প্রতিটা শব্দের ভেতর ডুবে যাই। এটা অদ্ভুত লাগে, যত বয়স বাড়ছে জীবনানন্দের কবিতায় ভালোলাগার অনুভূতি গভীরতর হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!