ইউজার লগইন

প্রিয়তমা কলেজ

আজকে রাতে আমি একেবারেই জড়ো পদার্থে পরিণত হয়েছি। প্রাণহীন, কি যে করি। সব ছেঁড়ে ছুঁড়ে বহুদুরে ছুটে যেতে না পারার গ্লানি আঁকড়ে ধরেছে মনটাকে। নিঃসঙ্গতা ঘিরে ধরছে। আমার পাশে কেউ নেই। এই বিশাল শুন্যতা ভাগাভাগি করলেও কি আর এমন কম হোতো?

শুন্যতা শুরু হয়েছে অনেক আগেই। যেদিন ছেলেপেলে কলেজে গেছে রি-ইউনিয়ন করতে। আর আমি যেতে পারিনি। আজকে দুপুরটায় যখন নিজের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সময় কাটাচ্ছি হলের ফুল বাগানে তখন থেকেই টের পাচ্ছি যে নিজেকে ধরে রাখতে পারছি না আর এক মুহূর্তও। কলেজের করিডোরগুলোকে ডেকে এনে পাশে বসিয়ে দেখাতে ইচ্ছে করছে আমার জানালা, মাঘের দুপুর আর বুকের ভেতরের শুন্যতা। প্যারেড গ্রাউন্ড আর একাডেমিক ভবনের সিঁড়িগুলোকে শোনাতে ইচ্ছে করছে আজ আমি কতোটা বদলে ফেলেছি নিজেকে। আর ফাইনাল পরীক্ষার ষড়যন্ত্রে আটকা পড়ে কি করে দিন কাটাচ্ছি।

আহ সেই কলেজ। কখনো বুঝিনি এতোটা ভালবাসবো সেই কলেজকে। যে কলেজকে গালমন্দ করেছি দিনের পর দিন। বছরের পর বছর। যে কলেজ কেঁড়ে নিয়েছে কৈশোরের আবেগি সময়। শিখিয়েছে কান্না চেপে রেখে আরও কঠিন হয়ে যেতে। শিখিয়েছে গান গাইতে, চিঠি আর প্রেমের কবিতা লিখতে। যে কলেজ আমার ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে রূপোলী ধারালো সব অস্ত্র।

যে কলেজে প্রতিটা মুহূর্ত কেটেছে ছুটির অপেক্ষায়। গ্রীষ্মকালীন অবকাশ। শীতকালীন অবকাশ। আরও বড় অপেক্ষা ক্লাস ট্যুয়েলভে ওঠার, কলেজ জীবন শেষ করে বেরোবার। মুহূর্ত কেটেছে একাকীত্বে,যন্ত্রণায়, সুখী দিনের ইশারায়।

কখনো বুঝিনি এতোটা বদলে ফেলব নিজেকে। আজ আমি আর ভোঁরে ঘুম ভেঙে উঠে পিটি করতে যেতে পারি না। অনেক অপরাধ করেও একটা এক্সট্রা ড্রিল খেতে পারি না। প্রিয় গানটা শুনে ছোট্ট সেই এমপিথ্রি প্লেয়ারটাকে যত্ন করে লুকিয়ে রাখতে পারি না লকারের গভীর গোপনতায়। জুতো পালিশ করতে পারি না। ফ্রন্ট রোল দিতে পারি না। স্যারদের টিজ করতে পারি না। ক্লাস টাইমে ঘুমাতে পারি না। সেবা প্রকাশনীর বইগুলোকে ভালবাসতে পারি না। রেস্টটাইমে জানালা দিয়ে দূরের প্রান্তরে তাকিয়ে থাকতে পারি না। আমি এখন শুধু রাতে জেগে থাকতেই পারি।

ক্লাস টুয়েলভের কথা অবশ্য আলাদা ছিল। তখন দিনগুলো ভালো কাটতো। বেড কভারটা মুড়ি দিয়ে সিলিং ফ্যানটাকে চালু করে দিতাম। আর কিছুদিন পরই মুক্তি। তারপর হাসির আলো খেলবে চারদিকে, আর শব্দগুলোও নিজেদের মানে বদলিয়ে ফেলবে। জীবনটা ফুরফুরে হয়ে যাবে রাতারাতি। এসব রঙিন ভাবনায় রেস্ট টাইম ফুরুৎ করে উড়ে যেত।

অথবা ক্লাস এইটের কথা। যেবার আমি প্রথম প্রেম করেছিলাম। প্রেমিকার মুখটা বুকের ভিতরে বাঁধাই করে রেখে খুঁজে পেতাম ভয় আর কষ্ট জয় করবার সেই জাদুকরী শক্তি। এক টার্মে দু’দুটো চিঠি পেয়েছিলাম প্রিয়তমার হাতের লেখায়। আহ, কত বার পরশ বুলোতাম তাতে, গন্ধ শুঁকে আলতো করে বুকে চেপে ধরতাম লাইটস অফ হলে পরে। টেলিফোন-টেলিগ্রাম নেই, ডাকপিয়ন নেই। থাকতে না পেরে সেই প্রথম মনে হয় কবিতায় আশ্রয় খুঁজেছিলাম।

সেই সময়ের সঙ্গি সাথীরাও ছিল দুর্দান্ত। জয় আর নাফসিনের সাথে আমার ইঞ্জিনিয়ারিংটা বেশ জমত। মাঝে মাঝে জামিলটাকে কি যে অসহ্য মনে হত তা আর কি বলবো। আমার ধারণা ছিল জামিলের মত বদ রুমমেট আর হয় না। কিন্তু ওকেই একটু আগে ফোন করেছি। বলেছি দোস্ত, আমার মজাটা তুইই করে নে। নাফসিন, হোসেন, সাইদু’রা এই মাত্র পাগলা পানি পান করে ফুটবল গ্রাউন্ডের দিকে এগোলো- যেখানে এখন কনসার্টের জোয়ার আর একটু পরেই ডিজে পার্টির উচ্ছ্বাস শুরু হবে। এসব কিছুই নাকি ইন্টারনেটে লাইভ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু আমার সেরকম গতির নেট নেই, থাকলেও দেখতাম কি না কি জানি। মাঘের এই রাতে মহানগরীর আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বাজ পড়ার শব্দে কেঁপে উঠছে আমার জানালা। ভরসা শুধু কয়েকফোঁটা বৃষ্টি আর শেষ সিগারেটটা। আহ প্রিয়তমা কলেজ, তোমাকে আমি কি করে লাইভে দেখি?

সে সব ঘৃণা ভালবাসার সাথীরা ঢাবি-জাবি-খুবি, বুয়েট-কুয়েট, মেডিকেল, মেরিন-আর্মি-নেভি ইত্যাদি যায়গায় নিজেদের তাঁবু গেড়েছে। অনেকের সাথে দেখা হয়, অনেকের সাথে হয় না। আমিও একটা যায়গায় আটকা পড়ে আছি। বয়স বাড়ছে, হারিয়ে যাচ্ছে তরতাজা সময়। মাঘের দমকা হাওয়ায় মনে পড়ছে কৈশোর। বেহালার সুরটা শুধু জন্ম দিচ্ছে বিষাদের। এই বিষাদকে আমি কিসের সাথে তুলনা করবো? প্রেমিকা হারানোর সাথে? নাকি অনুশোচনার সাথে?

আমিও কি জামিলের মত পরীক্ষা বাদ দিয়ে যেতে পারতাম না? অথবা রি-ইউনিয়ন থেকে এসে কোনও প্রস্তুতি ছাড়া পরীক্ষার হলে ঢুকতে পারতাম না? হয়ত পারতাম। তবে কেন গেলাম না? ভীষণ বিষাদগ্রস্ত হয়ে থেকে এই দুই দিনে একটা অঙ্কও হয়নি করা, একটা পৃষ্ঠাও হয়নি পড়া। আমার আসলে কোনও মানসিক বিকার টিকার হয়ে গেছে কি না কে জানে? কি হবে আগামীর? কলেজের লাইব্রেরীটা নিশ্চয়ই এসবের উত্তর দিতে পারবে।

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


চমত্‍কার নস্টালজিক লেখা..ভালো লাগলো অনেক।

নিয়োনেট's picture


আমাদের সবারই নিশ্চয়ই এরকম ঘটনা ঘটেছে জীবনের কোন এক সময়ে। আমার জীবনের এই অধ্যায়টা এতদিন ছিল একেবারেই গোপনে। আজ আর রাখতে পারলাম না। সঞ্জিব'দার কথাই মেনে নিলাম, আসলে ধরে রাখার কিছু নাই।

ব্লগ পড়ার জন্য অহেতুক ধন্যবাদ দিয়ে আর কি হবে। এতরাতে বিষণ্ণ বাউন্ডুলেকে 'নস্টালজিক' করা গেছে এইটুকু বাড়তি পাওয়া আমার। ভালো থাকুন। বন্ধুদের ভালো রাখুন। Smile

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


সেই চেষ্টাই আপাত পথচলার পাথেয়.. Smile

চাঙ্কু's picture


গেলেই পারতেন !! আমার মন খারাপ হলে মাঝে মাঝে স্কুল জীবনের বাঁদরামির স্মৃতিগুলোকে রিকল করি Smile

নিয়োনেট's picture


স্বীকার করছি-এই না যেতে পারাটা আমারই আরেকটা ব্যর্থতা। তবে সেই জীবনের স্মৃতিগুলিই মনে হয় বেঁচে থাকার রসদ হিসেবে কাজ করেছে আমাদের হা হুতাশের অন্তরালে। আপনিও লিখুন সেসব দুপুরের কথা। পড়তে পারলে ভালো লাগবে খুউব। Smile

চাঙ্কু's picture


আমারে লেখতে কন? তাইলে কয়েক ডজন কী-বোর্ড কিনা লাগবে Tongue

নিয়োনেট's picture


হ। কি-বোর্ড নিয়া চিন্তা কইরেন না। আমরাতো আছি! Smile

চাঙ্কু's picture


আপনি যখন কইতাছেন, দেখি কয়েক ডজন কী-বোর্ড কিনে লেখা শুরু করব Smile

নিয়োনেট's picture


জ্বি হা ভাইসাহেব, আপনাকে লেখা শুরু করতে হবে! কি বোর্ড কিনতে আলসেমি লাগলে আমারে কন -একেবারে বাসায় পউছায়ে দিব। Steve

১০

রৌদ চশমা's picture


ফিরে গেলাম সেই দিনগুলোতে। নস্টালজিক

১১

নিয়োনেট's picture


লিখে ফেলুন না... Smile

১২

sam's picture


বরিশাল ক্যাডেট কলেজ নাকি?

১৩

কামরুল হাসান রাজন's picture


কোন ব্যাচ ভাই? বিসিসি মনে হচ্ছে? আমি এফসিসি ... ৯৬-০২ Smile

১৪

নিয়োনেট's picture


২৭ তম ইনটেক। আপনারে পাইয়া ভাল্লাগলো। কয়দিন আগেই মনে হয় আপনাদের রি-ইউনিয়ন হইয়া গেল। গেসিলেন তো?

১৫

আরাফাত শান্ত's picture


নেভী স্কুলে পড়ার দরুন ক্যাডেট কলেজের বন্ধু ছিল আমাদের নেহায়েত সংখ্যায় কম না, ছুটিতে এসে তাঁরা শুধু কলেজের গল্পই করতো। বোরিং লাগতো। এখন বুঝি আসলে মানুষের গল্প খুব বেশী না।

১৬

নিয়োনেট's picture


ঠিক কইসেন। আমারও গল্প বেশি একটা নাই। যে দুই তিনটা গল্প আছে তার ভিতর থেকে একটা তো বলেই ফেললাম। বাকিগুলা বলার মত না।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিয়োনেট's picture

নিজের সম্পর্কে

অতীতের ভিত্তিতে নিজেকে ডিফাইন করা অর্থহীন। আর আগামীও অদেখা। বর্তমানে আমি কী সেটা যদি এখন বলি, সেই তথ্য খানিক সময় পরে ইনভ্যালিড হয়ে যাবে, যেহেতু মানুষ প্রতি সেকেন্ডে বদলায়। ফলে, নিজের সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলাটা কঠিন কাজ।