ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া

scarecrows.jpg

সন্ধ্যা হলেই ঝুপ করে আঁধার নামে শ্যামলপুর গ্রামে। কোন ঘোষণা ছাড়াই গাঢ় অন্ধকার এসে ঢুকে পড়ে গাছপালায় ঘেরা জঙ্গল আর ঘর বাড়ির ঘুলি-ঘুপচিতে, ধীরে ধীরে শুষে নেয় দিনের শেষবেলার সবটুকু আলো। এ সময় বিদ্যুতের দেখা মেলেনা বেশিরভাগ দিনই, তাই এখানকার জীবনযাত্রায় হারিকেন বা কুপিবাতি খুবই অপরিহার্য্য। চাপ চাপ অন্ধকার ভেদ করে গাছপালার ফাঁক গলে বিচ্ছিন্ন বাড়িগুলোতে হারিকেনের টিমটিমে আলো চোখে পড়ে থেকে থেকেই। পথের পাশের ঝোপে একটানা ঝিঁঝিঁপোকার ডাক কিংবা গাছের পাতার ফাঁকে নিশিজাগা পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ রাতের অন্ধকারের সাথে মিলেমিশে পরিবেশকে যেন আরও ভৌতিক করে তোলে। ঘন আঁধারের নির্জনতায় ভয় কাটাতে গ্রামের মেঠোপথ ধরে চলতে গিয়ে নিঃসঙ্গ পথিক নিজের মনেই গেয়ে ওঠে- হলুদিয়া পাখি সোনারই বরণ, পাখিটি ছাড়িল কে…! নিশুতি রাতে অনেকদূর থেকে ভেসে আসা দূরাগত পথিকের এসব গানের রেশ কারো কারো মনে হয়ত বাজতে থাকে দীর্ঘসময় ধরে। চারিদিকে পানি থাকায় আঁধার নামলে লোকজন বাইরে বের হয়না তেমন একটা। কিছুটা সময় ধরে কলাবতী বাজারে লোকসমাগম থাকে, তারপর ধীরে ধীরে সবাই ফিরে যায় বাড়িতে। বইয়ের দোকানে বেচাকেনা তেমন না থাকায় সাত্তার মাষ্টার দোকান বন্ধ করে বেশ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসেন।

অন্ধকার নামলেই অয়নের ভয় যেন বেড়ে যায় অনেকগুণ। তখন দূরের বাড়িগুলো আর বড় বড় গাছের ছায়া মনে কেমন ভয় ধরিয়ে দেয়, পুকুরের উল্টোপাড়ে ছাড়াবাড়ির দিকে তাকালেই ভেতরটা যেন কেঁপে ওঠে। ওর কেবলই মনে হয় ওখানকার ঘুটঘুটে অন্ধকার ভেদ করে এখনই বেরিয়ে আসবে সব মামদো ভূতের দল। শুকনো পাতা মাড়িয়ে ইঁদুর বিড়ালের হেঁটে যাওয়া কিংবা নাম না জানা কোন পাখির অদ্ভুত ডাকও ভয়ের মাত্রাটাকে বাড়িয়ে দেয়! তাই এই সময়ে ঘর থেকে একা বের হওয়া হয়না ওর। এমনকি ঘরের পাশের ছোট্ট বাগানটা যেটা অয়নের খুব প্রিয়, রাত হলে সেখানেও একাকী যাওয়া হয়না কখনও। রাতে বাইরে যাবার প্রয়োজন হলে মন্টুমামা কিংবা ছোটদিকে অবশ্যই ওর সাথে যেতে হয়। মন্টুমামার কোন ভয় নেই। মন্টুমামা অন্ধকার রাতে একা একা ছাড়াবাড়িও যেতে পারে। তবে জোছনা রাতে যখন আকাশে বেশ বড় চাঁদ উঠত- পুকুরের টলটলে স্বচ্ছ পানিতে তার ছায়া পড়ত, সারা আকাশ জুড়ে থাকতো তারার মেলা। তখন উঠোনে মাদুর বিছিয়ে কিংবা পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে বসে বড়দি, ছোটদি, মন্টুমামার সাথে গল্প করার সময় কোন ভয় লাগতো না। বড়দির কোলে মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে আকাশের তারা গুণতে আর গল্প শুনতে কি যে ভাল লাগতো! বড়দি চলে যাবার পর এখন আর তেমন করে গল্প শোনায় না কেউ। মন্টুমামাটার অনেক সাহস কিন্তু ভাল গল্প বলতে পারেনা। আর ছোটদি যে ক’টা গল্প জানে সবই তো ওর শোনা হয়ে গেছে!
অন্ধকারকে ভয় পেলেও বর্ষার সময়ে ঝিঁঝিঁপোকার ডাক আর থেমে থেমে ব্যাঙ ডাকার শব্দ ওর বেশ লাগে। রাতে হিসু করতে যাওবার সময় ও দেখেছে ব্যাঙগুলোর গায়ে লম্বা লম্বা দাগ। মন্টুমামা একবার পা দিয়ে চেপে একটা ব্যাঙ মেরেছিল। অয়নের একদম ভাল লাগেনি। মরে যাবার আগে ওটা কেমন ছটফট করছিলো! তারপর একসময়ে স্থির হয়ে গেল। অয়ন ওর বাবাকে বলেছিল। বাবা বলেছে, ওগুলো মারতে নেই। ও ঠিক করেছে বড় হয়ে কখনও কোন প্রাণিকে মারবে না। মন্টুমামার অনেককিছুই ওর খুব ভাল লাগে। অনেক বড় বড় গাছ বেয়ে কেমন তরতর করে উঠে যায়! ওদের পুকুরপাড়ে যে বড় নারিকেল গাছটা, যেটার মাথা অনেকটা আকাশের কাছাকাছি সেটাতেও অনেক তাড়াতাড়ি উঠে যায়। শীতের সময়ে রাস্তার পাশের সারি সারি খেজুর গাছে উঠে ধারালো দা দিয়ে কি সহজেই গাছগুলো কাটে, তারপর সেখানে হাড়ি বেঁধে রাখে। গাছের সাথে সাঁটানো বাঁশের কঞ্চির নল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা রস এসে হাড়িতে জমা হয় আর সকাল বেলা ঘন কুয়াশার মাঝেও মন্টুমামা ওগুলো নামিয়ে আনে। অয়ন অবাক হয়ে মন্টুমামার কাজগুলো দেখে। মাঝে মাঝে ভাবে বড় হয়ে এগুলো কি ও করতে পারবে?
শুকনো মৌসুমে ওদের বাড়ির পশ্চিম পাশের ভিটাবাড়িতে নানান ধরণের সবজীর চাষ করে মন্টুমামা। অয়ন অনেকদিন দেখেছে ঝাঁকে ঝাঁকে সবুজ টিয়াপাখি এসে বসে মরিচ ক্ষেতে। মামা ওগুলো তাড়াতে বাঁশ আর ভাঙা মাটির হাড়ি দিয়ে কাকতাড়ুয়া বানিয়ে বসিয়ে দেয় ক্ষেতের মাঝে। মাথায় কালো মাটির হাড়ি আর সাদা জামা গায়ে দিয়ে কাকতাড়ুয়াটা লাল-সবুজ মরিচ গাছের মাঝে কেমন প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে থাকে! ওর সাদা জামাটা পতাকার মত বাতাসে উড়তে থাকে। টিয়া পাখির ঝাঁক ভয়ে কাছেই আসেনা। অয়ন মাঝে মাঝে ওটার পাশে নিজেও কাকতাড়ুয়া হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে কতদিন! বাবা গাছ কাটা একদমই পছন্দ করেন না। কেবল আগাছা পরিষ্কার করে দিতে বলেন মন্টুমামাকে। বাগানে অনেক গাছ আছে যেগুলোতে কখনই ফল ধরেনি অথচ ওগুলোও কাটা নিষেধ। তিনি বলেন, ফল না দিক ছায়া তো দেয়, অক্সিজেনও দেয়! তাই সারা বাড়িতে ছড়ানো ছিটানো প্রচুর গাছপালা। মা বাবার অজান্তে মামাকে দিয়ে অনেক গাছ কাটিয়ে লাকড়ি বানিয়ে নেয়। মন্টুমামাকে বাবা কখনও কিছু বলে না, এমনকি তুই করেও না। মা মাঝে মাঝে বকে। মামা অবশ্য হাসিমুখে সবকিছু মেনে নেয়। মাকে ভীষণ ভালবাসে মন্টুমামা। মা বলে ছোটবেলা থেকেই মামা মায়ের সাথে ছায়ার মত লেগে থাকতো। মার কোন ছোট ভাই ছিলনা, দূর সম্পর্কের ভাই হলেও মন্টুমামাকে মা অনেক আদর করতেন। ওঁর আপন কেউ নেই। ওঁর বাবা নানাদের বাড়িতে আশ্রিত ছিল। মামাকে বিয়ে দিয়েছিলেন নানা। তবে বিয়ের ছয়মাস পর মামী সাপের কামড়ে মারা যায়। মামা আর বিয়ে করেনি। মায়ের সাথে এখানে চলে এলো। সেই থেকে মন্টুমামা এ বাড়ির একজন স্থায়ী বাসিন্দা।
সন্ধ্যার পর দু’ভাইবোনে এইসাথে পড়তে বসে। অয়নের খুব তাড়াতাড়িই পড়া শেষ হয়ে যায়। ও তখন ঘরের সিঁড়িতে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে গল্প শোনে। মা আদর করে ওর মাথায় হাত বুলাতে থাকে, মাঝে মাঝে ওর ঘুম এসে যায়। মা শুধু নানাবাড়ির গল্প করে। গোলাভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ-নানাবাড়ির এসব গল্প অনেকবার শোনা হয়ে গেছে অয়নের। নানাকে ওর মনে নেই, মা বলেছে ওর বয়স যখন দুই বছর তখন মারা গেছেন, তবে নানাবাড়ি গেলে নানী খুব আদর করেন ওকে। ছৈওয়ালা নৌকায় করে নানাবাড়ি যেতে ওর বেশ লাগে। নৌকায় উঠলে নৌকার মাথাটা দখল করা ওর চাইই, আর এ নিয়ে প্রতিবারই ছোটদির সাথে ওর লেগে যায়। নৌকার মাথায় বসে উজানগাঙের দু’পাশের গ্রামগুলোকে কেমন অপরিচিত মনে হয়। নদীর বুকে ছোট ছোট ঢেউ তুলে নৌকাটা তিরতির করে এগিয়ে চলে সামনের দিকে আর সেই ঢেউগুলির মধ্যে মাথার উপরের নীল আকাশের বুকে ভেসে থাকা মেঘগুলো কেমন কেঁপে কেঁপে ওঠে। সামনের বারান্দা থেকে মন্টুমামার রেডিওর গান ভেসে আসছে। সন্ধ্যার পর থেকে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত মামার সবসময়ের সঙ্গী এই রেডিওটা। সারাক্ষণই ওটা সাথে করে ঘুরে বেড়ায়। এন্টেনা এদিক ওদিক ঘুরাতে থাকে আর রেডিওটাও যেন মামার সাথে রাগ করে শো শো শব্দ করতে থাকে। মাঝে মাঝে অবশ্য ওটা থেকে ভরাট কন্ঠের গান ভেসে আসে। তখন মন্টুমামাও রেডিওর সেই লোকটার সাথে গেয়ে ওঠে। সেদিন যেমন করে বাজছিল, আমার হাড় কালা করলাম রে ওরে আমার দেহ কালার লাইগারে... মামাও সাথে সাথে গাইছিলো। মন্টুমামার গানের গলা তেমন ভাল না, তবুও সেদিন অয়নের বেশ লাগছিলো।

বাংলাঘরে এখন আর কেউ থাকেনা। আগে ওখানেই থাকতো মন্টুমামা, তখন বারান্দায় দাদা থাকতেন। দাদা হাঁটতে পারতেন না, সারাক্ষণ বারান্দার খাটের উপরে শুয়ে বসে সময় কাটতো তাঁর। ওর ফর্সা শীর্ণদেহী দাদার মাথায় কাশফুলের মত সাদা চুল ছিল। কাউকে কাছে পেলে কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতেন, দেখে খুব মায়া লাগতো ওর। একটু পর পরই শিউলি, বকুল, অয়নের নাম ধরে ডাকতেন। ছোটদি মাঝে মাঝে রেগে গেলে মা বলতেন, বুড়া মানুষ একলা একলা ভাল লাগেনা, একটু দ্যাখনা কি কয়। শীতের সময় প্রতিদিন সকালে বাবা কোলে করে উঠোনে বিছানো পাটিতে রোদে বসিয়ে দিতেন, রোদের তেজ বেড়ে গেলে মন্টুমামা আবার ঘরে উঠিয়ে রাখতেন। গত বছর দাদা চলে গেলেন। বাবা তখন অনেক কেঁদেছিল, ও সেদিন বুঝেছিল বাবা দাদাকে অনেক ভালবাসতেন। ও যেমন বাবাকে অনেক ভালবাসে। মায়ের কোলে শোয়া দেখলেই ছোটদি ওকে শুধু ক্ষেপায়। ছোটদির গলা শুনতে পেয়েই মায়ের কোল থেকে উঠে বসে ও। তিনজনে গল্প করার ফাঁকে অয়নের চোখে পড়ে বড় রাস্তা থেকে একটা উজ্জ্বল আলো বাড়ির দিকে দ্রুত ছুটে আসছে। একটু পরই উঠানের অপরপ্রান্ত থেকে পাঁচ ব্যাটারির টর্চের আলো এসে ওদের গায়ে পড়তেই অয়ন নীচের সিঁড়িতে নেমে দাঁড়ায়, আর তখনই একজন দীর্ঘদেহী মানুষ সাইকেল থেকে নেমে ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে।

চলবে...

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


সুন্দর হইছে গল্পটা~!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ শান্ত

টোকাই's picture


নাইস

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধইন্যা পাতা

তানবীরা's picture


চলুক

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


চলবে, তবে একঘেয়েমী না আসলেই হয়... Smile

সামছা আকিদা জাহান's picture


আমার গ্রামে এখনও ইলেক্ট্রিসিটি নাই। তাই রাতটা আরও তাড়াতাড়ি নামে। সন্ধ্যার আগেই সবার রান্না হয়ে যায়। মাগরিবের পর পরই খাওয়া। কাওন রকমে ইশার নামাজ শেষে ঘুম। হাট বারে হাটুরেরা ফেরে মাঝরাতে। তখন ঘড়িতে হয়ত নয়টা বাজে। কি গভীর রাত।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


অনেক গ্রামের চেহারাই অবশ্য বদলে গেছে এখন, তবে গ্রামের এই ছবিটা আমার কাছে বেশ লাগে!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।