বিপ্লবের ভেতর-বাহির: ৫
আমার কিশোর ভাই, প্রিয় ছিল স্বাধীনতা
শ্লোগানে উত্তাল হোত খুব। দর্পিত বাতাস
তাকে ডাক দিল, স্টেনগানে বাজাল সংগীত
বিরোধী বন্দুক থেকে একটি নিপুণ গুলি
বিদ্ধ তারে করে গেছে, ছিন্ন কুমুদের
শোভা দেহ তার পড়েছিল? জানি না কিসব
ঘাস জন্ম নেবে তার শয়নের চারপাশে,...
বিরোধী গুলির ক্ষতে যখন সুস্থির শুয়ে
আকাশের নীচে, চোখে তার বিস্মিত আকাশ
মানবিক সত্যরীতি, বঙ্গদেশ সুখের বাগান।
কবিতাটি লিখেছিলেন কবি হুমায়ুন কবির, তাঁর ছোট ভাই ফিরোজ কবিরকে নিয়ে। তাঁর কিশোর ভাইটি বরিশালে ১৯৭১ সালে আগস্ট মাসে পাক সেনাদের হাতে ধরা পড়েছিলেন। ১৮ আগস্ট বরিশালে ব্যাপ্টিস্ট মিশন সংলগ্ন খালপাড়ে দাঁড় করিয়ে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের একটি বড় কাজ মুক্তিযুদ্ধের কথ্য ইতিহাস। স্বরূপকাঠি গণপতিকাঠি গ্রামের শোভারাণী মন্ডল সরাসরি যুদ্ধ করেছিলেন। তাঁরও একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল।
প্র: আপনি যে দু’টো মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপে অংশগ্রহণ করেছিলেন সেই দু’টো গ্রুপের উচ্চ পর্যায়ে অর্থাৎ লিডিং পর্যায়ে কারা ছিলেন ?
উ: শেষের গ্রুপটায় লিডিং পর্যায়ে ছিলেন বেণীলাল দাশগুপ্ত। আর প্রথম পর্যায়ের লিডিং ম্যান ছিলেন সালাম ভাই ওরফে সিরাজ সিকদার। সেই ছিলো প্রথম ম্যান। দ্বিতীয় ম্যান ছিলো মজিবুল হক, তৃতীয় ম্যান ছিলো ফিরোজ কবির। কবিতা লেখে যে হুমায়ুন কবির তারই ভাই ফিরোজ কবির। আর কারো কথা আমার তেমন মনে নাই।
এই ফিরোজ কবির ছিলেন পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির একজন সক্রিয় সদস্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩ জুন পেয়ারা বাগানে যে দলটির সৃষ্টি তা আমরা আগেই জেনেছি। যুদ্ধের সময়েই সিরাজ সিকদারের মতের সঙ্গে মিল হয়নি ফিরোজ কবিরের। দল থেকে বহিস্কার করা হয় ফিরোজ কবিরকে। সদ্য গঠিত পার্টির এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য মোটেই ভাল হয়নি।
ফিরোজ কবিরের বড় ভাই হুমায়ুন কবির আগে থেকেই সিরাজ সিকদারের পার্টির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সিরাজ সিকদার বরিশালের বিএম কলেজের ছাত্র ছিলেন। তখনই পরিচয় হয় হুমায়ুন কবিরের সাথে। সম্পর্কটা ছিল পার্টি গঠনেরও অনেক আগে থেকে। দুজনেই বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন, দুজনেই মার্কসবাদি। দুজরেই পরে পিকিং লাইন বেছে নেন। বিশ্বাস করতেন সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে নতুন একটি দেশের স্বপ্ন।
সর্বহারা পার্টির প্রতিষ্ঠা আটঘর কুড়িয়ানার পেয়ারা বাগানে, ৩ জুন ১৯৭১, যুদ্ধের মধ্যে। আরও অনেক চীনাপন্থীদের মতো ভুল করেননি সিরাজ সিকদার। যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই মূল শত্রু চিনতে ভুল করেননি। ফলে অনেক আগেই পাকিস্তানি শোষনের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিলেন। ঢাকায় বিভিন্ন জায়গায় বোমা হামলার কাজটি আগেই করেছিলেন সিরাজ সিকদাররা। হুমায়ুন কবির আগে থেকেই যুক্ত সিরাজ সিকদারের সঙ্গে।
অসহযোগ আন্দোলনের সেই সময়ের হুমায়ুন কবিরকে পাওয়া যায় নির্মলেন্দু গুণের এক লেখায়।
‘আমি আর হুমায়ুন কবির পাবলিক লাইব্রেরির সামনের রাস্তা দিয়ে শাহবাগের দিকে ছুটে যাওয়া একটি ডাবল ডেকার বাসে গতিরোধ করি। হুমায়ুন কবির তখন আমার কাছ থেকে একটা দিয়ালশাই চেয়ে নেয়। তার আগে অগ্নিসংযোগে ব্যবহার করার জন্য সে তার প্রেমিকা সুলতানা রেবুর কাছ থেকে ওর র“মালটি চেয়ে নিয়ে এসেছিল। হুমায়ুন কবির বলে: আয় বাসে কী করে অগ্নিসংযোগ করতে হয়, তোকে শিখিয়ে দিচ্ছি। হুমায়ুনের কাছেই আমি বাসে অগ্নিসংযোগ করা শিখি।’
(আমার কণ্ঠস্বর, নির্মলেন্দু গুণ)
হুমায়ুন কবির আর ফিরোজ কবিরের ছোট বোন আলমতাজ বেগম ছবি। পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির আরেক সক্রিয় সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা। হাতের লেখা ভাল ছিল বলে ছবি পোস্টার দিলে দিতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনিও যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। তখন তিনি নবম শ্রেনীর ছাত্রী, বয়স ১৬ বছর বা সামান্য বেশি। যুদ্ধ শুরু হলে ফিরোজ কবির আর তাঁর বন।দুদের মুখে যুদ্ধের কথা শুনে শুরে যাওয়ার কথা বলে রেখেছিলেন ছবি। পাক সেনারা মেয়েদের ধরে নিয়ে যেতো। তাই পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে যুদ্ধ করাটাই ঠিক বলে মনে করেছিলেন আলমতাজ বেগম নামের কিশোরী মেয়েটি।
এখানে উল্লেখযোগ্য চরিত্র আরও একটি আছে। সেলিম শাহনেওয়াজ। ফিরোজ কবিরের বন্ধু, একই সঙ্গে পড়তেন। তিনিও সিরাজ সিকদারের ঘনিষ্ঠ। সেলিম শাহনেওয়াজ ও ছবি, একে অপরকে পছন্দ করতেন।
যুদ্ধ শুরু হলে এরা সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ছবির ভাষায় পড়তে পারি আমরা:
সিরাজ শিকদারের সঙ্গেও আমি একটা অপারেশনে গিয়েছিলাম। সেটি ছিল স্বরূপকাঠির সন্ধ্যা নদীতে। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে আমাদের গেরিলা যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে সেলিম শাহনেওয়াজ ছিলেন। সেই যুদ্ধে আমিই প্রথম পাকিস্তানি বাহিনীর গানবোটে গ্রেনেড ছুড়ে মারি। আমি যখন গ্রেনেডের পিনটা খুললাম, তখন বুকের মধ্যে ধড়ফড় করছিল, কী জানি, গ্রেনেডটা যদি আমার হাতেই বিস্ফোরিত হয়! হামলায় গানবোটের সব পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের দোসররা মারা যায়।
আমার নেতৃত্বেও হানাদার বাহিনীর সঙ্গে গেরিলাযুদ্ধ হয়েছিল। ঝালকাঠির গাবখান চ্যানেল দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি স্পিডবোট যাচ্ছিল। খবরটা আমরা আগেই পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, সেখানে ছয়-সাতজন মিলে হামলা চালাব। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করার মতো অস্ত্র আমাদের ছিল না। সিরাজ শিকদারের নির্দেশে আমি গেরিলা কায়দায় পাকিস্তানি গানবোটে গ্রেনেড আর হাতবোমার হামলা করি। আমার হামলায় গানবোট নদীতে ডুবে যায়। এবারও গানবোটের সব পাকিস্তানি সৈন্য মারা যায়।
রাজাকারকে বেয়নেট চার্জ করার উদাহরণও আছে ছবির জীবনে। সেলিম শাহনেওয়াজের সঙ্গে ছবির বিয়ে হয় রণাঙ্গণেই।
একাত্তরের ২৮ মে। যুদ্ধের ক্যাম্পে গুলির শব্দ, বারুদের গন্ধের মধ্যেই বিয়ে হলো আমার। বর সহযোদ্ধা সেলিম শাহনেওয়াজ। সহযোদ্ধারা সবাই বেশ আনন্দ-ফুর্তি করে ফুল দিয়ে বুঝিয়ে দিল যে, আমাদের বিয়ে হয়েছে।
দুই ভাই আর এক বোনের এই জীবন এর পর একই রকম আর থাকেনি। সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি আর সিরাজ সিকদার তাদের জীবনের উপর বড় ধরণের আঘাত নিয়ে আসে। কেবল মতের মিল হয়নি বলে সর্বহারা পার্টিতে অসংখ্য খুনোখুনি হয়েছে। আর এর শুরুটা হয়েছিল এই পরিবারটি দিয়েই।
ফিরোজ কবির এক অর্থে ভাগ্যবান। তিনি শহীদ হয়েছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে। তারপরেও পার্টির দলিলে তাকে বহিস্কারের অপবাদ নিতে হয়েছে। শহীদ হওয়ার মর্যাদা তাকে নিজের দলই দেয়নি। কারণ তিনি সিরাজ সিকদারের বিরোধীতা করেছিলেন।
যুদ্ধের সময় পেয়ারাবাগান থেকে একটা পর্যায়ে এসে সিরাজ সিকদারকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এ নিয়ে সিরাজ সিকদার পরে লিখেছেন, তিনি প্রত্যাহারের পক্ষে ছিলেন না, কিন্তু অন্য নেতা-কর্মীদের চাপে সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ প্রাণের ভয়ে নয়। প্রত্যাহারের পক্ষে ছিলেন ফজলু ও তারেক।
সিরাজ সিকদার পরে আরও লিখেছেন, ফজলু-তারেক কমরেড সিরাজ সিকদারের উপস্থিতিতে তাদের ইচ্ছা খুশীমত কার্যকলাপ করতে পারতো না।
সিরাজ সিকদারের লেখা ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে,
‘কমরেড সিরাজ সিকদারের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ফজলু তার প্রেমিকাকে নিয়ে পলায়ন করে, তারেক-মুজিব ষড়যন্ত্র করে কমরেড ফারুক মজিদকে হত্যা করে, সমরবাদী নেতা বনে যান, ১নং ফ্রন্টের চরম ক্ষতিসাধন করে, নারীদের নিয়ে স্বেচ্ছাচার করে।’
সিরাজ সিকদারের এ কথাগুলো ফজলু-তারেকের মুত্যুর পর লিখিত। ফলে এখানে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানার আর কোনো উপায় নেই।
একটি নতুন নাম নেওয়া গোপন পার্টিগুলোর নিয়ম। ফিরোজ কবিরেরই পার্টি নাম ছিল তারেক। সেলিম শাহনেওয়াজ ছিল পৈত্রিক নাম। পার্টিতে নাম ছিল একাধিক। যেমন আহাদ, ফজলু। তবে তিনি ফজলু নামেই ছিলেন বেশি পরিচিত।
তারেককে বহিস্কারের কারণ পাওয়া যায় ১৯৭২ সালের জুনে প্রকাশিত পার্টির একটি বিবৃতিতে। এর শিরোনাম ছিল, ‘বিশ্বাসঘাতক ফজলু চক্র কর্তৃক প্রচারিত পুস্তিকা সম্পর্কে কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতি’। সেখানে বলা আছে,
‘তারা ষড়যন্ত্র করে কমরেড মজিদকে হত্যা করে, সমরবাদী হয়ে উঠে, বন্দুকের নলের মুখে গেরিলা ও পার্টি কর্মীদের সন্ত্রস্ত রাখে, পার্টির কেন্দ্রকে অস্বীকার করে, নারীদের নিয়ে স্বেচ্ছাচার করে, বিনা অনুমতিতে বন্দুকের ডগায় বিয়ে করে, পার্টির সুনাম নষ্ট করে, পাক-ফ্যাসিস্টদের অনুরূপ কাজ করে। অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সর্বহারা পার্টির গেরিলা ও কর্মীরাই মুজিব-তারেককে খতম করার পরিকল্পনা করছিল। তাদের জীবিত অবস্থায় বিচার সম্ভব হয়নি, কারণ তারা পাক-সামরিক ফ্যাসিস্টদের হাতে মারা যায়।’
যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে সিরাজ সিকদারের দল পরিচালনা ও মতবাদের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিলেন ফজলু। সেই কাহিনী আমরা আগেই পড়েছি। পার্টির বিভিন্ন দলিলে বিশেষ করে ১৯৭২ সালের প্রায় সবগুলো দলিলে বার বার এসছে ফজলুর নাম। ইশতেহার বা বিবৃতিগুলো সিরাজ সিকদার নিজে লিখতেন বলে সেগুলো সিরাজ সিকদার রচনা সমগ্রতে স্থান পেয়েছে। সিরাজ সিকদার বার বা ফজলু চক্রের কথা বলেছেন, নানা ধরণের অভিযোগ তুলেছেন, দল থেকে বহিস্কার ও খতমের যুক্তি তুলে ধরেছেন।
সেরকম কিছু কথা বলা যেতে পারে:
এক জায়গায় সিরাজ সিকদার লিখেছেন,
'ফজলু চক্র ইতিমধ্যে কাজী-মেনন (কাজী জাফর, এরশাদের দলের নেতা এখন এবং রাশেদ খান মেনন) চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। তারা এ চক্রকে সর্বহারা পাটি, তার নেতৃত্বে বিশেষ করে কমরেড সিরাজ সিকদারকে খতম বা অপসারণের জন্য মদদ জোগাচ্ছে। তারা এই চক্রকে অস্ত্র, লোক অর্থাৎ সব কিছুই দিচ্ছে।.........তাদের এই দালালীর খবর কাজী-রণো চক্রের পান্ডা মেনন-জামাল হায়দার আমাদের জনৈক সহানুভূশীলের নিকট প্রকাশ করেছে।’ (এই জামাল হায়দারও এরশাদের মন্ত্রী হয়েছিলেন।)
সর্বহারা দলে ছিল সিরাজ সিকদারের একক নেতৃত্ব। অর্থাৎ সিরাজ সিকদারই পার্টি। জানা যায়, এ বিষয়ে তাঁর মনোভাব ছিল অত্যন্ত কঠোর। হঠাৎ করে এক গরীব কৃষকের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন সিরাজ সিকদার। এরপর বিয়ে করেন জাহানারা হাকিমকে। তবে বিয়ের আগে এই দুইজন দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকতেন। নিজে এ ধরণের জীবনযাপন করলেও পার্টির অন্য কেউ এ ধরণের সম্পর্কে জড়ালে তা মানতেন না তিনি। এ নিয়েও পার্টির মধ্যে নানা সময়ে সংকট দেখা দিয়েছিল। সেলিম শাহনেওয়াজ আর ছবি বা ফজলু-মিনুকে মানতে পারেননি সিরাজ সিকদার। আলমতাজ বেগম ছবির নাম দলে ছিল মিনু। সিরাজ সিকদারের সমালোচকদের কোনো জায়গা দলে ছিল না।
সিরাজ সিকদার লিখেছেন,
‘ফজলু যৌন স্বার্থকে বিপ্লবী স্বার্থের অধীন না করে বিপ্লবী স্বার্থকে যৌন স্বার্থের অধীন করে, পার্টির পদ ও নাম-যশের জন্য কাজ করে। তাকে এর জন্য বিপ্লবে যোগদানের প্রথম থেকেই সমালোচনা করা হয়, শেষ পর্যন্ত পার্টি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তখন সে চক্র গঠন করে। কাজেই যৌনের স্বার্থ, পদের স্বার্থ, নাম-যশের স্বার্থ অর্থাৎ ব্যক্তিস্বার্থ অর্থাৎ বুর্জোয়া শ্রেনীস্বার্থের কারণই চক্র গঠনের মূল কারণ।’
১৯৭২ সালের মে মাসে প্রচারিত কেন্দ্রীয় কমিটির তৃতীয় পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের এক ইশতেহারে বলা আছে, ‘ফজলু চক্রের সাথে মিনু (ফজলু চক্রের স্ত্রী) পার্টি পরিত্যাগ করে পলায়ন করেছে’।
ফজলুর এই বিদ্রোহ মাত্র দুই মাস টিকেছিল। ১৯৭২ সালের ৩ জুন ছিল সর্বহারা পার্টির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দলটি প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করে পার্টিরই একজন সক্রিয় নেতা সেলিম শাহনেওয়াজের খতম করার মধ্য দিয়ে। ১৯৭২ সালের ১০ জুন এ নিয়ে একটি বিশেষ ইশতেহার বের করেছিল সর্বহারা পার্টি।
সিরাজ সিকদার সেখানে বলেছেন,
‘ফজলু চক্র পূর্ব বাংলার কোনো এক স্থানে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি বিরোধী তৎপরতা চালাতে গেলে সেখানকার পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির বীর গেরিলারা নিজস্ব উদ্যোগে ৩রা জুন ফজলু চক্রকে দেশীয় অস্ত্রের সাহায্যে খতম করে। মৃত্যুর সময়ে কাপুরুষ ফজলু চক্র গেরিলাদের পায়ে ধরে প্রাণ ভিক্ষা চায়। কিন্তু শ্রেনী সচেতন গেরিলারা ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি-জিন্দাবাদ’, কমরেড সিরাজ সিকদার-জিন্দাবাদ’ শ্লোগান দিতে দিতে তাকে খতম করে। '
আলমতাজ বেগম ছবি এখন থাকেন পটুয়াখালির পাথর ঘাটায়। দেশের মানুষের মুক্তির জন্য তিনি বিপ্লব করতে মাত্র ১৬ বছর বয়সে যুদ্ধে যান, যোগ দেন সর্বহারা পার্টিতে। কিন্তু বাকি জীবন তাঁকে টিকে থাকার জন্য নিজের জীবন নিয়ে বিপ্লব করতে হয়েছে। সেলিম শাহনেওয়াজ যেদিন মারা যান সেদিন তিনি ছিলেন তিন মাসের অন্তঃসত্বা। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে জন্ম নেয় মেয়ে সিমু, পুরো নাম সেলিম শাহনেওয়াজ সিমু।
৩ জুন ছবি ছিলেন খুলনায়। আর সেলিম শাহনেওয়াজ ঝালকাঠি থেকে ফিরছিলেন। ছবি জানালেন, সেলিম শাহনেওয়াজ জানতেন তাঁর জীবন যে ফুরিয়ে আসছে। বলতেন, এই জীবনে একবার আসলে আর ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। সেলিম শাহনেওয়াজকে খতম করা হয় লঞ্চঘাটে। খতমের পর লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয় সুগন্ধা নদীতে। সেই লাশ আর কখনো কেউ দেখেনি।
সম্ভবত ঝালকাঠির লঞ্চঘাটে যাওয়ার আগেই সিরাজ সিকদারের অনুসারিরা সেলিম শাহনেওয়াজকে ধরে ফেলে। আলোচনার জন্য নিয়ে যায় লঞ্চঘাটে। এই দলের দুইজনের নাম জানা যায়। একজন রিজভী, অন্যজন বাদল। ইশতেহারে আছে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে খতম করা হয়েছে।
ছবি জানালেন, সেলিম শাহনেওয়াজকে মারা হয়েছিল পটাসিয়াম সায়ানাইড প্রয়োগ করে। তারপর লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয় নদীতে। রিজভী সেই পটাসিয়াম সায়ানাইড একবার দেখিয়েছিল ছবিকে। কিন্তু ছবি তখন জানতেন না এই বিষ তাঁরই স্বামীর জন্য। এই রিজভীও এক বছর পর দলীয় কোন্দলে দলের অন্যদের হাতেই খতম হয়েছিলেন। অথছ ফজলুকে মারার জন্য রিজভীদেরকে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। খতমের জন্য ছবিকেও খুঁজেছিল, কিন্তু না পাওয়ায় প্রাণে বেচে যান তিনি।
সেলিম শাহনেওয়াজের লাশ সুগন্ধা নদীতে ভাসলেও সেই খবর ছবি চেয়েছিলেন আরও তিন দিন পর। তাঁর বড় ভাই হুমায়ুন কবিরের মৃত্যুর পর। হুমায়ুন কবির খতম হন ৬ জুন, সর্বহারা পার্টির সদস্যদের হাতে। এই খবর যখন পাওয়া যায়, তখনও ছবি জানতেন না যে তার স্বামী আগেই খতম হয়েছেন। সেলিম শাহনেওয়াজ মারা যাওয়ার দুদিন আগেও হুমায়ুন কবিরের বাসায় স্ত্রীসহ গেছেন, খাওয়া দাওয়া করেছেন। সেই ছিল শেষ দেখা।
আমরা আগেই জানি কবি-গবেষক-শিক্ষক হুমায়ুন কবির অনেক আগে থেকেই সিরাজ সিকদারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারেক বা ফিরোজ কবির ও মিনু বা ছবির ভাই হওয়ার অপরাধ তো ছিলোই, এর সঙ্গে যুক্ত হয় সিরাজ সিকদারের সঙ্গে দল পরিচালনায় মতভেদ। এই ‘বিরাট’ অপরাধের জন্য তাঁরও জীবন চলে যায়।
হুমায়ুন কবির প্রসঙ্গ একটু আগে থেকে শুরু করা যাক। তাঁর স্ত্রী, সুলতানা রেবু এতোবছর পর, ২০১২ সালের ২ মে লিখেছেন,
‘হুমায়ুনের সঙ্গে আমার পরিচয় পর্বটা এই রকম-আমরা দু’জনই একই শহরে (বরিশাল) বড় হয়েছি, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে কেউ কাউকে দেখিনি। হুমায়ুনের পিঠাপিঠি বড়বোন মমতা পড়ত আমার সঙ্গে। আমাদের বাড়িতে সব ভাইবোনের গল্পের বই পড়ান নেশা ছিল, কিন্তু সেই অনুপাতে কিনে পড়ার সামর্থ্য বেশি ছিল না। বন্ধুদের অফুরান সাপ্লাই পেয়ে যেতাম। মমতা নিজে দিতে না পারলেও ভাইয়ের (হুমায়ুন) কাছ থেকে বই এনে দিত। ১৯৬৫ সালে দু’জনেই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হই। ১৯৬৬ সালের শেষের দিকে লাইব্রেরির বারান্দায় প্রবল ঝড়বৃষ্টির মধ্যে হুমায়ুনের সঙ্গে আমার প্রথম কথা হয়। আমার হাতে ছিল লাইব্রেরি থেকে নেয়া অনেকগুলো বই আর বাইরে ঝড়বৃষ্টি-হুমায়ুনের ইচ্ছা ছিল আমার কিছু বই হল-গেট পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। আমি বলেছিলাম, ‘যে ভার আমি বইতে পারি না, সেটা আমি নেই না।’ আমাদের গুরু অধ্যাপক আহমদ শরীফের কাছে ঘটনাটি পরদিনই পৌঁছে যায়। শরীফ স্যার উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, ‘চালিয়ে যাও, হবে।’
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সুন্দর একটি বর্ণনা দিয়েছেন এই দুজনের সম্পর্কের।
‘১৯৬৮-৬৯-এর দিকে কী একটা কারণে যেন একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে গিয়ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে করিডোরে প্রাণের রঙিন উচ্ছলতাঐনা আমাদের সময়ের মতোই চঞ্চল-স্রোতে বয়ে চলেছে। হুমায়ুন আমাকে ওর কিছু সহপাঠী-সহপাঠিনীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। তাদের মধ্যে একটি মেয়ে আলাদা করে চোখে পড়ার মতো। মাজা ফরসা রঙের ছিপছিপে দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটির লম্বা বেণী পিঠের উপর দুলছে, চাউনি সপ্রতিভ। বিকেলে হুমায়ুন বাসায় এলে বললাম: বেশ সুন্দর তো মেয়েটি! কে? এত সুন্দর একটা মেয়ে তোমার সহপাঠিনী আর তুমি এখনোআর প্রেমে পড়োনি।
হুমায়ুন ছোট্ট করে নিশ্বাস ফেলল। আমি-যে ওর অজান্তে মেয়েটার জন্য ওর ভেতরের কাতরতা টের পেয়ে গেলাম, ও বুঝল না।
জিজ্ঞেস করলাম, নাম কী মেয়েটার?
ও বলল, সুলতানা রেবু।
এর দিন কয়েক পরেই হুমায়ুন এসে ওদের প্রেমের সুখবরটা দিল। হ্যাঁ, ঐ মেয়েটিই। এর পরে শুরু হল ওর প্রেমে আর কবিতায়-ভরা মাতাল দিনগুলো।
এই মেয়েটিকে নিয়ে একটা কবিতা আমরা সংগ্রহে রাখতে পারি।
পার্শ্ববর্তিনী সহপাঠিনীকে
কি আর এমন ক্ষতি যদি আমি চোখে চোখ রাখি
পদাবলী প’ড়ে থাক সাতাশে জুলাই বহুদূর
এখন দুপুর দ্যাখো দোতালায় পড়ে আছে একা
চলো না সেখানে যাই। করিডোরে আজ খুব হাওয়া
বুড়ো বটে দু’টো দশে উড়ে এল ক’টা পাতিকাক।
স্নান কি করনি আজ? চুল তাই মৃদু এলোমেলো
খেয়েছ ত? ক্লাশ ছিল সকাল ন’টায়?
কিছুই লাগে না ভালো; পাজামা প্রচুর ধুলো ভরা
জামাটায় ভাঁজ নেই পাঁচদিন আজ
তুমি কি একটু এসে মৃদু হেসে তাকাবে সহজে
বলনি ত কাল রাতে চাঁদ ছিল দোতালার টবে
নিরিবিলি ক’টা ফুলে তুমি ছিলে একা।
সেদিন সকালে আমি, গায়ে ছিল ভাঁজভাঙা জামা
দাঁড়িয়ে ছিলাম পথে হাতে ছিল নতুন কবিতা
হেঁটে গেলে দ্রুত পায়ে তাকালে না তুমি
কাজ ছিল নাকি খুব? বুঝি তাই হবে।
ওদিক তাকাও দ্যাখো কলরব নেই করিডোরে
সেমিনার ফাঁকা হল হেডস্যার হেঁটে গেল অই।
না – না – যেও না তুমি চোখে আর তাকাব না আমি
বসে থাকি শুধু এই; এইটুকু দূরে বই নিয়ে
এ টেবিলে আমি আর ও টেবিলে তুমি নতমুখী।
- হুমায়ুন কবির/ কুসুমিত ইস্পাত -
তাঁদের বিয়ে হয়েছিল ১৯৬৯ সালে।
১৯৭২ সালের ৬ জুন, সময় রাত প্রায় সাড়ে ১০টা। হুমায়ুন কবির, স্ত্রী সুলতানা রেবু তখন থাকতেন ছেলে সেতু ও মেয়ে খেয়াকে নিয়ে ইন্দিরা রোডের একটি বাড়িতে। সেই রাতে অসহ্য গরম পড়েছিল। সুলতানা রেবু জানালেন, হুমায়ুন কবির কখনো খালি গায়ে থাকতেন না। শীত কি গরম, একটা গেঞ্জি থাকতোই। কিন্তু সেই রাতে হুমায়ুন খালি গায়ে ছিলেন। সারাদিনের ক্লান্ত সুলতানা রেবু তখন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাই কখন হুমায়ুন কবির খালি গায়ে বাইরে গেল জানতে পারেননি। হুমায়ুন কবির বাসার সামনের খালি মাঠটায় শুয়ে ছিলেন, মনে হচ্ছিল তীব্র গরমে খানিকটা স্বস্তির আশায় খোলা আকাশের নীচে শুয়ে আছেন। বাড়িওয়ালা বা পাশের বাসার ছেলে বাইরে থেকে আসছিল। তারাই প্রথম দেখেন হুমায়ুন কবিরকে। দ্রুত এসে খবর দেন সুলতানা রেবুকে। ১৯৭২ সালের সেই রাতে কোথা থেকে একটা বেবিটেক্সি এনে দ্রুত নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলে, কিন্তু বাঁচানো যায়নি। মাথার পেছনে ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছিল।
সর্বহারা পার্টির দুইজন এসেছিলেন একটা সাইকেলে চড়ে। একজন মাঠেই ছিলেন, আরেকজন এসে কথা বলার জন্য ডেকে নিয়ে যান। নিশ্চই এই লোকটি খুব পরিচিত ছিলেন হুমায়ুন কবিরের কাছে, ফলে খালি গায়েই তিনি চলে যান তার সঙ্গে সামনের মাঠে। মাঠে অপেক্ষায় ছিলেন আরেকজন। সম্ভবত তিনিই পেছন থেকে গুলি করে হুমায়ুন কবিরকে।
কে হত্যা করেছিল। অনেকেই খসরু নামের একজনের কথা বলেন। প্রকৃতপক্ষে হুমায়ুন কবিরকে খুন করেছিল জামিল। জামিল তার দলের নাম। প্রকৃত নাম মালেক। এই মালেক এখনও জীবিত আছেন। যে পিস্তলটি দিয়ে গুলি করা হয়েছিল সেটি থাকতো ইকবাল নামের একজনের কাছে। হুমায়ুন কবিরকে হত্যার আগে, তার কাছে থাকা দুটি পিস্তল আর একটি এসএমজি নিয়ে নেওয়া হয়। সেই পিস্তল দিয়েই খুন হন হুমায়ুন কবির।
হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাঁড় করানো হয়েছিল তাঁর মৃত্যুর পর। দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনা হয়েছিল। ভাইয়ের বহিস্কারাদেশ মেনে না নেওয়া, বোনকে আশ্রয় দেওয়া, বোনের স্বামীকে সমর্থন করা এই ছিল তাঁর বড় অপরাধ। সাহিত্যিক হতে চেয়েছেন এটাও ছিল দলের চোখে অপরাধ। তাঁর পরিবারকে বলা আখ্যা দেওয়া হয় সামন্তবাদী বংশ। সংসার করাকে বলা হয় বুর্জোয়া জীবনযাপন।
মতভেদ শুরু হয়েছিল সিরাজ সিকদারের দল পরিচালনা ও ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়ে। আর এর পরিণতিতে পুরো একটি বংশ বিপর্যয়ের মুখে পরে যায়। হুমায়ুন কবির যে গোপন একটি দলের সঙ্গে একটি যুক্ত তা সবাই জানতেন। সময়টা ছিল এমনই যে, তরুণদের একটি বড় অংশই আকৃষ্ট হয়েছিল বিপ্লবী দলগুলোর প্রতি। এর মধ্যে স্বাধীনতা যুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থানের কারণে সর্বহারা দলে যোগ দেওয়া মানুষের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। আজকের বিখ্যাত অনেকেই সেই সময়ে গোপন এই দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। আজকের একজন বড় যাদুকর ছিলেন সেরকম একজন। কিন্তু তাদের মধ্যে অত্যন্ত অল্প সময়ে জীবন দিতে হল প্রতিভাবান এই মানুষটিকে।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছিলেন,
‘তাঁর প্রথম কবিতার বইয়ের নাম ছিল কুসুমিত ইস্পাত। এই ফুল আর ফলা একই সঙ্গে ছিল ওর মধ্যে। প্রেমের কোমলতার পাশাপাশি বিপ্লবের রক্তস্নানেও ছিল ওর একইরকম উৎসাহ।'
শেষ পর্যন্ত রক্তস্নানই হল বিপ্লবী হুমায়ুন কবিরের।
তাঁর মৃত্যুর পর তাঁরই বন্ধু ফরহাদ মজহারকে নিয়ে পুলিশ টানাটানি করেছিল। আহমদ ছফাও বাদ যাননি। ফরহাদ মজহারকে সন্দেহ করার ইঙ্গিত আছে আহমদ ছফার লেখায়। তবে এরা কেউ জড়িত ছিলেন বলে হুমায়ুর কবিরের পরিবারের সদস্যরাও মনে করেন না। হুমায়ুন কবিরের মৃত্যুর পর কণ্ঠস্বর পত্রিকা একটি সংখ্যা তাঁকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। সেখানে ফরহাদ মজহারের একটা কবিতা ছিল। তিনি লিখেছিলেন,
আমি বলতে পারতুম যেমন বন্ধুরা আমাকে বলে
আমি বন্ধুর মতোন গ্রীবা উঁচিয়ে বলতে পারতুম
হুমায়ুনের কাঁধে হাত রেখে বলতে পারতুম, ‘হুমায়ুন
আয় আমার সঙ্গে বোস, আমরা কিচ্ছু না-ছুঁয়ে বসে থাকব।’
জানিয়ে দিতে পারতুম ইস্পাতের-সঙ্গে কুসুমের-ভালবাসা ভালো নয়,
ভালো নয় সেতুর উপর দাঁড়িয়ে খেয়ার জন্যে অপেক্ষা করা
ভালো নয় ইন্দিরা রোডে রেবুকে ফেলে লেখক শিবিরে
মেতে থাকা
বলতে পারতুম ‘অত দ্রুত নয় হুমায়ুন, আস্তে আস্তে যা’
এই লেখাটি আমাদের সবার খেয়াদিকে উৎসর্গ করা। অদিতি কবির খেয়ার সহায়তা ছাড়া এই লেখা সম্ভব ছিল না।
(এতো কিছুর পরেও সিরাজ সিকদারের বিপ্লবের আয়ু বেশিদিন ছিল না। থুব কম সময়ের মধ্যেই তাঁর জীবনেও বিপর্যয় নেমে আসে। সিরাজ সিকদার ধরা পড়া নিয়েও আছে নানা গল্প। সেখানেও আছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের গল্প। পরের পর্বে তা)





শেষে এসে মন ব্যপক খারাপ হলো । তবে নিশ্বাস বন্ধ করে পড়ার মত লেখা, ঘটনা । অসাধারণ এই লেখাটা জমা রাখলাম । অনেক ধন্যবাদ মাসুম ভাই ।
মন খারাপ করার মতোই সব ঘটনা। দীর্ঘ এই লেখা পড়ছো বলে ধন্যবাদ তোমারে
আবারও একবার এই সিরিজ খুব মন খারাপ করে দিল।
সিরিজটা অসাধারণ চলছে।
সাথে আছি,
আগ্রহ বাড়ছে বৈ কমছে না।
সিরিজ প্রায় শেষ। আরেকটা হয়তো হবে
বলতে ভুলে গেছিলাম,
শেয়ার করা কবিতাটা চমত্কার।
কবিতাটি অসাধারণ
মনে করেছিলাম আজ আর ঢুকব না, কিন্তু পোস্ট পড়ে লগ ইন না করে আর পারলাম না।বিপ্লব.......।
বিপ্লব
দারুন দারুন দারুন!
তবে কি নির্মম সময় ছিলো তখন!
সময়টাও ছিল চরম অস্থির, সারা দুনিয়ায়। সেই সময়ে ঢেউ লেগেছিল এখানেও।
অনেক অজানা তথ্য ........ ধন্যবাদ মাসুমভাই।
পড়ছেন বলে ধন্যবাদ
সিনেমা হতে পারে এমন কাহিনী!
একমত। সিনেমার অনেক উপাদানই আছে পুরো ঘটনায়।
মাসুম্ভাই'রে ধন্যবাদ দেয়াই লাগে, আগ্রহ করে এগিয়ে অদিতি'র বাসা থেকে অনেক অজানা তথ্য জানার কষ্টটুকু করছেন, আমাদের সাথে তা শেয়ার করছেন।
আর অদিতি'র আম্মা'র কথা ভাবছি কেবল, কারন এই লেখার তথ্যগুলা আবার সামনে আনার জন্যে উনাকে সে বিবমিষাময় সময়গুলো স্মরণ করে, সেই কষ্টতে আবার পড়তে হয়েছে।
আমার বাড়তি পাওনা এটাই। অদিতির বাসায় গেছিলাম, সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। আবার অদিতির ফুফুর সংগেও দীর্ঘ কথা বলেছি। অদিতির জন্যই সম্ভব হয়েছে তা।
অনেক আগ্রহ জাগানিয়া সিরিজ...
পড়েন বইলাই তো লিখি
কত্ত কি যে অজানা...
আসলেই
কি নির্মম কি নির্মম কি নির্মম
নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি অনেক বেশি নির্মম
ইস ! কত কিছু জানতাম না ! এই সিরিজটার কি বই আকারে বের হবার সম্ভাবনা আছে ? আশা করি পরের পর্বটা শীঘ্রই আসবে । ভাল থাকুন ।
বই হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই
অনেক অজানা কাহিনী জানতে পারছি, ধন্যবাদ মাসুম ভাই।
পড়ার জন্য ধন্যবাদ
Excellent! I kept on waiting for it like my old days for Masud Rana. The main difference is - unfolding history as well as mystery. Masum is doing it in an artistic way by blending poetries in it. Keep writing.
অনেক ধন্যবাদ পড়ার জন্য
নেট নিয়ে ঝামেলার কারণে মন্তব্য করতে পারছিলাম না। বরাবরের মত অসাধারণ পোস্ট! মাসুম ভাই, একটা বই না হলেও কোন একটা বইয়ের পার্ট হতেই পারে। পোস্ট আমাকে উৎসর্গ করায় সম্মানিত বোধ করছি।
আম্মা মাঠে গিয়ে দেখতে পায় আব্বা শুয়ে আছে। অন্ধকারে আম্মা তাকে বলে- এখানে শুয়ে আছ কেন? ঘরে চল।
কয়েকবার ডাকাডাকিতেও আব্বা না ওঠায় আম্মা বসে পড়ে তার কপালে হাত রাখে, কপাল ভেজা। মুহূর্তেই আম্মা বুঝতে পারে কি হয়েছিল।
সর্বহারা মানুষের রাজনীতির নেতার মৃত্যুকে করুণ মনে হয় না আমার কাছে, ওটা তার পাওনা।
ওই রাতের পুরো সময়ের বর্ণনা শুনেছিলাম। অন্য কারো পক্ষে সেভাবে লেখা সম্ভব না। তবে যেটা লেখিনি সেটা হল, তিনি (আপনার মা) যদি জেগে থাকতেন, এবং দেখতেন কারা ডেকে নিয়ে গেল, তাহলে আপনাদের পরিবারের ইতিহাস হয়তো আরও করুণ হতো। সাক্ষী রাখার ঘটনা তো দেখা যায় না। খালাম্মা শেষ দেখা হয়তো দেখেননি, সেটা হয়তো আপনাদের জন্য ভাল হয়েছে।
অনেক কিছু, অনেককে নিয়ে মিথ, আমাকেও এখন আর টানে না। সুতরাং কারো কারো 'করুণ' মৃত্যু আপনাদের কারো কাছেই করুন মনে হবে না। কারণও নেই মনে হবার।
আমি তো আসলে এগুলো মনের তাগিদে লেখি ব্লগে, বইয়ের কথা ভেবে না। কারণ এগুলো আমার বিষয় না। অনেক কিছুই হয়তো জানিই না। সুতরাং বই মনে হয় হবে না।
আরেকটা কথা আমার আম্মা উচ্চশিক্ষার বলে একটি বাসা সহ চাকরী পেয়েছিলেন। চমৎকার একটি পরিবেশে আমরা মানুষ হয়েছি। অন্যদিকে আমার ফুপু লেখাপড়ার বেশি সুযোগ পান নি, কারণ খুব অল্প বয়স থেকেই জীবন সংগ্রামে নেমে পড়তে হয়েছে। তাঁর মেয়ে সেলিমা শাহনেওয়াজ সিমুর জীবনও তাই মসৃণ থাকেনি। আশা করি সিমুর মেয়ে মৌলির জীবন সুন্দর হবে।
ফুফুর পুরোটা জীবনই কাটলো বিপ্লব করতে করতে। শুরুতে মানুষের জন্য বিপ্লব, পরের জীবন টিকে থাকার বিপ্লব। অথচ এসব না করলে জীবনটা হয়তো অন্যরকম হতো।
মাসুম ভাই, পুরো সিরিজটা পড়লাম, সিরাজ সিকদারকে জানতাম, তার বিপ্লব সম্পর্কেও ধারনা ছিল, কিন্তু জানতাম না তার ব্যক্তিগত জীবনযাপন আর খতম রাজনীতির পেছনের কারন গুলো। ধন্যবাদ আপনাকে, দারুন করে আমাদের জানানোর জন্য নির্মম এই ইতিহাস।
ধন্যবাদ মানস। আপনি কি আমাদের মানস?
মাসুম ভাই, সিরিজটি পড়ে অনেক ভাল লাগলো। সিরাজ সিকদার সম্পর্কে জানতাম, তার উথান, তার চিন্তা, তার দর্শন, তার সংগ্রাম, তার মৃত্যু... কিন্তু জানতাম না পেছনের এই খতম রাজনীতির করুণ আর নিষ্ঠুর কাহিনী। ধন্যবাদ আপনাকে অর্থনীতির বাইরে নতুন কিছু উপহার দেবার জন্য। ভাল থাকুন
মন্তব্য করুন