ঘড়ি
বাড়ির পাশেই স্কুল । রাস্তার সমান্তরালে পূর্ব-পশ্চিম লম্বা একটা সেমিপাকা ভবন ।ইটের দেয়ালের উপর টিনের চাল । প্রাইমারী স্কুল আর হাই স্কুল দুই-ই এই একই ভবনে । একেবারে পূর্ব দিকের পাঁচটি কক্ষ প্রাইমারী স্কুলের জন্য নির্ধারিত । সেখানে ক্লাশ ওয়ান থেকে ক্লাশ ফাইভ পর্যন্ত পড়ানো হতো । আর বাকী অংশে সিক্স থেকে নাইন পর্যন্ত । পশ্চিম দিকে উত্তর-দক্ষিণ লম্বা অন্য একটি পাকা দালান (যেটিতে ছাদ ছিল, টিনের চাল দেওয়া বেশ চওড়া বারান্দাও ছিল) । সে দালানে হেডমাস্টার, অন্যান্য শিক্ষক এবং ক্লাশ টেনের জন্য ছিল একটা করে কক্ষ । এই বিল্ডিংয়ের আরও কয়েকটি কক্ষ লাইব্রেরী ও হেডমাস্টারসহ কয়েকজন শিক্ষকের আবাসিক কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো । এই স্কুলে একটানা দশ বছর পড়ার পর স্কুল জীবন সমাপ্ত হয়েছিল ।
সারা স্কুলে ছিল একটা মাত্র ঘড়ি। সেটি ছিল হেডমাস্টার যেখানটাতে বসতেন ঠিক তার মাথার উপরে। আর সে ঘড়িই ছিল সে সময়ে সময় দেখবার একমাত্র অবলম্বন । পেন্ডুলামবিশিষ্ট সে ঘড়িতে I, II, III, IV, V, VI, VII, VIII, IX, X, XI, XII এভাবে ১ থেকে ১২ পর্যন্ত লেখা ছিল। এ ছাড়া ছিল 13,14………..23,24 লেখা । ঘন্টা ও মিনিটের কাঁটা ছাড়াও তৃতীয় একটা কাঁটা ছিল, আর ঘড়ির ডায়ালে লেখা ছিল 1,2,3.................29,30,31 পর্যন্ত । ঘড়ির ঐ তৃতীয় কাঁটা, ১৩-২৪ আর ১-৩১ লেখা থাকার কারণে সময় দেখা কঠিন হয়ে উঠত । এভাবে ১৩ থেকে ২৪ পর্যন্ত লেখা ঘড়ি পরে দেখেছি, কিন্তু আর কোথাও পেন্ডুলামবিশিষ্ট দেয়াল ঘড়িতে এভাবে তারিখ লেখা আর তৃতীয় কাঁটা দেখেছি বলে মনে পড়েনা। এ ছাড়া একটা ঘড়ি ছিল সৌখিন এক দরজীর ঘরে । সে দরজীকে ডাকতাম মামু বলে । সেলাই মেশিন আর ঘড়ি দু’টোই ছিল সে সময়ে আমার কাছে বড়ই আকর্ষণীয় বস্তু। দরজী মামুর কাছে ঘড়িতে সময় দেখা আর সেলাইকলের খুঁটিনাটি দু’টোই শেখা হয়ে গিয়েছিল ।
সে সময় শার্টের বামদিকের বুক পকেটের নীচে আর একটা পকেট থাকতো । সেটাকে বলা হতো ঘড়িপকেট । এতে রাখা হতো পকেটঘড়ি । হাতঘড়ির মত দেখতে, আকারে একটু বড়, বেশ লম্বা একটা সুতা বাঁধা থাকতো এতে । সে সুতার আরেক প্রান্ত আটকানো থাকতো শার্টের বোতামের সাথে । সময় দেখা ছাড়াও আভিজাত্য প্রকাশ করতে এ ঘড়ির অবদান ছিল । হাতঘড়ি দেখা যেত কালেভদ্রে । আর দামও ছিল অনেক* ।এরপর হাতেহাতে ঘড়ি পরার চল শুরু হলো জাপানী সিটিজেন ঘড়ি বাজারে আসবার পরে, ষাটের দশকের শেষার্ধে** । তার আগে ঘড়ি তৈরী হতো শুধুমাত্র সুইজারল্যান্ডে, আমাদের ধারণা ছিল তা-ই ।
বর্তমানে হাতঘড়ির প্রচলন তো প্রায় উঠেই যাচ্ছে । একটা সময় ছিল যখন হাতঘড়ি ফ্যাশনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল । কেউ বাম হাতে আবার কেউবা ডান হাতে ঘড়ি পরে তা দর্শনীয় করে তুলবার জন্য ব্যাস্ত হয়ে থাকত । কেউ যদি না দেখল, তবে আর কিসের ঘড়ি পরা! বাজারে কোন জিনিষ কিনতে গেলে ঘড়িপরা হাত এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করতো, ‘ঐটার দাম কত?’ এখন মোবাইলে ঘড়ি, ল্যাপটপে ঘড়ি, বাড়িতে প্রত্যেক ঘরে দেয়ালে ঘড়ি, শোপিচে ঘড়ি – ঘড়ি নেই কোথায় ! কে খামাখা হাতে একটা বাড়তি ও অপ্রয়োজনীয় ফালতু ভার বহন করে ? হাতঘড়ি এখন আর ফ্যাশান নয়, মনে হয় দামী মোবা্ইল সেট সে জায়গা দখল করেছে । এখনকার ছেলেমেয়েদের দেখে অবশ্য কখনও-সখনও মনে হয়, কোন রকম ফ্যাশন না করাটাই এখনকার ফ্যাশান ।
==========================================================
(*আমার পিতা তার বড় জামাতাকে সেই আমলে (পঞ্চাশের দশক বা তারও আগে)একটা হাতঘড়ি কিনে দিয়েছিলেন। শুনেছিলাম সেটার নাম ছিল সাইমা (Sigma), আর দাম নাকি ছিল ৩০০ টাকা।)
[**ইউনিভার্সিটির শেষ বর্ষে এসে স্কলারশিপের টাকা হাতে পেয়ে আমার ঘড়ি পরার হাতেখড়ি হয়। তখন জাপানী সিটিজেন পাওয়া যেত ৮০ টাকায়, আমি কিনেছিলাম সুইজারল্যান্ডের ফেবারলিউবা ১২৫ টাকার বিনিময়ে ।]





আমাকে খুব ছোটবেলায় একটা হাতঘড়ি কিনে দেয়া হয়েছিল যেটি গোসল করার সময় শুধু খুলতাম, বাদবাকী সময় হাতে বেঁধে ঘুরতাম এমনকি ঘুমাতে গেলেও। ঘড়ির প্রতি খুব দূর্বল ছিলাম, এখনো তাই আছি, কানে- নাকে- হাতে কোথাও কোন অলংকার নেই শুধু এক হাতঘড়ি
আপনার স্মৃতিচারণ ভালো লাগলো নাজমুল ভাই।
ধন্যবাদ ।
আমার মনে হয় না, হাত ঘড়ি একদিন উধাও হয়ে যাবে! হাত ঘড়ি ছাড়া চলে কি করে!

আপনার জন্য, নিন। আমার প্রিয় ঘড়ি ব্যান্ড - ওমেগা।
ওমেগা হাতঘড়ি পেয়ে খুশি হলাম । ধন্যবাদ ।
আমার একটা ঘড়ি ছিল, ' সিটিজেন' ব্রান্ড এর। টানা পাঁচ বছর ইউজ করার পা নষ্ট হয়ে যায়, এরপর আর ঘড়ি কেনার প্রয়োজনবোধ করিনি...।
ঘড়ি না-পরা বুদ্ধিমানের কাজ । বিয়েতে একটা ঘড়ি পেয়েছিলাম । বিয়ের ক'দিন পরে বৌ নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছি। ট্রেন যশোর স্টেশন ছাড়বার পরপরই এক ভদ্রলোক টান মেরে আমার ঘড়িটা নিয়ে দিল এক লাফ । আমার হাতে থাকলো ছিনতাইকারীর নখের আঁচড়, আর মনের মধ্যে তীব্র যন্ত্রণা ।
একটা পকেট ঘড়ির শখ ছিল কিন্তু কেনার জন্য খুঁজে পাই নাই।
এক কাজ করতে পারেন । হাতঘড়ির চেইন বা বেল্ট ফেলে দিয়ে তাতে একটা লম্বা কালো সুতা বেঁধে পকেটে রাখুন। শখ পূরণের জন্য মানুষ কত কিছু করে !
ছোট বেলায় ভাল রেজাল্টের উপহার ছিল হাতঘড়ি। কি যে অনুভূতি! আর এখনকার বাচ্চাদের প্রথম পছন্দ মোবাইল।
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলায় তো প্রগতি ।
মজার বিষয় হৈল, ঘড়ি কিন্তু এখনো গিফট্ করার জন্য একটা ভাল জিনিস।
ঠিক ! কাজে লাগুক বা না-লাগুক!
আমার একটা দামি সোনালি ঘড়ি ছিল কলেজ জীবনে। ওটা পরলে নিজেকে বর্বর (জামাই জামাই) লাগত বলে দুলাভাইকে দিয়ে দিয়েছি
সখ ছিল সোনালী রঙের ঘড়ির ।নিজে কেনা বা অন্যের উপহারে কখনো সোনালী আর জোটেনা। শেষ জীবনে হকি ফেডারেশন থেকে সৌজন্য উপহার হিসেবে একটা পেয়েছিলাম। সোনালী চেইন ছিলনা, ছিল কালো রঙের চামড়ার বেল্ট । তাই বোধহয় বর্বর মনে হতোনা । ব্যাটারী শেষ - এখন পড়ে আছে ।
বিয়েতে জামাই কে ঘড়ি দেয়া একটা অপরিহার্য কাজ ।
হ্যাঁ, সাইকেল, ঘড়ি, আংটি । পরে এর সাথে যোগ হয়েছিল রেডিও । তারপর সাইকেলের জায়গায় মোটর সাইকেল। এরও পরে রেডিওর স্থান দখল করলো টেলিভিশন । এবং ক্রমান্বয়ে......।
স্মৃতিচারণ ভালো লাগলো, প্রাচীন বন্ধু।।
প্রাচীন? কোন অর্থে?
মনে হয় 'ব্যাকডেটেড' । সত্য কথা ।
এখানে 'প্রাচীন বন্ধু' বলতে 'বিজ্ঞ বন্ধু' বলা হয়েছে নাজমুল ভাই। অবশ্যই 'ব্যাকডেটেড' নয়।
আসলে আমাদের মধ্যে যদিও আপনি মনের দিক থেকে তরুণ তবে বয়সে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতায় সবকিছুতেই তো আপনি আমাদের অগ্রজ। কাজেই....
অবিজ্ঞতায়ও কিন্তু আমি অগ্রজ ! এখনকার তরুণরা সবকিছুতেই আমার চেয়ে অনেক বেশি বিজ্ঞ ।
সময়ই ঠিক করে দিবে কি টিকে থাকবে আর কি নয়। তবে ঘড়ি আজকাল সময়ের চেয়ে বেশি ফ্যাশনের কাজ ব্যবহার হয়।
হাতঘড়ি ছাড়া তো এক সময় বিয়া হইতো না।
এখনো ঘড়ি ছাড়া বিয়ে হয় না । বাসরঘরে সময়ের হিসাব খাকেনাতো। তাই সময়ের কল....
ছোটবেলায় ঘড়ি পরার সখ ছিল। কিন্তু স্কুলে এই ব্যাপারে কড়াকড়ি করা হত। দামী ঘড়ি পরে আসা একদমই বারণ ছিল। এস এস সি পাশের পর ঘড়ি কিনলাম একটা, আরেকটা উপহার পেলাম কদিন পরেই। দুটোই বেশ সম্ভ্রান্ত সুইস বংশীয়। হাফ হাতা শার্ট পরে মানুষকে সময় সম্পর্কে ত্যক্ত বিরক্ত করে ছাড়লাম।
দুই মাস পরেই আমাদের বাসায় ডাকাতি হল।
আমার ঘড়ি তো নিলই, সময়বোধটাও নিয়ে গেল সাথে।
দুষ্টু লোকে বলে - সেই থেকে আমি বড়ই অগোছালো, সময়জ্ঞানহীন।
কান্ডজ্ঞান থাকলে আর সব ঠিক ।
এরকম স্মৃতিচারণগুলো ক্লাসিক! ঘড়ি নিয়ে আমার স্মৃতিগুলো নাড়াচাড়া করতে শুরু করেছে লেখাটা পড়ে।
আমাদের সবার জীবনই ছোট ছোট কত স্মৃতির ভান্ডার । মাঝে মাঝে মনে পড়ে-আবার হারিয়ে যায় । এগুলো বলতে পারলে ভাল লাগে- অন্যদের হাতড়ে পাওয়া স্মৃতি জানলে অতীতে ফিরে যাবার আনন্দ উপভোগ করা যায়। বলে ফেলুন- আমাদের অংশীদার করুন।
প্রথম ঘড়ি পড়ি বাপের পুরানটা। তারপর ক্যাসিও কিনেছিলাম। তবে ঘড়ি পড়া হয় নাই তেমন কারণ হাত চিকন। ঘড়ি পরলে লেরলের করে। শ্বশুর বাড়ি থেকে পাওয়া সোনালি রংয়ের ঘড়ি আলামারির ভিতর রাখা আছে।
শুধু শুধু পড়ে থাকলে জিনিষ নষ্ট হয়ে যায় । আলমারি থেকে আজই বের করুন, হাতে পরুন । ঘড়ির কাঁটা ঘোরে, সময় দেয় । আর ঘড়ি 'লেরলের' করলে সেটা হয় ইস্টাইল ।
ভাই, কেট উইন্সলেট একটা লঙ্গিন্স ডলসি ভিটা'র কমার্শিয়াল করসে, চোখে পড়েছে কি? ইদানীং টাইমের ব্যাক পেজ-এ এই অ্যাডটাই যায়।
দেখলাম। সুন্দর! ভাল লাগলো । ধন্যবাদ ।
মন্তব্য করুন