ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে
পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল অয়নের। আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে পড়ল ও। ঘরের বাইরে এসে দেখে সূর্য ওঠেনি তখনো। খাবারঘর থেকে বাবা মার কথা ভেসে আসছে। ছোটদি’র ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো তখনো ঘুমিয়ে আছে বকুল। ঘর থেকে বেরিয়ে উঠানে নেমে এলো ও। সারারাত বৃষ্টি হওয়ায় উঠানটা কাদা জমে কেমন স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। কাদা এড়িয়ে ঘাসের উপর দিয়ে ঘরের পাশের ছোট ফলের বাগানে চলে আসলো অয়ন। ছোট্ট বাগানটায় বেশকিছু ভাল জাতের ফলের গাছ লাগিয়েছে সাত্তার মাষ্টার। মন্টু গাছগুলোর বেশ যত্ন নেয়, তাইতো বাগানটা সবসময়ই বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে। বাগানটি শেষ হলেই বাড়ির পশ্চিমদিকের একেবারে শেষ প্রান্তে বেশ বয়সী একটি হিজল গাছ আর বড় একটি বাঁশের ঝাড়। সকাল আর সন্ধ্যায় এখানে প্রচুর পাখি এসে ভিড় করে। ওদের কিচিরমিচির শব্দে চারিদিক মুখরিত হয়ে ওঠে তখন। অয়নের ভীষণ ভাললাগে পাখিদের এই মিলন মেলা। প্রতিদিন সকালে এই পাখি ডাকার শব্দেই ওর ঘুম ভাঙ্গে। অয়ন বাগানের মাঝখানে আতা গাছটার নীচে এসে দাঁড়াল। গত পরশু নতুন ফোটা পাখির বাচ্চাগুলো খাবারের জন্য কেমন শব্দ করে ডাকছে। দুটো বাচ্চা ফুটেছে, কি সুন্দর! তুলতুলে। কাল বিকেলে ছোট গাছটায় উঠে একবার ধরে দেখেছিল অয়ন। একটু পরই দেখতে পেল মা পাখিটা কোত্থেকে যেন উড়ে এসে বাচ্চাদের কাছে চলে আসলো যেন বুঝতে পেরেছে ওর বাচ্চাদের কেউ ক্ষতি করতে পারে। মন্টু মামা পাখির ছানা ধরতে বারণ করে দিয়ে বলেছিল মা পাখি দেখতে পেলে ঠোকর দিবে। ও ধীরে ধীরে সরে আসে ওখান থেকে।
এই সময়টা ভীষণ ভাল লাগে অয়নের। সকালবেলা ওঠার অভ্যাসটা গড়ে উঠেছে বাবার কল্যাণে। বাবা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে তুলে বেড়াতে নিয়ে যায়। এই গ্রাম, নদী, প্রকৃতি সবকিছুর প্রতিই অয়নের একটা প্রগাঢ় ভালবাসা তৈরি হয়েছে। অয়ন হাঁটতে হাঁটতে পুকুর ঘাটে চলে আসলো। শান বাঁধানো ঘাটের উপর বসে দেখছে পুকুরের পানিতে ছোট ছোট পোনা মাছগুলোর সাঁতার কাটা। নতুন ফোটা লালচে পোনাদের ঝাঁক যখন একসাথে পুকুরের পাশে ভেসে ওঠে কি যে ভাল লাগে ওর! একটু লক্ষ্য করলে পোনামাছের ঝাঁকের নীচেই মা মাছটাকে দেখা যায়, যেন নিজের বাচ্চাগুলোকে আগলে রাখার জন্য আশে পাশেই থাকে। কিছুদিন আগে কচুরীপানা পরিষ্কার করার পর পুকুরের পানি যেন টলমল করছে। ছোট ছোট ঢেউগুলো তিরতির করে পুকুরের এদিক থেকে ওদিকে বয়ে যাচ্ছে, আকাশে বাঁধনহারা পাখির ঝাঁক যেমনি করে নির্বিঘ্নে উড়ে চলে। রোদ উঠলেই কেমন চিকচিক করবে পানিগুলি। কিন্তু আজ আকাশের অবস্থা ভাল না, মনে হয় আজ আর রোদ উঠেবে না। ঘরের দরজায় বাবাকে দেখে অয়ন পুকুর ঘাট থেকে উঠে ঘরের দিকে হেঁটে চলল।
সকালের নাস্তা শেষ করে অয়ন মন্টু মামাকে খুঁজতে লাগলো। গতকাল মন্টু মামা বলেছিল আজকে সে ওকে কলাগাছের ভেলায় চড়িয়ে শাপলা তুলতে নিয়ে যাবে। বাড়ির পশ্চিম পাশের জমিগুলো সব পানিতে ডুবে আছে। অয়ন অনেকদিন ধরে দেখছে ঐ পানিতে প্রচুর শাপলা ফুটে আছে। কতদিন মন্টুমামাকে বলেছে ওকে নিয়ে যেতে! মন্টুমামার যেন আর সময়ই হয়না। আজ আর ছাড়াছাড়ি নেই। অয়ন অনেক খোঁজাখুঁজি করে ছাড়াবাড়ির ভিটায় তাকে পেল। এদিকটায় সহসা আসেনা ও। ঘন জঙ্গলে ভরা। বাবা বলেছে এদিকটায় না আসতে, এখানে নাকি সব বিষধর সাপ আছে। মন্টুমামার কোন ভয় নেই। তাকে সন্ধ্যার পরও এদিকে আসতে দেখেছে অয়ন। সন্ধ্যা হলে এদিকে তাকালেই ভয় লাগে অয়নের, কেমন যেন গা ছমছম করে। এই বাগানের মধ্যে দিনের বেলায়ও বেশ অন্ধকার! অয়নকে দেখে মন্টু লাকড়ি কাটা বন্ধ করে ওর দিকে ফিরে তাকালো।
-কি রে মামা, এই জঙ্গলের মধ্যে ক্যান আইছো?
-তোমারে খুঁজতে, তুমি না কইছিলা আইজ আমারে ঐ বিলে শাপলা তুলতে নিয়া যাইবা?
-হ যামু তো, এই গাছগুলান চইলা নেই। দুফুরের আগেই যামুনে
-কলা গাছের ভেলা বানাইবা কহন?
-যাওনের আগেই বানামুনে, তুমি এহন যাও। এইহানে বেশিক্ষণ থাইকো না, অনেক জোঁক আছে।
জোঁককে ভীষণ ভয় অয়নের। একবার বাড়ির পাশের ছোট নালায় নেমে মন্টুমামার চাই পাতা দেখছিল। উপরে ওঠার পরই দেখতে পেয়েছিল বড় একটা জোঁক ওর পায়ের গোড়ালি থেকে প্রায় হাঁটুর কাছাকাছি পর্যন্ত লম্বা হয়ে চামড়ার সাথে আটকে আছে। ভয়ে সে কি চিৎকার আর হাতপা ছোড়াছুড়ি! মন্টুমামা ছুটে এসে লবণ দিয়ে সেই জোঁকটাকে ছাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই থেকে আর নালায় নামেনি অয়ন।
বাগানের ভেঁজা পথ ধরেই আবার ফিরে চলল ও। হঠাৎ পথের ধারের সরু লম্বা আমগাছটার মাঝামাঝি জায়গায় ওর দৃষ্টিটা আটকে গেল। গাছের সাথে প্যাচানো লকলকে বেত গাছের ঝোপের মধ্যে থোকা থোকা বেতফল! পেকে একেবারে হলুদ হয়ে আছে। এগুলো পেলে ছোটদি কি যে খুশি হবে! আবার মন্টু মামার ফিরে এসে ওগুলো পেড়ে দেবার জন্য বায়না ধরল
-মামা দেইখা যাও, ঐখানে অনেকগুলান বেতফল পাইকা আছে, আমারে কয়ডা পাইরা দেওনা।
-তুমি ঐ ফল খাবা? ওগুলা তো জংলা ফল, কষে ভরা। কাপড় চোপড় নষ্ট অইব
-না অইব না, আমি ছোটদির লাইগা নিমু
-আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি এইহানে দাঁড়াও।
মন্টু বেত লতাগুলোকে টেনে নামিয়ে বেশ কিছু পাকা বেতফল পেড়ে দিলে অয়ন খুশিমনে ভেতর বাড়ির দিকে ফিরে চলল।
-ছোটদি খাবি?
অয়নের কণ্ঠ শুনে পড়ার টেবিল থেকে পিছনে ফিরে তাকায় বকুল। ওর দুহাতে পাকা বেতফলের ছড়া দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
-কি রে এগুলান তুই কই পাইলি?
-ছাড়াবাড়ির জঙ্গলে। আরও অনেক আছে
-তুই একলা ওইহানে গেছিলি?
-হ, মন্টুমামা আছে তো ওইহানে। লাকড়ি চলতাছে। ছোটদি জানোস, আইজ মন্টুমামা আমারে নিয়া শাপলা তুলতে যাইব। খুব মজা হইব, তাইনা রে?
-হ, মজা তো হইব, আবার পানিতে পইড়া যাইসনা। এই পানিতে কিন্তু অনেক জোঁক আছে।
-জানি, মন্টুমামা কইছে অনেক বড় ভেলা বানাইবও। আমি ভেলার মধ্যেহানে বইয়া থাকুম।
-ছোটদি তুই যাবি আমগো লগে?
-না রে! তুই যা, তয় সাবধানে থাকিস।
লাকড়ি কাটা শেষ হয়ে গেলে মন্টু বাড়ির মধ্যে ফিরে আসে। অয়ন মন্টুর পিছনে লেগে থাকে, মন্টু বুঝতে পেরে হাসতে হাসতে বলে
-কি রে মামা, এহনই ভেলা বানাইতে অইব?
-হ, দেরি অইয়া যাইতাছে তো। অয়ন হেসে জবাব দেয়
-তাইলে লও, আমরা ভেলা বানাই।
পুকুর পাড় থেকে বড় দেখে পাঁচটি কলাগাছ কেটে অল্প সময়ের মধ্যেই একটি ভেলা বানিয়ে পুকুরে ভাসিয়ে দিল মন্টু। দেখেই মনে হয় এটি বেশ মজবুত। পুকুরের জান দিয়ে বের হয়ে খোলা জায়গায় চলে আসল ওরা। পানির গভীরতা এখানে খুব বেশী না। আউশ ধান কেটে নেয়ার পর আশপাশের জমিগুলো পানিতে ডুবে আছে, সেই ডুবন্ত পানিতে যেন শাপলার মেলা বসেছে। নলখাগড়া আর বুনো লতাগাছগুলোকে এড়িয়ে মন্টু ভেলা নিয়ে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। কাঁচা ঘাস আর এই নতুন পানির গন্ধে এক ধরনের মাদকতা আছে। কেমন যেন মাতাল করা গন্ধ! প্রথম ভেলায় চড়া আর এই নতুন এডভেঞ্চারের স্বাদ পেয়ে অয়নের চোখে মুখে যেন রাজ্য জয়ের আনন্দ। অয়ন ভেলার উপর বসে দেখছে চারিদিক কেমন পানিতে ডুবে আছে। জমিগুলো পানিতে ডুবে থাকায় কেমন অবাক লাগছে! এই তো কিছুদিন আগেও এখানে কোন পানি ছিল না। পাকা ধানে ভরে ছিল সবটা জমি। অয়নের মনে পড়ে সেবার যখন মন্টুমামার সাথে ওদের ধান ক্ষেতে এসেছিল, অনেক ইঁদুরের বাসা দেখেছিল। মন্টুমামা যখন জমি কেটে ওদের বাসা থেকে বের করে এনেছিল অনেক যত্ন করে সাজিয়ে রাখা ধানগুলো, ওর বেশ খারাপই লেগেছিল। ঘন সবুজ ঘাস আর নল খাগড়ার মধ্য দিয়ে কেমন তিরতির করে এগিয়ে যাচ্ছে ওদের ভেলাটা। মন্টুমামা কি সুন্দর করে ভেলাটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে! ও কি কখনও পারবে এমন করে?
একটু আগে সূর্য্য উঠেছে আকাশে। যদিও তাপ অতটা প্রখর নয় তবুও চারিদিক আগের চেয়ে একটু বেশিই আলোকিত হয়ে উঠলো। এখানকার পানিগুলোতে কোন নড়াচড়া নেই, কেবল স্থির হয়ে আছে। উজানগাঙের পানি যেমন একদিক থেকে আরেকদিকে চলতে থাকে। অয়ন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে অনেকদিন দেখেছে পানির ঘুর্নি। সবকিছু কেমন করে যেন সেই ঘুর্নি টেনে নিয়ে যায়। এর মধ্যেই অনেকগুলো শাপলা তোলা হয়ে গ্যাছে। মন্টু যখন বলল- মামা, অনেক শাপলা তুলছি, লও এবার কিছু মাছ মারি। অয়ন আনন্দেই রাজি হয়ে যায়। লম্বা ঘাস আর ভাসমান আবর্জনা এড়িয়ে মন্টু অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ পানির খোলা জায়গা খুঁজতে লাগলো। একটু পর ভেলাটা নিঃশব্দে অনেকটা খালি জায়গায় চলে আসে, এখান থেকে পানির নীচের লালচে মাটি দেখা যায়। মন্টু ভেলায় করে মাছ ধরার কোঁচ নিয়ে এসেছিল। এবার অতি সন্তর্পণে ওটা হাতে তুলে নিল। চুপচাপ অনেকক্ষণ ধরে ভেলার উপর দাঁড়িয়ে থাকে, সাবধানী চোখ সামনের পানিতে স্থির। একটু পর পানির নীচে একেবেঁকে ছুটে চলা কালচে প্রানীটার দিকে চোখ পড়তেই হাতের কোঁচটা সজোরে ছুড়ে মারল। লগি মেরে কাছে গিয়ে দেখা গেল কিছুই বাঁধেনি। ইস, পলাইয়া গেল! ঘাস আর আগাছার জঙ্গল কাটিয়ে খুব ধীরে ধীরে আরও সামনে এগিয়ে যায়, কিছুটা খোলা জায়গা পেয়ে একেবারে স্থির হয়ে যায় ভেলা, এখানে পানির গভীরতা একটু বেশী। আবার ধৈর্য্যের পরীক্ষা। মন্টুর সন্ধানী চোখ পানির নীচে আতিপাতি করে খুঁজে ফেরে লক্ষ্যবস্তু। একসময় সচল হয়ে ওঠে ডানহাত, বাজপাখীর ক্ষিপ্রতায় পানির মধ্যে ছুটে যায় কোঁচটা। মন্টু কাছে গিয়ে কোঁচটা তুলতেই অয়ন অবাক হয়ে দেখে সূচালো কাঁটার মধ্যে প্রাণপণে ছটফট করছে শোলমাছটা। যেন ছুটে আবার ওর ঠিকানা পানিতেই নামতে চাইছে। আবারও ধীর গতিতে এগিয়ে গিয়ে একসময় স্থির হয়। এখানে পানিটা এতোটাই স্বচ্ছ যে ছোট ছোট প্রতিটা প্রাণীর নড়াচড়া স্পষ্ট দেখা যায়। হঠাৎ আঙ্গুল দিয়ে পানির নীচে দেখিয়ে অয়ন চিৎকার করে উঠে বলল, মামা দেখ ঐ যে একটা সাপ! মন্টু ইশারায় ওকে চুপ থাকতে বলে, তারপর কোঁচটা সপাং করে ছুড়ে মারে সেই খোলা পানিতে, মুখে তৃপ্তির হাসি। ভেলাটাকে কাছে এগিয়ে নিয়ে দেখা গেল কোঁচের মাথায় বেশ লম্বা একটা বাইন মাছ। সাপের মত দেখতে মাছটা মাথা ও লেজ দিয়ে কাঁটাগুলোকে পেঁচিয়ে ধরে আছে। লও, এইবার বাড়ি যাই। মন্টুর কথাতে ঘাড় কাত করে সায় দেয় অয়ন। শাপলা তোলা আর মাছ মারার আনন্দ নিয়ে অয়ন যখন বাড়ি ফিরল তখন সূর্য্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে।





ভালো লাগলো!
ধন্যবাদ শান্ত।
সুন্দর। ভাল লাগল সাবলীল লেখা।
এই লেখার একটা অংশ 'ধূসর গোধূলি' নামে ব্লগে অনেক আগেই দেয়া হয়েছিল, সেটা ছিল অনেকটা অসম্পূর্ন। ইদানীং লেখাটা সম্পন্ন করার কাজে হাত দিয়েছি। ধীরে ধীরে অন্য পর্বগুলি ভিন্ন ভিন্ন নামে প্রকাশ করার ইচ্ছা আছে।
ধন্যবাদ পড়ার জন্য।
পড়লাম আর পরের পর্বগুলি পড়ার আশায় রইলাম
ধীরে ধীরে দিবো তবে একঘেয়ে না লাগ্লেই হয়
অদ্ভুত সুন্দর
পড়ার জন্য ধন্যবাদ
মন্তব্য করুন