ইউজার লগইন

যুদ্ধকালীন স্মৃতির খন্ডচিত্র

দেশে যুদ্ধ চলছে। একদিকে সশস্ত্র পাক হানাদার বাহিনী, অন্যদিকে নিরস্ত্র মুক্তি বাহিনী। তখন দেশ এক চরম সংকটে। পাক বাহিনী যেন বাঙালির চারপাশ ঘিরে রেখেছে। যখন-তখন যে কারো ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে ওরা। এ অবস্থায় মাকেসহ আমাদের গ্রামে পাঠিয়ে বাবা ও মেজো ভাই লালবাগের বাড়িতে রয়ে গেলেন। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী ইসলামবাগ তখন চর এলাকা। গ্রামে যেতে হলে জিঞ্জিরা থেকে বাসে সৈয়দপুর, তারপর লঞ্চে শ্রীনগর গিয়ে নামতে হতো। একদিন মেজো ভাই গ্রামের উদ্দেশে ইসলামবাগের ভেতর দিয়ে রওনা হলেন। চাঁদনীঘাট ওয়াটার ওয়ার্কস পাম্পের কাছে আসতেই পাক সেনাদের নজর পড়লো তার ওপর। একজন মেজো ভাইকে দূর থেকে কাছে যাওয়ার জন্য ইশারা করলো, কিন্তু তিনি সাড়া না দিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ডুব সাঁতারে অনেকটা দূর গিয়ে ভেসে উঠতেই তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লো। গুলিটি তার চুল ঘেঁষে চলে যায়। রাখে আল্লাহ মারে কে? এ যাত্রায় বেঁচে গেলেন তিনি।
বর্ষাকাল। চারদিকে পানি থই থই করছে। বর্ষার পানি ইরিক্ষেতগুলোকে কি এক অপরূপ শোভায় ঢেকে রেখেছে। আবার কোথাও হাসি ছড়িয়ে ফুটে আছে সাদা শাপলা। এ ঋতুতে গ্রামের মানুষেরা বর্ষার কাছে চরমভাবে অসহায় হয়ে পড়ে। এ সময়টা আমার মতো পুঁচকেদের হাত-পা গুটিয়ে বন্দী থাকা ছাড়া কোনো উপায়ান্তর থাকে না। গ্রামের খোলা মাঠগুলো বর্ষাকালে স্বকীয়তা হারায়। যে মাঠগুলোতে সারা বছর চলে কৃষকের ব্যস্ত পদচারণা কিংবা সকাল-সন্ধ্যা চলে গরু-ছাগল আর মানব সন্তানের দৌড়ঝাঁপ, সে মাঠগুলো ভরা বর্ষায় শাপলা-শালুক এবং কচুরিপানায় ভিন্ন রূপ ধারণ করে। বর্ষা গ্রামের মানুষের জন্য দুর্ভোগ নিয়ে এলেও অপরূপ দৃশ্য সবার মন কাড়ে।
যুদ্ধকালীন জিঞ্জিরায় একটি বিমান ভূপাতিত হয়েছিল, পরিচিতদের সাথে তা দেখতে গিয়েছিলাম। দেখলাম, যেখানে বিমানটি পড়েছিল; সেখানে বিশাল একটি গর্তের সৃষ্টি হয়েছে এবং আশপাশের কয়েকটি গাছ আগুনের তাপে ঝলসে গেছে। তবে জানমালের কোনো ক্ষতি হয়নি। এ দৃশ্যটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন এসে ভিড় জমাচ্ছে।
দেশ স্বাধীন হয়েছে- এ সংবাদটি যখন পেলাম, আমি তখন শ্রীনগরের কোলাপাড়া গ্রামে মায়ের সাথে মেজো বোনের বাড়িতে। গ্রামটি রাঢ়িখালের পাশে। রাঢ়িখাল বিখ্যাত উদ্ভিদ বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্মস্থান। যিনি প্রমাণ করেছিলেন গাছেরও জীবন আছে। দেশ তখন মুক্ত-স্বাধীন। বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত জনগণ। শত্রুর হামলা থেকে বাঁচার লক্ষ্যে যারা বাসস্থান ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়েছিল, তারা নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে শুরু করেছে। এতো কিছুর পরও খুঁজে ফিরছে কে কোথায়, কেমন আছে বা কেমন ছিল? মুখচেনা রাজাকার-আলবদররা কি কোথাও লুকিয়েছে, নাকি সদর্পে বহাল তবিয়তে আছে? যুদ্ধ-উত্তর দেশে এখানে-সেখানে এ প্রশ্নগুলোই ঘুরে ফিরেছে।
স্বাধীনতার সুসংবাদটি নিয়ে বাবা গ্রাম থেকে আমাদের ঢাকায় আনতে গিয়েছেন। তার গ্রামে আসার সংবাদটি আগেই জেনেছিলাম। এতে আমি খুব আনন্দিত হলাম। এ আনন্দের পেছনে রয়েছে একটি ঘটনা। বোনের বাড়ির একটি গাব গাছে কানি বক বাসা বেঁধে বাচ্চা ফুটিয়েছে। একটি উঁচু আমগাছে উঠে এ দৃশ্যটি আমি কয়েক দফা উপভোগ করেছি। তাই বাবা পৌঁছামাত্র আমি তাকে বকের বাচ্চাটি দেখাবো বলে দৌড়ে ওই গাছে উঠি। আনন্দের যেন তর সয় না। বিধিবাম, গাছের মগ ডালে উঠে বাবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বকের বাচ্চাটি দেখাবো বলে বাসায় যেই হাত দিয়েছি, হঠাৎ হাত ফসকে বাম হাতে ধরা ডাল ভেঙে পড়ে গেলাম। গাছ থেকে পড়ার দৃশ্যটি দেখে মা চিৎকার দিয়ে উঠলেন। ভাগ্যিস, পা দুটি একটি মোটা ডালে আটকে গেলো। মাথা নিচের দিকে। পরে বাবা ধরাধরি করে আমাকে নিচে নামালেন। এতে বড় কোনো আঘাত পাইনি, তবে হাত ও পায়ে সামান্য আঁচড় লেগেছিল। তখন ভয়ে আমার শরীর ভূকম্পনের মতো কাঁপছিল। এরপর থেকে আমার আর গাছে ওঠা হয় না।
দেশ স্বাধীনের পর ঢাকায় ফিরে অনেক ঘটনা ও অঘটনের কথা জানতে পারলাম। জানতে পারলাম- হাজারীবাগের পিলখানা, রায়েরবাজার ও মিরপুরের বধ্যভূমিতে স্তূপ হয়ে আছে অসংখ্য মানুষের লাশ।

পোস্টটি ৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

টুটুল's picture


অনেক দিন পর পর ক্যান?

আহমাদ আলী's picture


পর পর ভাবছেন ক্যান, কাছেই তো...হা..হা..হা... Smile

মীর's picture


অনেক দিন পর পর ক্যান?

আহমাদ আলী's picture


মীর ভাই,
এখন থেকে পরপর দেয়ার এরাদা থাকলো, Big smile

মীর's picture


সেইজন্য কিন্তু কবিতা পোস্টানো বন্ধ কৈরেন্না। তাহলে আবার আমার মতো সর্বভূক প্রাণীদের বিপদ হয়ে যাবে।

আহমাদ আলী's picture


মাথ্থা খারাপ। কমেন্টস না পেলেও নয়। প্রমাণ দ্র.বি. Big smile

রশীদা আফরোজ's picture


আপনি গাছে চড়তেও জানতেন?! কত অজানা রে!!!
আপনাকে দেখলে মনে হয় জন্ম থেকেই আপনি শান্তশিষ্ট মানুষ।

আহমাদ আলী's picture


এখনো গাছে চড়তে পারি, কিন্তু নামাটাই যতো সমস্যা। শান্তশিষ্ট কি? ভাগন্তিস

তানবীরা's picture


পড়ছি।

কাল গেরিলা দেখলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভয়াবহতা অনুভব করলাম। কি দুঃসহই না ছিল দিনগুলো

১০

আহমাদ আলী's picture


কর্ম আর সংসার ধর্ম ছাড়া অন্য কিছুতে এখন অর সময় হয় না, গেরিলা দেখার ইচ্ছা ছিল, সুযোগ হলে পূরণ করবো। বাস্তব হয়তো গেরিলা থেকেও ভয়াবহ। পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আহমাদ আলী's picture

নিজের সম্পর্কে

মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা ও বাচালতা আমার কাছে সবচেয়ে অপন্দনীয় কাজ। ধূমপান, এটাকে তো রীতিমতো ঘৃণার চোখে দেখি।