ইউজার লগইন

শর্মি'এর ব্লগ

ঈশ্বরবাবু আসছেন...

নাটকটা শুরু হয় একস্তুপ জঞ্জালের পাশে বসা দু’জন ভবঘুরের আলাপে-- ভ্লাদিমির ও এস্ট্রাগন। তারা প্রতিদিন এসে বসেন এক মরা গাছের নিচে, বসে অপেক্ষা করেন ঈশ্বরবাবু (Godot) নামক এক ভদ্রলোকের জন্য। তিনি আসবেন তা নিশ্চিত; কিন্তু আসলে কি হবে, কি বলবেন তিনি, কি পাবে দুই ভবঘুরে-- জানা নাই কারও। তারা দিনের পর দিন কাটিয়ে দেন জঞ্জালের পাশে অপেক্ষায় দিনগুনে। তারা নিজেদের মাঝে ঝগড়াঝাটি করে, একে অন্যকে গালাগালি দিয়ে যায়, ছেড়ে যায় একে অন্যকে, কিন্তু পরক্ষনেই আবার মিটমাট। সেখানেই তারা হাসে, কাঁদে, গান গায়, প্রাতঃকৃত্য সারে। খালি মাঝে মাঝে একজন বলে উঠে, “ধুর বাল, চল গলায় দড়ি দেই এরচেয়ে।” অন্যজন তৎক্ষণাৎ মনে করিয়ে দেয়, “তবে ঈশ্বরবাবু যে আসছেন...।” "ও হ্যাঁ হ্যাঁ। অপেক্ষা করতে তো হবে”- বলে আবার শুরু হয় তাদের কালক্ষেপন।

অপহৃত উৎসব বিষয়ক কিছু কথা

১. দূর্গাপুজা ও কোরবানির ঈদ চলে গেল হাত ধরাধরি করে। মাতৃরুপেনু সংস্থিতা দেবী দূর্গা সপরিবারে পিত্রালয়ে নাইওর এসে এবারো দমন করলেন অশুভশক্তির প্রতীক দেবদ্রোহী মহিষাসুরকে। মৃত্যুর কিছুকাল পূর্বে নিজের মৃত্যুদৃশ্য স্বপ্নে দেখে ভীত মহিষাসুর ভদ্রকালীকে তুষ্ট করেছিলেন। ভদ্রকালী তাঁকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি না দিলেও তাঁর ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে বরদান করতে ইচ্ছুক হন। মহিষাসুর দেবতাদের যজ্ঞভাগ বর চাইলে দেবী সেই বর দিতে অস্বীকৃত হন; কিন্তু মহিষাসুরকে এই বর দেন যে যেখানেই দেবী পূজিতা হবেন, সেখানেই তাঁর চরণতলে মহিষাসুরেরও স্থান হবে। মায়ের গৃহে সকলেরই ঠাঁই আছে।

ভেবে দেখলে, কোরবানির ঈদ ও দুর্গাপুজার দর্শন প্রায় একই। এই ঈদ মূলত পশু কোরবানি অর্থাৎ প্রতীকী অর্থে অশুভ’কে নিধন করা, এবং আল্লাহর নেয়ামত সমাজের বঞ্ছিতদের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য পালন হয়। গরীব ধনী সকলের স্থান আছে ঈশ্বরের ঘরে, সবাইকে শামিল করতে পারলে তবেই না যথার্থ উৎসব।

সেই ফুলের দল...

এই মুহুর্তে আমি যে ঘরটায় থাকি তাতে একটা জানলা। সেটা দিয়ে বেশ দূরে হাইওয়ে দেখা যায়। সেখান দিয়ে দিনরাত বিরামহীন হুস হুস করে চকচকে গাড়ি যায়, বিশাল বিশাল ট্রাক যায়, বাস যায়, পিকাপ যায়। আমি বড় একটা হোটেলের ছোট্ট জানালায় একা দাঁড়িয়ে গাড়ি দেখতে থাকি।

জানালায় দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম প্রিয় মানুষের মৃত্যু নিয়ে।

গত সপ্তাহে খবর পেলাম প্রিয় লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের লেখক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছে । ডিমেনশিয়া আক্রান্ত এই লেখক আর লিখতে পারবেন না বলে ঘোষনা দিয়েছে তার ভাই। আমরা আর হাতে পাবোনা সহজ সরল ভাষায় লেখা এক জাদুবাস্তবের ল্যাটিন আমেরিকা।

ওড টু মাই ফ্যামিলিঃ ৭

গতসপ্তাহে পর পর দুই রাত ধরে আমাদের এলাকায় টর্নেডো এলার্ট ছিল।

প্রতি সপ্তাহান্তেই আমেরিকায় আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। কাজের শেষে সবাই পরিবার নিয়ে পার্কে যায়, ঘন্টার পর ঘন্টা কাটায় প্রিয় রেঁস্তোরায়, ছাত্র ছাত্রীরা সেজে-গুজে পাড়ার বারে গিয়ে আড্ডা মারে, ভাগ্য ভালো হলে কারো কারো একটা ডেট ও জুটে যায়। মোটের উপরে সারা সপ্তাহ কলুর বলদের মত খাটার পর দুইদিন চুটায়ে উপভোগ করতে চায় সবাই। এ বিষয়ে একটা জনপ্রিয় বচনও আছে, Thank God, it’s Friday। ফলে শুক্রবার আসলেই সবার মন ভাল হয়ে উঠতে থাকে, অফিসের কিউবিকলগুলিতে শুরু হয় মোটাদাগের ঠাট্টা-তামাশা, কিভাবে কোথায় ছুটির সময় কাটানো হবে তার পরিকল্পনা। এই সুযোগে ব্যস্ত হয়ে উঠে দোকানপাট। পুঁজিবাদের এই পূন্যভুমিতে “আল্লায় বাঁচাইলো আইজ শুক্রবার” নিয়ে ব্যবসা হয় হরহামেশা। একটা খাবারের দোকানের নামই হলো T.G.I.F. বা Thank God, It’s Friday. মানুষের মুখে শুনেছি, শুক্র-শনি-রবি এই তিন দিন এই দোকানে নাকি সেরকম ক্রেতা সমাগম হয় ।

আগুনের পুরাণকাহিনী

কিছুদিন আগে একটা বই পেলাম-- আদিবাসী আমেরিকানদের পবিত্র গল্প (Native American Stories of the Sacred)। লোককাহিনী/রূপকথা/ধর্মকথা আমার আগ্রহের জায়গা। তাই অনেক কাজের চাপের মধ্যেও সময় পেলেই চট করে একটা গল্প পড়ে নেই। আমাদের দেশের প্রাচীন লোককাহিনীগুলোর মত এগুলোও বিনোদনের সাথে সাথে গভীর উপলব্ধির তৈরী করে। সহজিয়া কথক ঢংয়ে বলা গল্পগুলোর মধ্যে দিয়ে পাওয়া যায় সামাজিক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ন প্রমান। “পৃথিবী কিভাবে তৈরী হলো”, “প্রথম আগুন” বা এজাতীয় অন্য গল্পগুলো শুধুমাত্র তাদের সামাজিক জীবন বা চিন্তাধারাই ব্যাখা করেনা সাথে সাথে তুলে ধরে নেটিভ আমেরিকানদের বিশ্বাসের একটি বিশেষ দিক, যাতে প্রকৃতি, মানব, ঈশ্বর, পশুপাখি সবাই একে অপরের পরিপূরক, সবাই পবিত্র আত্মার অংশ।

ওড টু মাই ফ্যামিলিঃ ৬ (খালাতো/ ফুপাতো/ চাচাতো/মামাতো )

আমার বড়লোক বন্ধুটি খালি তুতো ভাইবইনের গল্প করতে চান। আজ এ মামাতো বিদেশ হইতে আসলো, তো কাইল সে খালাতো গিফট পাঠাইলো, পরশু আবার আরেক চাচতো বিয়া সান্ধাইল, বা বিয়া ভাংলো, ইত্যাদি ইত্যাদি। মোটকথা চরম বিরক্তিকর। সে ফোন দিলেই আমি আর দুস্ত ত্রাহি ত্রাহি কইরা দ্বিগবিদিক দৌড়াইয়ে পালাইতে চাই। লাভ হয়না। ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম নিমেষে পাড়ি দিয়ে তুতোময় বন্ধু ঠিক আমাদের ধরে ফেলে। এরপর চরদখলের মত তুতোআলাপি বন্ধু কলকল করে দখল করতে থাকে আমাদের সময়। আমরা গোমড়া মুখে বসে থাকি, শুনতে শুনতে কানের অবস্থা যায়যায় প্রায়। তাই একদিন উনারে বললাম আচ্ছা, আপনার খালাতো মামাতোদের গল্প তো শুনলাম, আসেন এবার আমারগুলা বলি।

-“শিওর, শিওর, হাউ নাইস!! আমার না কাজিনদের গল্প শুনতে এত্ত মজা লাগে, চিন্তার বাইরে।”

-কন কি? আমি তো কাজিনদের দুইচক্ষে দেখতে পারিনা।

সিসিমপুরের অন্যদিক/ ওড টু মাই ফ্যামিলি -৫

[২৯ নভেম্বর ২০১১ তে প্রকাশিত জনপ্রিয় ব্লগার একজন মায়াবতী'র আমার সিসিমপুর-২ এ মন্তব্য হিসাবে লেখাটা শুরু করেছিলাম। একটু বেশি বড় হয়ে যাচ্ছিলো, বিধায় ব্লগ হিসাবে পোস্ট দিলাম। রেফারেন্সের জন্য লেখাটি পড়ে নিন। ]

তৃতীয় গল্পটি পড়ে শুধু মন খারাপ হলোনা, বরং কিছুটা হতাশ হলাম।

গরীব একজন আমার বাড়িতে কাজ করে বলেই তার আনন্দ-বেদনা নিয়ে হাসাহাসি করাটা আমার কাছে অস্বস্তিকর, বিশেষত যখন তাদের নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটির ব্যবস্থা নাই, বিনোদনের সুযোগ সীমিত, সঙ্গত কারনে ঘর থেকে বের হওয়া নিয়ন্ত্রিত, এবং তাদের নতুন বন্ধু তৈরী ও মতামত বিনিময় করার সুযোগ প্রায় নাই বললেই চলে। খেয়াল করে দেখবেন, এর প্রতিটি খুব সাধারন মানবিক চাহিদা। ওগুলো পূরনের উদ্দেশ্যেই আপনি বা আমি এখন ইন্টারনেটের দ্বারস্থ।

ক্যালিফোর্নিয়া

ক্যালিফোর্নিয়া হলো আমেরিকানদের স্বপ্নের রাজ্য।

ক্যাফেকথন

আমি সাধারনত চকচকে-ঝকঝকে জায়গা একটু এড়িয়ে চলি। বড়লোক, মিডিয়া পার্সোনালিটি, সমাজ সংস্কারক, আর্ট-সমালোচক, সংস্কৃতি-বোদ্ধা, সুন্দরী সোসালাইট—এই গ্রুপের লোকজন দেখলে আমার কেন জানি একটা টেনশন তৈরী হতে থাকে। তাদের নানারকম ভাঁজের আলাপ শুনতে শুনতে এক পর্যায়ে সেটা পরিনত হয় হীনমন্যতায়। যতক্ষন তাঁরা সামনে থাকেন আমার মনে অদ্ভুত সব চিন্তা ঘুরতে থাকে (আচ্ছা, আজ কি চুলে শ্যাম্পু করেছিলাম?/ মুনীর চৌধুরী যেন শেষ কোন নাটক লিখেছিলেন?/ বামদলগুলো কি আবার দেশ গেলো, দেশ গেলো রব তুলেছে?/ পিকাসো’র ব্লু-পিরিয়ডের ত্বাত্তিক মাহাত্ব্য নিয়ে সবাই এত চিন্তিত কেন?/ নাহ, এবার বুনুয়েলের ছবিগুলো দেখতেই হবে)। মোটের উপরে, আমি কি কি জানিনা, কি কি বুঝিনা, কি কি দেখিনাই, কি কি করিনাই—জীবনের সেই সবগুলো ব্যার্থতাগুলোকে জোর করে ইনারা আমার ঘাড়ে সিন্দাবাদের বুড়োর মত চাপিয়ে দ্যান। আমি হাঁসফাঁস করতে থাকি দিনের পর দিন। বন্ধ

ওড টু মাই ফ্যামিলি-৪

নিজের বাড়ির লোকগুলোই কি শুধু আপন? ভাবছি গত ২-৩ দিন ধরে।

আমি সেই অসম্ভবকেই চাই

castillo.jpg

হ্যাঁ, আমি সেই অসম্ভবকে চাইঃ আমাকেই ভালোবাসো চিরদিন
ভালবাসো যখন সকল কামনা ফুরিয়ে যায়
ভালবাসো সেই তপস্বীর একাগ্রতায়।
যখন পৃথিবী, তার সবকিছু, তোমার সকল পবিত্রতা
একসাথে নিষেধ করতে থাকে তোমায়ঃ বেশীই ভালবাসো, তারপরও।
যখন এক বেনামী রাগ অন্ধ করে দেয় তোমাকেঃ আমাকেই ভালবাসো।
যখন ঘর থেকে কাজের দিকে প্রতিটি পা ক্লান্ত করে তোমাকেঃ আমাকে ভালবাসো ।
আর যখন কাজের শেষে ঘরে ফেরোঃ আমাকে ভালবাস, আমাকেই।

আমাকে ভালবাসো যখন তুমি নিস্পৃহ।
যখন আগের নারীর চেয়ে বেশী আকর্ষনীয় প্রতিটি রমনীর রূপ,
অথবা বেশী দুঃখী, আমাকেই ভালবাস যেমনটি বেসেছ আগেঃ
না, চাটুকার বা বিচারকের মত নয়
বরং সেই স্নেহে যা রেখেছ একান্ত নিজের জন্য।
ভালবাসো নিজস্ব একাকীত্বের মত, মৃত্যুচিন্তার মত।

খুব সকালের স্বপ্নেরা

সকাল সকাল এক স্বপ্নের করাঘাতে
দরজা খুলে দেখি--
সীমান্ত পেরিয়ে কতিপয় অতিথি এসেছেন।
চোখে তাদের ভারী বিষন্নতা, চেহারা মলিন
পা ধুয়ে দিলাম, হাত ধোবার জল দিলাম, উঠানে আসন পেতে দিলাম
তন্দুরের পাশে বসে সেঁকে দিলাম কিছু মোটা রুটি।
পুটলিতে করে অতিথিরা গত বছরের ফসলের গূড় এনেছিলেন।

যখন চোখ খুললাম, ঘরে কেউ ছিল না,
তন্দুরে হাত দিয়ে দেখলাম সেটা এখন ও নিভে যায়নি,
আর আমার মুখে মিষ্টি গূড়ের চটচটে স্বাদ যেন এখন ও লেগে আছে।

স্বপ্ন ছিল হয়তো।
স্বপ্নই হবে।

সীমান্তের ওপারে শুনেছি কাল রাতে গুলি চলেছে।
সীমান্তের ওপারে শুনেছি কাল রাতে কতিপয় স্বপ্নকে হত্যা করা হয়েছে।

------------------------------------------------------------------------------

সূর্যরাঙ্গা পরানপুর

আমার এক বন্ধু আছেন নিউ ইয়র্কে থাকেন-- স্বভাবে মধ্যবিত্ত, অভাবে গল্পকার, কিভাবে কিভাবে যেন ফিল্ম পরিচালকও। সবচেয়ে বড় পরিচয় তার, সে হইলো ব্যাপক আড্ডাবাজ। আগে প্রায় দেখা সাক্ষাত হইতো এখন দূরে থাকি বিধায় ফোনে কথা হয় মাঝেসাঝে। উনি সুযোগ পাইলে পচানি দিতে ছাড়েন না আমাকে, "শুনেন শুনেন... কেবল তো আইসেন, ৫ বছর কাটুক ঢাকার নামটাও মুখে নিবেন না। কি নাই এই শহরে। ঢাকার জন্য কান্দেন ক্যান। আপনি হইবেন বিশ্বনাগরিক, ঢাকা ঢাকা করলে চলবো?"

সন্তভাবনা

duarte.jpg

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের যে কয়টা গল্প বার বার মনে হয় তার মধ্যে "সন্ত" (The Saint) অন্যতম। গল্পটি কলম্বিয়ার এক গন্ডগ্রাম টলিমা থেকে আসা এক পিতা-মারগারিতো দুয়ার্তের- দাবীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে; যে তার কন্যার শবদেহ নিয়ে ২২ বছর ঘুরে বেড়ায় ভ্যাটিকানের পথে পথে, দাবি একটাই তার কন্যাকে সন্ত মনোনীত করা হোক।

ওড টু মাই ফ্যামিলি- ৩

আমার ছোট বোনটি বড্ড ভালো মানুষ। সকালে উঠে মর্নিং ওয়াক করেন, বাবা-মাকে সঙ্গ দেন, বাড়ির অন্যদের দেখাশুনা করেন, কাজের ফাঁকে ধ্রুপদী ভারতীয় নাচের তালিম নেন, আর সঙ্গে ঢাকায় একটা বিদেশী দূতাবাসে বিরাট অঙ্কের চাকরি করেন। সিরিয়াস মানুষ বলেই মনেহয় কমেডি ঘটনাগুলো ওর কপালেই ঘটে। কাল সকালে ফোন করেছে আমাকে, উদ্বিগ্ন গলায় বললো, জানিস কাল কি হইসে? আমি নিশ্চিত তেমন সিরিয়াস কিছুনা। বললাম কি হইসে? আধাঘন্টাব্যাপী ঘূর্নিঝড় উঠলো ঢাকা-আমেরিকা ফোন লাইনে। আমার মনে পড়ে গেলো অন্য একগল্প।