স্মৃতিকথা – ৩
স্মৃতিকথা – ১
স্মৃতিকথা – ২
বছর শেষ হতে চলল কিন্তু বেড়াতে যাওয়া হল না এখনো ! মামা বাড়ি থেকে বার বার তাগাদা দিচ্ছে- তোরা কবে আসবি? ধান উঠে গেছে, তোরা এলে একসাথে পিঠা খাব। আমি বলি, মামা এখন ছুটি পাব না। অন্যদের সাথে যোগাযোগ করে ঠিক একই উত্তর পান মামা। তাই নিয়ে খুব আক্ষেপ মামার- খুব শহুরে হয়ে গেছিস, গ্রামের প্রতি তোদের আর কোন টানই নেই!
গ্রামের যাবার কথা আসলেই মনটা কেমন যেন উৎফুল্ল হয়ে ওঠে, নাগরিক জীবনের নানা ব্যস্ততা স্বত্তেও প্রতি বছরই গ্রামে যাওয়ার একটা প্রচলন চালু ছিল আমাদের ঢাকায় বসবাসকারী আত্মীয়স্বজনদের মাঝে। সবাই একসাথে গ্রামে যাওয়ার একটা আলাদা মজা আছে। ছেলেবেলায় সব কাজিনরা একসাথে হলে যে কি আনন্দ হত! এখন মনে পড়লে খুব আফসোস হয়। আগের সেই মজাটা যদিও এখন আর পাওয়া যায় না তবুও সবাই মিলে একসাথে যাওয়া, কিছুদিন একসাথে বেড়ানোর আনন্দটাও কম না। একসাথে লঞ্চে বাড়ি যাওয়ার মজাটাও একটু অন্যরকম! কেবিনগুলোর সামনে চেয়ার পাতা প্রশস্ত বারান্দা, অনেক রাত ধরে জম্পেশ চায়ের আড্ডা আর সবার বাসা থেকে আসা রকমারি খাবারের স্বাদ একসাথে সবাই মিলে শেয়ার করে নেয়ার অন্যরকম আনন্দ!
আমাদের জীবনে আনন্দের সময় বড় অল্প! খুব দ্রুত ঐ সময়গুলো ফুরিয়ে যায়। ছেলেবেলায় গ্রামে যাওয়ার জন্যে থাকতো দীর্ঘ প্রতীক্ষা। প্রতি ডিসেম্বরে গ্রামে কাটানো অদ্ভুত নস্টালজিক সময়গুলোর কথা মন থেকে মুছে যাবে না কখনো। মাঝরাতে খেজুর গাছ থেকে পাড়া টাটকা রসের স্বাদ এখন প্রায় ভুলতে বসেছি। নানা বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের দু’পাড়ে সারি সারি খেজুর গাছে ঝুলানো রসের হাড়ি থেকে রস পেড়ে সেই রাতেই পায়েস করে খাওয়ার মজা আর এখনো মনে গেঁথে আছে। নানা আজ নেই, সারি সারি খেজুর গাছ আজ আর কেউ কাটে না। আমাদের আর নিয়ম করে ডিসেম্বরে দল বেঁধে বাড়ি যাওয়াও হয় না এখন আর। নানা বাড়ির সেই উৎসবমুখর পরিবেশ মিস করি খুব!
বড় মামার সাথে মাছ ধরতে যাওয়া কিংবা পাখি শিকারের কথাও খুব মনে পড়ে। পাখি শিকার ছিল মামার নেশার মত। দলবল নিয়ে তিনি বেড়িয়ে পড়তেন, কখনো নদী পার হয়ে বহুদূর পর্যন্ত চলে যেতাম মামার সাথে সাথে, ফেরার সময় আমাদের একেকজনের দুহাত ভারী হয়ে যেত শিকার করা পাখীদের ভারে! তখন না বুঝে পাখি শিকারে যে আনন্দ পেতাম এখন ততটাই অনুশোচনা হয় প্রকৃতির অলঙ্কার নিরীহ পাখিগুলো হত্যা করার জন্য। মামাও এখন তার ভুল বুঝতে পেরেছেন তাই পাখি শিকারে আরোপ করেছেন কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
সেই ছেলেবেলা থেকেই গ্রাম আমাকে খুব টানত। গ্রামের কথা আসলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমার প্রিয় নদীর ছবি। ভরা পুর্নিমায় ওর মায়াবী রুপ আমায় আবিষ্ট করে রাখতো সারাক্ষণ। এখন সেই পুর্ণযৌবনা নদী আর আগের মত নেই! আমার স্বপ্নের চেনা পথে আজ কাঁকড় বিছানো। ওখানে আজ ধুলো জমেছে অনেক! যে নদী আমাকে প্রতিনিয়ত টানত, ওর কাছে গেলে এখন মন খারপ হয়ে যায়! নদীর যেখানে ছিল বিস্তীর্ন খোলা প্রান্তর, ধবল বক আর বালি হাঁসদের মুক্ত ওড়াওড়ি- সেখানে আজ ইটের ভাটার কালো ধোঁয়ার আস্তরণ! কেমন যেন বদলে গেছে সবকিছু। বদল সময়ের দাবী-এটা জানি, কিন্তু সেই বদলের কোন কিছুই যেন পজিটিভ নয়। পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে নিজেকে ঠিক মিলাতে পারি না! কোন কিছুই আর আগের মত নেই, না পরিবেশ না মানুষগুলো!
এখন বাড়িতে যাওয়া হয় বিভিন্ন প্রয়োজনে। হয়ত দু-একদিন থাকা হয়, কাজ শেষ করে ফিরে আসি কর্মস্থলে, এটাই বাস্তবতা। তবুও খুব মিস করি হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলিকে।
শেষ হয়ে এল বছর। অনেক ঘটনাবহুল আরও একটি বছর। চাওয়া পাওয়ার হিসেব মিলাতে গেলে অনেক অপ্রাপ্তি যোগ হয়েছে এ বছরে। বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু এখনো স্বপ্নই রয়ে গেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী এখনো নিরবে কাঁদে! ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তি বার বার রুদ্ধ করে দিচ্ছে বিচারের পথ। খুব আশাবাদী ছিলাম এ বছর হয়ত বিচার হবে, এই সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল অনেক কিন্তু দিনে দিনে হতাশা বাড়ছে। আর মাত্র কয়েকটা দিন! তারপর শুরু নতুন বছর। নতুন আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে শুরু হবে পথ চলা। সেই পথ কতটা কন্টকমুক্ত হবে জানিনা।
শীত বেশ জাঁকিয়ে বসেছে এবার! কুয়াশা ঢাকা সকালটাকে কেমন যেন অদ্ভুত লাগে আজকাল। কোন কোনদিন সুর্যের দেখা মেলে না সারাদিনে। সুর্য উঠুক আর না উঠুক অফিসে তো যেটেই হবে। রাস্তার যানজট এড়াবার জন্যই আমি একটু সকাল সকাল বের হই। এই হিম শীতল সকালেও দেখা যায় শীতে কুঁকড়ে হেঁটে চলা স্বল্প আয়ের গার্মেন্টস কর্মীদের। কারো কারো গায়ে থাকে না শীত নিবারণের জন্য তেমন কোন গরম কাপড়। উত্তরাঞ্চলের মানুষের অবস্থা তো আরও বেগতিক! মাঝে মাঝে মনে হয় শীত শেষ হয় না কেন? তাহলে অন্তত এই মানুষগুলো রক্ষা পেত!





শেষ প্যারাটায় আইসা মন খারাপ হয়ে গেলো
পড়ার জন্য ধন্যবাদ শুভ ভাই।
মন খারাপ করা ছাড়া আমাদের যেন কিছুই করার নেই !
আমারও প্রতিনিয়ত মন খারাপ হয়।
পড়তেছি!
নস্টালজিক লেখার শেষে এসে মন খারাপ করিয়ে দিলেন।
বাস্তবতা বড় বেশি নিষ্ঠুর..
আমরা সবাই নিষ্ঠুর বাস্তবতার শিকার!
আপনাকে আমার মত রোগে ধরেছে। চমৎকার স্মৃতি আপনার। আমিও গাঁয়ের ছেলে। অনেক মিল আছে আপনার স্মৃতির সাথে আমার স্মৃতির। মাঝে মাঝে স্মৃতি স্মরণ করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠি।
স্মৃতি যখন দরজায় কড়া নাড়ে তখন সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়!
স্মৃতি কাতর করে দিলেন, চমৎকার একটি লেখা।
পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
আপনার নানা বাড়ির সাথে আমার নানাবাড়ির বেশ মিল আছে। পাখি শিকার - মাছ শিকার
ভাল লাগলো লেখাটা পড়ে
সব নানাবাড়িতেই মনে হয় মধুর হাড়ি আছে
মন্তব্য করুন