নস্টালজিয়া I গল্প
মাহামুদার সময়টা ভালো যাচ্ছে না। দেখতে দেখতে তিনটি বছর কেটে গেলো তার বিয়ে হয়েছে, কিন্তু সংসার জীবন নিয়ে যে রকম স্বপ্ন দেখেছিলো সেই স্বপ্নের সাথে এই বাস্তব সংসারের কোনো মিলই নেই। দশটা পাঁচটা সাদামাটা সংসারের মধ্যেই জীবনটাকে সমর্পণ করতে হলো। কাকে দোষ দেবে, নিজের ইচ্ছে মতেই এই জীবন বেছে নিয়েছিলো মাহমুদা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে অল্প বয়সে জীবন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে নেই, আরেকটু বুঝে নিয়ে সংসার ধর্ম পালন করা উচিৎ ছিলো। ইদানিং মাহামুদার এই পরিতাপের মধ্যে সময় কাটে।
সন্ধ্যা হচ্ছে, এই সময়টাই সবচাইতে বেশী অসহনীয় করে তোলে মাহামুদাকে, কোনো কিছুই তার ভালো লাগে না। নিজেকে এতো অসহায় মনে হয় যে, সবকিছু ছেড়ে দিয়ে এমন কোন জায়গায় চলে যেতে ইচ্ছে করে যেখানে কেউ তাকে চিনবে না জানবে না; একেবারে নতুন একটা জায়গায় চলে যেতে ইচ্ছে করে। মাহামুদা এও জানে বাস্তব খুব কঠিন ব্যাপার, যে চিন্তা সে করেছে তাকে বাস্তব রুপ দিতে গেলে যে অবলম্বন দরকার তারই তো ঠিক নেই। তাছাড়া মাহামুদা টের পায়, তার ভিতরের আমিত্বটা দিনে দিনে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। মনের চাওয়াই যে সব সময় পাওয়া যায় না তার প্রমাণ-তো সে নিজেই। ইতোমধ্যে মাহামুদা বুঝতে পারে বাস্তব বা পরিণত বয়স খুব কঠিন এক ব্যাপার, হুট করে যে কোন সিদ্ধান্ত পরে ভুল হতে পারে।
মাহামুদা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। চারদিক অন্ধকার ঢেকে যাচ্ছে, স্থির বাতাস কেটে দুরে-কাছের মসজিদগুলো থেকে মাগরিবের আযান ভেসে আসছে। পূব আকাশের দিকে তাকায় মাহামুদা, আজ চাঁদ ভেসেছে কিনা খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। নাহ্ নেই, পশ্চিম দিকে চাঁদ ভাসতে পারে, যে দিকটা তার বারান্দা খেকে দেখা যায় না। চাঁদ যে দিকেই ভাসুক, মাঝ রাতে চাঁদকে আকাশের মাঝখানে পাওয়া যাবে, তখন আরেকবার এসে দেখলেই হবে। সাড়ে পাঁচটা বাজে, ডিউটি শেষ হলে রাত বারোটায় সারোয়ার বাসায় ফিরবে। এই দীর্ঘক্ষণ একা একা কি করা যায় মাহামুদা ভাবে। টিভি দেখা ছাড়া অন্য এমন কি করা যায় যাতে মনটা চাঙ্গা থাকে। নাহ্ তেমন কিছুই নেই যা তার এই মুহূর্তে ভালা লাগার মতো, এটা ভাবতেই তার মন আরো খারাপ হতে থাকলো, নিজেকে খুব অসহায় লাগতে লাগলো। রাত বারোটায় সারোয়ার এসে কোনোমতে গোসল শেষ করে ভাত খেতে বসবে। সারাদিনের ক্লান্তিতে ভাত খেতে খেতে তার ঘুম পেয়ে যাবে। মাহামুদা এও জানে তার পুলিশ সার্জেন্ট স্বামী প্রতিদিন মদ বা বিয়ার খেয়ে বাসায় ফেরে। তাই ঘুমের ঘোরে বিছানায় শরীর ছেড়ে দিয়ে ঘুমের ঘোরেই মাহামুদাকে চেপে ধরবে। কয়েক মুর্হুত... তারপর সারোয়ার ঘুমিয়ে পড়বে এবং নাক ডাকতে থাকবে-এক অসহনীয় ব্যাপার। কিন্তু সহজে মাহামুদার চোখে ঘুম নেমে আসবে না, একটার পর একটা স্মৃতি নিয়ে ভাবতে থাকবে। এই হলো মাহামুদার একঘেমেয়ীর জীবন- ইদানিং মোটেও যা তার ভালো লাগছে না।
ঘর থেকে বাচ্চাটা কাঁদছে, ঘুম ভেঙ্গে গেছে সালমানের। মাহামুদা দ্রুত ঘরে ফিরে এলো, ছেলেকে কোলে তুলে নিলো। দুধ খাওয়ার সময় হয়েছে, মুখে ফিডার চেপে ধরতেই গ্রোগাসে দুধ খেতে লাগল এবং আস্তে আস্তে ছেলের চোখ বুজে এলো। এই হলো সারোয়ারের সঙ্গে সংসার জীবনের প্রথম সন্তান। এতো তাড়াতাড়ি সন্তান নেবে এই ইচ্ছে ছিলো না, যে কারণে সারোয়ারকে বিয়ে করেছিলো সে, কারণটি ছিলো এই সন্তান- যার অস্বিত্ব টের পেয়েই মাহামুদা সারোয়ারকে বিয়ে করতে বাধ্য ছিলো। বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এই সন্তানের জন্ম হলো। সন্তান হওয়ার পর থেকেই সারোয়ার বদলে যেতে শুরু করলো। যে রকম তীব্র প্রেম ভালোবাসা উপস্থাপন করে সে মাহামুদার মন জয় করেছিলো, সেই প্রেম ভালোবাসা কোথায় যেন বিলীন হয়ে গেলো। ভাবতেও অবাক লাগে মানুষের মধ্যেকার সত্যিকার চরিত্রটি কতো অদ্ভুদ রকমের হয়। মাহামুদা টের পায়, একমাত্র সঙ্গমের প্রয়োজন ছাড়া সারোয়ারের কাছে তার অন্য কোনো মূল্যায়ন নেই।
মাহামুদা ভাবে- ‘এতো বোকা আমি, যে প্রেম ভালোবাসায় জীবনকে রাঙ্গাবো বলে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা আর হলো না!’ অবশ্যই এটা নিজের ব্যার্থতা, অল্প বয়সী মানষিকতা অনেক ভুলে ভরা থাকে তার প্রমাণ হলো। গৎ বাঁধা সংসারের বাইরে তার আর কি করবার আছে। কিভাবে সত্যিকার জীবনে ফেরা যায় তার সমাধানই বা কেমন করে হবে। সময়ের কাজ অসময়ের হলে যা হয়, তার পরিণতি ভোগ করা ছাড়া আরতো কোনো পথ নেই।
সালমান ঘুমিয়ে পড়েছে, কি নিষ্পাপ একটা মুখ ছেলেটার। মাহামুদা সালমানের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, তার একদিন নিজের গর্ভজাত সন্তান হবে এ নিয়ে তার সে কি উত্তেজনা ছিলো। সেই ইচ্ছে আজ বাস্তবে রুপ নিলো, দেখতে দেখতে সে মাও হলে গেলো! সবকিছু কেমন স্বপ্নের মতই লাগে মাহামুদার। ছেলে একদিন বড় হবে, বড় হয়ে সেও নিশ্চয় একদিন কাউকে ভালোবাসবে, সংসার করবে, সেও কয়েকজন সন্তানের বাবা হবে। আরেকটা প্রশ্ন এলো মাহামুদার মাথায়, সালমান কার মানষিকতা নিয়ে বড় হবে, তার নিজের মতো না সারোয়ারের মতো। মাহামুদা ভেবে দেখে সালমান তার নিজের মতো হলে মুশকিল, কারণ সে জীবনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখবে এক কিন্তু জীবনটা হয়ে যাবে আরেক। সংস্কার আছে যে, কয়েক পুরুষের জীবনের নিয়তি এক সূত্রে গাঁথা থাকে। সেক্ষেত্রে মাহামুদার পরিবার সব সময় চেয়েছে সমাজে মাথা তুলে দাঁড়াতে, কিন্তু মাথা তুলে কি দাঁড়াতে পেরেছে তার পরিবারের কেউ! পরিবারের বড় মেয়ে হিসেবে তার উপর তার মায়ের আশা ছিলো মেয়েকে বড় ঘরে বিয়ে দিয়ে সংসারের চাপ কমাতে। বড় ঘর বলতে সরকারী চাকুরী করে এমন ছেলের কাছে বিয়ে দিতেই মাহামুদার মায়ের সব সময়ের ইচ্ছে ছিলো। তাই এক এলাকায় শৈশবে যখন সারোয়ার মাহামুদাকে ভালোবাসতো তখন মাহামুদা ভাবতেও পারতো না সারোয়ারকে সে কিভাবে ভালোবাসবে। ভালবাসা বা তার পছন্দের ছেলে নিয়ে তার অন্য রকম ভাবনা ছিলো। এ রকম করে চলছিলো, স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় সারোয়ার পুলিশের সার্জেন্ট হিসেবে চাকরী পেলো, সে চলে গেলো চট্টগ্রামে টেনিং নিতে। এদিকে মাহামুদা তার ভালোবাসার মানুষকে খুঁজে পেলো।
মাহামুদা এও ভাবে, সালমান তার বাবার মতো হলে আরো মন খারাপ হবে তার। কারণ পুরুষ হিসেবে সারোয়ারকে মাহামুদাকে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। সবমিলিয়ে এই সংসার বা স্বামী নিয়ে তার মনটাই ভেঙ্গে গেছে। এই ভাঙ্গা মন তাকে দিনে দিনে তলিয়ে নিচ্ছে কোথায় যেন, তার সমস্ত শক্তিকে ক্রমে দূর্বল করে দিচ্ছে প্রতিটি দিন রাতে। এ কারণে মাহামুদা ভাবে তার দোষটা কি, তা যদি সংশোধন করা যেতো আবার। আদৌ সেই পরিত্রাণের পথ কি মাহামুদা জানে না।এমন সংসার যেন নিজের জীবনে না আসে এই ছিলো তার প্রকৃত চাওয়া, সেই চোড়াবালির মধ্যেই সে পড়ে গেলো!
বিছানা থেকে উঠে মাহামুদা টিভিতে যে কোন একটি হিন্দি সিরিয়াল দেখবে সিন্ধান্ত নিলো। টিভি অন করলো, সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রিসিটি চলে গেলো...
(নস্টালজিয়া, প্রথম পর্ব। এই ধারাবাহিক গল্পটি মা দিবসে লিখতে বসলাম, সঙ্গত কারণে সব মায়েদের প্রতি ভালোবাসা স্বরুপ এই গল্পটি উৎসর্গ কললাম। গল্পটির প্রথম পর্ব 'আমরা বন্ধু' ব্লগে প্রকাশ করলাম, কারণ এই ব্লগে আজ আমার সদস্য পদ লাভ হয়েছে তাই বাকী পর্বগুলো আমার বন্ধু ব্লগে প্রকাশ করতে পারবো বলে আশা রাখি। ধন্যবাদ সবাইকে)
জন রোমেল।
৮.০৫.২০১১





মন্তব্য করুন