ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা

ভোরের প্রথম আলোর ছোঁয়ায় প্রকৃতি জেগে উঠছে নতুন করে। আশপাশের গাছপালা তার সবুজ রঙ ছড়াতে শুরু করেছে মাত্র। সকালের চমৎকার এই ঠান্ডা আবহাওয়ায় প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। সূর্য্য ওঠার আগের এই সময়টাতে বেড়াতে ভীষণ ভাল লাগে বকুলের। শ্রাবণের আকাশের মত মেঘের ঘনঘটা আর দিনভর ঝুম ঝুম বৃষ্টি এখন আর দেখা যায়না, তবে শেষরাতে যে হালকা বৃষ্টি হয়ে গেছে প্রকৃতিতে তার রেশ রয়ে গেছে এখনও। আশেপাশের গাছপালা আর ঝোপঝাড়গুলো এখনও ভেজা, অনেকটা সদ্য স্নান শেষে গ্রাম্য কিশোরীর ভেজা চুলের মত। প্রতিদিনের মত আজও খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই মন ভাল হয়ে গেল ওর। এই নির্মল ঠাণ্ডা বাতাসে রোজই বেড়ানো হয় তবুও সবসময়ই যেন নতুন করে অনুভব করে এই স্নিগ্ধ সকালটাকে, কখনোই পুরনো লাগে না। ঘর থেকে বেরিয়ে উঠানে এসে দাঁড়াল বকুল। বড় রাস্তার দিকে দৃষ্টি পড়তেই দেখতে পেল অনেকগুলো চাই হাতে মন্টুমামা ভিতর বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। বকুল পুকুরের ঘাটে গিয়ে বসল, মন্টুমামা কাছাকাছি আসতেই দেখল প্রতিটা চাইয়েই ভাল পরিমাণ মাছ আটকা পড়েছে। বকুলকে দেখে মন্টু বলে উঠলো,
-কি ছোডো বুড়ি, উইঠা পড়ছ?
-হুম, আইজ অনেক মাছ উঠছে তো মন্টু মামা!
-আইজ কয়ডা বেশী মাছ পাইলামরে মা
-দেহি তো কি কি মাছ পাইলা
-তোমার পছন্দের বাইলা ও ইচা মাছই বেশী উঠছে আইজ, তুমি কি বড় রাস্তার দিগে যাইবা?
-হ যামু। অয়ন এহনও ওডে নাই, ওরে তুইলা নেই।
-তুমি তুলতে গেলেই তো ক্ষ্যপব!
-ক্ষ্যাপুক, একটু পড়েই আবার ঠিক অইয়া যাইব

মন্টু হাসতে হাসতে পাকের ঘরের দিকে চলে যায়। দিনের বেশীর ভাগ সময়ই লেগে থাকে ওদের খুনসুঁটি, একটু পর পরই অয়ন বড় বোনের বিরুদ্ধে নালিশের ঝুড়ি নিয়ে হাজির হয় মায়ের কাছে। মান-অভিমানের পালা চলেতে থাকে ভাই বোনের। অবশ্য বেশীক্ষণ না, কিছুক্ষণ পর আবার স্বাভাবিক। অয়নকে ঘুম থেকে জাগাতে বকুল শুরু করে ওর সাথে স্বভাবসুলভ দুষ্টুমি-
অয়নের ঘুম ভেঙ্গে গেছে কিছুক্ষণ আগে, বিছানা থেকে নামার কথা ভাবতেই ছোটদির ডাক শুনতে পেল। ইচ্ছে করে ঘুমের ভান করে শুয়ে আছে ও। একটু পরই পানির ফোটা এসে লাগে চোখে মুখে। তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমেই ছোটদিকে খুঁজতে থাকে। ঘরের দরজায় আসতেই দেখে ছোটদি পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। অয়নও ছাড়ার পাত্র নয়, বাইরে এসেই আবার সেই চেলাকাঠ নিয়ে তেড়ে যায় বকুলের পিছে পিছে। দুজনেই পুকুরের পাড় ধরে বড় রাস্তার দিকে দৌড়াতে থাকে। সালমা বেগম পিছনে তাকিয়ে হাসে, এ তো ওদের নিত্যদিনের চিত্র!
বকুলের পিছন পিছন ছুটতে গিয়ে একসময় হাঁপিয়ে ওঠে অয়ন। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বকুলকে ডাকতে থাকে-
-ছোটদি দাঁড়া
-আমারে আর মারবি?
-না, মারুম না। এই দেখ লাডি ফালাই দিলাম
বকুল ভাইয়ের কাছে এগিয়ে আসে। দুজনের পায়েই গতরাতে বৃষ্টিতে ভেজা রাস্তার কাদা লেগে আছে। ঘাসে সেই মাটি মুছে দুই ভাই বোনে সামনে এগিয়ে চলে। ঘন সবুজ গাছ গাছালিতে ঢাকা বাড়িটার পুর্ব দিকে বের হওয়া বড় রাস্তাটা ধরে ওরা ছুটতে থাকে কোটাখালী খালের দিকে। সেই খালের উপর একটা কাঠের ব্রিজ। অয়নের ভাল লাগার জায়গাটা বাড়ি থেকে এই সেতু পর্যন্ত বিস্তৃত। সাড়া বাড়িময় ছড়ানো বড় বড় গাছ, পুকুর, উঠোন, আর এই সবুজ ঘাসে ছাওয়া চওড়া রাস্তাটাই ওর জগৎ। রাস্তার দু’পাশে বড় বড় রেইনট্রি, কড়াই, কৃষ্ণচূড়া, আর ফাঁকে ফাঁকে বড় বড় তালগাছের সারি ওর মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে সারাক্ষণ। খালের পাড়ে, একেবারে ব্রিজের পাশ ঘেঁসে লম্বা তালগাছটি খুব প্রিয়। ওদের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়েই দেখা যায় এটি। ওখানে দাঁড়িয়ে প্রায়ই গাছটির সাথে ঝুলন্ত বাবুই পাখির বাসাগুলোতে দৃষ্টি আটকে যায়। গাছ থেকে একদিন একটি বাসা নীচে খসে পড়েছিল। অয়ন ওটা হাতে নিয়ে দেখেছিল কি সুন্দর নিখুঁত ভাবে তৈরি করা হয়েছে ওগুলো! নরম, তুলতুলে!

প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে এই কাঠের ব্রিজ পার হয়েই বাড়ি ফিরে অয়ন। সুবল আর মিরাজের সাথে ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে কতদিন খালের মধ্যে মানুষের মাছ ধরা দেখেছে! এখানটায় এসে দাঁড়াতেই মনে হয় যেন বাড়িতে পৌছে গেছে ও। ব্রিজের কাছে আসতেই দেখে হরিকাকা খালে পাতা ভেসাল জাল দিয়ে মাছ ধরছে। হরিকাকাকে দেখেই অয়ন বড় রাস্তা থেকে নেমে খালের পাড়ে এগিয়ে যায়।
-ও কাকা, অনেক মাছ পড়ছে বুঝি আইজকা?
অয়নের কণ্ঠ শুনে ঘুরে তাকায় হরিপদ। আরে! অয়ন আর বকুল যে। আইজকা জোবা তো, তাই মাছ ভালাই পড়ছে। তো এত বিহান বেলা তোমরা এইহানে?
-এমনিই ঘুরতে আইছি
-হ, এই বিহান বেলা ঘুরন ভালা। মাছ লাগবো?
-না, লাগবো না কাকা। আমাদের মন্টুমামাও আইজ চাই’তে অনেক মাছ পাইছে। বকুল জবাব দেয়।
হরিপদকে খুব পছন্দ করে অয়ন। ওদের বাড়িতে হরিপদের অবাধ যাতায়াত; ওকে ভীষণ স্নেহ করেন তিনি। খালের ঐ পাড়ে উঠে পূর্বদিকে তাকালে প্রথম যে বড় বাড়িটা চোখে পড়ে সেটাই হরিপদ ঘোষের বাড়ি। ওঁদের বাড়িতে কতদিন গেছে ও বড়দি’র সাথে! হরিকাকার মেয়ে মালতিদির সাথে বড়দি’র ভীষণ ভাব। বড়দি যখনই ও বাড়ি যেত অয়ন যেন আর পিছু ছাড়ত না। ওঁদের বাড়িতে গেলে খুব ভাল লাগতো, সুন্দর সাজানো গোছানো বাড়িটার উঠোনের চারিপাশে নানা ধরনের ফুলের গাছ। মালতিদি’র মাকে অয়ন ডাকে কাকী। ও বাড়িতে গেলেই কাকী নাড়ু, পায়েস, বাতাসা খেতে দিতেন। হরিকাকার দোকানের মিষ্টি আর বাতাসাও ভীষণ পছন্দ ওর। হাটের দিন বাবার সাথে গেলে ওই দোকানের বাতাসা তার চাইই। বড়দি’র বিয়ের পর মালতিদি’রও বিয়ে হয়ে গেল। হরিপদর ছেলে সুবল যদিও ওর সাথে একই ক্লাসে পড়ে তবুও ওদের বাড়িতে এখন আর যাওয়া হয় না তেমন।

রাস্তার দু’পাশের ডুবন্ত জমির আলের উপর উঁচু করে জমিয়ে রাখা আগাছার প্রাচীরের ফাঁকে ফাঁকে পেতে রাখা চাই তুলছে লোকজন। খালের পাড় থেকে রাস্তায় উঠে আসে ওরা। চারিদিকে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে আসছে। পূব আকাশে একটা লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমশ। ভোরের ঠান্ডা বাতাসে ব্রিজের উপর উঠে কিছুক্ষণ দাঁড়ায় ওরা। তারপর পূব দিকে তাকাতেই অয়ন দেখে হরিপদ ঘোষের বাড়ির উপর দিয়ে বড় গোল থালার মত লাল সূর্যটা উঁকি দিচ্ছে কেমন রাজকীয় ভঙ্গীতে। যেন সবাইকে জানান দিয়ে যাচ্ছে আমি এসে গেছি এবার তোরা উঠে পড়। ওরা আরও কিছুক্ষণ ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে ফিরে চলল দুজনে।

চলবে....

আগের কিছু পর্বঃ
ধূসর গোধূলিঃ মায়া
ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে
ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া
ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন
ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


সুন্দর!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


তোমারে ধইন্না Smile

সামছা আকিদা জাহান's picture


ভাল লাগলো।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ নিয়মিত পড়ার জন্য Smile

তানবীরা's picture


খুব ভাল লাগলো।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


সত্যি?
অন্যরা কেউ কিছু বলেনা তো!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।