ইউজার লগইন

চলমান থ্রেডের একটি বিচ্ছিন্ন অংশ- ৯

১.
আমাদের অফিসের সামনে একটা চা’ওয়ালা কাকা আছে। আমি কাকাই বলি। কাকা এই ৭৫+ বয়সেও প্রোডাক্টিভ। তার সবচেয়ে ছোট ছেলেটা নটরডেম স্কুলে পড়ে। ওয়ান বা টু’য়ে মনে হয়। পিচ্চিটা খুব্বি কিউট। পিচ্চিরা এমনিতে কিউট'ই হয়। এইটা আবার মাঝে মাঝে বাপের দোকানে বসে ক্যাশ সামলায়। আর বাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা বানায়। দেখতেই ভালো লাগে। আমি গেলেই এই পিচ্চির মাথাটায় পাঁচ আঙ্গুলে একটা চাপ দিই। সে মনে হয় বুঝতে পারে না, এটা তাকে ‘আদর’ করা হইসে। খানিকটা বিরক্তি নিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে।
কাকা’র অন্যান্য ছেলেগুলোও দোকানে বসে। তার কি দেরীতে বিয়ে হয়েছিলো কিনা, কে জানে! তার একটা ছেলেকেও আমার বয়েসী দেখি না। অথচ আমার বাবার চেয়ে অন্তত ২০ বছরের বড় হবেন বয়সে।
কাকার অন্য ছেলেগুলোও বিভিন্ন বেলায় দোকানে বসে। যেমন- মেজোটা বসে বিকেল চারটার দিকে। আমি অফিসে ঢোকার আগে মেজো ছেলের বানানো চা খেয়ে ঢুকি। সেই চা’টা মোটামুটি মানের হয়। কাকা ভালো চা বানাতে পারেন। তিনি চা বানাতে বসেন সন্ধ্যায়। আর কে না জানে; চা খেকোদের সন্ধ্যার চা’টা ভালো না হলে, একেবারেই চলে না। কাকাকে সন্ধ্যায় চা বানাতে দেখে দেখে আমার ধারণা হয়েছে, তার ব্যাবসায়িক বুদ্ধি চমৎকার। কিন্তু মানুষ হিসেবে অতিমাত্রায় সৎ হওয়ার কারণে, তিনি নিজের অর্থনৈতিক শ্রেণীর উন্নতি ঘটাতে পারেন নি।
এই বুড়ো ভদ্রলোক আমাকে কোনো কারণ ছাড়াই বেশ পছন্দ করেন। পছন্দ করে তার ছেলেগুলোও। পছন্দের মাত্রাটা সম্পর্কে আমার খানিকটা ধারণা ছিলো। একদিন বিকালে আমি ওই দোকানে গিয়ে এককাপ চা হাতে নিয়ে সিগারেট চাইলাম। মেজো ছেলে আর কিউট পিচ্চিটা ছিলো দোকানে। মেজোটা পিচ্চিটাকে বললো, ‌'ভাইরে গোল্ড লীফ দে।' পিচ্চির সাথে সাথে তেজোদীপ্ত উত্তর, 'আমি জানি ভাইয়ে কি খায়!'
তবে তাদের পরিবারে যে মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে কথাও হয় জানতাম না। একদিন কাকা’র স্ত্রী (তিনিও আমার মাএর চেয়ে বয়সে অনেক বড়) দোকানে এসেছিলেন। কাকা আমার সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময়, তিনি আবার স্বামীকে জিজ্ঞেস করছিলেন; 'এইটাই কি সেই পুলা, যার কথা তুমরা কও?' কাকা সঙ্গে সঙ্গে সামনের দুই ফোকলা দাঁত বের করে বিরাট একটা হাসি দিয়ে বসলেন। আমি নিজের তিনগুণ বয়েসী দুইজন মানুষের সামনে হঠাৎ ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেলাম। এই মানুষদ্বয়ের সন্তানগুলোর দিকে তাকালে মনটা ভরে ওঠে। একদিন হয়তো এরা দু'জন থাকবেন না। কিন্তু এ দু’জনকে মনে-শরীরে ধারণ করে নিয়ে বেঁচে থাকবে এদের সন্তানেরা। আমি তাদের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করি।
২.
চাএর দোকানীদের মধ্যে শাহবাগের সোহেলটাও চমৎকার। মিট মিট করে হাসে শুধু আমাকে দেখলে। আর কোনো কথা নাই। ওর পেটে বোম্ মারলেও কোনো কথা বের হবে না। তবে তার দোকানে গেলেই সে নীল রঙএর পানির পিপে কিংবা প্লাস্টিকের শীট বের করে দেবে। শাহবাগের আইল্যান্ডে ঐগুলার উপরে বসতে হয়। ওকে কোনো কিছুর জন্য একবারের বেশি দুইবার বলতে হয় না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, দাম নেয়ার সময় সে ইচ্ছা করে হিসাব ভন্ডুল করে। আমি খেয়াল করে দেখেছি; মোট যদি বিল হয় ২৩ টাকা, সে বলবে ২০ টাকা। আবার কখনো বিল হয়তো ৪৭-৪৮ টাকা হয়ে গেছে। ওকে ১০০ টাকার নোট দিলে ৬০ টাকা ফেরত দিয়ে, নির্বিকারভাবে আরেক ক্রেতা কি চায় সেদিকে নজর দেবে। এ কারণে ওর দোকানে বসলে কি খাচ্ছি না খাচ্ছি হিসাব রাখতে হয়।
যেসব দোকানদার সবসময় একটু বেশি টাকা রাখার তক্কে থাকে, তাদেরকে আমি পছন্দ করি। কারণ তখন আমার নিজের কোনো হিসাব রাখা লাগে না। ওরাই হিসাব করে দেয়। এর চার্জ বাবদ হয়তো আলাদা দুই-পাঁচ টাকা বেশি রাখে। সোহেল সেটা তো রাখেই না, উল্টা কম রাখে। এটা সে শুধু আমার সঙ্গেই করে নাকি সবার সঙ্গে করে, আমি জানি না। আমার ধারণা এই রাজার হালে ব্যাবসা করার অভ্যাসটাই একদিন ওকে রাজা বানিয়ে দেবে। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে সেইদিনটা দেখার অপেক্ষায় আছি।
৩.
মাওলানা শাহজাহানপুরী কানে খাটো। বেশিরভাগ কথাই শুনতে পায় না। সারাদিন শুয়ে থাকবে আর বুড়ির সঙ্গে খিট খিট করবে। কিন্তু আমি ওর কুড়ে’র ভেতরে গিয়ে ঢুকলেই বিছানায় উঠে বসবে। ‘আসেন আব্বা আসেন, বসেন।’- বলে বিছানার একপাশে জায়গা করে দেয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়বে। শুধু বুড়োই নয়, একসময় বুড়িটাও এসে পাশে বসবে। একগাদা নালিশ জমা থাকে বুড়ির কাছে সবসময়। মাওলানা শাহজাহানপুরীর ব্যপারে। আমি মনোযোগ দিয়ে সেগুলো শুনি। অধিকাংশই শারীরিক অনিয়ম সংক্রান্ত নালিশ। কয়েকটা নমুনা দিই- ‘ডায়বেটিসের রুগী, তাও সারাদিন চিনি দিয়ে চা খায়। কোনো নিয়ম-কানুন নাই। খাওয়া-দাওয়ার ঠিক নাই।’
আমি এসব শুনে-টুনে বুড়োকে ভয় দেখিয়ে আসি। ডায়বেটিসে অনিয়ম করলে কি হয়! শরীরের কি হয় আর মনের কি হয়! সবচেয়ে বড় কথা, জমানো টাকাগুলোর কি হয়! শরীর বা মনের চেয়ে টাকার কথায় বেশি কাজ হয়। এই জিনিসটার কথা যখন বলি তখন দু’জনের মুখ খানিকটা শুকিয়ে আসে। যদিও আমি প্রাণপনে চাই, কখনোই যেন আমার কথাগুলো তাদের জন্য সত্যি না হয়। তবুও সাবধানের মার নেই ভেবে, ভয় দেখানোর সময় কোনো মায়া-দয়া দেখাই না।
জানি না, বুড়োবুড়ি আমার কথাগুলো যত মনোযোগ দিয়ে শোনে তত মনোযোগ দিয়ে মানে কিনা। কিন্তু শোনার সময় তারা একদম লক্ষী ছাত্র-ছাত্রী একেকজন। হয়তো এরপরে দু’চারদিন তারা আমার কথা মানেও। এতটুকুও যদি তারা আমার জন্য করে তো, আমি খুশি। ভীষণ খুশি। আর না মানলেও কোনো আক্ষেপ নাই। আমি ওস্তাদের কাছে তাদের দুইজনের দীর্ঘ নিরোগ জীবনের জন্য দরখাস্ত করেছি। মনে হয় ওস্তাদ সেটা অনুমোদনও করেছে। কারণ এ দুইজনকে অনেক দিন হচ্ছে চিনি। সৌভাগ্যের কথা, এর ভেতরে কখনোই কোনো অপ্রত্যাশিত সংবাদ আমার শুনতে হয় নি এদের ব্যপারে।
৪.
রিকসাওয়ালা কাশেম কখনো আমার কাছে ভাড়া কম নেয় নাই। বরং সবসময় ৫-১০ টাকা বেশি নিতো। তার যুক্তিটা ছিলো, 'আপনে দেশি মানুষ। তাও একই গ্রামের মানুষ। আপনের কাছ থিকাই তো নিমু।' আমি বিরক্ত হতাম। কিন্তু তাও তার রিকসা ছাড়া আর কারো রিকসায় চড়তাম না। কারণ প্রতিদিন সকালে একটা নির্দিষ্ট সময়ে, সে আমার বাসার সামনের মোড়ে এসে দাঁড়ায় থাকতো। মোড়ের পেপার স্ট্যান্ডের দুলাল অনেকদিন আমাকে বলেছে, ‘কাশেম কিন্তু আপনে না আসা পর্যন্ত আর কোনো প্যাসেঞ্জার উঠায় না।’
আমি কথাটা শুনে ভাবতাম, মানুষ কতোটা মহৎ হলে এরকম একটা মহানাগরিক-দরিদ্র-ঘিঞ্জি জীবন যাপন করেও, সামান্য পরিচিত কারো জন্য এভাবে সময় বের করতে পারে? আমি সাইকেল কেনার পর আস্তে আস্তে কাশেমের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেল। দেখা-সাক্ষাৎ'ও কমলো সমানুপাতিক হারে।
অনেকদিন পর একদিন নয়াপল্টনে বিএনপি অফিসের সামনে জ্যামের মধ্যে বসে আছি। পাশে এসে দাঁড়ালো কাশেমের সিএনজি। ওর রিকসায় চড়ার সময়ই সে বলতো, রিকসা বাদ দিয়ে সিএনজি কিনতে চায় একদিন। চোখের সামনে এমন জলজ্যান্ত একটা স্বপ্নপূরণ দেখতে পেয়ে আভিভূত হলাম। কাশেম সিএনজি’র গেট খুলে বের হয়ে এসে আমার সঙ্গে শেক-হ্যান্ড করলো। বললো, ‘স্যার আপনাদের দোয়ায় রিকসা ছেড়ে দিছি। এখন সিএনজি চালাই।’ আমি তাকে বললাম, ‘খুব তাড়াতাড়ি এইটা ছেড়ে ট্রাক চালানোর ফিকির করো। তোমারে আরো উপরে উঠতে হবে।’
কাশেমের চোখে যে চকচকানিটা সে সময় আমি দেখেছিলাম, সেটা ছিলো একটা অকৃত্রিম সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ। সামনাসামনি কথা বলার সুবিধা হচ্ছে এই যে, এক্সপ্রেশনে অর্ধেক কথা বলে দেয়া যায়। কাশেমের চোখের অভিব্যক্তি আমাকে বলে দিয়েছিলো, সে অবশ্যই একদিন ট্রাকের মালিক হবে। এতদিনে হয়তো হয়েই গেছে। হয়তো একাধিক ট্রাকের মালিকও হয়ে থাকতে পারে। উদ্যমী তরুণটির অনেক অনেক ভালো হোক। ভালো হোক দুপচাঁচিয়াবাসী তার পরিবারের সব সদস্যের।
৫.
আমার অন্তরের শুভকামনাগুলো রইলো এদের সবার জন্য। যাদেরকে আমি চিনি না, শুভকামনা রইলো তাদের জন্যও। প্রতিটি শুভাকাঙ্খীর শুভেচ্ছা আমাকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। নাহলে তো কবেই মরে গিয়ে হারিয়ে যেতাম অষ্টপাকের চক্করে। জীবন যে ভীষণ যন্ত্রণার।
---

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

লীনা দিলরুবা's picture


মীরকে কে যে পছন্দ করেনা এইটা গবেষণা করে বের করে হবে Big smile

জীবন যন্ত্রণার কে বলছে? Puzzled জীবন খুবই সুন্দর আর আনন্দময়, মাঝে-মধ্যে পেজগি লাগে, কিন্তু এইটা কোনো ব্যাপারনা সান্তনা

জেবীন's picture


কতো সহজে কতোজনের সাথে মিশতে পারেন, তাদের কাছের জন হন, এটাও কি কম পাওয়া!. Smile

জীবন বড়ই যন্ত্রনাদায়্ক, আসলেই Stare

মেসবাহ য়াযাদ's picture


অবাক ব্যাপার মীর। এত চমৎকার একটা লেখায় মন্তব্য মাত্র দুইটি ? আমি অবশ্য তখন অনিবার্য কারণে ব্লগে লগ ইন করতাম না...
কবে যে আপনার মত এত সুন্দর করে লিখতে পরবো ?
কাশেমের মত আমিও স্বপ্ন দেখি...

জ্যোতি's picture


এই অসম্ভব সুন্দর লেখাটা কোথায় ছিলো?আপনি তো অনেক ভালো।
জীবন কেমন সে বিষয়ে কোন বক্তব্য নাই।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!