ধূসর গোধূলিঃ মায়া
সুবল বাড়িতে ঢুকে মাকে খুঁজতে লাগলো। বড় ঘর, পাকের ঘর, ঠাকুর ঘর, কোথাও মাকে খুঁজে না পেয়ে শেষমেশ গোয়ালঘরের পাশে এসে পেল। ওখানে দাঁড়িয়ে ভাসানির মা’র গোবর দিয়ে ঘুটে বানানো তদারকি করছে।
-তুমি এইহানে? তোমারে কত জায়গায় খোঁজ করলাম!
-ক্যান বাবা, কি অইছে? একবেলা মা’রে দেখতে না পাইয়াই এত অস্থির হইলি, আমি না থাকলে কি করবি?
-দূর, তুমি কি যে কও না! তুমি আবার কই যাবা? মা ক্ষিদা লাগছে, খাইবার দাও।
-একটু দাঁড়া বাবা, এই ঘুইটে কয়ডা বানানো শ্যাষ হউক।
সুবল ডানদিকে তাকিয়ে দেখল গোয়ালঘরের পাশের বড় নালাটার মধ্যকার কচুরীপানা আর নল খাগড়ার ঝোপের মাঝ দিয়ে কাকু গরুর জন্য ঘাসভর্তি ডোঙ্গাটা বাড়ির কিনারে ভিড়াচ্ছে। শুকনো মৌসুমে পানি শুকিয়ে গেলে এই নালায় অনেক মাছ পাওয়া যায় আর এখন বর্ষার সময়ে পাশের জমিগুলোর সাথে মিলেমিশে কেমন একাকার হয়ে আছে! সুবল ছুটে গিয়ে পাড়ে দাঁড়ালো।
-কিরে ব্যাডা, খালি বাড়ি বইয়া থাকলে অইব? কাম করন লাগব না? হাসতে হাসতে বলে তারাপদ
-আমি তো এহন স্কুল থেইক্যা আইলাম আর আমি কি এইগুলান পারি? বড় হইয়া নেই, দেইখো তোমার মতন সব পারুম।
-ও আইচ্ছা, আমার বাজান তো আবার স্কুলে ভর্তি অইছে। থাউক, তোর এইগুলান করতে অইব না। তুই অনেক বড় হ বাপ।
হরিপদ আর তারাপদর যৌথ সংসারে হরিপদ পারিবারের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন তৈরির ব্যবসাটা অব্যাহত রেখেছে আর তারাপদ পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমিজমাতে চাষবাসের কাজটা দেখাশোনা করে বেশ ভালভাবেই। দু’ভাইয়ের মধ্যে বেশ মিল। তারাপদ দাদা বলতে অজ্ঞান। আজ পর্যন্ত হরিপদর অবাধ্য হয়নি কোনদিন। হরিপদও কোনদিন ছোটভাইকে নিজের থেকে আলাদা করে দেখেনি। হরিপদর দুই ছেলে শ্যামল আর সুবল। একমাত্র মেয়ে মালতির বিয়ে হয়েছে দু মাস হল মাত্র। তারাপদর ছেলে তাপস ভাতিজা শ্যামলের সাথে একসাথে শহরে থেকে কলেজে লেখাপড়া করে আর একমাত্র মেয়ে চারুলতা শ্যামলপুর হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেনীতে পড়ে। দুই জায়ের মধ্যেও দারুণ সদ্ভাব, ছোট জা বিজয়া বড় জা সুরবালাকে আজও বড় বোনের মতই শ্রদ্ধা করে। ব্যবসা আর জমিজমার কল্যানে ওদের আর্থিক স্বচ্ছলতার কমতি হয়নি কোনদিন।
এ বছর আউশ ধানের ফলন বেশ ভালই হয়েছে। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে অনেক ধান জমা হয়েছে যেগুলো মাড়ানো খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। বাংলাঘরে বলতে গেলে হাঁটার জায়গাও নেই। উঠানের অনেকটা জায়গা জুড়েই ধানের স্তূপ জমে আছে, কেবল পাটি আর খড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। আজ অনেকদিন পর রোদ উঠেছে তাই তারাপদ ঠিক করে বিকালে ধান মাড়ানো শুরু করবে। গোপালকে দিয়ে ছমির আর জগাইরে খবর পাঠিয়েছে যেন দুপুরের পরই ওরা চলে আসে। ওরা দুইজন আর গোপালকে নিয়ে শুরু করলে সন্ধ্যার মধ্যেই অনেক ধান মাড়ানো সম্ভব।
বিজয়া ভাসানির মাকে দিয়ে গোবর লেপে ধানের কুড়া দিয়ে উঠোনটিকে ধান মাড়ানোর উপযোগী করে তুলছে। কিছুক্ষণ পর সুবল এসে জিজ্ঞেস করে,
-কাকী এইগুলান দিতাছ ক্যান? আইজ এইহানে কি করবা?
-আইজ তোরে বিয়া দিমু, বিজয়া দুষ্টুমি করে বলে
-যাও! তুমি খালি ফাইজলামী কর
-ক্যান, তুই কোনদিন বিয়া করবি না?
-হেইডা তো অনেক বড় অইয়া
-হুম, তোর তো অনেক বুদ্ধি! তাইলে চিন্তা কইরা বাইর কর আইজ এইহানে কি করা অইব বলে হাসতে থাকে বিজয়া।
সুবল কিছুটা লজ্জা পেয়ে বিজয়ার সামনে থেকে দৌড়ে পালায়। বিজয়া এভাবেই সবাইকে হাসি ঠাট্টায় মাতিয়ে রাখে সারাক্ষণ। একমাত্র ভাসুর হরিপদ ছাড়া অন্য সবার সাথে ওর সম্পর্কটা এমনই। এজন্য এ বাড়ির সবার কাছেই একজন প্রিয় মানুষ- বিজয়া।
সূর্য্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়লে গোপাল উঠানের মাঝে একটি বাঁশ গেড়ে দেয়। শুরু হয়ে যায় ধান মাড়াইয়ের কাজ। দুজন ঘরের সামনের ধানের স্তূপ থেকে ধান এনে বাঁশের চারপাশে ছড়িয়ে দিতে থাকে, গোপাল গোয়ালঘর থেকে গরুগুলোকে এনে একসাথে বেঁধে ধান মাড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করে। সুবল খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করে ওদের কাজ। ওর মনে পড়ে গত শুকনো মৌসুমে এভাবেই কয়েকদিন ধান মাড়াই করা হয়েছিল, সেবার রাতে হ্যাজাক বাতি জ্বালিয়েও চলেছিল ধান মাড়াইয়ের কাজ। গরুর পিছন পিছন ও অনেকক্ষণ হেঁটেছিল।
উঠানে ছড়ানো ধানের উপর দিয়ে গরুগুলো বাঁশটির চারপাশে ঘুরতে থাকে। ছমির ও জগাই ধানের ছড়াগুলোকে উল্টেপাল্টে দেয় বার বার। সুবল যেন ওর আসল মজাটা পেয়ে যায়, গরুগলোর পিছন পিছন ছুটতে থাকে। সন্ধ্যার মধ্যে উঠানে রাখা ধানের স্তূপগুলো শেষ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ বিশ্রাম দিয়ে সন্ধ্যার পর শুরু হয় বাংলাঘরের ধানগুলো মাড়ানির কাজ। ঘরের সামনে ঝোলানো বাল্বটি বাড়তি তারের সাহায্যে উঠানের মাঝখানে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যতই বিদ্যুতের বাতি জ্বালানো হোক, রাতের অন্ধকার দূরীভূত হয় সামান্যই। এই স্বল্প আলোতেই আবার শুরু হয় ধান মাড়াইয়ের কাজ। কিছুক্ষণ পর যথারীতি বিদ্যুৎ চলে যায়, এটা যেন নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে। গোপাল আগে থেকেই হ্যাজাক বাতিটা তৈরিই রেখেছে, এবার ওটা জ্বালিয়ে দেয়। সুবলের কাছে এই হ্যাজাক বাতির ঝলমলে আলোটা খুব ভাল লাগে। দেখতে হারিকেনের চেয়ে বেশ বড় আর কাঁচের ভিতরের ধবধবে উজ্জ্বল আলোটা কেমন চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। এখন চারদিকটা যেন আরও বেশী উজ্জ্বল। খড়ের মধ্যে সুবলের লাফালাফি দেখে তারাপদ বলে- বাজান, খ্যাড়গুলান গায়ে মাইখো না, শরিল চুলকাইব। সুবল উঠে দাঁড়ায়, তাকিয়ে দেখে ঘরের সিঁড়ির উপর বসে আছে চারুদি। ও উঠান থেকে ছুটে এসে সিঁড়ির উপর গিয়ে বসে। ঘরের সামনের হাস্নাহেনা গাছটা থেকে ভেসে আসে মাতাল করা সুন্দর গন্ধ। এই গাছটা চারু লাগিয়েছে, নিয়মিত যত্নও নেয় ও। চারু বাড়িতে না থাকলে অবশ্য বিজয়া যত্ন নেয়। অন্ধকার আকাশে তারার দেখা নেই কতদিন! সুবল চারুকে বলে- দ্যাখ চারুদি, আকাশটা ক্যামন ঘুডঘুইটে অন্ধকার! হুম, এহন আমাবস্যা চলতাছে তাই অন্ধকার, চারু জবাব দেয়। সুবল শুনতে পায় গোয়ালঘরের পাশের গাছগুলোর মধ্যে থেকে থেকেই ব্যাঙ ডেকে চলে আর তুলশী তলার পাশের পাতাবাহার গাছগুলোর ভিতর থেকে একটানা ভেসে আসে ঝিঁঝিঁপোকার ডাক।
চলবে...





সুনদর লেখা কিনতু গলপ কোথায়? গলপতো মিসিং
ধন্যবাদ।
এটা ধারাবাহিক, তাই এক লেখায় পুরো গল্পের মজা পাওয়া যাবে না
দু:খিত, চলবে লেখাটা খেয়াল করিনি
ভালই!
পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
ধন্যবাদ পড়ার জন্য, পরের পর্ব আসবে শীঘ্রই
মন্তব্য করুন