আল্লাহ কেন সকল মানুষকে মুসলিম হতে বাধ্য করেন নি?
স্রষ্টা মানুষের মধ্যে জন্মগত ভাবে ভালো ও মন্দের পার্থক্য বোধ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন- ‘আর আমি ভালো ও মন্দ উভয় পথ তার জন্য সুস্পষ্ট করে রেখে দিয়েছি’(সুরা আল বালাদ)। ‘আমি তাদের পথ দেখিয়ে দিয়েছি, চাইলে তারা কৃতজ্ঞ হতে পারে আবার চাইলে হতে পারে অস্বীকারকারী’। (সুরা আদ্দাহর)।
মানুষের মধ্যে একটি নফসে লাওয়ামাহ(বিবেক)আছে। সে অসৎ কাজ করলে তাকে তিরস্কার করে। (সুরা আল কিয়ামাহ আয়াত-২)। আর প্রত্যেক ব্যক্তি সে যত ওজর পেশ করুক না কেন সে কি তা সে খুব ভালো করেই জানে।(সুরা আল কিয়ামাহ আয়াত১৪-১৫)।
এখানে এ কথাটি ভালো ভাবে বুঝে নিতে হবে যে, মহান আল্লাহ স্বভাব জাত ও প্রকৃতিগত ইলহাম করেছেন প্রত্যেক সৃষ্টির প্রতি তার মর্যাদা ও স্বরূপ অনুযায়ী। যেমন- প্রাণীদের প্রত্যেক প্রজাতিকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী ইলহামী জ্ঞান দান করা হয়েছে। যার ফলে মাছ নিজে নিজেই সাঁতার কাটে। পাখি উড়ে বেড়ায়। মৌমাছি মৌচাক তৈরী করে। পাখি বাসা বানায়। মানুষকেও তার বিভিন্ন পর্যায় ও ভূমিকার ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক জ্ঞান দান করা হয়েছে। মানুষ এক দিয়ে প্রাণী গোষ্ঠিভূক্ত। এই দিক দিয়ে তাকে যে জ্ঞান দান করা হয়েছে তার একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে, মানব শিশু জন্মের সাথে সাথে মায়ের স্তন চুষতে থাকে। আল্লাহ যদি প্রকৃতিগত ভাবে তাকে এ শিক্ষা না দিতেন তাহলে তাকে এ কৌশলটি শিক্ষা দেবার সাধ্য কারো ছিল না। অন্যদিকে মানুষ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণী। এ দিক দিয়ে তার সৃষ্টির শুরু থেকেই আল্লাহ তাকে অনবরত ইলহামী পথ নির্দেশনা দিয়ে চলছেন। এর ফলে সে একের পর এক উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের মাধ্যমে মানব সভ্যতার বিকাশ সাধন করছে। এই সমস্ত উদ্ভাবন আবিষ্কারের ইতিহাস অধ্যয়নকারী যে কোন ব্যক্তিই একথা অনুভব করবেন যে, সম্ভবত মানুষের চিন্তা ও পরিশ্রমের ফল হিসেবে দু’ একটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রত্যেকটি আবিষ্কার আকষ্মিকভাবে শুরু হয়েছে। হঠাৎ এক ব্যক্তির মাথায় এক চিন্তার উদয় হয়েছে এবং তারই ভিত্তিতে সে কোন জিনিস আবিষ্কার করেছে। এই দু’টি মর্যাদা ছাড়াও মানুষের আর একটি মর্যাদা ও ভূমিকা আছে। সে একটি নৈতিক জীবও। এই পর্যায়ে আল্লাহ তাকে ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার শক্তি এবং ভালোকে ভালো ও মন্দকে মন্দ জানার অনুভূতি ইলহাম করেছেন।এই শক্তি, বোধ ও অনুভূতি একটি বিশ্বজনীন সত্য। এর ফলে আজ পর্যন্ত দুনিয়ায় এমন কোন সমাজ ও সভ্যতা গড়ে ওঠেনি যেখানে ভালো ও মন্দের ধারণা ও চিন্তা কার্যকর ছিল না। আর এমন কোন সমাজ ইতিহাসে কোন দিন পাওয়া যায়নি এবং আজো পাওয়া যায়না যেখানকার ব্যবস্থায় ভালো ও মন্দের এবং সৎ ও অসৎকর্মের জন্য পুরস্কার ও শাস্তির কোন না কোন পদ্ধতি অবলম্বিত হয়নি। প্রতিযুগে, প্রত্যেক জায়গায় এবং সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রত্যেক পর্যায়ে এই জিনিসটির অস্তিত্বই এর স্বভাবজাত ও প্রকৃতিগত হবার সুস্পষ্ট প্রমাণ। এছাড়াও একজন বিজ্ঞ ও বিচক্ষন স্রষ্টা মানুষের প্রকৃতির মধ্যেই এটি গচ্ছিত রেখেছেন, একথাও এ থেকে প্রমাণিত হয়। ভাল ও মন্দ সম্পর্কে জ্ঞান দান করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রতিটি মানুষকে সঠিক পথে চলতে পথ নির্দেশনা দিয়ে সৃষ্টির সেরা জীবের প্রতি দয়া করেছেন। সেরা জীব হিসাবে অনেক
মুসলিম ও হিন্দুকে অনেক সময়
বলতে শোনা যায়, ‘তাহলে আল্লাহ
কি চাইলে সবাইকে মুসলিম
বানাতে পারতেন না?’ আমরাও তখন
অজ্ঞতার কারণে সাথে সাথে বলি,
‘আসলেই তো!’ সুতরাং আল্লাহই যেহেতু
মানুষকে বিভিন্ন ধর্ম গ্রহণের
কিংবা ভিন্ন মত অবলম্বনের
অনুমতি বা সুযোগ দিয়েছেন
তাহলে আমরা কেনো তাদেরকে ইসলামের
কথা বলতে যাবো?
এক্ষেত্রে অনেকে একধাপ এগিয়ে
সুরায়ে কাফিরুনের মূল অংশ গুলো বাদ
দিয়ে কেবলমাত্র বিচ্ছিন্নভাবে শেষ
আয়াতটি উল্লেখ করে পান্ডিত্য ঝাড়েন।
বলেন দেখেন আল্লাহই
সূরায়ে কাফিরুনে বলেছেন, ‘তোমার
ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার। এই কথা বলে তারা পুরো সুরার মুলভাব গোপন করে। আজ
শুধু পুরো সূরাটি উল্লেখ করে
দিচ্ছি।
“হে নবী আপনি বলুন, হে কাফির
সম্প্রদায়। তোমরা যার ইবাদাত কর
আমি তার
ইবাদাত করি না। এবং আমি যার
ইবাদাত করি তোমরা তার
ইবাদাতকারী নও। আর তোমরা যার
ইবাদত করছ আমি তার ‘ইবাদাতকারী হব
না। আর আমি যার ইবাদাত
করি তোমরা তার
ইবাদাতকারী হবে না। তোমাদের
জন্য তোমাদের দীন আর আমার জন্য আমার
দীন।” (সূরা কাফিরুন ১০৯, আয়াত ০৬)
এবার আসল কথায় আসা যাক।
কাউকে কোনো কাজে বাধ্য
না করা আর তাকে অন্যায়
করতে সুযোগ দেয়া এক কথা নয়।একমাত্র
জিন ও মানুষ ছাড়া এই মহাবিশ্বের
আসমান,
যমীন, পাহাড়, সাগর, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-
নক্ষত্র, নিহাড়িকাপুঞ্জসহ সকল
সৃষ্টি প্রকৃতিগতভাবেই মহান আল্লাহর
পুরোপুরি অনুগত। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন -
“তারা কি আল্লাহ্র দ্বীনের
পরিবর্তে অন্য দ্বীন তালাশ করছে? অথচ
আসমান ও যমীনে যা কিছু
রয়েছে সেচছায় হোক বা অনিচছায়
হোক, সব সৃষ্টি একমাত্র আল্লাহরই অনুগত
হয়ে মুসলিম হয়ে গেছে এবং তাঁর
দিকেই সবাই ফিরে যাবে। (সূরা আল
ইমরান : আয়াত ৮৩)
এই সকল সৃষ্টির
কোনো একটি সামান্যতমও ব্যতিক্রম
করে না। মহান আল্লাহর নির্দেশনার
বাইরে যায় না। প্রত্যেকটি সৃষ্টি তার
জন্য মহান আল্লাহ কর্তৃক
বেঁধে দেয়া নির্ধারিত নিয়ম
ও বিধান অনুযায়ী চলে। নির্দিষ্ট
দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করে।
অর্থ: “তোমরা কি লক্ষ্য করনি যে,
বস্তুত আল্লাহই এক
সত্তা যাকে সেজদা করে সকলেই,
যারা আছে আকাশমণ্ডলী ও
পৃথিবীতে এবং সেজদা করে সূর্য, চন্দ্র,
তারকারাজি, পাহাড়, পর্বত, বৃক্ষরাজি,
চতুষ্পদ জন্তু ও বহুসংখ্যক মানুষ। (সূরা হজ্জ ২২,
আয়াত ১৮)
উপরোক্ত আলোচনার
দ্বারা এটা পরিস্কার হয়ে গেলো যে,
মহান আল্লাহ চাইলে পৃথিবীর অন্যান্য
সৃষ্টির মতো মানুষ ও জিন সম্প্রদায়কেও
প্রকৃতিগতভাবেই তার অনুগত ও বাধ্য
করতে পারতেন। মহান আল্লাহ
ইচ্ছা করলে পৃথিবীর সব মানুষকে মুসলিম
হতে বাধ্য করতে পারতেন।
তিনি চাইলে সকল মুসলমানকেও তার সকল
নিয়মাবলী যথাসময়ে এবং যথাযথভাবে
পালন করতে বাধ্য করতে পারতেন। কিন্তু
তিনি এটি করেন নি।
কিন্তু কেনো এটা করা হয় নি?
বিচক্ষণদের জন্য এটিই হচ্ছে তার
জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ
ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ নিজেই বলেন,
“সুতরাং আপনি তাদের
মধ্যে ফয়সালা করুন আল্লাহ যা নাযিল
করেছে তদনুসারে এবং আপনার
কাছে যে সত্য
এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-
খুশীর অনুসরণ করবেন না।
আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য
নির্ধারণ করে দিয়েছি নির্দিষ্ট
শরীয়ত ও নির্দিষ্ট পন্থা। আর যদি আল্লাহ্
চাইতেন, তবে অবশ্যই তিনি তোমাদের
সাইকে এক জাতি করে দিতেন। কিন্তু
তিনি তোমাদের পরীক্ষা করতে চান
যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন তাঁর
মাধ্যমে। অতএব নেক কাজের
প্রতি ধাবিত হও। তোমাদের
সবাইকে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন
করতে হবে। তারপর তিনি তোমাদের
অবহিত করবেন
সে বিষয়ে যাতে তোমরা মতভেদ
করতে।” (সূরা মায়িদাহ ৫: ৪৮)
মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এই
সমগ্র মহাবিশ্বকে সুন্দর
করে সৃষ্টি করেছেন। তারপর
তিনি সুন্দরতমভাবে সৃষ্টি করেছেন
মানুষ। অনেক আদর ও মমতায়
তিনি তৈরী করেছেন আমাদেরকে।
তিনি ইরশাদ করছেন,
“অবশ্যই
আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম
গঠনে।” (সূরা তীন ৯৬,
আয়াত ০৪)
এই পৃথিবী ও তার সকল
সম্পদরাজি এবং তার মধ্যকার সকল
উপকরণ মহান আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন
একমাত্র মানুষের জন্য। এই মানুষের জন্যই
তিনি সৃষ্টি করেছেন
চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র। মানুষের সেবায়
তিনি নিয়োজিত করেছেন সকল
মাখলুকাতকে। সকল মাখলুকাত ও সৃষ্টির
মাঝে তিনি মানুষকে এভাবে করেছেন
সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ সম্মানিত।
“আর আমি তো আদম সন্তানদের
সম্মানিত
করেছি এবং আমি তাদেরকে স্থলে ও
সমুদ্রে বাহন
দিয়েছি এবং তাদেরকে দিয়েছি উত্তম
রিযিক। আর আমি মানুষকে আমার অনেক
সৃষ্টির উপর অনেক
মর্যাদা দিয়েছি।” (সূরা ইসরা ১৭,
আয়াত ৭০)
এবার চিন্তা করুন। এতো সম্মানিত
মানুষকে যদি মহান আল্লাহ তায়ালা
বাধ্য করেন, তাহলে কি তার সম্মান
থাকে? কোনো অনুষ্ঠানে প্রধান
অতিথিকে অনেক সম্মান
দিয়ে এনে তারপর যদি তাকে বলা হয়
যে, আপনি ঠিক ৩০ মিনিট
দাঁড়িয়ে কথা বলবেন। এক মিনিট কম-
বেশি করতে পারবেন না। এই এই
কথা বলতে হবে। এর বাইরে কিছু
বলতে পারবেন না।
এভাবে বিভিন্ন
ব্যাপারে যদি তাকে
বাধ্য করা হয় তাহলে প্রধান অতিথির
সম্মান কি আর বাকি থাকে?প্রধান
অতিথির সামনে বা সম্মানিত
ব্যক্তিদের সামনে মূলনীতি পেশ
করা যায়। এলাকার কে কেমন, কার
সাথে কেমন ব্যবহার করা উত্তম-মন্দ
তা তাকে জানানো যায়। কিন্তু
তাকে নির্দিষ্ট কোনো কাজের
ক্ষেত্রে বাধ্য করা যায় না।
একই ভাবে মহান আল্লাহ সুবহানাহু
ওয়া তা‘আলাও তার এই বিশাল সৃষ্টির
মধ্যে মানুষকে প্রধান
অতিথি করে পাঠিয়েছেন। এই
মহাবিশ্বের সকল সৃষ্টির উপর
মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। এরপর
মানুষকে তার দেয়া পথে ও
পদ্ধতি অনুসারে চলতে বলেছেন। সঠিক ভাবে চলার জন্য আল কুরআন দিয়েছেন ॥ কিন্তু
প্রকৃতিগতভাবে তাদেরকে বাধ্য করেন
নি। এটাই মানুষের জন্য পরীক্ষা।
কারা তার রবের এতো নিয়ামত
পেয়ে কৃতজ্ঞ হয় আর কারা অকৃতজ্ঞ হয় মানবজাতির
মধ্যে যারা এই বিশ্ব ও মহাবিশ্বের
এতো নিয়ামত পেয়ে তার প্রতিপালক ও
স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ ও শ্রদ্ধাশীল
হবে তাদের জন্য পরকালে রয়েছে অফুরন্ত
নিয়ামত। আর অকৃতজ্ঞদের জন্য আযাব।
“এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। আর
যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য
করে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন
জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত
রয়েছে নহরসমূহ।
সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর
এটা মহা সফলতা। আর যে আল্লাহ ও তাঁর
রাসূলের নাফরমানী করে এবং তাঁর
সীমারেখা লঙ্ঘন করে আল্লাহ
তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন।
সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর তার জন্যই
রয়েছে অপমানজনক আযাব।” (সূরা নিসা,
আয়াত ১৩-১৪)
তাই সহজেই বোঝা যাচ্ছে আল্লাহ তায়ালা সকল মানুষকে কেনো মুসলমান বানাননি।





উক্ত কারনে আপনার লেখাটি প্রথম পাতা থেকে সরিয়ে নেয়া হইলো! ব্লগ নীতিমালা মেনে লেখালেখি করবেন।
মন্তব্য করুন