ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন

শ্যামলপুর গ্রামটিকে ঠিক অজ পাড়া গাঁ বলা যায়না আবার শহরাঞ্চলের সুযোগ সুবিধাও তেমন পৌঁছেনি এ অঞ্চলে। শহর থেকে আসা পাকা রাস্তাটি কলাবতী বাজার পর্যন্ত এসে শেষ হয়েছে, তারপরই নদী। শান্ত, স্নিগ্ধ একটি নদী। এ নদীটি এমন ছিল না আগে। শোনা যায় অনেক বড় আর খরস্রোতা ছিল। একসময় এটির বেশ বদনামও শোনা যেত। তখন নাকি কুমিরের বসবাস ছিল এ নদীতে। লোকে কাউকে ভয় দেখাতে বলতো, তোরে উজানগাঙের কুমির দিয়া খাওয়ামু! বাজারের এইখানটিতে নদী যদিও ভাঙ্গেনি তেমন কিন্তু শ্যামলপুরের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া অংশটি অনেক ভাঙা গড়ার মুখে পড়েছে। ভাঙতে ভাঙতে শ্যামলপুরের বেশ বড় একটা অংশই আজ নদীগর্ভে। কলাবতী বাজারের বাম দিকে উজানপুর আর ডানদিকে নদীর পাড় ঘেঁসে ছুটে চলা কাঁচা রাস্তাটি শ্যামলপুর গ্রামের ভিতর ঢুকে পড়েছে। গ্রামে আধুনিক সুযোগ সুবিধা বলতে একমাত্র বিদ্যুৎ, যা পল্লীবিদ্যুতের কল্যাণে প্রাপ্ত। যতটুকু সময় এ বিদ্যুৎ থাকে তারচেয়ে না থাকার সময়টা অনেক বেশী, রাত দিন মিলিয়ে বড়জোর দুই-আড়াই ঘন্টা বিদ্যুৎ পায় গ্রামবাসী। বাজার থেকে একটু নীচে নেমে নদীর ঠিক পাড় ঘেঁষেই একটি বড় বট গাছ। কেউ কেউ বলে শতবর্ষী গাছ। এ গাঁয়ের সবচেয়ে বৃদ্ধ যে লোকটি, সেও বলে তার ছেলেবেলা থেকেই এমনই দেখে এসেছে গাছটিকে। বিশাল এলাকা নিয়ে বিস্তৃত এর শিকড়, অনেকগুলো নদীর মধ্যেই ডুবে আছে। প্রকান্ড বটের ছড়ানো ডালপালা থেকে থামের মত অসংখ্য ঝুরি নেমে এসেছে। কাক, শালিকের আধ খাওয়া ছোট ছোট লাল ফলে ছেয়ে থাকে বটতলা। এই বটগাছের নীচেই কলাবতী ঘাট, যেখান থেকে নৌকায় চলাচল করে ওপারের লোকজন। ওপারের চরকমল এপার থেকেও অবহেলিত, যেখানে কোন সুবিধাই পৌঁছেনি। এমন কি পল্লীবিদ্যুতও নয়! নদী পারাপারের জন্য নেই কোন সেতু কিংবা ফেরি, কারণ ওপারে গাড়ি চলাচলের কোন প্রয়োজন হয়না। লোকজনের নদী পারাপারের একমাত্র মাধ্যম নৌকা যা এই কলাবতী ঘাট থেকেই ছাড়ে।
প্রতি শনি আর মঙ্গলবারে হাট বসে এই বটগাছের তলেই। লোকে বলে বটতলার হাট, কলাবতী বটতলার হাট। এই অঞ্চলে কয়েক গ্রাম পর পরই হাট বসে, পালা করে দিন বদলে। কোথাও রবি-বুধ আবার কোথাও সোম-বৃহস্পতি। বটতলার অনেকটা জায়গা জুড়ে ছোট ছোট চালাঘরে দোকানিরা বিভিন্ন এলাকা থেকে বাহারি পণ্য এনে সাজিয়ে রাখে। একেক দিন একেক স্থানে বসাতে দোকানীদের সুবিধাই হয়। এরা বিভিন্ন হাটে তাদের পশরা নিয়ে হাজির হয়। প্রতি হাটবারে প্রচুর ডিঙ্গি নৌকা এসে ভিড় করে কলাবতী ঘাটে, যেন নৌকার মেলা বসে। বটগাছটার শিকড়ের সাথে নোঙর করে থাকে বেশীর ভাগ নৌকা।
হাট কিংবা ঘাট, উভয়ের জন্যই ইজারাদার একজনই। প্রতি দুই বছরের জন্য ইজারাদার নির্বাচিত হয়। প্রতিবারই ইজারাদার নির্বাচন নিয়ে নানান হাঙ্গামা লেগেই থাকে। ঘাটের ইজারা পাবার জন্য শুরু হয় গ্রুপিং। বর্তমানে ইজারাদার খালেক মেম্বারের ছোট ভাই বাদল মিয়া। এই নিয়ে হারু মেম্বরের ভাই মজনুর সাথে রেষারেষি লেগেই থাকে। ঘাটের নৌকার মাঝিদের কাছে হারু মেম্বর কিংবা খালেক মেম্বার কাউকেই বিশেষ পছন্দ না। ওরা জানে, এরা দু গ্রুপ হল মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। স্বার্থের কারণে গলায় ছুরি বসাতে কেউই পিছপা হবে না। এই তো গত সপ্তাহে চরকমলের পঞ্চাশ বছর বয়সী মোক্তার মাঝিকে তার ছেলের বয়সী বাদল মিয়া মাত্র পাঁচ টাকার জন্য থাপ্পর মেরে বসলো। অন্য মাঝিরা কেউ বিশ্বাস করতে পারছিলো না, এ বয়সী একজন লোকের সাথে এরকম আচরণ কেউ করতে পারে। কাজেম মাঝি সেদিন বুঝে গিয়েছিল দিন বদলে গ্যাছে। নৌকা চালানো ছেড়ে দিতে হবে। বাপ দাদার পেশা, কেমন যেন একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল। আগেও অনেকদিন চেষ্টা করেছে ছাড়তে, পারেনি। নৌকাটায় উঠে বসলে যেন প্রাণ ফিরে পায়। বাপে সহায় সম্পদ ভালই রেখে গেছে, তারপর নিজে পরিশ্রম করে যেটুকু বাড়িয়েছে তাতে কাজেম মাঝির বেশ ভালভাবেই চলে যায়। বড় ছেলেটা বাজারে দোকান দেবার পর তার অবস্থা এখন আরও ভাল। সে চাইলে যে কোন সময় নৌকা বাওয়া বন্ধ কর দিতে পারে। কিন্তু যারা এটার উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে তারা কোথায় যাবে? বদলে যাওয়া সময়ে এই নষ্ট মানুষদের ভিড়ে এরা কতদিন টিকে থাকতে পারবে?
সন্ধ্যার পর কলাবতী বাজার বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে। চায়ের দোকানগুলোতে আয়েশি ভঙ্গীতে লোকজনের চা পান আর গল্প-আড্ডা জমে ওঠে বেশ রাত অবধি। বৃষ্টির দিনে যদিও লোকজন কমই আসে বাজারে, আর যারা আসে তারাও তাড়াতাড়ি ফিরে যায় বাড়িতে। বাজারের একপ্রান্তে নদীর পাড় ঘেঁষে হরিপদ ঘোষের চায়ের দোকান। এই দোকানটি সবসময়ই লোকজনে সরগরম হয়ে থাকে। অন্যান্য চায়ের দোকানের সাথে তার দোকানের পার্থক্য হল- এখানে নানা ধরনের মজাদার মিষ্টান্ন পাওয়া যায় যার স্বাদ অতূলনীয়। আশেপাশের কয়েকটা গ্রামে তার মিষ্টির বেশ সুনাম আছে। বিভিন্ন গ্রামের হাটে তার দোকানের খাবার খুব তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে যায়। হরিপদর দোকানের একটু সামনের দিকে সাত্তার মাষ্টারের বইয়ের দোকান। এটিই এই অঞ্চলের একমাত্র বই-খাতার দোকান। সবাই বলে মাষ্টার সাবের লাইব্রেরী। বিকালে খোলা হয় দোকানটি। সাধারণত স্কুল ছুটির পর মাষ্টারসাব নিজেই বসেন এখানে। নদীর দিকে মুখ করে হওয়াতে এখান থেকে নদীর দুই দিকের গতিপথই সরাসরি দেখা যায়। বাজারে দোকানপাট ছাড়াও একটা ক্লাবঘর আছে যেখান থেকে নানান ধরনের খেলাধুলার ব্যবস্থা করা হয়। আশেপাশের গ্রামের মধ্যে ফুটবল ও ব্যাডমিন্টন খেলার প্রতিযোগিতা হয় প্রতি বছর। বর্ষাকালের এই সময়টাতে দাবা ও ক্যারামের প্রতিযোগিতাও হয়। তাই বিকেল থেকেই গ্রামের তরুণরা সব ক্লাবঘরেই জমায়েত থাকে।
গুমোট আবহাওয়া আর কয়েকদিন ধরে একটানা বর্ষণে সবকিছু কেমন যেন থমকে আছে। গ্রামের কাঁচা রাস্তাগুলোতে প্রায় হাঁটু সমান কাদা আর চারিদিকে পানি জমে থাকার কারণে লোকজন অনেকটাই গৃহবন্দী। ঘরের মধ্যে বসে ছোটদি’র সাথে গল্প করে আর লুডু খেলেই সময় কাটে অয়নের। তবে এই বিকেলবেলায় ঘরে বসে থাকতে একদম ভাল লাগেনা ওর। বিচ্ছিরি স্যাঁতসেঁতে বিকেলগুলো শুধু মন খারাপ করে দেয়। কয়েকদিন ধরে একটানা বৃষ্টি থাকায় মাষ্টারসাব বইয়ের দোকানে যাননা প্রতিদিন, আজও যেমন যাওয়া হয়নি তার। মাঝে মাঝে বিকেলবেলায় বাবার সাথে বইয়ের দোকানে গিয়ে বসে অয়ন। দোকান থেকে সামনের দিকে তাকালে উজানগাঙের অনেকটাই চোখে পড়ে। শেষ বিকেলে গোধূলি বেলায় যখন পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে ওঠে তখন বেশ ভাল লাগে ওর।
চলবে...





বর্ননা সুন্দর।
সুন্দর লাগলো!
তোমারেও ধইন্যা
মন্তব্য করুন