ক্ষ্যাপ ০১
জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে বিশ্বের অন্য কোথাও হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বাংলাদেশের আমজনতার কাছে জাতীয়তাবাদ গুরুত্বহীন। পরিজন, মহল্লা, গ্রামের সীমান্ত পার হলে বড় জোর জেলাপর্যায় পর্যন্ত এই জাতীয়তাবাদ টিকে থাকে, অনেকাংশেই আঞ্চলিকতাবাদের বাইরে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যেতে পারে নি। পীচ ঢাকা রাজপথ, রেললাইন, বিভিন্ন সেতু গ্রাম আর শহরের ব্যবধান ঘুঁচিয়ে ফেললেও আমাদের শৈশবে বাংলাদেশ নদীঅবরুদ্ধই ছিলো, সেই দুরে ইশ্বরদীতে পাকশী সেতু, সেখান দিয়ে যশোর খুলনা কুষ্টিয়া, ফুলবাড়ী স্টেশনে নেমে সেই মেইল ট্রেইন, এর বাইরে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম সবই অগম্য দুস্তর পারাবার।
পদ্মা-মেঘনা-যমুনার নৌকাগুলো দুপারের যোগাযোগ ধরে রেখেছিলো, বাংলাদেশের এপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের যোগাযোগের সুতো ছিলো এইসব নৌকা। সেইসব নদীর পাশে পাড়াগাঁ আজ থেকে ২০ বছর আগেও রবীন্দ্রনাথের দেখা গ্রাম থেকে খুব বেশী আলাদা ছিলো না। গ্রামের সম্মান গ্রামবাসীর মর্যাদা একই সাথে মিলেমিশে ছিলো। ক্রিকেট তখনও এক ধরণের জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা তৈরি করতে পারে নি, বরং ফুটবল হাডুডু ছিলো আকর্ষণের কেন্দ্র।
এই ফুটবল নিয়ে গ্রামবাসীর সড়কি যুদ্ধ হয়েছে, হাডুডুতে জয়-পরাজয় পক্ষপাতিত্ব নিয়ে খুনজখম হয়েছে, একটা খেলায় পরাজয় ছিলো না সেসব বরং আত্মমর্যাদাবোধ আহত হওয়ার প্রশ্ন ছিলো এখানে। শিল্ডের দল মানেই গ্রামের সেরা সেরা খেলোয়ার গ্রামের মর্যাদা রক্ষার্থে রণে যাচ্ছে, অন্য গ্রামের মাঠ থেকে শিল্ড জিতে আসা খেলোয়ারেরা বীরোচিত অভ্যর্থনাও পেতো সে সময়ে। মফ:স্বলে অবশ্য গ্রামের মতো সীমানা টানা ছিলো না, সেখানে রাস্তার মোড়ে মোড়ে মহল্লার সীমান্ত- এ মহল্লা- সে মহল্লায় একই রকম মর্যাদার লড়াই।
আমাদের শৈশবে শিল্ড লড়াইয়ের মর্যাদা এমনই ছিলো, অবশ্য দিনাজপুর স্টেশন থেকে স্টেশন রোডে নেমে ৫০০ গজ এগিয়ে হাতের বামের গলিতে ক্ষুদে মহল্লায় জনবসতি এতটা ছিলো না যে তারা শিল্ড লড়াই করবে। সব মিলিয়ে দশ ঘরের মহল্লা তেমন গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়াশক্তি হয়ে উঠতে পারে নি খেলোয়ার সংকটে, আমরা যখন বড় হতে শুরু করেছিলাম তখন সব মিলিয়ে হয়তো ১৫জন খেলোয়ার হতো- সেই ১৫ জনের ফুটবল দলে ক্ষীন-খর্ব আমার কোনো অবস্থানই ছিলো না। দুধ-ভাত আমি না ফরোয়ার্ড না ব্যাক না গোলকীপার- শীতে ক্রিকেট খেলার প্রচলন তখনও হয় নি, ১৯৮৫ সালের দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়প্রত্যাগত মামা প্রথম ক্রিকেটের প্রচলন করলেন মহল্লায়, ক্ষুদে মহল্লায় ফুটবল খেলার মতো জায়গা ছিলো না, আমরা ফুটবল খেলতে যেতাম বড় মাঠে- স্টেশন পার হয়ে সরকারী গোডাউনের পাশের রাস্তা দিয়ে বিশাল মাঠের যেকোনো জায়গায় খেললেই হতো।
ক্রিকেটের একটা সীমিত পীচের মতো জায়গা ছিলো, তার একপাশে ডোবা, অন্য পাশে বাগান। সেখানেই পাশের বাসার বেড়া বাঁচিয়ে ক্রিকেট খেলার সুযোগ ছিলো। টেনিস ক্লাব থেকে ২০ টাকায় কেনা টেনিস বলগুলো দীর্ঘজীবী হোক, তাদের পশম খসে যাওয়ার পরও খেলা চালিয়ে যাওয়া যেতো, তবে আমরা খেলতাম মুজার বলে। বাতিল মোজা, দরজির দোকানের ফেলে দেওয়া কাপড়, সুতো, সুতলি দিয়ে প্লাস্টিকে পুরে শক্ত করে বল বানানো হতো- দীর্ঘ কসরতে , কাঠের দোকানে গিয়ে বানানো ব্যাট নইলে নারকোল গাছের ডাল দিয়ে বানানো ব্যাটে খেলা চলতো, ৮ ওভারের ম্যাচ, বিকেলে দুটো তিনটা ইনিংস হতো।
আমরা প্রতিদিন ঠিক ৩টায় দর্জির দোকানে ছাঁট কাপড়ের খোঁজে যেতাম, রাস্তা থেকে কিংবা বেকারী থেকে চেয়ে আনা সুতলি, প্লাস্টিক সবই গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। বাসা থেকে চেয়ে আনা সুই, পুরোনো মোজার বল খুলে নতুন বল বানাতে বানাতে ৪টা, তারপর দুই দলে ভাগ করে খেলা শুরু।
এভাবে একটা সময় আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আমরাও একটা ক্লাব বানাবো, পাশের মহল্লায় ক্রিকেট টিম হয়ে গেলো, আমাদের এখানে কিছুই নেই। যথা সময়ে একটা ক্লাব তৈরি হলো, ক্লাবে সম্বল বলতে ভাঙাচোড়া একটা ব্যাট, একটা ফুটবল, খেলার সরঞ্জাম কিনতে সামনের বাজারের দোকানে চাঁদা চাওয়া হবে ঠিক করা হলো, চাঁদার রশিদ বই ছাপিয়ে বাজারেরদোকানে দোকানে ভিখারির মতো ঘুরলাম, কেউ অনেক কথা শুনালো, কেউ করুণা করে ২টাকা ৫ টাকা দিলো, আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার পরও অবশ্য তেমন তহবিল জমে নি। ডাকসাইটে মাস্তান না হলে চাঁদাবাজি করা যায় না। আমাদের তেমন মাস্তান পরিচিতি ছিলো না।
তবে পরিচিত কাঠের দোকান থেকে দুটো ব্যাট বানিয়ে আনা হলো, মোস্তাক মামার লেদ ম্যাশিনে সেটাকে ছেঁটে একটা সুন্দর আকৃতিও দেওয়া গেলো, দুই দিনের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে টেনিস বলের জোগার হলো। সুতরাং খেলায় আর বাধা থাকলো না। আমরা প্রথম শিল্ড ময়াচ খেলতে গেলাম মিশনরোডে, বাবুদের সাথে- খেলায় হারলাম। আমাদের ধারণা ছিলো আমরা অনেক ভালো টিম, বাবুদের মহল্লায় মিশনরোড ক্রিকেট ক্লাব, ওদের প্রাকটিস আর দক্ষতার কাছে আমাদের এই উচ্চাশা ধুয়ে মুছে গেলো। পাশের মহল্লার সাথে ক্রিকেট খেলতে গেলাম বড় মাঠে- ওদের সম্বল বলতে এক জোড়া প্যাড, দুই জোড়া গ্লাভস আর কিপীং গ্লাভস, এবডোমেন গার্ডও ছিলো, নিতান্ত মহল্লার মর্যাদাবোধের লড়াই ছিলো বলে সম্ভবত এক পায়ে প্যাড পরে ক্রিকেট খেলেছি, জিতি নি, তবে হারটা সম্মানজনক ছিলো।
প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন ভাবে টাকা জমিয়ে একটা ৫ ইঞ্চি শিল্ড কেনা আর অন্য মাঠে গিয়ে শিল্ড হারানোর অভ্যাস হয়ে যাওয়ার পর মহল্লার লোকজন আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করতো না খেলার ফলাফল। আমরা খেলতে যেটাম, মুখ কালো করে ফিরে আসতাম হেরে। এভাবে হারতে হারতে কোনো একদিন একটা ফুটবল ময়াচ জিতলাম, প্রতিপক্ষ কে ছিলো মনে নেই, তবে জয় উদযাপন করতে করতে বাসায় এসেছে, বাসায় আসবার পথে স্টুডিওতে ছবিও তুলেছিলাম, অনেক দিন পরে সে ছবি দেখে মনে পরেছিলো আমাদের ক্লাবের কথা।
দিনাজপুরে রূপালি ট্রফি শুরু হয়েছে , আমারও স্কুল বদল হয়েছে, জেলা স্কুল সেবার নির্মান স্কুলের জোনাল সেরা দল হলো সম্ভবত- সোহাগ ভাই, সুমি রাতারাতি ক্রিকেট হিরো, আর দিনাজপুরে তখন বিভিন্ন জায়গায় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট- আমাদের মহল্লার দলের সেরা সাফল্য নিউটাউনের মাঠে গিয়ে সেমিফাইনাল খেলা। আমাদের দলটা তখন দুর্ধর্ষ না হলেও দীর্ঘ দিন খেলতে খেলতে দক্ষ- আমরা প্রথম রাউন্ড, দ্বিতীয় রাউন্ড জিতে কোয়ার্টার ফাইনাল, সেখান থেকে সেমিফাইনাল, সেখানে গিয়ে হারবার পর সম্ভবত শেষ খেলেছি রাজবাড়ীর মাঠে। তারপর আমি স্কুল বদলে ঢাকায় চলে আসলাম। মহল্লার উঠতি তরুণেরা তখন সেজেগুঁজে আশেপাশের মহল্লায় বিকেল হলেই সাইকেল নিয়ে যায়, অবাধ্য কয়েকজন টখনও ক্রিকেট খেলছে।
আমরা শৈশবের আনন্দে মার্বেল, পাথরের টুকরো, প্লাস্টিকের বল সব দিয়েই ক্রিকেট খেলেছি, তারপর মহল্লার মাঠ দখল করে একটা বাসা উঠলো, ক্লাবের মৃত্যু অনেক আগেই হয়ে গেলেও সে বাড়ীর ভিতের সাথে দাফন হলো আমাদের ক্লাব।





টেনিস বল দিয়ে বহু ক্রিকেট খেলছি এক সময়, সেই কথা মনে পরলো
স্মৃতি জাগানিয়া লেখা..... ধন্যবাদ আপনাকে।
সুন্দর একটা লেখা।
ভালো লাগলো!
মন্তব্য করুন