ইউজার লগইন

অনুবাদঃ গাছ পাথর মেঘ

কারসন ম্যাককুলারস ক্ষণজন্মা এক আমেরিকান লেখিকা। খুব বেশি লেখালেখি করেননি তাঁর মাত্র অর্ধশতাব্দী দীর্ঘ জীবনে। কিন্তু যাই লিখেছেন মোটামুটি তার সবই স্থায়ী আসন করে নিয়েছে আমেরিকান সাহিত্যে। সম্প্রতি এক বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল ছোটগল্প বিষয়ে, তিনিই দিলেন বিখ্যাত এই গল্পটির সন্ধান। A Tree. A Rock. A Cloud. নামের এই গল্পটিতে লেখিকা সহজ ভাষায়, অল্প কথায় মানব চরিত্রের অতিচেনা কিন্তু ছকবন্দী নয় এমন কিছু বিষয়ের উপরে আলোকপাত করেছেন। পুরো গল্পের কোথাও পাঠকদের ঘাড়ে তাঁর নিজের ভাবনা চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস নেই, আবার পাঠককে দুবলা-পাতলা ভেবে হাত ধরিয়ে পথ দেখিয়ে দেয়াও নেই। লেখাকে নিজের গতিতে এগিয়ে যেতে দিয়েছেন, নৈর্বক্তিকভাবে। গল্পটা আমার কাছে বারবার পড়বার মতো মনে হয়েছে। আশাকরি আপনাদের কাছেও ভালো লাগবে।
লেখাটি কলেবরে একটু স্থুল হওয়ায় দুই খণ্ডে দিচ্ছি, আশাকরি আপনাদের ধৈর্য্চ্যুতি ঘটবে না Smile

********************
সেদিন সকালে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, চারদিক ঘোর অন্ধকার করে। খবরের কাগজের হকার ছেলেটি কাগজ বিলির প্রায় শেষ পর্যায়ে রাস্তার পাশের কাফেটিতে এসে হাজির হলো। কাফেটি সারারাত খোলা থাকে, মালিক লিও নামের খিটখিটে মেজাজের হাড়কৃপণ এক লোক। কষ্টকর দীর্ঘ নিষ্প্রাণ রাস্তার পরে কাফেটির পরিবেশ জমজমাট আর অমায়িক মনে হয়। কাউন্টারে পাশে দাঁড়িয়ে আছে জনাদুয়েক সৈন্য, সুতার কলের তিনজন শ্রমিক, আর এক কোণায় বুড়োমতোন এক লোক সামনে ঝুঁকে টাল হয়ে আছে বীয়ারের গ্লাসে অনেকটা নাক-মুখ ডুবিয়ে। ছেলেটির মাথায় বৈমানিকদের মতো হেলমেট। কাফেতে ঢুকে সে থুতনীর নিচ থেকে হেলমেটের বাঁধন খুলে তার ছোট্ট গোলাপী ডান কানের উপর ঝুলায়। অন্য যে কোনো দিনে কফিপানের সময় তার সাথে দু’একজনের খোশগল্প হয়। কিন্তু আজ সকালে লিও তার দিকে ভ্রুক্ষেপও করছে না, বা অন্য কেউও কথা বলতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সে কফির দাম মিটিয়ে বেরিয়ে আসবে এমন সময় পেছন থেকে একজন ডাক দেয়-
-‘এই বাবা, একটু শোন তো’

সে পেছনে তাকিয়ে দেখে কোণায় বসা সেই লোকটি হাতের ইশারায় তাকে ডাকছে। বীয়ারের মগ থেকে মাথা উঠিয়ে নিয়ে বেশ হাসি-খুশি মুখে এদিকে তাকিয়ে আছে। লোকটি দেখতে ফ্যাকাশে চেহারার, বেশ লম্বা, বাঁশির মতো নাক এবং চটে যাওয়া কমলা রঙের চুল মাথায়।

-‘এই যে বাবা’—লোকটি আবার ডাকে।

-‘জ্বী, আমাকে ডাকছেন?’—ছেলেটি কাছে গিয়ে বলে।

লোকটি কথা না বলে ছেলেটির কাঁধে হাত রাখলো, তারপর চিবুক ধরে মুখটা নাড়িয়ে দিলো এদিক থেকে সেদিকে। ছেলেটি অস্বস্তিভরে পিছু হটে।

-‘ কী ব্যাপার ? এমন ঘটা করে ডাকলেন কেন?’—ছেলেটি কর্কশ স্বরে বলে, কাফের ভেতরটা হঠাৎ করে নীরব হয়ে আসে।

-‘ আমি তোমাকে ভালোবাসি’—লোকটি ধীরকন্ঠে বলে।

কাউন্টারের আশেপাশের সবাই হেসে উঠলো। ছেলেটি রুষ্টভাবে ভ্রুকূটি করে সরে যায়, কী করবে বুঝতে না পেরে। সে কাউন্টারের পেছনে দাঁড়ানো লিওর দিকে তাকালো। লিওর মুখে একটা ক্লান্ত, অবসন্ন বিদ্রুপ ঝুলে আছে। ছেলেটিও একটু হাসার চেষ্টা করে। কিন্তু লোকটির চেহারায় গাম্ভীর্য আর বিষণ্ণতার মিলিত প্রলেপ।

-‘ আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না। বসো আমার সাথে, একটা বিয়ার খাও। তোমাকে আমার কিছু বলার আছে।’

ছেলেটি চোখে-মুখে প্রশ্ন নিয়ে চারদিকে তাকায়। কিন্তু বাকী লোকেরা ততক্ষণে আবার তাদের বিয়ারের মগে চুমুক দিচ্ছে অথবা নাশতার প্লেটে হামলে পড়েছে। তার দিকে কারুরই নজর নেই।

-‘ও এখনো একটা বাচ্চা ছেলে’—লিও কাউন্টারে এক মগ কফি আর ছোট্ট একটা জগে দুধ নামিয়ে রেখে বলে।

হকার ছেলেটি একটা টুলে চড়ে বসে। হেলমেটের ফিতার ঘেরাটোপে আটকানো ওর ছোট্ট কানটি টুকটুকে লাল হয়ে আছে। লোকটি ধীর-স্থিরভাবে ওকে বলে, -‘ ব্যাপারটা জরুরী।’ তারপর সে তার পকেট থেকে কিছু একটা বের করে দু’হাতের তালুতে ছড়িয়ে রাখে, যাতে করে ছেলেটি ঠিকমতো দেখতে পায়।

‘খেয়াল করে দেখ,’—সে বলে।

ছেলেটি তাকালো, খুব লক্ষ্য করে দেখার মতো কিছু না। লোকটির বিরাট, কঠিন হাতের তালুতে একটা ফটো। ছবিতে এক মহিলার অস্পষ্ট মুখ, শুধু মাথার হ্যাট আর পরনের পোশাক পরিষ্কার ভাবে দেখা যায়।

-‘দেখতে পাচ্ছ?’—লোকটি জানতে চায়।

ছেলেটি মাথা নাড়িয়ে সায় দিলে লোকটি আরেকটি ফটো বের করে দেখায়। ছবিটি একই মহিলার, তবে এখানে সে একটা সৈকতে দাঁড়িয়ে আছে, পরনে সাঁতারের পোশাক। পোশাক ভেদ করে তার উঁচু পেট বের হয়ে আছে, ছবিটার বিশেষত্ব কেবল এটুকুই।

-‘দেখেছ ভালো করে? এই মহিলাকে আগে কোথাও দেখেছ বলে মনে পড়ে?’—লোকটি সামনে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে।

‘না, আমার মনে পড়ছে না’— নিশ্চল ভঙ্গিতে বসা ছেলেটি তীর্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে।

‘ঠিক আছে। উনি আমার স্ত্রী।’—লোকটি ছবিটিতে ফুঁ দিয়ে পকেটে রাখতে রাখতে বলে।

-‘মারা গেছেন?’—ছেলেটি জানতে চায়।

লোকটি মাথা ঝাঁকিয়ে ঠোঁটদুটো শিস দেয়া ভঙ্গিতে গোল করে খুব ধীরে-সুস্থ্যে বলে, ‘ দাঁড়াও, আমি সব খুলে বলছি।’

লোকটির সামনে বিয়ারের বড় মগটি বাদামী রঙের। সে চুমুক দিতে সেটাকে হাতে তুলে নিল না। বরং মাথা নামিয়ে মগের কিনারায় মুখ রেখে খানিকটা জিরিয়ে নেয়। তারপর দু’হাতে মগটি কাত করে বিয়ারে চুমুক দেয়।

-‘একরাতে দেখা যাবে বেখেয়ালে আপনার ঐ লম্বা নাক বিয়ারের মগে চুবিয়ে ঘুমের ঘোরে ডুবেই মারা গেছেন। বিশিষ্ট লোকেদের মৃত্যু হয়ে বিয়ারের কারণে। আহ্‌ বড় মধুর সেই মরণ।’—লিও বলে ওঠে।

হকার ছেলেটি লিওর দিকে ইশারা করে। লোকটির দৃষ্টি এড়িয়ে নিঃশব্দে প্রশ্ন করে, ‘ মাতাল নাকি?’। কিন্তু লিও ভ্রু কুচকিয়ে তাওয়ায় বেকন ভাজতে চলে যায়। লোকটি বিয়ারের মগটি ঠেলে দূরে সরায়, সোজা হয়ে বসে দুই হাত জড়ো করে কাউন্টারের উপরে রাখে। চোখে গভীর বিষণ্ণতা নিয়ে সে ছেলেটির দিকে তাকায়। সে চোখের পাতা ফেলছিল না, কিন্তু অল্প বিরতিতে তার ফ্যাকাশে সবুজ চোখের পাতা এমনিতেই নেমে আসছিলো। ভোর হয়ে গেছে প্রায়, ছেলেটি খবরের কাগজের বোঝা শরীরের আরেক পাশে সরিয়ে নেয়।

-‘আমি ভালোবাসার কথা বলছি। আমার কাছে এর মানে হচ্ছে বিজ্ঞান।’

ছেলেটি টুল থেকে আধাআধি নেমে যাচ্ছিল, কিন্তু লোকটি আঙুল উঁচিয়ে ধরে, তার মাঝে এমন কিছু একটা ছিল যে ছেলেটা উঠতে গিয়েও থেমে যায়।

-‘ বারো বছর আগে আমি ফটোর ঐ মেয়েটিকে বিয়ে করি। তার সাথে আমি ঘর করেছি এক বছর, নয় মাস, তিন দিন এবং দুই রাত। আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম। সত্যিই।’ লোকটি তার অস্পষ্ট, অসংলগ্ন কন্ঠকে চড়িয়ে আবার বলতে শুরু করে, ‘ আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম। আমি ভাবতাম সেও আমাকে ভালোবাসে। রেলরাস্তার একজন ইঞ্জিনিয়ার ছিলাম আমি। সুখী হবার সমস্ত উপকরণ আর বিলাসিতা তার জীবনে ছিল। আমি ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি যে সে অসুখী। কিন্তু জান তারপর কী হলো?’

‘মিয়াঁও’—পাশ থেকে লিও টিপ্পনী কাটে।

লোকটি তার দৃষ্টি সরালো না, ছেলেটির মুখের দিকে একটানা তাকিয়ে থেকে বলে, ‘ সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমি এক রাতে বাড়িতে ফিরে দেখি কোথাও কেউ নেই। কোনো কথাবার্তা ছাড়াই সে চলে গেল আমাকে ফেলে।’

-‘অন্য একটা লোকের সাথে?’—ছেলেটি জানতে চায়।

লোকটি শান্তভাবে তার হাত সামনে রেখে বলে, ‘ এটা কোনো প্রশ্ন হলো? এমন একজন মহিলা একা একা ঘর ছাড়ে না।’

কাফের ভেতরটা চুপচাপ, বাইরে ঝমঝম ভারী বৃষ্টি, থামার কোনো লক্ষণ নেই। লিও লম্বা হাতা দিয়ে বেকন উল্টে-পাল্টে, তাওয়ার সাথে চেপে ধরে বেকন ভাজে। হঠাৎ মুখ উঁচিয়ে বলে, ‘ আর তুমি সেই দুশ্চরিত্রাকে এগারো বছর ধরে ধাওয়া করে চলেছ? বুড়ো ভাম আর কাকে বলে!’

প্রথমবারের মতো লোকটু লিওর দিকে তাকায়, ‘ দয়া করে বাজে কথা বলবেন না। আর আমার কথা তো আপনার সাথে হচ্ছে না।’ তারপর ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আন্তরিক অথচ মিনতিপূর্ণ স্বরে বলে, ‘ ওনার কথাকে পাত্তা দিও না। ঠিক আছে?’

ছেলেটি অনিশ্চিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ায়।

-‘ব্যাপারটা ছিল অনেকটা এরকমের,’—লোকটি বলতে শুরু করে। ‘আমার অনুভূতি খুব তীক্ষ্ণ। সারা জীবনই আমি একের পর এক বিভিন্ন জিনিস দেখে অভিভূত হয়েছি। চাঁদের আলো। সুন্দরী মেয়ের চমৎকার দীর্ঘ পা। একটার পর আরেকটা। কিন্তু যখনই আমি কোনো কিছুকে পছন্দ করতে শুরু করতাম একটা অদ্ভুত অনুভূতি ধীরে ধীরে আমার ভেতরটা গ্রাস করে ফেলতো। কোনোটাতেই পরিপূর্ণ তৃপ্তি আসতো না, নিজেকে হারিয়ে ফেলতাম অবোধ্য গোলকধাঁধাঁয়, অদ্ভুত শুন্যতা আমাকে গ্রাস করে নিত। নারী? আমার জীবনে অনেক এসেছে। একই অবস্থা। একটা পর্যায়ে এসে আমার ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগতো । কেউই আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসেনি।’

খুব ধীরে সে তার চোখের পাতা নামালো, যেভাবে মঞ্চের পর্দা নেমে আসে। এরপর সে আবার উত্তেজিত কন্ঠে বেশ দ্রুতগতিতে বলতে শুরু করে, কথার তোড়ে তার বিরাট কানের লতিগুলো কেঁপে কেঁপে ওঠে।

-‘তারপর আমার সাথে এই মেয়েটির দেখা হয়। আমি তখন একান্ন বছরের এক প্রৌঢ় আর সে তিরিশ বছরের যুবতী। পেট্রোল পাম্পে আমার সাথে তার পরিচয়ের তিন দিনের মধ্যে আমরা বিয়ে করে ফেলি। আমার সেই সময়কার অনুভূতিগুলো তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। সারাটাদিন আমার শুধু তার সাথে লেপ্টে থাকতে ইচ্ছা করতো, এক মুহূর্তের জন্যেও চোখের আড়াল হলে ভালো লাগতো না। আমি নিজেকে খুঁজে পেতে শুরু করলাম, আমার অস্তিত্ব লীন হতে লাগলো তার মাঝে।’

লোকটি হঠাৎ করে থেকে গিয়ে তার নাকে হাত বোলাতে শুরু করে। কন্ঠ নামিয়ে ভর্তসনার সুরে বলতে শুরু করে, ‘আমি বোধহয় ঠিকভাবে বোঝাতে পারছি না। যা ঘটেছিল তা হলো—আমার মধ্যে একই সাথে অসাধারণ এক অচেনা অনুভূতি এবং ছেঁড়া ছেঁড়া আনন্দ খেলা করছিলো। এই মেয়েটি যেন আমার আত্মাকে জাগিয়ে তুলছিলো। তার কারণে আমার টুকরো টুকরো হয়ে থাকা সত্ত্বা এক হয়ে আমি পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিছু বোঝাতে কি পারলাম?’

-‘কী নাম ছিল মেয়েটির?’—ছেলেটি প্রশ্ন করে।

‘ওহ্‌ আমি তাকে ডোডো বলে ডাকতাম। কিন্তু এটা কোনো বিষয় না।’

-‘আপনি তাকে ফিরিয়ে আনার কোনো চেষ্টা করেছিলেন?’

লোকটি অগ্রাহ্য করার ভঙ্গিতে বলে যেতে থাকে, ‘ এমন অবস্থায় মেয়েটির চলে যাওয়াতে আমার কেমন লেগেছিল তা হয়তো তুমি ধারণা করতে পার।’

লিও দুই টুকরা বেকন ভাজা তুলে নিয়ে একটা স্যান্ডউইচ বানালো। তার চেহারা ফ্যাকাশে, কুতকুতে চোখ আর সরু নাকের আশেপাশে ছোপ ছোপ নীলচে দাগ। সুতার মিলের একজন শ্রমিকের ইশারা পেয়ে সে তার মগে কফি ঢালে। কফি সে মাগনা কাউকেই খাওয়ায় না। শ্রমিকের সেখানে প্রতিদিন সকালে নাশতা করতে আসে, কিন্তু লিও চেনা-পরিচিত লোকের সাথেই বেশি কঞ্জুসী করে। বিরক্তি চেপে সে স্যান্ডউইচে কামড় দেয়, তার চোখে-মুখে অসন্তোষ ফুটে ওঠে।

-‘আপনি কি আর কোনোদিনই তাকে খুঁজে পাননি?’

ছেলেটি আসলে লোকটাকে সে ভাবে বুঝে উঠতে পারছিল না, ওর অনভিজ্ঞ চোখে মুখে সন্দেহমাখা আগ্রহের ছাপ ফুটে ওঠে। তার হকার জীবন খুব বেশিদিনের না, এত ভোরে শহরে ঘোরাফেরার সাথে সে নিজেকে এখনও সেভাবে মানিয়ে নিতে পারেনি।

‘হ্যাঁ। আমি তাকে খুঁজে পেতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলাম। যে দিকে সে যেতে পারে বলে মনে হয়েছে সে দিকেই গিয়েছি। টুলসায় ওর বাবা-মায়ের বাড়িতে খোঁজ নিয়েছি। তার পরে পথে পথে ঘুরেছি অনেকদিন। ওর মুখ থেকে যতগুলো শহরের নাম শুনেছি তার সবগুলোতেই খুঁজেছি, ওর পরিচিত প্রতিটি মানুষের কাছে গিয়েছি। তুলসা, আটলান্টা, শিকাগো, আলবেনি, মেম্ফিস—একটানা প্রায় দুই বছর আমি ওর সন্ধানে সারাদেশে পাগলে মতো ঘুরেছি।’

-‘কিন্তু ভেগে যাওয়া সেই জুটি পৃথিবী থেকেই উধাও হয়ে গেছে!’—লিও আবার টিপ্পনী কাটে।

‘বাজে কথায় কান দিও না। আর ঐ দুই বছরের কথাও ভুলে যাও। দরকারী কিছু না। দরকারী কথাটা হলো, তৃতীয় বছরের দিকে অদ্ভুত কিছু ঘটনার সূত্রপাত।’—লোকটির কন্ঠ আত্মবিশ্বাসী শোনায়।

-‘কী?’—ছেলেটি কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে বলে।

লোকটি বিয়ারের মগে চুমুক দেয়ার ভঙ্গিতে সামনে ঝোঁকে। মগের উপরে তার নাক স্থির হয়ে গন্ধ শোঁকে, টাটকা বিয়ারের সুবাশ না পেয়ে চুমুক না দিয়ে সোজা হয়ে বসে।

‘অদ্ভুত বিষয়গুলোর মধ্যে ভালোবাসার কথা দিয়েই শুরু করি। প্রথমদিকে আমার একমাত্র চিন্তা ছিল তাকে ফিরে পাওয়া নিয়ে। ব্যাপারটা একটু পাগলামীর পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এভাবে অনেকটা সময় কেটে গেলে আমি একদিন আবার তাকে মনের পর্দায় দেখতে চাইলাম। তুমি জান তখন কী হলো?’

-‘কী?’—ছেলেটি জানতে চায়।

‘আমি বিছানায় শুয়ে তাকে নিয়ে ভাবতে চাইতেই আমার মাথাটা পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে গেল। আমি তাকে আর দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমি তার ছবি বের করে দেখলাম, কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না। আমার স্মৃতির মাঝে তার কোন চিহ্ন আর খুঁজে পেলাম না।পুরোপুরি ফাঁকা। ভাবতে পারো? ’

-‘ম্যাক, শুনতে পাচ্ছ এইসব আজগুবি কথা? এই বুড়ো হাবড়াটার মাথা নাকি ফাঁকা’—কাউন্টারের অন্য প্রান্তের লোকটির দিকে তাকিয়ে লিও আবারও খোঁচা দেয়।

খুব ধীরে, অনেকটা মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে লোকটা তার হাত নাড়ায়। তার সবুজ চোখদুটি অনড়ভাবে সেঁটে আছে খবরের কাগজ বিলি করা ছেলেটার ছোট্ট মুখে।

‘কিন্তু ধর রাস্তার পাশে পড়ে থাকা এক টুকরো কাচ। অথবা গানের বাক্স হতে ভেসে আসা সাধারণ কোন সুর। রাতের দেয়ালে খেলা করা অর্থহীন ছায়া। এমন যে কোন একটা কিছু হুট করিয়ে দেয় সব। এটা সাধারণত রাস্তাতেই ঘটে এবং আমি পাগলের মতো ভেউ ভেউ করে কাঁদি অথবা ল্যাম্পপোস্টে মাথা ঠুকি। তুমি বুঝতে পারছ আমার কথা?’

‘এক টুকরা কাচ...’—ছেলেটা অস্ফুটে বলে।

( চলবে)

পোস্টটি ১২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

সাঈদ's picture


আরে , দিলেন তো নেশা লাগায়ে, জলদি পরের পর্ব ছাড়েন।

এবি তে অনুবাদ আসতেছে একের পর এক। দারুন।

মামুন হক's picture


এই একটু ফিনিশিং টাচ দেয়া বাকী। হয়ে গেলেই বাকীটুকু পাবেন। অনেক ধন্যবাদ ধৈর্য ধরে পড়ার জন্য Smile

মীর's picture


দ্বিতীয় খন্ডও নিশ্চই রেডী আছে। এখনই দিয়ালান। পইড়া ঠান্ডা হই। এক পর্ব পড়ায়া তো গরম কৈরা দিয়া গেলেন।

ভাই শরীর-স্বাস্থ্য ভালা? মাইয়ারা কেমুন আচে? ওদের ছবি পাই না ক্যান?

মামুন হক's picture


দিচ্ছি ভাই, দুয়েকদিনের মধ্যেই।
শইল-সাস্থ্য ভালো, মেয়েরাও খুব জ্বালাতন করলেও আছে সুখে Smile আপনার সম্মানে ছবি দিলাম একটাঃ-

ঝগড়া

মীর's picture


এষা কানতেছে আর আয়লা বলছে আমি কিছু করি নাই। রাইট?

রাসেল আশরাফ's picture


মীর ভাই@আমিও এই কমেন্টটা লিখতে গিয়া দেখি আপনে দিয়া দিছেন।
সহমত আপনের সাথে।

মামুন ভাই@ আপনার অনুবাদের কিচ্ছু হয় নাই।আপনি এর চাইতে এষা আয়লার ছবি পোস্ট দেন।

মডু ভাই@ এবি বন্ধুদের সোনামনিদের নিয়ে একটা ব্যানার বানানো হোক।

মামুন হক's picture


এষা কোলে চড়ার জন্য কান্দে, আবার ওরে উঠাইলে আয়লা কান্না শুরু করবে। কোলে না নিলে মিনিট কয়েক কান্নাকাটি করে আবার শান্ত হয়ে যায়, দুই বোনে হাত-পা ছুঁড়ে খেলে। তবে আয়লার ভাব খুব এখন থেকেই। ছবিতে দেখবেন কত পদের পোজ দেয় Smile

জ্বিনের বাদশা's picture


হেভী তো ... দেখে মনে হলো হোয়াট আ কনট্রাস্ট! Wink

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


অপেক্ষায় আছি আইজুদ্দিন Big smile

১০

মামুন হক's picture


আসবে অচিরেই। পড়ার জন্য ধন্যবাদ Smile

১১

জ্যোতি's picture


মামুন ভাই, এইটা পড়ার পর ২/১ দিন অপেক্ষা করার ধৈর্য ধরতে পারছি না। মেয়ের বাবার এত আইলসা হলে চলে না। তাড়াতাড়ি পরের অংশ দেন তো!

আপনেরে মাইনাস। মেয়েদের কান্নার ছবি দিছেন কেন? একটা হাসির ছবি নাইলে মারামারির ছবি দেন।কান্না দেখে ভালো লাগছে না। আহারে মেয়েটা কানতেছে কান্না না থামাইয়া বাপ ছবি তুলে!!!!!!!!!!!!!!!

১২

মামুন হক's picture


প্রথম পাতায় একটা লেখা থাকতে আরেকটা দিতে আমার কাছে ভালো লাগে না। আর একটা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি Wink

মেয়েরা যা করে তাই ভালো লাগে, এমনকি কান্নাও। সবাই তো ভাবে এরা বুঝি সারাদিন শুধু হাসিখুশিই থাকে, তাই একটা ভিন্নধর্মী ফটুক দিলাম আর কি।

এই মাস শেষে আরেকটা ছবি ব্লগ দেব। ওদের মনে হয় দাঁত উঠতেছে!

১৩

জ্যোতি's picture


আপনি আমার জন্য গোপনে এখনই একটা ছবি দেন। পিলিজ লাগে।

১৪

মামুন হক's picture


এখনও ওঠে নাই, উঠলেই ছবি দিব Smile

১৫

ভাস্কর's picture


শিগগিরি দ্বিতীয় পর্ব চাই...আপনের অনুবাদ পড়লে হিংসা হয়...

১৬

মামুন হক's picture


ধন্যবাদ ভাস্করদা, কালকেই পাবেন বাকী অংশ Smile

১৭

হাসান রায়হান's picture


পরের পর্ব জলদি।

১৮

মামুন হক's picture


জ্বি, আসিতেছে খুব তাড়াতাড়ি Smile

১৯

শওকত মাসুম's picture


আপনি যাই লেখেন না কেন, আপনার কাজ হলো প্রতি লেখায় দুই মা-এর ছবি দেওয়া। এইটা এবির নতুন নীতিমালা।
অনুবাদ চলুক।

২০

মামুন হক's picture


মাথা পেতে নিলাম এই নির্দেশনাটি। নীতিমালা ভাঙ্গনের দুর্মতি হবে না আমার Smile

২১

টুটুল's picture


চলুক

২২

মামুন হক's picture


ওক্কে বস

২৩

মাহবুব সুমন's picture


Cool

২৪

মামুন হক's picture


Cool

২৫

জ্বিনের বাদশা's picture


অনুবাদ মুচমুচে হয়েছে (থাম্বস আপের ইমো)

২৬

মামুন হক's picture


অশেষ ধন্যবাদ বাদশা ভাই, আপনার গ্রিন সিগন্যাল আমাকে উৎসাহ জোগায়।

২৭

আরিফ জেবতিক's picture


অনুবাদটা ঝরঝরে, সুস্বাদু।
পড়ে যাব।

২৮

আরিফ জেবতিক's picture


কিছু বাক্য দ্বিতীয়বার দেখবেন নাকি ?
যেমন, :

সেদিন সকালে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, চারদিক ঘোর অন্ধকার করে

এই বাক্যটি যদি এভাবে লেখা হয়,

চারদিক ঘোর অন্ধকার করে,সেদিন সকালে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল

তাহলে কেমন হয় ?

২৯

মামুন হক's picture


আরিফ ভাই,
খারাপ হয় না। আর কোথায় কোথায় খটকা লাগছে দয়া করে জানাবেন।

৩০

তানবীরা's picture


দারুন হচ্ছে দারুন দারুন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.