ধূসর গোধূলিঃ ৩১ - নতুন দিনের ডাক
বছর শেষ হয়ে আসছে। কলাবতী বাজারের ক্লাবের ছেলেদের মধ্যে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান আয়োজনের বেশ ব্যস্ততা পরিলক্ষিত হচ্ছে। শ্যামল, তাপস, রিয়াজ, আসাদ, তপু, রঞ্জুদের দিনের বেশীর ভাগ সময় কাটছে ক্লাবঘরেই। সকাল বিকাল ক্লাবঘরে চলছে রিহার্সেল আর সেই সাথে বটতলায় অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ষ্টেজ তৈরির কাজ এগিয়ে চলেছে জোরেশোরেই। সামনে নির্বাচনের ঝামেলা এড়াতেই এবার বটতলায় অনুষ্টান আয়োজনে কোন বাধার সৃষ্টি করেনি বাদল আর মজনুরা। বরং যেচে আসছে সাহায্য করার জন্য।
দুপুরের পর থেকেই বটতলায় ষ্টেজ বানানোর কাজ তদারকি করছে আসাদ আর তাপস। বিভিন্ন বাড়ি থেকে জোগাড় করা হয়েছে বাঁশ, কাঠ ও অন্যান্য সামগ্রী। বটতলার সামনের খোলা মাঠে দর্শকদের বসার জন্য মাটি ফেলে সমান করা হচ্ছে। বাজারে যাবার পথে বটতলার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে সাঈদ খান। মাঠের দিকে হেলে পড়া গাছের ডাল থেকে নেমে আসা কিছু ঝুরি ছেঁটে দিতে দিতেই আসাদের চোখ পড়ে সাঈদ খানের দিকে। একটু পরই নেমে আসে ও।
-চাচা, দর্শকের বসার জায়গাটা আরও বড় করতে পারলে ভাল হইত। সাইদ খানের উদ্দেশ্যে বলে আসাদ।
-তো কর, সমস্যা কি?
মাঠের কোণার দিকে হাটের দিনে ব্যবহারের জন্য অস্থায়ী দুটো টং দোকানের দিকে ইশারা করে বলে, ঐ দোকান দুইটা সরাইলে আরও অনেক জায়গা বাড়ত।
-ঐ দোকান দুইটা তো খালেক তালুকদারের। আলগা দোকান, সরানো তো কন সমস্যা না।
-আমরা সরাইতে কইছিলাম কিন্তু খালেক তালুকদার নাকি মানা করছে। আপনে কইলে কাম অইবো।
-ওরা কেউ আছে বাজারে?
-হ, একটু আগেই তো বাদইল্যারে মজনুর লগে হারু মেম্বারের দোকানের দিকে যাইতে দেখলাম।
-বাদইল্যারে ডাক।
আসাদ ষ্টেজের কাজে ব্যস্ত ছমিরকে বাদলকে ডাকতে পাঠায়।
বাদল আর মজনুর মধ্যে সম্পর্ক আবার আগের মতই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ইদানিং দুজনকে বিভিন্ন জায়গায় একসঙ্গেই দেখা যায়। মজনু যেমন বাদলের নদীর পাড়ের ঘরের আড্ডায় যায় তেমনি বাদলকেও মাঝে মধ্যেই দেখা যায় মজনুর ডেরায়। কেবল নির্বাচন প্রসঙ্গে দু’জনকে একসাথে কথা বলতে দেখেনি কেউ। ছমিরের পিছন পিছন বটতলার দিকে এগিয়ে আসে বাদল আর মজনু। ওরা সামনে এলে সাঈদ খান বলে,
-দর্শকদের বসার জন্য মাঠটা বড় করন দরকার। তোদের ঐ দোকান দুইটা একপাশে আপাতত সরাইরা দে, অনুষ্ঠান শেষ অইলে আবার জায়গা মত বসাইয়া দেওন যাইব।
বাদল কিছুক্ষণ ভাবে। সাঈদ খানের মুখের উপর না করতে পারে না। কিছুক্ষোন পর বলে
-ঠিক আছে আপাতত সরাইয়া রাখুক, তয় অনুষ্ঠান শেষে আবার জায়গামত বসাইয়া দিতে অইবো।
আসাদের ইশারায় ছমির অন্য লোকজন নিয়ে দোকান সরানোর কাজে লেগে পড়ে।
-বড়ভাই, এইবারের আয়োজনডা অনেক জাকজমকপূর্ণ অইতাছে, সাঈদ খানের সামনে এসে বলে মজনু।
-এইডা আমগো গ্রামের একটা ঐতিহ্য। মান সম্মানের ব্যাপার। তয় এই ব্যাপারে সব কৃতিত্ব ওদের। আসাদদের দেখিয়ে বলে সাঈদ খান।
-আমগো কোন কামে লাগলে কইস, আসাদের উদ্দেশ্যে বলে বাদল।
মজনু চালের আড়তের দিকে চলে গেলে বাদল সাঈদ খানের উদ্দেশ্যে বলে,
-বড়ভাই, হুনতাছি এইবার আপনে চেয়ারম্যানে খাড়াইবেন?
-কার কাছে হুনলি? আমি তো এহনও ঘোষনা দেই নাই।
-না, নির্দ্দিষ্ট কারো কাছে না, লোকজন বলাবলি করতাছে।
-এহনও কিছু ঠিক অয়নাই, চেয়ারম্যান পদে খাড়াইলে তো জানতে পারবি।
-বড়ভাই, আপনে অইলেন আমগো নিজেগো মানুষ, আপনে খাড়াইলে আমরাও খুশি। হগগলে মিল্লা আপনার লইগ্যা কাম করুম। বাদল বলে।
-খালেক কি এইবারও মেম্বার পদে খাড়াইবো?
-হ, কইলো তো খাড়াইবো।
-ভালো। আর কে কে খাড়াইবো, জানোস? সাঈদ খান জিজ্ঞেস করে।
-না ভাই, এহনও তো অনেক দেরী আছে। তয় মনে অয় কয়েকদিনের মধ্যেই জানন যাইবো।
সাঈদ খান বাজারের দিকে চলে যায়। বাদল কিছুক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে লোকজনের দোকান সরানোর কাজ দেখে।
-এই ছমির্যা, অনুষ্ঠান শ্যাষ অইলে দোকান যেন আবার জায়গা মত দেখি। বেশ চড়া গলায় ছমিরদের উদ্দেশ্যে বলে। তারপর এগিয়ে যায় নদীর পাড় ধরে সমিলের দিকে।
আজ কয়েকদিন ধরেই দ্বিধার মধ্যে আছে আতিক। তার শুভাকাঙ্খী কাছের মানুষজন খুব করে চাচ্ছে সে নির্বাচনে প্রার্থী হোক, কিন্তু আতিক নিজে এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। প্রথমত নির্বাচনী খরচ একটা ভাবনার বিষয়। যদিও অনেককেই তার জন্য খরচ বহন করতে প্রস্তুত আছে, কিন্তু কারো কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে নির্বাচন করতে আতিকের আত্মসম্মানে বাঁধছে। সেইসাথে আরেকটা বিষয় তার ভিতরে কাজ করছে, সেটা হচ্ছে তার বাবার ইমেজ। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গ্রামের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তার বাবার স্থান অনেক উঁচুতে, সে প্রার্থী হলে যে জিতে যাবে এ ব্যাপারেও তার পূর্ণ আস্থা আছে কিন্তু নির্বাচিত হলে সবার জন্য ঠিকমত কাজ করতে না পারলে অনেক প্রশ্ন উঠবে। অবশ্য সাঈদ খান চেয়ারম্যান হলে তার সাথে কাজ করা অনেক সহজ হবে। সে সাত্তার মাষ্টারকে জানিয়ে দিয়েছে, সবকিছু নির্ভর করবে তার মায়ের উপর। মায়ের অনুমতি না থাকলে সে কিছুতেই নির্বাচনে দাঁড়াবে না।
সাত্তার মাষ্টার বলেছে, সে ওর মায়ের সাথে কথা বলবে। আতিক বোঝে মা বললে ওর আর পিছিয়ে আসার উপায় থাকবে না।
বিকালে কলাবতী বাজারে সাত্তার মাষ্টারের দোকানের সামনে বসে আছে সবাই। আলোচনার বিষয়বস্তু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। সবার একটাই লক্ষ্য- গ্রামের উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা। আর এজন্য চেয়ারম্যান এবং মেম্বার পদে সাঈদ খান আর আতিককে জয়ী করতে সবাই এক হয়ে কাজ করবে। ঠিক হয়, এই মূহুর্তে কোন কিছু প্রকাশ করবে না কেউ। আরও কিছুদিন পরিস্থিতি যাচাই করে মাঠে নামবে সবাই।
ক্লাবঘরে বিকাল থেকেই রিহার্সেলে ব্যস্ত ছেলেমেয়েরা। লাইব্রেরী রুমে চলছে নাটকের রিহার্সেল, অফিস কক্ষটিতে আবৃতি আর খেলার রুমে চলছে গানের অনুশীলন। শ্যামলপুর, উজানপুর আর ভবানীপুরের তরুণ ছেলেমেয়েরা নিরলসভাবে চেষ্টা করছে একটি সফল অনুষ্ঠান আয়োজনের। সন্ধ্যা থেকে আতিক, শ্যামল আর তপু ভরাট কন্ঠে আবৃতি করছে। নাটকের পারফর্মাররা শেষ মূহুর্তে নিজেরা সংলাপ ঝালাই করে নিচ্ছে। পাশের রুমে আসাদ, রঞ্জু, চারু, বকুল, হামিদ শেখের মেয়ে শিখা গাচ্ছে দেশাত্ববোধক গান। ওদের সাথে সাথে তাপস আর সুশীল হারমোনিয়াম আর তবলা বাজিয়ে চলছে। কেউ কেউ ব্যস্ত ষ্টেজ আর অন্যান্য বিষয়গুলো তদারকিতে।
সাত্তার মাষ্টারের দোকানের সামনে থেকে ক্লাবঘরের দিকে আসার পথে ইসমাইল হাওলাদেরের কানে ভেসে আসে চারুর সুরেলা কন্ঠে দেশাত্ববোধক গান- এ কী অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী....। মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। মনে মনে সে ভাবে, এরাই তো দেশের ভবিষ্যৎ। এরাই গড়বে আগামীদিনের সোনার বাংলাদেশ। ইসমাইল হাওলাদার ক্লাবঘরে ঢুকতেই শুরু হয়ে যায় নাটকের মূল রিহার্সেল। অনেক রাত অবধি চলে ওদের এই অনুশীলন।
সন্ধ্যার পর লোকজন চলে যাওয়ার পর হারু মেম্বরের চালের আড়তটা ফাঁকা হয়ে পড়ে। মজনু আড়তে ঢুকে দেখে হারু মেম্বর হিসাবের খাতা খুলে বসে আছে, ভাইয়ের পাশে গিয়ে বসে সে। মজনুকে দেখে হারু মেম্বর নির্বাচনের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়।
-কেডা কেডা খাড়াইবো খবর পাইছস? হিসাবের খাতা থেকে মুখ না তুলেই জিজ্ঞেস করে হারু মেম্বর।
-খালেইক্যা তো হুনতাছি এইবারও খাড়াইবো।
-হেইডা আমিও হুনছি, চেয়ারম্যান পদে হুনলাম সাঈদ খা খাড়াইবো?
-আমিও হুনছি, তয় এহনও সিওর না
-পাটোয়ারী এইবার চেয়ারম্যানে খাড়াইবো না? হারু মেম্বর জিজ্ঞেস করে
-হ, হেয়ও খারাইবো হুনলাম, মজনু জানায়।
-তুই খালেইক্যার ভাইয়ের লগে লগে হারাদিন ঘুরছ ক্যান?
-ও আগাইয়া আইলে আমি তো আর না করতে পারি না। তাছাড়া বিভার মাইয়াডার বিচারের সময় ওরা আমগো গিয়াসের পক্ষে আগাইয়া না আইলে বিচারে অরও শাস্তি অইতো। এহন ওগো লগে খারাপ ব্যবহার করন ঠিক অইব না। আমি এমনি এমনি তো আর অগো কাছে যাইনা, অগো ভিতরের খোঁজ খবর নিবার লইগ্যাই ওর লগে ঘুরি। মজনু বলে
-তুই খালেইক্যারে চিনস না। ও অইলো কালসাপ, ভাইডাও অইছে তেমন। ও কোন মতলব ছাড়া এমনি এমনি এই কাম করে নাই। তাছাড়া ওরা জানে বিচারে আমার পোলার কিছু অইলে আমিও বইয়া থাকতাম না।
-গ্রামের অনেকেই তোমার পোলার বিরুদ্ধে আছিলো, মফিজ মিয়া আর ওরা ব্যাপারডা ঘুরাইয়া দিছে।
-মফিজ মিয়া নিজের স্বার্থেই এইকাম করছে, আমার লগে হের আগেই কথা অইছে
-ঠিক আছে, আমি আস্তে আস্তে বাদইল্যার লগে ঘুরন কমাইয়া দিমু, এহন ক্যামনে সামনে আগাইতে অইবো এইডা নিয়া আমগো বইতে অইবো
-আস্তে আস্তে গ্রামের সব ধরনের মানুষের লগে মেলামেশা করতে থাক, তাগোরে জানা যে তুই ভোটে খাড়াইতাছস। সবাইর লগেই খুব ভালা ব্যবহার করবি।
-ঠিক আছে ভাইজান। তুমি বাড়ি যাইবা কহন?
-আমার দেরী অইবো, তোর বেশী রাইত পর্যন্ত বাইরে থাহনের দরকার নাই, এহন বাড়ি যা। আবারও কইতাছি, খালেইক্যা-বাদইল্যার থেইক্যা সাবধান।
চলবে....
আগের পর্বগুলো দেখতে চাইলে - ধূসর গোধূলিঃ ৩০ - অনন্ত যাত্রা - এ ক্লিকান





মন্তব্য করুন