ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ ক্লান্ত দিনের শেষে

সকাল থেকে ঘরের দরজায় চুপচাপ বসে আছে বিভা। প্রবল বৃষ্টিতে কয়েকদিন কাজে যেতে না পারায় গত তিনদিন অর্ধাহারে দিন কেটেছে ওদের। হারু মেম্বরের চালের আড়তেও কয়েকদিন ধরে কোন কাজ ছিলনা। নিজে না খেয়ে থাকলেও মেয়েটার দিকে তাকিয়ে পারুলের ঘরের দিকে পা বাড়ায় ও। বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কয়েকবার ডাকাডাকির পর দরজা খুলে বেরিয়ে আসে পারুল।
-তোমার ঘুম ভাঙ্গাইয়া দিলাম পারুবু, কি করুম? না ঠেকলে আইতাম না
-আরে এত কতা কইতে অইবনা, কি হইছে খুইলা ক
-আইজ তিনদিন ধইরা ঘরে কিছুই নাই। নিজেরে নিয়া ভাবিনা কিন্তু কি করমু কও, মাইয়াডার মুখের দিগে তাকাইতে পারিনা। তোমার ঘরে খুদ থাকলে কয়ডা দেওনা!
-আরে পাগলী, এমন কইরা কইতে অয়? তোরা না খাইয়া রইছস তয় আমার কাছে আইলি না ক্যান?
-তোমারে আর কত জ্বালাইমু?
-বিভা, এইডারে জ্বালান কয়না। আমিও তো চাচীরে অনেক জ্বালাইছি। তোর মা তোরে আর আমারে আলাদা কইরা দ্যাহে নাই। ভরা পেটে না পারি আধপেটা খাওয়াইতেও তো পারি!
-মেম্বরের কলে ঘরের ভিডা হমান পানি উইঠা গ্যাছে, তাই মেম্বর কল বন্ধ রাখছিলো এতদিন, কাইল খুলবো। তুমি তো জান, কাম না করলে হেয় এক পয়সাও দেয়না। আইজ বিহালে হাডে যামু, দেহি একটা হাঁস বেচতে পারি কিনা। তাইলে কয়েকদিন চলন যাইব।
-এইভাবেই চলতে অইব রে বইন। হাঁস মুরগীগুলান এই সময় তোর অনেক কামে দিবো।
-হ, এইগুলান বেইচাই তো এই সময় চলি। ঘরের পাশেই তো ঘন বাগান। গুইল, বেজি আর খাডাশের লইগা তো বেশী টেকে না
-অইগুলান তো তবুও নিজেরা বাঁচনের লইগা হাঁস মুরগীর ছাও খায় কিন্তু মানুষের লোভ তো আরও বেশী। এগো যার যত বেশী আছে যেন আরও বেশী কইরা চায়। তুই ব, আমি আইতাছি।
কিছুক্ষণ পর পারুল একটা মাটির সানকিতে করে বেশ কিছু চাল আর একটা পটে করে কিছু ডাল নিয়ে এসে বিভাকে দেয়।
-পারুবু, তুমি না থাকলে আমি কবেই ভাইসা যাইতাম!
-আমরা একলগে বড় অইছি না? আমি থাকতে তুই ভাইসা যাইবি ক্যান? আমারও কেউ নাই, তোরও কেউ নাই। আমরা একলগেই যুদ্ধ কইরা বাইচা থাকুম।
বিভার চোখদুটো ভিজে ওঠে। চোখ মুছতে মুছতে ফিরে আসে নিজের ঘরের দিকে। ঘরে ফিরে দেখে প্রভা বাগানের গাছ থেকে বেশ কিছু মাটি আলুর ফল পেড়ে জড় করেছে। বিভা মনে মনে ভাবে এইগুলো দিয়ে খিচুড়ি করলে পারুবুর দেয়া চালে অন্তত দুইদিন চলে যাবে।

দুপুরের খাওয়া শেষ করে ঘরের মধ্যে মায়ের সাথে শুয়ে আছে প্রভা। ও প্রতিনিয়ত দেখছে ওকে নিয়ে মায়ের বেঁচে থাকার যুদ্ধ। মনে মনে ভাবে আজ বাবা বেঁচে থাকলে আমাদের এত কষ্ট করতে হত না। বাবার চেহারাটা আবছায়াভাবে ভাসে মনের আয়নায়। তখন ওর বয়সই বা কত? পাঁচ কি ছয়।
-মা, তুমি কত কষ্ট কর! বাবা বাইচা থাকলে আমগো এত কষ্ট করতে অইত না, আমগো কপালডাই পোড়া।
-সুখ ভাগ্যে না থাকলে মানুষের কি করনের আছেরে মা?

ঝড়, ভাঙন যেন ওকে ছায়ার মতই অনুসরণ করে। উজানীচর থেকে শ্যামলপুর, এখানেও সেই ঝড়ই আবার ওর সর্বস্ব কেড়ে নিল। নদীভাঙা মানুষ, তবুও নদীকে অবলম্বন করেই বেঁচে থাকে। তাইতো অসীম উজানগাঙকেই বেছে নিয়েছিলো নিজের জীবিকা হিসেবে। মাছের কোন কমতি ছিলনা নদীতে, কেবল প্রয়োজন ছিল পরিশ্রমের। অসীমের পরিশ্রমের বলেই টিকে থাকে ওরা। প্রতিরাতে লুঙ্গির কোচায় গুজা টাকা আর খালুই ভর্তি মাছ নিয়েই ফিরত ও। বিভার সংসার যেন সুখে ভরে উঠেছিল। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হল না। কথায় আছে, সুখ যার ভাগ্যে নেই তাকে সুখী করে সাধ্য কার? আবারও ঝড়, নদী- সর্বগ্রাসী! সবকিছু কেড়ে নেয়।
সে রাতে প্রচন্ড ঝড় ছিল আর বিভার বুকের ভিতরটা কেবলই কেঁপে কেঁপে উঠছিল। ফুঁসে ওঠা উজানগাঙ যেন এক নিষ্ঠুর খেলায় মেতে উঠেছিল। ধ্বংস, ভাঙ্গন, সব হারানো- এই যেন নিয়তি। যুগ যুগ ধরে চলে এই ভাঙ্গনের খেলা। নদী ভাঙ্গে, সেই সাথে ভাঙ্গে নদী পাড়ের মানুষের বুক। ধুলিস্যাত হয় তাদের স্বপ্ন, বাঁচার আশা। জীবিকার সন্ধানে মানুষ ছোটে এখানে থেকে ওখানে, নতুন আশায় বুক বাঁধে। ঝড়, বন্যা, নদী ওদের সব কেড়ে নেয়। যেন আর কিছুই করার থাকে না, শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
নির্ঘুম রাতের শেষে ফিরে পেয়েছিল একটা বিধ্বস্ত সকাল। গ্রামের সর্বক্ষেত্রেই শুধু ধ্বংসের চিহ্ন। বড় বড় গাছ ভেঙ্গে পড়ে আছে, কারো ঘর ভেঙ্গে গেছে। কারো ঘরের চাল, টিন উড়ে গেছে অন্য কোথাও। নদীর পাড়েও ঝড়ের ধ্বংসলীলা। এক রাতে নদীর চেহারা বদলে গেছে একেবারেই। সকাল হতেই বিভা ছুটে গিয়েছিল নদীর পাড়ে।

অনেকে বলছিল, কাল রাইতে নদীতে অনেক নৌকা ডুইবা গ্যাছে। বুকের ভিতর ধ্বক করে উঠেছিল ওর! প্রভার বাপের কিছু হয় নাই তো! কাজেম মাঝিরে দেখে বুকে একটু সাহস এসেছিল।
-চাচা, কাইল নাকি নদীতে অনেক নাও ডুইবা গ্যাছে?
-হ, হুনলাম তো। তুই চিন্তা করিস না, অসীমের কিছু অইবো না। ওরা সবাই খুব ভাল নাও বায়, এর আগেও অনেকবার এইরহম ঝড়ের মধ্যে মাছ ধরছে। নিশ্চয়ই কোনহানে নাও ভিড়াইয়া রাখছে। এহন তো ঝড় থাইমা গ্যাছে, ফিরা আইবো। তুই বাড়ি যা।
আস্তে আস্তে বাড়ি ফিরে আসে বিভা। সারাদিন কেটে যায়, চিন্তার জায়গায় ভর করে ভয়। একে একে গফুর, ছমির, পরান ও মালেকের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে দেখে কেউ ফেরেনি। সন্ধ্যার একটু আগে খবর আসলো ছমির ফিরেছে। প্রচন্ড উৎকন্ঠা নিয়ে একছুটে চলে গিয়েছিল ছমিরের বাড়ি। ছমির উঠানে পা ছড়িয়ে বসে আছে, বিধ্বস্ত চেহারা। ছমিরের সামনে গিয়ে বসে পড়ে বিভা।
-ছমির ভাই তুমি একলা! প্রভার বাপ কই ?
ছমির কোন জবাব দিতে পারেনি সেদিন, শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল। সে দৃষ্টিতে কোন ভাষা ছিল না, কেবল দুই চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়েছিল কয়েকফোটা অশ্রু।
বিভা বুঝে গিয়েছিল এতদিনের দেনা পাওনা কড়ায়গণ্ডায় উশুল করে নিয়েছে নদী। আবার সেই ঝড়! সর্বনাশা নদী! দুই চোখ অন্ধকার হয়ে এসেছিল, টলতে টলতে মাটিতে পড়ে যায় ও। সবাই ধরাধরি করে নিয়ে গিয়েছিল ছমিরের ঘরে। চোখেমুখে, মাথায় পানি দেয়ার পর জ্ঞান ফিরে এলে প্রভাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল বিভা। অসীমের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। তারপর, সহায় সম্বলহীনা বিভা সাত বছর ধরে মেয়েটাকে নিয়ে নিরন্তর সংগ্রাম করে টিকে আছে, সম্পূর্ণ একা।

চলবে...

ধূসর গোধূলি - প্রথম পর্ব
ধূসর গোধূলি - দ্বিতীয় পর্ব

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


ভালা হইতেছে ক্যারি ওন!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


THNX

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


চলুক।

একেক পর্বের মাঝে গ্যাপ আরেকটু কম হলে ভাল হয়।

অনিমেষ রহমান's picture


সাথে আছি !!
Smile

তানবীরা's picture


সাথে আছি !!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।