ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ আলোর নীচের অন্ধকার...

dhusor godhuli-15_0.jpg
প্রতিদিন সকালে, সুর্য্য ওঠার পর পরই মসজিদের সাথে লাগোয়া ছোট একটি ঘরে ছেলেমেয়েরা উচ্চস্বরে আরবি পড়ে। শ্যামলপুর গ্রামে এটাই একমাত্র মসজিদ। মসজিদের পাশে একটি আলাদা ঘর, বাঁশের খুঁটির উপরে গোলপাতার ছাউনি দেয়া ঘরটার চারপাশে কোন বেড়া নেই। সেই ঘরের মেঝেতে খেজুর পাতার পাটিতে বসে সকাল থেকে বিভিন্ন বয়সী ছেলেমেয়েরা আরবি পড়ছে। অয়নও প্রতিদিন আসে এখানে। বয়সে বড় ছেলেমেয়েরা কোরাণ আর অপেক্ষাকৃত ছোটরা পড়ছে আমপারা। অগ্রহায়নের হাড় কাঁপানো শীতে কিংবা গ্রীষ্মের মাঠ ঘাট ফেটে চৌচির হওয়া গরমে, কখনই বন্ধ হয়না মাদ্রাসা। সবাই এতটাই উচ্চস্বরে পড়ছে যে কারো উচ্চারণই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছেনা। লম্বা একটা বেত নিয়ে মৌলভীসাব মাঝখানে বসে সবার পড়া দেখছেন, মাঝে মাঝে ওটার ব্যবহারও করছেন।

উজানগাঙের শেষ মাথায় ছোট্ট একটি গ্রাম কমলডাঙা, যার বেশীর ভাগই এখন নদীগর্ভে। মঈনুদ্দিন মৌলভী শ্যামলপুরে এসেছেন অনেক বছর আগে। নদীভাঙ্গা কমলডাঙা এলাকার মানুষ। নিজের বাড়িঘর নদীতে চলে যাবার পর জীবিকার তাগিদে শ্যামলপুরেই বসতি গেড়েছেন তিনি। মসজিদের পাশেই সপরিবারে তার বসবাস। মফিজ মিয়ার শ্বশুরপক্ষের দূর সম্পর্কের আত্মীয় হওয়ায় মসজিদের সাথে লাগোয়া এক টুকরা জমিতে মৌলভীসাবের বসবাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছে সেই-ই। মসজিদের এই জায়গাটা মফিজ মিয়ার বাবা আজিমুদ্দিন হাওলাদারের দান করা, তাই মসজিদ কমিটির প্রধানের পদটির অধিকার উত্তরাধিকারসূত্রেই মফিজ মিয়াই বহন করে চলেছে বছরের পর বছর। মৌলভীসাবের উপরেও তাঁর রয়েছে বিস্তর প্রভাব।
গ্রামের দরিদ্র, অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত মানুষের কাছে তিনি ধর্মের মহান বানী পৌঁছে দেন মৌলভীসাব, গ্রামের ছেলেমেয়েদের দীনি এলেম শিক্ষা দেন। ধর্মের বানী শুনলে দশ বছরের বালক থেকে শুরু করে সত্তর বছরের বৃদ্ধেরও মন নরম হয়ে যায়, তাইতো গ্রামের সব শ্রেণির মানুষের কাছে দিনে দিনে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। যে কোন বিচার আচারে ধর্মীয় বিধিনিষেধের ব্যাপারে তার মতামত সবাই মেনে নেয় বিনা বাক্যব্যয়ে। যদিও বিধিনিষেধ আরোপের ব্যাপারে মফিজ মিয়ার মতামতের যথেষ্ট প্রাধান্য থাকে।

বড়ভাই রহিম হাওলাদার মারা যাবার পর মফিজ মিয়া তার বাবার সমস্ত সহায় সম্পত্তি নিজের দখলে নিয়ে নেয়। বড়ভাই মৃত্যুর আগে তাঁর একমাত্র মেয়ে বিভাকে মফিজ মিয়ার হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন, পিতৃহারা বিভা’র অভিভাকত্ব চলে আসে চাচার কাছে। ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে মফিজ মিয়া। বছর খানেকের মাথায় মা মারা গেলে সম্পূর্ণ একা হয়ে যায় বিভা। বিভার বয়স তখন মাত্র তের কি চৌদ্দ। শুরু হয় চাচা চাচীর কাছে তার কষ্টের জীবন। এক সময় সে নিজেকে আবিষ্কার করে চাচা-চাচীর কাজের মেয়েতে হিসেবে! সকাল সন্ধ্যা চাচী পেয়ারা বেগমের গাল-মন্দ আর মার-ধর খেয়ে বছর তিনেক পার করার পর উজানিচরে এক গরীব ঘরে তাকে বিয়ে দিয়ে আপদ বিদায় করে চাচা মফিজ মিয়া।

শহরে যাবার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় উঠেই মফিজ মিয়া দেখে দূর থেকে খালেক মেম্বার তাকে ইশারা করে একটু থামতে বলছে। মফিজ মিয়া কিছুক্ষণ দাঁড়ায়, কাছে আসতেই মেম্বার বলে,
-ভাইসাব, আমি তো কয়দিন ধইরা আপনেরে খুজতেছি!
-ক্যান, কি অইছে? আমার কাছে তোমার আবার কি কাম?
-জমিজমা নিয়া কিছু সমস্যায় পড়ছি। ফুপাতো ভাইরা তাগো ফরাজ বুইঝা নিতে চায়, তাগো হিসাবে কিছুডা গড়মিল দেখতে পাইতাছি। তাই আপনের লগে একটু বুঝতে আইছিলাম।
-এ তো অনেক সময়ের ব্যাপার, এইহানে দাঁড়াইয়া তো এতসব কাগজপত্র দ্যাহা যাইব না। রাইতে বাড়ি আইও। আরেকটা কাম অবশ্য করতে পার, তুমি তো শহরে যাও, অইহানেও দ্যাহা করতে পারো।
-একটু পর অবশ্য শহরে যামু, শহরে আপনেরে ঠিক কোন জায়গায় পাওয়া যাইব?
-তহসিল অফিসের সামনেই তো সারাদিন থাহি, ভুবন পালের গদির সামনে খোঁজ করলেই পাইবা
-আইচ্ছা ভাইসাব, আমি অইহানেই আমুনে।
মফিজ মিয়া বাজারের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে দেখে মৌলভীসাব তার দিকে এগিয়ে আসছে। কাছাকাছি এসে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করে, মিয়াভাই কেমন আছেন?
-ভাল, আপনের সব খবর ভাল তো? মাদ্রাসায় ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা মনে বাড়ছে।
-হ, ছাত্র-ছাত্রী ভালাই আইতেছে এহন, তয় সবাই তো টাকা পয়সা দিতে পারেনা তেমন!
-হাতের পাঁচ আঙ্গুল কি সমান অয়? একটু পরে আমগো বাড়ি যাইয়েন। আপনের লইগা একবস্তা ধান রাহা আছে, সাজুর মা’রে কইয়া রাখছি।
-জে মিয়াসাব, আপনের দয়ার শরিল!

মফিজ মিয়া বাজারের দিকে চলে যায়। মঈনুদ্দীন মৌলভী তিন রাস্তার মাথায় এসে মফিজ মিয়ার বাড়ির দিকে মুখ করে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। তার দৃষ্টি মফিজ মিয়ার বাড়ির দিকে নয়, সে আসলে তাকিয়ে আছে দীঘির পাড় দিয়ে সরু রাস্তাটা পার হয়ে বাগানের একপাশে ছোট্ট একটি কুড়েঘরের দিকে। বাগানের এই ছোট্ট ভিটায় বাস করে মফিজ মিয়ার একমাত্র ভাতিজী বিভা। অনেকদিন থেকেই এই জায়গাটুকুর স্বপ্ন দেখছেন মৌলভীসাব। মসজিদের পাশের ঐ ছোট্ট জমিটুকুতে ছেলেমেয়ে নিয়ে বেশ কষ্ট হয় তার। মফিজ মিয়ার স্ত্রী পেয়ারা বেগম একরকম কথা দিয়ে রেখেছে কোনভাবে বিভাকে তাড়াতে পারলে এই জায়গাটুকু তাকেই দেয়া হবে। সেই থেকেই তিনি এই জায়গাটুকু পাবার জন্য অধীর অপেক্ষায় আছেন।

সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে বাংলাঘরে গিয়েই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল পেয়ারা বেগমের। কাল বিকেলে মাড়াই করে রাখা ধানের বস্তাগুলো থেকে একটা উধাও! বুঝতে আর বাকি থাকেনা কাজটা কার। ঘরে ঢুকে বড় ছেলে সাজুকে ঘুম থেকে তুলেই গালাগালি শুরু করে সে-
-এই হারামজাদা ওঠ!
চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙ্গে যায় সাজুর। উঠেই মায়ের অগ্নিমূর্তি দেখে প্রথমে ঘাবড়ে যায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য সামলে নিয়ে স্বভাবসুলব আচরণে ফিরে আসে সে।
-কি অইছে চিল্লাইতেছ ক্যান?
-ঐ হারামির বাচ্চা, বাংলাঘর থেইক্যা ধানের বস্তা সরাইছস ক্যান? খাওন কি এমনি এমনি আহে?
-আমি সরাইনাই, দ্যাহো তোমার ছোড পোলা সরাইছে নাহি
-রাজু সরায়নাই, ও কাইল সারাদিন ঘরেই আছিলো। তুই ছাড়া কেউ সরায়নাই। এক্কেরে ঝাড়ু দিয়া বাইড়াইয়া ঘর থেইক্যা বাইর কইরা দিমু বাদাইম্যার বাচ্চা বাদাইম্যা। দুই পয়সা আয় করার মুরোদ নাই, খালি বাপের গোলা খালি করার তালে আছে!
-হ, নিলে আমার বাপেরডা নিছি, তোমার কি?
-আহারে! বাপের লইগ্যা যেন দরদ উথলাইয়া উঠছে। এত কইরা কইতাছি বাপের লগে গিয়া সবকিছু শিখ্যা নে, হ্যার লগে দ্যাহা নাই! খালি ঘরে বইস্যা গিলন আর বাদাম্যার লাহান ঘুইরা বেড়ান!
-তোমারে কইছি না হ্যার অই কাম আমি শিখুম না। তুমি জানো, হ্যারে পিছনে পিছনে সক্কলে দালাল কয়? জমির দালাল।
-ও আইচ্ছা! বাপেরে দালাল কয় হেতে তোমার খারাপ লাগে না, তোমারে কইলে মান সম্মান যাইব, না?
-তুমি কি এইহান থেইক্যা যাইবা? বলে কাঁথা গায়ে দিয়ে আবার শুয়ে পড়ে সাজু।
-তিনডা মাইয়া পোলা আমার হাড্ডি মাংস জ্বালাইয়া খাইল! বলে পেয়ারা বেগম গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।

চলবে....

• ধূসর গোধূলিঃ মৌমাছি
• ধূসর গোধূলিঃ চেনা পথের গল্প...
• ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক...
• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা
• ধূসর গোধূলিঃ মায়া
• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে
• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া
• ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন
• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


ভাল হয়েছে .............পড়ছি

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


অনেক ধন্যবাদ

দূরতম গর্জন's picture


এই বেতের বারির জন্যই ছেলে পেলে একটু মানুষ হয়
তানাহলে চরম দুষ্ট হতো এগুলো

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


Smile

সামছা আকিদা জাহান's picture


ভাল লাগল।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ আপু Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।