ছোট চাচা (প্রথম পর্ব) নামটা এখনও ঠিক করতে পারিনি।
ছোট চাচা (প্রথম পর্ব) নামটা এখনও ঠিক করতে পারিনি।
আমার ছোট চাচা অত্যন্ত পরহেজগার মানুষ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, কোরান পড়া ,তাহাজ্জুতের নামাজ পড়া সহ যত রকমের ইবাদত করার সবই করেন। দিন বা রাতে কখন ঊনি নিদ্রা যেতেন তা শুধু তিনি ও আল্লাহ তায়লাই জানতেন। এগার কি বার বছর বয়সেই উনি পবিত্র কোরানে হাফেজ হলে একটি বিখ্যাত মাদ্রাসায় হাদিস বিশারত হবার জন্য দাদাজান ভৃর্তি করে দেন। ছোট চাচা দেখতে অত্যন্ত সুন্দর ও মেধাবী ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। অল্প বয়সেই উনি একজন পরহেজগার মানূষ হিসেবে অত্র এলাকায় বেশ সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
আমাদের বাড়ীর দক্ষিন দিকে বড় চাচার বাড়ী। প্রথমে একই বাড়ী ছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারনে বাড়ী আলাদা করা হয়েছে। দুই বাড়ীর মাঝখানে একটি বাগান আছে যাতে এমন কোন ফলের গাছ নেই যা নেই তবে সুপারি ও তালের গাছ সবচেয়ে বেশি। এই বাগান ও বাড়ির সামনের দিকে( পূর্ব দিক দিয়ে) রাস্তা উত্তর দক্ষিন চলে গেছে। তার পরও দুই বাড়িতে শটকাট মারার জন্য বাগানের মাঝ দিয়ে একটি রাস্তা আছে। বাগানের পশ্চিম দিকে পারিবারিক গোরস্থান। গোরস্থান লাগোয়া মসজিদ। তার উত্তর দিকে বিশাল বাঁশ ঝাড়, তারপর পশ্চিম দিকে আব্বার চাচাত ভাইদের বাড়ী।
বাড়ীর পূর্ব দিকে অনেক দূর পর্যন্ত ফাঁকা আবাদী জমি। প্রায় সবই আমাদের ও চাচাদের। তার পর বিশাল জঙ্গল। আর এ জঙ্গল বৃক্ষ লতায় এতই ঘন ছিল যে দিনের বেলায়ও সূর্যি মামার আলোচ্ছটা কদাচিৎ ভিতরে প্রবেশ করার আবশ্যক মনে করত।দিনের বেলাতেও তাই জঙ্গলের কাছে যেতে ভয় লাগত। জঙ্গলের পুর্ব দিকে নদী নয় সাগরও নয় তবু বিশাল এলাকা জুড়ে এক সুবিশাল জলরাশির আঁধার, আর তারই পূর্ব উত্তর কোনে অত্র এলাকার চিতাশাল বা শ্মশান ঘাট। শ্মশান
দাদা মারা যাবার পর ছোট চাচা আমাদের সাথে থাকতেন। চাচা অনেক দিন হল মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে এসেছেন কিন্তু আর যাচ্ছেন না, আব্বা কিছু জিজ্ঞেস করলে যাব যাচ্ছি এমন উত্তর দেন। কিন্তু যান না। তবে এবার চাচা যেন কেমন হয়ে গেছেন। কারও সাথে তেমন কথা বলেন না। সারাদিন মসজিদে পড়ে থাকেন আর কি যেন ভাবেন। দাদি ও মা কারন জানার অনেক চেষ্টা করেও সফল হতে পারেন নি।
প্রতিদিনের অভ্যাস মত চাচা তাহাজ্জত নামাজ পড়তে ঊঠেছেন। সেদিন ভিতর বাড়ির টিউব ওয়েলটা খারাপ ছিল । চাচা তাহাজ্জুতের নামাজ পড়ার আগে গোসল করতেন। তাই বাধ্য হয়ে বাহির বাড়ীর টিউব ওয়েলে গোসল করার জন্য গেট খুলে বাইরে বেড়িয়ে এলেন। এত গাছ গাছালি ও বাঁশঝাড় থাকার কারনে রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে হঠা কোন পাখির ডাক,বাতাসে দোল খাওয়া দুই বাঁশের ঘর্ষনে ক্যাঁ ক্যু শব্দ, তাল গাছের সুকনা পাতায় বায়ু প্রবাহের কারনে কড় কড়, মড় মড় শব্দ, বা বিশাল উচু আম, বা কাঠাল ও শিমুল গাছের ডালে নিশাচর পাখিদের দাপাদাপি কেমন জানি গা ছমছম করা একটা ভাব লেগে থাকত।
টিউব ওয়েলটা ছিল হাজারি কাঠাল গাছের নীচে। হাজারি গাছ নাম হবার কারন ছিল এ গাছে এতই কাঠাল ধরত (অবশ্য বেশী বড় কাঁঠাল নয়) যে মৌসুমের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এ গাছে কাঁঠাল থাকত। আমি যতদিন গ্রামে ছিলাম অনেক বার গাছে বসেই প্রমান সাইজের কত কাঁঠালের সৎকার করেছি হিসেব করে বলা অসাধ্য। এ গাছটি সর্বদা পত্র পল্লবে ভরা থাকত। চাচা গোসল করার জন্য টিউব ওয়েলের কাছে আসার সাথে সাথেই নাই বাতাসে কোত্থেকে যেন বাতাস বইতে লাগল। বাঁশ ঝাড় হতে ক্যাঁ ক্যু শব্দ,তাল গাছের পাতার কড় কড়,মড় মড়,আর ঊচু সুপারি শিমুল, আম কাঠালের গাছ হতে পাখিদের দাপাদাপি গা ছম ছম করা পরিবেশকে যেন এক ভুতুরে পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। আজকের এ পরিবেশটা ভয়ভীতি হীন চাচার কাছেও কেন জানি একটু অন্য রকম লাগল। একটু ইতস্তত বোধ জন্মালেও দোয়া ইঊনুস পড়ে চাচা টিউব ওয়েলের হাতলে হাত রাখলেন। হঠাৎ চাচার কানে ষাড়ের উচ্চ হাম্বা রব কোথা থেকে যেন ভেসে এল। চাচা পুর্ব দিকে তাকাতেই আবছা আলো আঁধারিতে দেখেলন বড় চাচার দৌড়ের ষাড় আমাদের ক্ষেতের ধান একাধারে খেয়ে যাচ্ছে।চাচা রাখালদের মনে মনে গোষ্টি উদ্ধার করে কাঊকে না ডেকে নিজেই চললেন ষাঁড়টাকে ধরে আনার জন্য। চাঁদ মামার তখন যাবার সময় সমাগত। তাই আলোর স্বল্পতায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না। তবে ষাড়টির দিকে চাচা যতই এগিয়ে যাচ্ছেন ষাড়টিও যেন ততই চাচার কাছ থেকে দূরে সরে যাছেন। চাচা এটাকে স্বাভাবিক হিসেবে মনে করে ষাঁড়ের পিছন পিছন যেতে লাগলেন। ষাড় জমিতে ধান খেতে খেতে যাচ্ছে আর চাচা কখনও ধান ক্ষেত বা আল ধরে ধরে ষাড়ের পিছু পিছু যাচ্চেন। এবার জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাবার সময় চাচার মনে হল যে জঙ্গলের ভিতর সব জানোয়ারের মাঝে যেন রায়ট লেগে গেছে। কেউ উচ্চ শব্দ করছে কেউ বা হাউমাউ করে কাঁদছে। একবার মনে হল বড় বড় গাছ গুলো হুমড়ি খেয়ে যেন এক সাথে সেজদায় লুটিয়ে পড়েছে।
যার মনে যা ফালদে উঠে তা।
চাচা পরহেজগার মানুষ উনার অন্তরে সর্বদা আল্লাহর জিকির লেগেই থাকে।
ওয়ান নাজমু ওয়া্স সাজারু ইয়াছজুদান (সুরা রহমান)
অর্থঃ নক্ষত্র ও বৃক্ষ সমূহ সেজদারত আছে।
চাচা ভাবলেন বৃক্ষলতাদি হয়ত আল্লাহর ধ্যানে সেজদারত আছেন। তাই তিনি পরম করুণাময়ের প্রতি তাঁর মাহিমার সানে নিজেও মনে মনে একবার সেজদাবন্ত হইলেন।
ইতি মধ্যে কখন যে চাচা সাগর তীরে শ্মশান ঘাটে এসে পৌঁছলেন খেয়াল করতে পারেন নি। শ্বসান ঘাটে একটা বিশাল বড় বটগাছ ছিল। আলো আধারিতে মনে হচ্ছে বট গাছের ডালে কঙ্কাল, হাড় গোড়, মাথার খুলি ইত্যাদি আপন খেলায় মত্ত। বিশাল জলরাশির মাঝে ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকাগুলোতে জনমানবের চিহ্ন নেই কিন্তু কেমন জানি এমনিতে নৌকাগুলো ঘোরপাক খেলায় মত্ত। চাচা তো একেবারে থ। কোথা থেকে আমি কোথায় চলে এলাম।
আর ধানের ক্ষেত খাওয়া ষাঁড়টিই বা হঠাৎ কোথায় হাঁড়িয়ে গেল। চাচা যেন কিছুটা নিজের স্তম্ভিত ফিরে পেলেন। মনে হয় কিছু একটা ভুল হয়েছে। চাচা দোয়া ইঊনুস ও আয়াতুল কুরছি পড়তে পড়তে ফিরে আসার উদ্দেশ্যে যেই ঘুরে দাঁড়ালেন। পিছন থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর, শামছুল কোথায় যাচ্ছিস। আমি তোকে খোজে পাবার জন্য কত জায়গায় খুজেছি। এমন কোন জেলা, থানা, গ্রাম মহল্লা নেই যে তোকে আমি খুজিনি। তুই তো জানিস আমি তোকে ছাড়া আর কাউকে আমার রুমে জায়গনা দিতাম না। তুই আমার কত প্রিয় তা শুধু আমি জানি।আমার সাথে চল বন্ধু।
কথাগুলো চাচার কানে যেন সিসার মত বিঁধছিল। শরীর শীতল হতে শীতল হচ্ছিল। চাচা কথাগুলো কানে শুনছিলেন আর জোড় কদমে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। এসব ব্যপারে কখনও পিছন দিকে তাকাতে নেই এ কথাটা কার কাছে শুনেছিলেন মনে নেই কিন্তু কথাটা ঠিক মনে আছে।
চাচা জোড় কদমে হাটতে হাটতে এবার হালকা দৌড় লাগালেন। দৌড়াতে গিয়ে মনে হল একটি বড় সাইজের কোলা ব্যাঙ চাচার পায়ে বাড়ি খেয়ে দূরে ছিটকে পড়ল। আর কেমন জানি মানুষের মত আঘাত পাওয়ায় কুকড়ে ঊঠার মত শব্দ করল। চাচার তাতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি এবার দোয়া পড়তে পড়তে ম্যারাথন দৌড় দিলেন। জঙ্গলের পাশ দিয়ে দৌড়ানোর সময় মনে হল একটি বিশাল গাছ রাস্তার মাঝে পড়ে আছে। চাচা গাছকে না ডিঙ্গিয়ে পাশ কেটে চলে এলেন। পিছনে শব্দ হল, ইস তাও পারলাম না। এই দৌড়ের মাঝেও চাচা একবার খেয়াল করলেন ধানের জমির কোথাও একটি ধানের চারা খাওয়ার চিহ্নও নেই। এবার চাচার যেন রক্তও ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগল। তারপরও যেন প্রাণপণ দৌড়াচ্ছেন। হঠাৎ মসজিদ হতে আজানের ধ্বনি শুনতে পেলেন। কিন্তু চাচাও ততক্ষণে বাড়ীর মেইন গেটে পৌছে গেছেন, আর গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে বড় ভাইয়াকে ডাক দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেটের কাছে পড়ে গেলেন। (চলবে)
মনটা যখন বিষাদে ভরা, তখন একটু ভিন্ন স্বাদের আস্বাদনের আশায় আমার এ প্রয়াস জানিনা ভাল লাগবে কি না।





চলুক..
ইনশাল্লাহ
পড়লাম চলুক!
মন্তব্য করুন