ইউজার লগইন

মাফরুহা অদ্বিতী'এর ব্লগ

সাদাসিধে কথা

আজ তেইশ দিন হল বাংলার দামাল ছেলেরা পথে নেমেছে রাজাকারদের ফাঁসির দাবিতে আর তাতে সমর্থন জানিয়ে যোগ দিয়েছে লাখো জনতা। মন ভরে যায়। সচরাচর এই দেশের প্রেক্ষাপটে মন ভালো হবার মতো কিছু তো ঘটে না। তাই ব্যাক্তিগত অনেক সুখদুঃখ ভুলে এই শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে ডুবে আছি দিনরাত।
এরই মাঝে খেয়াল হল আজ আমার গুড়ি মেয়েটার বয়স ছয়মাস হয়ে গেলো।আমার দুই মেয়ে –রাইসা রাইমা, ওদের নিয়ে আমার এই নন্দনকানন। বড়টির আট বছর।

অন্ধকার সকাল

হাঁটতে হাঁটতে পুরো ঢাকা শহর চষে ফেললাম তারপরেও ক্লান্তি এলো না। সেই দুপুর থেকে হাঁটছি এখন প্রায় মাঝরাত। এবার কোথাও থামতে হবে নাহলে পুলিশ আবার আদর করে থানায় ভরে দেবে, দেশের যা অবস্থা! আর একটা সিগারেট শেষ করে ঐ মসজিদে রাতটা কাটিয়ে দেই। মনে হচ্ছে মাথাটা পুরো ফাঁকা, বোধশূন্য অবস্থা। জুলাই মাসের দারুন গরম তায় আবার প্রচণ্ড মশার উৎপাত, অথচ আমাকে কিছুই কষ্ট দিচ্ছে না – সত্যই কি বোধ হারাইলাম! পকেটে মোবাইল রাখতেই চিঠিটা বেরিয়ে এলো, একবার পড়েছি মাত্র।রিমি লিখেছে...
‘‘ওগো বাঁশিওয়ালা
এই সম্বোধনে রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা আছে, তুমি জানো আমার খুব পছন্দের। ক্যামন আছো তুমি? বড্ড সাদামাটা প্রশ্ন । তা হোক, তোমার আমার সম্পর্কটাই তো সাধারন কোন ভান-ভনিতা নেই, লুকোচুরি নেই তাইনা? সেই কবে তোমাতে মুগ্ধ হয়েছি সে রেশ এখনো কাটল না । আজো যদি আমায় নাম ধরে ডাকো মনে হয় লক্ষ বকুল ফুটল...
এর মাঝে কেন যে এমন হল! তুমি আমি আমাদের দিন রাত সব কি রকম হয়ে গেল! মজা পুকুরের মত জীবন ছিল আমার।যেখানে কচুরিপানাও প্রান পেত না, সেখানে পদ্ম ফোটালে তুমি। সমস্ত আকাশ আলোকিত করে তুমি গেয়েছ –

আজ তোমার জন্মদিন

তোমার অনুপস্থিতি
তোমার বিলীনতা
তোমার চলে যাওয়া
তোমার জ্বলজ্বলে স্মৃতি
বিশেষত তোমার অভাব,
আমাকে এমনই বিপন্ন করেছে-
যা তুমি অনুভবও করতে পারো নি কোনদিন।
আজ তোমার জন্মদিন
জানিনা সেইক্ষণ সেইদিন কি মধুর ছিল !
কিন্তু তোমার চলে যাবার দিনটি
বড় নিদারুন ছিল, পুড়ে যাচ্ছিলো সবকিছু।
আজ একযুগেরও বেশী তুমি নেই
এতটুক ঝাপসা হয় না তবু
তোমার মুখ।
পৃথিবীর এমনি নিয়ম –
এখানে অবিচল থাকে না কিছুই।
তবুও মানতে কী বিষম জ্বালা ...
তুমি কেন চলে গেলে প্রাণ পরাণি
কেউ মুছে দেয় না আর চোখের পানি।

খোলা চিঠি

প্রিয় নানুআপা,
ছোট বেলায় ভোররাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে অন্ধকার ঘরে শুনতাম মিষ্টি সুরে ‘কোরআন শরিফ’ পড়ার ধ্বনি। আমি এমন দরদ মাখা সুরেলা কণ্ঠ আজ পর্যন্ত আর শুনি নাই। সেই সময় অবাক হয়ে ভাবতাম নানুআপা অন্ধকারে দেখতে পান কী করে! তারপর কত দিন,মাস,বছর পেরিয়ে গেছে- তোমার ছায়ায় অনেকটা সময় কাটিয়ে আজ আমি অনেক বড়। জীবনের যত শিক্ষা, যত দীক্ষা তার অর্ধেক তোমার দান। তুমি খাইয়ে না দিলে অনেক বড় হয়েও নিজ হাতে ভাত খাইনি,তোমার ভয়ে ঠকঠক কেঁপেছি;আবার তোমাতেই নির্ভর ছিলাম। শিউলি ফুল কুরানোর জন্য কোনও সকালে তুমি ডাকতে ভুলে গেলে কিরকম রাগ হয়ে থাকতাম, সত্যি নানুআপা ছোট থেকে বড় - সব বেলাতেই তোমার সঙ্গে কত রাগ-অভিমান যে করেছি। তুমি তো দুঃখও পেয়েছ কত। জান নানুআপা এখন মেয়েকে যখন পড়তে বসাই,মনে পড়ে যায় দুপুরে তুমি শুয়ে থাকতে আমি তোমার পাশে বসে হোমওয়ার্ক করতাম। স্কুলে যাওয়ার সময় কেঁদে বুক ভাসাতাম, ইশ কত জ্বালিয়েছি তোমায়।

মুক্তিযুদ্ধ ও একটি পরিবার

ছোট্ট শহর বগুড়া, যেখানকার কতশত মধুর স্মৃতি আমাকে জড়িয়ে রেখেছে পরম মমতায়। সেই ছোট বয়সে নানাবাড়ির (জলেশ্বরীতলা) পাশের বাড়ির দুই বোনকে আমার রূপকথার পরীর মত মনে হতো, শাহানাআপু- সোমা আপু একই রকম দেখতে, চেহারার এত মিল যে আমার শিশু চোখ তাদের ঠিকমতো নির্ণয় করতে পারতো না- কোনটা কে। তারা দুই বোন দুই ভাই, দাদা-দাদী আর ফুপুর কাছে থাকতো ।স্কুল শিক্ষিকা সেই ফুপুকে যে ওরা কী ভয় পেত (আমরাও ভয় পেতাম)! সেই ফুপুই তাদের অভিভাবক, আমার মনে প্রশ্ন ছিল ওদের মা-বাবা কোথায়?তারপর একদিন সেই প্রশ্নের জবাব পেলাম-তখন অতকিছু বুঝি নাই কিন্তু মনটা বিষাদে ভরে গিয়েছিল। যত বড় হয়েছি সেই বিষাদ বেদনাও বেড়েছে ,মনে হয়েছে দেশের মানুষের তাদের কথা জানা দরকার কিন্তু কিভাবে?