ইউজার লগইন

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অতীত-ভবিষ্যত-বর্তমান

ইংরেজগণ আমাদের সভ্য করেছে না কি আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে কেরানী তৈরির উপযুক্ত শিক্ষানীতি চাপিয়ে দিয়েছে আমাদের উপরে সে প্রশ্নের মীমাংসা হয়তো সম্ভব হবে না, অন্তত আমার পক্ষে এ বিষয়ে তেমন সিদ্ধান্তমূলক কিছু ব্যক্ত করা সম্ভব না।

রাষ্ট্রের শিক্ষাবিস্তারের নিজস্ব তাগিদ থাকে- নিজস্ব প্রয়োজনেই এক ধরণের অলিখিত শিক্ষানীতি তারা অনুসরণ করেন- প্রাগৈতিহাসিক বিবরণ দেওয়ার অক্ষমতা মেনে নিয়েই বলছি হয়তো এখন থেকে দুই হাজার বছর আগেও উপমহাদেশে বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব ছিলো । মুনি-ঋষি- স্মার্ত-বৈয়াকরণিক-নৈয়ায়িক-বেদি-দ্বিবেদী-ত্রিবেদী-চতুর্বেদী-ভট্টাচার্য-শংকরাচার্য বিভিন্ন উপাধি থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মাণ হয় একদা শিক্ষাদান এক ধরণের সম্মানজনক পেশা হিসেবে স্বীকৃত ছিলো-

কথিত আছে রাজপূত্র রাহুল বিভিন্ন পন্ডিতের কাছে লিপিশিক্ষা গ্রহন করেছিলেন, রাজপূত্রদের রাজ্য পরিচালনার প্রয়োজনে বিভিন্ন দেশের ভাষা ও কৃষ্টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়ার প্রয়োজনও ছিলো- জানা যায় বড় বড় শহরের গণিকাগণ ষোল কলায় পারদর্শী ছিলেন- এই ষোলোকলার একটি মুখে মুখে ছন্দোবদ্ধ শ্লোক তৈরির ক্ষমতা- তাদের প্রশিক্ষক কিংবা প্রশিক্ষিকাগণ তাদের সমাজেরউচ্চস্তরের মানুষদের বিদ্যা-রুচি ও মাণের সমতুল্য শিক্ষাই প্রদান করতেন- এইসব গণিকালয়ে কিংবা দেবালয়ে উচ্চশিক্ষিত-উচ্চবর্গের মানুষজন এসে তাদের সাথে বাক্যালাপে যেনো হতাশ না হন সে জন্য তাদের সেভাবেই তৈরি করা হতো- জ্ঞাতসারে কিংবা প্রয়োজনেই বিভিন্ন শহরে এক শ্রেণীর নারীদের ভেতরে উচ্চতর শিক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণের বন্দোবস্ত ছিলো।

বাংলাদেশের বিভিন্ন বৌদ্ধবিহার আদতে পাঠশালা হিসেবেই অভিহিত হতো-সেখানে বিদ্যার্জন করতে আসতেন বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীগণ- দক্ষিণারঞ্জন রায়ের বাংলার ইতিহাসে তেমন অনেক বর্ণনাই খুঁজে পাওয়া যাবে- প্রয়োজনটা যাই হোক না কেনো ইংরেজগণ আসবার আগেই এখানে এক ধরণের শিক্ষাপদ্ধতি প্রচলিত ছিলো-

পরবর্তীতে উচ্চাভিলাষী- তস্কর মুসলমানেরা বাংলাদেশ দখল করেছিলো- তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিলো যতটা সম্ভব সম্পদ লুণ্ঠন করে চলে যাওয়া কিন্তু এদের কেউ কেউ শুধু তস্করবৃত্তিতে জীবন অতিবাহিত করেন নি- তারা বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ করেছেন, বাহুবলে বিভিন্ন রাজ্য জয় করেছেন- সম্রাজ্যে এক ধরণের স্থিরতা আসবার পরে তারা বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছেন এখানে।

ঢাকার অদুরেই ছয় শতাব্দী আগে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো- সে মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্রদের চাহিদা পুরণে নিস্কর জমিরও বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন সম্রাট- এভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় মুসলমাণদের শিক্ষার প্রয়োজন কতটুকু পুরণ হয়েছিলো তা বলা যায় না কিন্তু মাদ্রাসা-মক্তব-ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ দিন ধরেই দরিদ্র মুসলমানদের শিক্ষার প্রয়োজন মেটাচ্ছে-

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের টোল-পাঠশালা-বিদ্যালয় -বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুযোগ ছিলো, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ ঘরের ছেলেরা পাঠশালার দোরগোরা থেকেই ফেরত আসতো- পাঠশালার খরচ মেটানোর সামর্থ্যও ছিলো না অনেকের- এরা পন্ডিতের বাসায় শ্রম দিয়ে শিক্ষা কিনতো- কেউ কেউ নিজস্ব মেধায় পন্ডিতের মন জয় করে উচ্চশিক্ষার সুযোগও পেতো।

ইংরেজ আসবার আগে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে অন্তত একটি টোল কিংবা পাঠশালার অস্তিত্ব ছিলো- প্রতি ৪০০ জনের জন্য একটি বিদ্যালয় খুব উন্নততর শিক্ষাব্যবস্থার অস্তিত্বের জানান দিলেও এইসব পাঠশালার ছাত্র সংখ্যা কোনো সময়েই শতের ঘরে পৌঁছাতো না- বিদ্যালয়ের এমন বিস্তৃতি সত্ত্বেও বাংলাদেশে পাঠশালা পাশ শিক্ষার্থীর সংখ্যা কখনও শতকরা ১০ এর বেশী হতে পারে নি।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে আসে- পলাশীতে বিজয়ের পর তারা বাণিজ্যখাত দখল করলেও রাষ্ট্র পরিচালনা ও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহন করে নি- মীরা জাফরের পর মীর কাসিম- পরবর্তীতে মীরান এবং এর পর স্বয়ং ইংরেজরাই বাণিজ্য ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহন করে।

বিচার বিভাগ অতীতে মুসলমানদের করায়ত্বে থাকলেও ১৭৮০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বিচার বিভাগে নিজেদের লোক নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহন করে- তাদের প্রশিক্ষণের জন্য ফোর্টউইলিয়ামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়- একই সময়ে তারা কোলকাতা মাদ্রাসার পৃষ্টপোষকতা শুরু করে- ইংরেজ মনিবের তত্ত্বাবধানে আইনের বিধান তৈরির প্রয়োজনে বাংলাদেশের বাঙালীরা ইংরেজী অনুবাদ শুরু করে- ইংরেজী শিক্ষিত হতে থাকে এবং এভাবে বাংলাদেশে ইংরেজী শিক্ষিত জনগণ বিস্তৃতি লাভ করে।

১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ঘোষিত হওয়ার পর ইংরেজদের এৃজন্ট বাঙালী বাবুরা নিজেরাও জমিদার হয়ে উঠেন- অন্যান্য খাতে অর্থ বিনিয়োগের তেমন সুবিধা না থাকায় কিংবা ইংরেজদের চাতুর্যে তারা ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে জমিতে বিনিয়োগ করলো-

এ সময়েই ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানীর শেয়ারহোল্ডারগণ উপমহাদেশে শিক্ষাবিস্তারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বাদানুবাদে লিপ্ত হলেন। তাদের বাদানুবাদের ফলশ্রুতিতে ১৮১৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিবছর শিক্ষাখাতে ন্যুনটম হাজার টাকা বিনিয়োগের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন- ইংরেজ কোম্পানির খরচে উপমহাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হয়- সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম কি হওয়া উচিত এ বিষয়ে ইংল্যান্ডে এবং উপমহাদেশে ব্যবসা তদারকি ও কর আদায়ে নিয়োজিত কর্মকর্তা কর্মচারীদের ভেতরে বিভিন্ন ধরণের তর্ক বিতর্ক হয়েছে- প্রতি বছরই এরা শিক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করতো- সেখানে উপমহাদেশে শিক্ষার অগ্রগতি- বিভিন্ন সমস্যা- সম্ভবনার উল্লেখ থাকতো- এইসব প্রতিবেদন গুগল বুকসের কল্যানে পাওয়া যায়- কষ্ট করে ইংল্যান্ডে গিয়ে এসব প্রতিবেদন খুঁজতে হয় না এখন। তবে সেসব প্রতিবেদন বিস্তারিত পড়বার সময়ের অভাবটাই এক ধরণের বাধা- আমার নিজস্ব আগ্রহের ক্ষেত্রটাও আলাদা- সুতরাং কয়েক পৃষ্টা উল্টে দেখার বাইরে তেমন গভীর ভাবে পড়া হয় নি এসব প্রতিবেদন-

বাৎসরিক প্রতিবেদনে এলাকাভিত্তিক শিক্ষাঙ্গনের নাম- শিক্ষার্থীদের সম্ভবনা এসবের বর্ণনা থাকতো- আর থাকতো প্রতিবছর কৃতি শিক্ষার্থীদের নামের তালিকা- এক ধরণের পরিসংখ্যানও থাকতো সেখানে- ধর্মভিত্তিক-বয়েসভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের গ্রুপিংও করা হতো সময় সময়ে-

শিক্ষা বিতর্কের একটা অংশ জুড়ে অবশ্য ছিলো উপমহাদেশের ক্ষেত্রে শিক্ষানীতি কি হওয়া উচিত সে বিষয়ে বিভিন্ন বক্তব্য- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদা ইংরেজদের উপনিবেশ ছিলো- জর্জ ওয়াশিংটন- টমাস জেফারসন- ফ_রাংকলিন রুজভেল্ট- মূলত মার্কিন সংবিধানে সাক্ষরকারী অধিকাংশ ব্যক্তিই ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন- তাদের শিক্ষার মান ও পাঠ্য ক্রমের সাথে ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের তেমন পার্থক্য ছিলো না-

স্বাধীনতা ঘোষণা করা এইসব ব্যক্তিদের অধিকাংশই ইংরেজপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর মালিকেরা এবং তাদের শেয়ার হোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইংরেজ সম্রাটের পরামর্শদাতাগণ আমেরিকার মাণের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধী ছিলেন- এমন কি তারা বিজ্ঞান-দর্শণ এসব পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করারও বিরোধিতা করেছেন। সম্ভবত টমাস মান( গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে যিনি বিশ্বে অধিকতর পরিচিত) তিনিও উপমহাদেশে শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে সমতুল্যতার বিরোধিতা করেছিলেন-

[ বেশ আগে খ্রীষ্টান ভাবাদর্শ বিস্তার ও উপমহাদেশ সহ বিভিন্ন উপনিবেশের শিক্ষানীতি বিষয়ে একটা বই পড়া শুরু করেছিলাম সেখানে এমন কিছু তথ্য ছিলো - ]

শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে- তাদের স্বাধীনতার স্পৃহা জাগ্রত করতে পারে এমন শিক্ষানীতি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নীতিবিরুদ্ধ ছিলো এবং উপমহাদেশের ইংরেজ প্রতিষ্ঠিত ও ইংরেজদের পৃষ্টপোষকতায় পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোতে এ শিক্ষানীতি অনুসৃত হয়েছিলো- একই সময়ে সহস্রাব্দ প্রাচীন উপমহাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পরে-

গ্রামের প্রতিষ্ঠিত পাঠশালাগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে থাকে- একদা প্রতিষ্ঠিত- সম্মানিত পন্ডিতগণ নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়, নতুন ধরণের শিক্ষা পরিবেশে উপেক্ষিত-অবাঞ্ছিত গলগ্রহ হয়ে যান। তাদের শিক্ষা-নৈতিকতা- এবং তাদের শিক্ষানীতি বৃহত্তর সমাজে উপেক্ষিত হয়ে যাওয়ায় তারাও ক্রমশ: দরিদ্র হয়ে যান। গ্রামীণ পাঠশালার পাঠ্যক্রমে হয়তো আধুনিক তেমন কিছুই ছিলো না, যুগোপযোগী বিজ্ঞান-দর্শণ-অর্থ শাস্ত্র সম্পর্কে তেমন কিছুই হয়তো পড়ানো হতো না তাদের- কিন্তু এই পাঠশালার শিক্ষার্থীরা ছন্দে ছন্দে তাদের জীবনের প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক লেনদেনের জ্ঞানটুকু ঠিকই অর্জন করতে পারতেন এখান থেকে-

জমির পরিমাণ, খাজনার পরিমাণ- বাজার দর- অর্থের মূল্য এবং তাদের বিভিন্ন পরিবর্তন রীতি তারা জানতে পারতেন পাঠশালায়- তেমন উচ্চতর জ্ঞানসাধানার চাহিদা পুরণ করতে না পারলেও এই পাঠশালানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা সমসাময়িক সামাজিক চাহিদা পুরণ করতে পারতো। সমাজে জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো সম্পর্কে অবগত ও অবহিত হওয়ার প্রায়োগিক প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম ছিলো এইসব বিদ্যানিকেতনগুলো।

পন্ডিতদের পাঠশালার মতো অতিদ্রুত ধ্বংস না হলেও মসজিদভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে অজনপ্রিয় হয়ে যায়। বাংলার মুসলমানগণ নিজেদের মানসিক জড়তা কিংবা দ্বেষ ভুলে ইংরেজী স্কুলের শিক্ষার্থী হতে শুরু করেন সে সময়ে-

প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষায় তেমন মনোযোগী না হয়ে ইংরেজদের লক্ষ্য ছিলো মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার- এ বিষয়ে বিনয় ঘোষের বিস্তর লেখা আছে- বাংলা ভাষাভাষী জনগণের শিক্ষা ও শিক্ষার বিস্তার নিয়ে তার ঐতিহাসিক গবেষণাগুলো অমূল্য।

ইংরেজী শিক্ষা পাঠ্যক্রম এক ধরণের ইহজাগতিকতার জন্ম দিয়েছিলো- তৎকালীন পরিস্থিতিতে ন্যুনতম ইংরেজী বলতে পারার যোগ্যতায় অনেকের অর্থনৈতিক অবস্থাই রাতারাতি বদলে গিয়েছিলো, বাংলা ভাষাভাষি যুবক তরুণদের জীবনের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিলো ইংরেজদের কোম্পানীতে কেরানীগিরি- শিক্ষকতা কিংবা অন্যান্য পেশায় জীবিকা নির্বাহের চেয়ে কোম্পানির কর্মচারী হওয়াটাকে তারা অধিকতর যোগ্যতার স্মারক হিসেবে বিবেচনা করতেন-

আমাদের শিক্ষানীতি সেই একই ধরণের নীতি অনুসরণ করছে, এখানে নাগরিক তৈরির বিভিন্ন বানী দেওয়া হলেও সামাজিক মানস থেকে কেরানিগিরিই শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য এ ধারণা দুর হয় নি- কেরানীগিরিই বাঙালি যুবকের জীবনের লক্ষ্য কিন্তু উনবিংশ শতাব্দির শেষ ভাগ থেকেই এক ধরণের চাকুরি সংকট তৈরি হয়েছিলো, তখনও চাকুরির চেয়ে চাকুরিপ্রার্থীর সংখ্যা ছিলো বেশী- গ্রাজুয়েটের সংখ্যা শিক্ষা বিস্তারের সাথে সাথে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে- অর্থনৈতিক অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয় নি। এখনও চাকুরির পদের চেয়ে চাকুরি প্রার্থীর সংখ্যা অনেক অনেক বেশী -

চাকুরির পদের প্রার্থিত যোগ্যতার তুলনায় অধিকতর যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীদের সংখ্যাধিক্য একধরণের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন- কেরানিজীবিতা এবং চাকুরি সংকট সব মিলিয়ে আমাদের ডিপ্লোমাপ্রীতি বাড়িয়ে দিয়েছে।

যেহেতু চাকুরিপ্রার্থী অনেক তাই কোনো রকম বিচার-বিবেচনা ছাড়াই অনেককে পত্রপাঠ বিদায় জানাতে হবে- প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষা বিস্তার কিংবা গ্রাজুয়েটের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাছাইয়ের ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফলাফলকে অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করছে- ফলে শিক্ষার মুল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ভালো ফলাফল করা- বাবা-মাদের উদ্বেগ বেড়েছে- পরীক্ষা পদ্ধতি বদলে- সৃজনশীল অধিকসৃজনশীল প্রশ্নপত্র আবিস্কার করে অভিভাবকদের এই উদ্বেগকে উচ্ছ্বাসে বদলে দেওয়া যাবে না। পরীক্ষায় যাচাইয়ের ধরণ বদলালে তারা আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে আরও বেশী টিউশনি নির্ভর হয়ে যাবেন।

তাদের কাছে সন্তান কতটুকু জানে- কতটুকু শিখেছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ফলাফল, এই ফলাফল নির্ভরতা শিক্ষার আনন্দ থেকে বঞ্চিত করছে শিক্ষার্থীদের- শুধুমাত্র ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হওয়ায় অনেকেই শিক্ষার উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে , কল্পনাশক্তি- সৃজনশীলতা- সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাইয়ের কোনো উল্লেখযোগ্য উপায় না থাকায় ক্লাশের প্রথম দিন থেকে শিক্ষার্থীর অন্যতম লক্ষ্য থাকে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা- যেকোনো উপায়েই তারা ভালো ফলাফল করতে চায়- যদি পরিশ্রম না করে সাজেশন পাওয়া যায় তারা সাজেশন অনুসরণ করে পড়বে- কম পরিশ্রমে অধিকতর ভালো ফলাফলের লোভের সামাজিক প্রভাব নিয়ে হয়তো পরবর্তীতে কেউ গবেষণা করবে।

আমার ধারণা এই ভালো ফলাফলের লোভ- প্রতিযোগিতা বিভিন্ন ধরণের অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় দেয়- শিক্ষার্থীদের আরও বিপন্ন করে- হয়তো এখনও পরিস্থিতি তেমন হয় নি- কিন্তু ফলাফল নির্ভর পরীক্ষা ও শিক্ষাপদ্ধতির এ ধারা অব্যহত থাকলে ভবিষ্যতে স্কুলে-কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ছাত্র-ছাত্রি হিসেবে পরিচিতদের ভেতরে এক ধরণের হীনমন্যতা তৈরি হবে- তাদের ভালো ফলাফলের পেছনে অনেক ধরণের অনৈতিকতার প্রভাব আছে এমন ধারণাটা ধীরে ধীরে বদ্ধমূল হবে। সুযোগসন্ধানী, যৌনকাতর শিক্ষকদের লোভের শিকার হতে হবে ফলাফল-নির্ভর শিক্ষার্থীদের। এটা হয়তো এক ধরণের পরাজয় কিন্তু সামগ্রীক বিবেচনায় এই ফলাফল নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা কোনো সামগ্রীক নৈতিকতার জন্ম দিতে পারে নি- তেমন নৈতিক ভিত্তির অনুপস্থিতিতে আমি নিজের মাণদন্ড দিয়ে যা বললাম সেসব কথার দায় দায়িত্ব আমারই নিতে হবে।

[লেখার মাণ জঘন্য হয়েছে- সে বিষয়ে আমি অবগত, তেমন গুছিয়ে লেখা সম্ভবও ছিলো না, তিন তিন বার লোডশেডিং পেরিয়ে একটা লেখা তিন দফায় লিখলে সেটা সম্ভবও না।]

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

গৌতম's picture


১. আপনার লেখা পড়ার বড় অসুবিধা হলো (আমার কাছে) একসাথে একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা, ফলে আলোচনা করতে চাইলে অনেক কিছু নিয়ে বলতে হয়। ব্লগে এই ধরনের ইন্টারঅ্যাকশনটা আমার কাছে অসুবিধাজনক মনে হয়।

২. ইংরেজরা আমাদেরকে তৎকালীন সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, কিন্তু সেটাকে তারা এমনভাবে কাস্টমাইজ করেছে যেন আমরা কেরানী মানসিকতার বাইরে যেতে না পারি।

৩. ভালো ফল আর প্রতিযোগিতা দুটো আলাদা করে দেখা যায়। সুস্থ প্রতিযোগিতা বলে একটা শব্দ আছে- আমরা সেটার প্র্যাকটিস করছি না।

রাসেল's picture


আমার মনে হয়েছিলো এই লেখাটা শুধুমাত্র ফলাফলনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থাকে ভিত্তি করে ছিলো- অনেক রকম আগডুম-বাগডুম আছে লেখায়- এক ধরণের ঐতিহাসিক ভিত্তি দেখানোর চেষ্টাও হয়তো ছিলো - কেনো ইংরেজরা এ দেশে কেম্রিজ-ম্যানচেস্টার-লীডস অক্সফোর্ডের সমতুল্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করতে চাইলো না সেটার ব্যাখ্যা হিসেবেই সেটুকু ইতিহাস টানা হয়েছিলো-

ফলাফল নির্ভরতা-শিক্ষার আনন্দ ও আমাদের শিক্ষার ব্যর্থতা এক ধরণের ভাবনার জায়গা তৈরি করেছে- জিপিএ ৫- উচ্ছ্বাস- বিষাদ- শিক্ষাকেন্দ্রের অপ্রতুলতা- বিভিন্ন ধাঁচের বিষয় হয়তো আসতো- তবে পীড়াদায়ক মনে হয়েছে অতিরিক্ত পরনির্ভরশীলতাটুকুই- আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিত মানুষগুলো কত কম জেনেও ভালো ফলাফল করে সেটা দেখে কিছুটা বিব্রত হয়েছি-

আলোচনা ব্লগে ভালো হয়- মানে প্রতিক্রিয়া জানানোর জায়গার সীমাবদ্ধতা নাই- সময়সীমার বাধ্যবাধকতা নাই- পর্যাপ্ত সময় নিয়ে আলাদা আলাদা করে টপিক ধরে আলোচনার সুযোগ তো অন্য কোথাও নেই- মানে চায়ে চুমুক দিতে দিতে আড্ডা দেওয়ার বাইরে ব্লগেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকে-

শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার বিষয়টা আমার বোধগম্য না- গবেষণাগারে ফলাফল পাওয়ার প্রতিযোগিতাও এক ধরণের লড়াই- সুস্থ প্রতিযোগিতার সাথে শিক্ষার সম্পর্ক কিভাবে তৈরি হয়?

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


লেখাটা কঠিন হইয়া গেছে। Sad

তানবীরা's picture


সবাই সমস্যা আর কারণ লিখে কেউ সমাধানের রাসতা ভাবে না Puzzled

রাসেল's picture


সমস্যার কারণ চিহ্নিত করাটা সমস্যা সমাধানের প্রথম পথ- এখানে শিক্ষাক্ষেত্রে সমস্যার প্রধান কারণ সম্ভবত আমাদের মানসিকতা- গৌতম বলেছে সুস্থ প্রতিযোগিতার কথা- প্রতিযোগিতাও এক ধরণের ফলাফল নির্ভরতা, সমস্যার কারণ যেটা সেটা সুস্থ কিংবা অসুস্থ যেকোনো ফর্মায়ই সমস্যাই আদতে।

রাতারাতি আমাদের মানসিকতা বদলে ফেলা সম্ভব না, সবাইকেই ক্লাশে প্রথম হতে হবে এ লড়াইটা বাচ্চারা করে না, করে বাচ্চার বাবা মায়েরা- তাদের মানসিক সংকটের পেছনে হয়তো ছেলে মেয়ের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টাও কাজ করে- সেই পরিবারের কাছেও শিক্ষা মানেই আয় উপার্জন ধান্দাবাজির উপায়- সেই মানসিকতা লিখে বদলে ফেলে যাবে না। এর ভেতরে যদি শিক্ষা গবেষণার ছাত্রছাত্রীরা বেশ ফলাও করে প্রমাণ করতে পারে যেসব বাচ্চারা আনন্দের সাথে শিখে তারা ভবিষ্যতে বেশী অর্থ উপার্জন করে, তাহলে বাচ্চাদের হয়তো কিলিয়ে-পিটিয়ে- টিউশনি দিয়ে নোটস গিলিয়ে প্রথম করে তোলার পাগলামিটা কমবে।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রাসেল's picture

নিজের সম্পর্কে

আপাতত বলবার মতো কিছু নাই,