ইউজার লগইন

কখনো বিশ্বাস না হারানোর কারণে

08_1.jpg

লেখালেখি কমতে কমতে প্রায় শূন্যের পর্যায়ে নেমে এসেছে। গত ডিসেম্বরের পর এই অগাস্ট পর্যন্ত কিছুই লিখিনি। চেষ্টাও করি নি সেভাবে। গত বছর গণপিটুনি খাওয়ার অভিজ্ঞতা লেখার পর আমাকে অনেকে "সবকিছু" না লেখার পরামর্শ দিয়েছে। সেটা একটা কারণ। লেখার ইচ্ছে আগের মতো জাগে না- সেটাও একটা কারণ। সবমিলিয়েই হয়নি আরকি। আজকাল গল্প বলার কত নতুন নতুন মাধ্যম হয়েছে! ইন্সটাগ্রামের "স্টোরি" নামক ফিচারটি সমসাময়িক অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের কাছাকাছি ঘরানার ফিচারগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়তম। আমার বর্তমান জীবনটাও মূলত ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, গুগল ইত্যাদির আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। কিভাবে এই ঘুরপাক খাওয়ার শুরুটি হয়েছে- সেটির বর্ণনাই আমার আজকের লেখার মূল উপজীব্য। লেখার ভেতর নিজের জীবন থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন আনুষাঙ্গিক ব্যাপার সম্পর্কে আমার মতামত এবং সবশেষে একটি ছোট্ট উপদেশ রয়েছে। যারা পড়ে দেখতে আগ্রহী, তাদেরকে সাদরে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

২০১৮ সালে পূর্ব-জার্মানীর "ইলমিনাউ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়"-এর "মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন সায়েন্স" বিভাগ থেকে জীবনের দ্বিতীয় মাস্টার্স ডিগ্রিটি অর্জনের পর ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি দিয়েছিলাম পশ্চিম-জার্মানীতে। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে একটি মাস্টার্স ডিগ্রি আমি অর্জন করেছিলাম।

পশ্চিম-জার্মানীর যে শহরে পাড়ি দিয়েছি সেটার নাম অফেনবুর্গ। এখানে অনলাইন মার্কেটিং-এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা আমাকে "শোয়ার্জভাল্ড অনলাইন-মার্কেটিং আগেন্টুর" প্রতিষ্ঠায় ব্যপকভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। শোয়ার্জভাল্ড অনলাইন-মার্কেটিং আগেন্টুর অর্থ হলো- ব্ল্যাক ফরেস্ট অনলাইন-মার্কেটিং এজেন্সি। এটি আমার নিজস্ব এজেন্সি।

প্রিয় বন্ধু ও সহচারিণী শিল্পী শারমিন আহমেদের সাহায্যে এজেন্সির ওয়েবসাইটটি তৈরি করেছিলাম। এখন এটাই আমার রুটি-রুজির প্রধান অবলম্বন। এই এজেন্সির মাধ্যমে স্থানীয় বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আমি অনলাইন মার্কেটিং-এ সাহায্য করি। নিজস্ব ব্যবসার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে মানুষ নিজের প্রয়োজনেই এটাতে নিজের সবচেয়ে ভাল কাজটা দেয়ার চেষ্টা করে। আমি যে কাজটা করি সেটা আমার নিজের কাজ, অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়- এটাই আমার জন্য যথেষ্ট, সকালে সূর্য্যিমামার আগে ঘুম থেকে উঠে পড়ার জন্য।

তবে আপাতত এই ব্যবসা চলবে ২০১৯ পর্যন্ত। পরে হয়তো আবার কখনও এটা আমি করবো তবে এই মুহূর্তে আমি প্রস্তুত হচ্ছি ২০২০-এর ১লা জানুয়ারী থেকে স্থানীয় একটি জনসংযোগ-নেটওয়ার্কের অনলাইন মার্কেটিং বিভাগের 'প্রকল্প প্রধান' হিসেবে যোগদানের জন্য।

প্রতিষ্ঠানটির কাজ হলো জার্মানীর বাডেন-ভুর্টেমবার্গ রাজ্যের ১৭০টি বড় ও মাঝারি আয়তনের প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, সরকারী দপ্তর ইত্যাদির জনসংযোগ বিষয়ক কার্যাবলীর সমন্বয় ঘটানো। পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মেধাবী মস্তিষ্কগুলোকে উক্ত রাজ্যের চাকুরী বাজারে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় সরকার প্রশাসন উন্নয়নে সরাসরি অংশীদার হিসেবেও কাজ করে।

আমার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানটির অনলাইন উপস্থিতি প্রায় "শূন্য অবস্থা" থেকে গড়ে তোলা, প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচিগুলির অনলাইন মার্কেটিং ক্যাম্পেইনের নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন ঘটানো, এবং উক্ত রাজ্যের ৫৩ টি শহরের (সদস্য) নগরপিতার কার্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের কর্মকর্তাদের অনলাইন মার্কেটিং-এর ওপর ট্রেনিং দেয়া।

প্রতিষ্ঠানটির অনলাইন উপস্থিতি আহামরি কিছু নয়। ফেসবুকের পাতাটিতে হাজার দুয়েকের সামান্য বেশি অনুসারী ছাড়া উল্লেখযোগ্য আর কিছু নেই। তবে ওদের কর্মসূচি লেগে থাকে বছরজুড়েই। ইউরোপের সব বড় বড় চাকুরী মেলায় অংশ নেয়া, ৫৩টি সদস্য নগরের নানাবিধ সরকারী কর্মসূচির আয়োজন তো আছেই। পাশাপাশি নগরপিতাদের নিজস্ব কিন্তু সরকারী কর্মসূচি আয়োজনের দায়িত্বও এ প্রতিষ্ঠানের।

ভবিষ্যতে এ প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলী নিয়ে আমার একটি বিস্তারিত ব্লগ লেখার ইচ্ছে আছে। যাহোক, সারাবছর কর্মসূচি লেগে থাকলেও অগাস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে ওদের সামান্য বিরতি জোটে ব্যস্ত নাগরিক জীবনের ছকে বাঁধা নিয়মের ঘেরাটোপ থেকে।

অগাস্ট-সেপ্টেম্বর মাস দু'টো মূলত ইউরোপের ছুটির সময়। এ সময় আবহাওয়া থাকে মনোরম। সূর্য প্রায় সারাদিন মাথার উপরে অকাতরে রোদ বিলায়। ইউরোপের আবহাওয়ার সবচেয়ে বড় শত্রু শীত। কনকনে ঠান্ডায় কারই বা বেড়াতে ভাল লাগে? তাই অগাস্ট-সেপ্টেম্বরের দুই মাসে ইউরোপের বেশির ভাগ অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ বন্ধই থাকে বলা যায়। রাস্তায় সারাদিন হাসিমুখো মানুষের ভীড় প্রায় প্রতিটি বড় শহরের চেনা দৃশ্যপট।

গত বছরের এ সময়টায় আমি একটা সুপারশপে ঘন্টায় ১২ ইউরো বেতনের চুক্তিতে কাজ করে যাচ্ছিলাম প্রতিটি দিন। পাশাপাশি পড়াশোনার সাথে খাপ খায় এমন একটা ৪০ ঘন্টার (প্রতি সপ্তাহে) চাকুরী খুঁজছিলাম। জার্মানীতে পড়াশোনা শেষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য মূলত দুইটি দরজা খোলা থাকে। এক, পড়াশোনার লাইনের ভেতর একটি ফুল-টাইম চাকুরী ১৮ মাসের ভেতর খুঁজে বের করা। দুই, নিজের নামে একটি চলমান ব্যবসা দাঁড় করিয়ে দেখানো। তবে সে ব্যবসাটিও হতে হবে পড়াশোনার লাইনের সাথে সমন্বিত। অন্যথায় এখানে বসবাসের অনুমতি পাওয়া যায় না।

আমি প্রথমটার জন্যই হন্য হয়ে চেষ্টা কর‍ছিলাম। আমার ধারণা ছিল ব্যবসা দাঁড় করানোর খরচ অনেক। আমি প্রায় চার বছর ঘরের টাকায় বিদেশে বসে পড়াশোনা করেছি, জীবনের চাকায় শান দিয়েছি। বাসা থেকে টাকা আনাতে মন আর সায় দিচ্ছিল না কোনভাবেই।

তবে আমার জানা ছিল না যে, আমাকে নিয়ে মহাকালের অন্য পরিকল্পনা ছিল। সে পরিকল্পনার বলেই এখন একটা ব্যবসা চালাচ্ছি। একটা চাকুরীও অপেক্ষা করে আছে ভবিষ্যতের গর্ভে।

আর এটা সম্ভব হয়েছে কখনো বিশ্বাস না হারানোর কারণে।

আজকের আত্মবয়ানে যারা বিরক্ত হয়েছেন তাদের কাছে দুঃখপ্রকাশ করছি। যারা হননি, তাদের উদ্দেশ্যেই মূলত আমার এই দীর্ঘ প্রয়াস। আপনাদেরকে আমি খোলা মনে একটা কথা জানাতে চাই। বিশেষ করে তাদেরকে যাদের এখন-এই মুহূর্তে যেকোন কারণে একটা খারাপ সময়ের ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। হ্যাঁ, যদি আপনি মনে করেন যে আপনি একটা খারাপ সময়ে ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন, তাহলে আপনিই! আপনাকেই আমি সবিনয়ে একটা ছোট্ট কথা মনে করিয়ে দিতে চাচ্ছি।

আপনি প্লীজ নিজের ওপর থেকে কখনও বিশ্বাস হারাবেন না। এমনকি জীবনের একটা কাজও যদি আপনার পরিকল্পনামাফিক না হয়ে থাকে, তাও নিজের ওপর থেকে বিশ্বাস হারাবেন না। মহাকাল গোঁয়ার ধরনের মানুষদেরকে পছন্দ করে। যারা নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে ভালোর লক্ষ্যে দিনের পর দিন হার না মেনে গোঁয়ার্তুমি চালিয়ে নিতে পারে- তাদের আটকে রাখার ক্ষমতা কারও নেই। তাদের জয় একদিন অনিবার্য, অবশ্যই।

এতটুকুই বলতে চেয়েছিলাম আসলে। ধন্যবাদ।

আগামী সোমবার ৩৪-এ পদার্পণ করতে যাচ্ছি। এ ব্যাপারটি নিয়েও আমি অত্যন্ত "এক্সাইটেড"। জানি না জীবনের নতুন বছরটি ভাল না খারাপ যাবে। ভালোর আশায় তো আছি অবশ্যই। তবে খারাপ বা আপাতদৃষ্টিতে খারাপ ধরনের কোনোকিছুও আমাকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যূত করতে পারবে না।

কেননা আমি জানি, নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে ক্রমাগত চেষ্টা করে যাওয়াই সাফল্য। সবাই সেটা পারে না। মাঝপথে হাল ছেড়ে দেয়। সাফল্য তাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারতো- সেটা তার দেখা হয়ে ওঠে না।

আজ এ পর্যন্তই। ভাল থাকবেন সবাই। শুভেচ্ছা নিরন্তর।

---

মীর রাকীব-উন-নবী
২২ অগাস্ট, বৃহস্পতিবার
অফেনবুর্গ, জার্মানী

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

কাজী রত্না's picture


বাহ। আপনার সাথে তো আমি বোধহয় অনেক কাল আগেই পরিচিত হয়েছিলাম.. কিন্তু এভাবে আবার পরিচিত হবো এটা ভাবিনি। আমার জীবনের সব চাইতে প্রিয় মানুষটিকে ভালো রাখবেন। ওর কোন কষ্ট আমার ভিত নাড়িয়ে দেয়। ভালো থাকুন।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম, আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। এটি একটি মৌলিক ব্লগ। দিনলিপি, ছোটগল্প, বড়গল্প, কবিতা, আত্মোপলব্ধিমূলক লেখা এবং আরও কয়েক ধরনের লেখা এখানে পাওয়া সম্ভব। এই ব্লগের সব লেখা আমার নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত, এবং সূত্র উল্লেখ ছাড়া এই ব্লগের কোথাও অন্য কারো লেখা ব্যবহার করা হয় নি। আপনাকে এখানে আগ্রহী হতে দেখে ভাল লাগলো। যেকোন প্রশ্নের ক্ষেত্রে ই-মেইল করতে পারেন: bd.mir13@gmail.com.

ও, আরেকটি কথা। আপনার যদি লেখাটি শেয়ার করতে ইচ্ছে করে কিংবা অংশবিশেষ, কোনো অসুবিধা নেই। শুধুমাত্র সূত্র হিসেবে আমার নাম, এবং সংশ্লিষ্ট পোস্টের লিংকটি ব্যবহার করুন। অন্য কোনো উপায়ে আমার লেখার অংশবিশেষ কিংবা পুরোটা কোথায় শেয়ার কিংবা ব্যবহার করা হলে, তা
চুরি হিসেবে দেখা হবে। যা কপিরাইট আইনে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। যদিও যারা অন্যের লেখার অংশবিশেষ বা পুরোটা নিজের বলে ফেসবুক এবং অন্যান্য মাধ্যমে চালিয়ে অভ্যস্ত, তাদের কাছে এই কথাগুলো হাস্যকর লাগতে পারে। তারপরও তাদেরকে বলছি, সময় ও সুযোগ হলে অবশ্যই আপনাদেরকে এই অপরাধের জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনার ব্যবস্থা নেয়া হবে। ততোদিন পর্যন্ত খান চুরি করে, যেহেতু পারবেন না নিজে মাথা খাটিয়ে কিছু বের করতে।

ধন্যবাদ। আপনার সময় আনন্দময় হোক।