ইউজার লগইন

অংবংটং

অংবংটং

ক্লাসের সবাই ওসমানকে বুদ্ধু বলে, এমনকি স্যারেরাও। সেজন্য ওর খুব দুঃখ। পড়াশুনা করে খুব। রাত জেগেও পড়াশুনা করে, কিন্তু কি যে তার ভাগ্য, মনে থাকে না কিছুই। এজন্য তাকে সবার কাছেই বকুনি খেতে হয়। বাড়িতে মা বাবা ভাই বোন সবাই বকে, বোকা বলে, গাধা বলে। আবার পাড়ার লোকরাও বকে মাথা নেই বলে। ক্লাসের সব ছাত্রই ওকে একদম আসল বুদ্ধু বলে।

সেদিন ছিলো শনিবার। হাফ স্কুল। হেড স্যার এলেন ক্লাসে। পড়া ধরলে সবাই ঠিক ঠিক উত্তর দিল। কিন্তু ও মানে ওসমানের গালে জোরে জোরে দুটো চড় কষে দিলেন। লজ্জায় অভিমানে দুঃখে, ওসমানের মরে যেতে ইচ্ছে করলো।

ওসমান মনের দুঃখে বাড়ি গিয়ে বইগুলি টেবিলে রেখে সোজা চলে গেল তাদের আমবাগানে। বাগানে খুব বড় একটা আমগাছ। গাছটির কয়েক হাত উপরে চার দিকে চারটা বড় রকমের ডাল। তার মাঝখানে বেশ অনেকখানি জায়গা। ওসমান গাছে চড়ে সেই প্রশস্ত জায়গায় চুপচাপ বসে রইল। আস্তে আস্তে সূর্য পশ্চিম আকাশে ডুবে গেল। পাখিরা সব কলরব করতে করতে গাছের ডালে ফিরে এলো। পূব আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ সারা দেশে আলো ছড়িয়ে দেখা দিল। একটা পেচা গাছের ডালে প্যাঁকো প্যাঁকো করে ডেকে উঠল। বাগানের তাল গাছের মাথায় বসে দুটো হুতোম প্যাঁচা ত্ইু থুলি মুই থুলি বলে বাগান প্রকম্পিত করে ডাকতে লাগল। আর ওসমান গাছের মধ্যে বসে এসব দেখতে লাগল। পূর্ণিমার চাঁদ আস্তে আস্তে আকাশের উপরে উঠে এল। কতগুলি মেঘ চাঁদটাকে ঢেকে ফেলল। কতগুলি বাদুড় পাখা দোলায়ে উড়ে চলল। একটা বাদুড় এসে ওসমানের মাথার উপর ডালে ঝুপ করে বসে পড়ল। ওসমান একটুও ভয় পেল না।

এদিকে ওসমানের মা ওসমানকে না দেখে সারা পাড়াময় বাড়ি বাড়ি খোঁজ করে দেখলো, কিন্তু কেউ তার কোন খোঁজ খবর দিতে পারল না। ওসমানের মা বাবা ভাই বোন সবাই খুব চিন্তিত হোল, তারা ওসমানের জন্য কাঁদতে লাগলো।

আস্তে আস্তে আকাশের চাঁদ তারা সব পশ্চিম দিকে সরে যেতে লাগলো। কেবল উত্তর আকাশের ধ্রুব তারাটি এক স্থানেই স্থির হয়ে রইল। ওসমান পূর্ণিমার চাঁদের দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে রইল। মনে মনে ভাবলো, তা যদি পাখিদের মতো পাখা থাকতো কিম্বা পরীদের মতো- তাহলে সে উঠে ঐ পূর্ণিমার চাঁদের উপর গিয়ে বসে থাকতো। তাহলে কত মজাই না হোত। দুনিয়ার ঝঞ্ঝাট তার কাছে ভালো লাগে না। যা কিছু পড়াশুনা করে সবই ভুলে যায়, মনে থাকে না কিছুই। এজন্য সে সবার কাছেই বকুনি খায়। এরূপ চিন্তা কোরতে কোরতে তার চোখে ঘুম এলো। সে গাছের ডালে ভালো করে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল। থানা ঘড়িতে ১২ টা বাজলো, ঢং ঢং।

ওসমানের চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছে, এমন সময় সুন্দর সাদা পোষাক পড়া একটি পরী এসে ওসমানের কাছে বসলো। আস্তে আস্তে ওসমানের কানে বলল, ওসমান ওঠো, তোমার ভাগ্য ভালো। ওসমান তাড়াতাড়ি উঠে বসলো। পরী সস্নেহে ওসমানের গায়ে হাত বুলিয়ে দিল। পরীর গা থেকে আতরের সুগন্ধ বের হচ্ছে, সেই সুগন্ধ ওসমানকে মোহিত করল। পরী বলল, ওসমান তুমি ভয় পেয় না। আমি তোমাকে একটি মন্তর শিখিয়ে দেব। সেই মন্তর পড়লে তোমার সব দুঃখ দূর হোয়ে যাবে। তার আগে আমি তোমাকে সাতটি প্রশ্ন করবো। সেই প্রশ্নের উত্তর যদি আমর মনপুত হয় তবেই তোমাকে মন্তর শিখিয়ে দেব। ওসমান বলল, খালা আম্মা, আপনি আমাকে যা প্রশ্ন করবেন যদি আমি তার ঠিক উত্তর দিতে না পারি তবে কি হবে? পরী ওসমানের মুখে খালা আম্মা ডাক শুনে ভারী খুশি হলো। বলল, ভয় নাই; যেসব প্রশ্নের উত্তর তুমি সহজেই দিতে পারবে আমি সেই প্রশ্নই তোমাকে করবো।

১ নং প্রশ্ন: তুমি কোন দিন কখনও মিথ্যা কথা বলেছ কি? ওসমান অনেকক্ষণ চিন্তা করে বলল, না খালাম্মা আমি কোন দিন মিছা কথা বলি নাই। পরী খুব খুশি হয়ে বলল, তুমি পাশ। জানো তো মিথ্যা কথা বলা মহাপাপ।

আচ্ছা এবার ২ নং প্রশ: তুমি কখনও কারো জিনিস চুরি করেছ কি? এবারও ওসমান চিন্তা করতে লাগল। না সে তো কোন দিন কারো জিনিস চুরি করে নাই। ওসমান বলল, খালাম্মা আমি কোন দিন কারো কোনো জিনিস চুরি করি নাই। পরী খুব খুশি হয়ে বলল, তুমি পাশ। জানো তো চুরি করাও মহা পাপ।

এবার তোমাকে ৩ নং প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি, বলতো- তুমি কোনদিন কাউকে হিংসা করেছ কি? এবারেও ওসমান অনেকক্ষণ চিন্তা ভাবনা করে বলল, না খালাম্মা আমি কোনদিন কাউকে হিংসা করি নাই। পরী খুব খুশী হয়ে বলল, পাশ। জানো তো হিংসা করা মহাপাপ।

আচ্ছা এবার ৪ নং প্রশ্ন: বলতো বাবা ওসমান, তুমি কোনদিন অকারণে কোন জীব হত্যা করেছ কি? ওসমান এবারও অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা ভাবনা করে বলল, না খালাম্মা আমি কোনদিন জীবহত্যা করি নাই। পরী খুশি হয়ে বলল, এবারও তুমি পাশ। জানোতো জীব হত্যা মহাপাপ।

এবার পরের প্রশ্নটি তোমাকে করবো। সস্নেহে পরী ওসমানের গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে লাগল। এমন সময় একটি হুতুম পেচা গুরু গম্ভীর স্বরে ডেকে উঠল। তুই থুলি মুই থুলি। পরী ওসমানকে অভয় দিয়ে বলল, ওটা হুতুম পেচা। ভয় নেই। ওসমান বলল, ভয় ডর কাকে বলে আমি জানি না। পরী বলল, হ্যাঁ এই তো বীরের মত কথা। যাক ৫নং প্রশ্নটি শোন। আচ্ছা বলতো দেখি- কোন দিন কোন কিছু দেখে লোভ করেছ কিনা? ওসমান এবাও গভীরভাবে চিন্তা করে বলল, না, খালাম্মা আমি জীবনে কোন দিন লোভ করি নাই। এমন সময় থানার ঘড়িতে ঢং ঢং করে রাত্রি ২ টা বাজলো। পরী বলল, রাত্রি তো অনেক হয়েছে। যাহোক মাত্র ২ টার জবাব বাঁকি আছে। সকাল হবার আগেই আমি চলে যাবো। এই প্রশ্নের উত্তরেও তুমি পাশ। জানোই তো লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।

এবার তোমাকে ৬ নং প্রশ্ন করবো। আচ্ছা বলতো- ওসমান কোনদিন কাউকে গালি দিয়েছ কি? ওসমান মাথা চুলকায়ে চিন্তা করে বলল, না, খালাম্মা আমি কোনদিন কাউকে গালি দেই নাই। পরী শুনে খুব খুশি হলো। বলল, পাশ। জানোই তো গালি দেওয়াও মহাপাপ।

আচ্ছা এবার আমি তোমাকে সর্বশেষ ৭ নং প্রশ্ন করবো। বলতো- গুরুজনদের তুমি কখনও অমান্য করেছ কিনা? এবারে সাফ জবাব দিয়ে বলল, খালাম্মা আমি কোনদিন বাপ-মা, বড় ভাই-বোন, চাচা-চাচী, খালা-খালু, নানা-নানী, দাদা-দাদী, ওস্তাদ পীর মানে আমার যারা গুরুজন, তাদের আমি কোনদিন অমান্য করি নাই। পরী সন্তুষ্ট হয়ে বলল, তুমি পাশ। জানোই তো গুরুজনদের অমান্য অবহেলা নিন্দাবাদ করা খুব মহাপাপ। ওসমানের সব কথা শুনে পরী খুব খুশি হলো।

তারপর পরী ওসমানকে বলল, ওসমান তোমার কথায় আমি খুব খুশি হয়েছি। এবার তোমাকে মন্তর শিখিয়ে দেব। এই মন্তরটা একবার পড়লে তোমার মনের দুয়ার খুলে যাবে। যা কিছু পড়বে সব মনে থাকবে। দেখি তোমার জিহ্বা । ওসমান হাঁ করে জিহ্বা দেখলো। যেমনভাবে ডাক্তার তার রুগীর জিহ্বা দেখে থাকে। পরী একটা সোনার কলম নিয়ে ওসমানের জিহ্বার উপর কি সব লিখে দিলো। তারপর বলল- ওসমান তুমি বলতো আমার সঙ্গে অং বং টং। ওসমান পরীর সঙ্গে পড়ল- অং বং টং। তারপর পরী বলল- সকালে গাছ থেকে নেমে বাড়িতে গিয়ে বেশ করে দাঁত মাজবে। হাত পায়ের আঙ্গুলের নখ (চাড়া) কাটবে। চুল কাটবে। তারপর গরম পানিতে গোসল করবে। এবার কিছু খাওয়া দাওয়া করে তোমার ক্লাসের যে সব বই পুস্তক আছে তা পড়ার পূর্বে একবার অংবংটং মন্তরটা পড়ে নিবে। মন্তর পড়া হলে বই পড়বে। দেখবে সব তোমার মুখস্ত হয়ে গেছে। আর কোন দিন ভুল হবে না। এই কথা বলে পরী আকাশ আলো করে চলে গেলো।

ওসমান কিছুক্ষণ গাছের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। মসজিদের মিনারে মোয়াজ্জেন সাহেব আজান হাঁকলো- আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। গাছে ডালে বুলবুলি শিস দিতে লাগলো। বাঁশের ঝাড়ে শালিকেরা কিচির মিচির করে ডাকতে লাগলো। আজানের সুমধুর স্বরে, পাখিদের কলকাকলিতে ওসমানের ঘুম ভেঙে গেলো। চোখ মেলে দেখে পুব আকাশ ফর্সা হয়ে উঠেছে। আবছায়া আঁধার আস্তে আস্তে পালিয়ে যাচ্ছে।

ওসমান আল্লাহ রসুলের নাম করে খুব খুশি মনে গাছ হতে নেমে বাড়িতে এসে মাকে ডাকল। ওসমানের মা তাড়াতাড়ি ঘরের দরজা খুলে দিলো। মা জিজ্ঞেস করলো, সারা রাত্রি কোথায় ছিলি? ওসমান জবাব দিলো, খালাম্মার কাছে। মা মনে করলো- তার ছোট বোনের বাড়ি গিয়েছিল।

ওসমান হাত মুখ ধুয়ে আসলো। পরীর কথামত দাঁত মাজলো। নখ কাটলো। চুল কাটলো। তারপর গরম পানিতে গোসল করে মায়ের কাছে গিয়ে কিছু নাস্তা খেল। তারপর ক্লাসের সব বই পুস্তক নিয়ে পড়তে বসলো। প্রথমেই মন্তরটা পড়ল- অংবংটং। আর যায় কোথা। যা পড়ে সব মুখস্ত হয়ে যায়। সব মনে থাকে। বাংলা, ইংরেজী, অঙ্ক, ভুগোল, ইতিহাস, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, সমাজ পাঠ, পর্যবেক্ষণ সব বই পড়ে ফেলল। আর সব মুখস্ত হয়ে গেলো। কি খুশি ওসমান।

স্কুলে গেলে মাষ্টার যা পড়া ধরে, অঙ্ক দেয় সব ঠিক ঠিক বলে দেয়। পড়ার আছে চুপিসারে আস্তে আস্তে অংবংটং বলে। মাষ্টার ওসমানের পড়া লেখায় খুব সন্তুষ্ট হলো। পরীক্ষায় এক্কেবারে যাকে বলে ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট হলো। পাড়ার সবাই ওসমানকে খুব ভালোবাসে। কারণ সে মিথ্যা কথা বলে না। চুরি করে না। হিংসা করে না। লোভ করে না। কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করে না। গুরুজনকে সম্মান করে।

তোমরাও যদি ওসমানের মতো সত্যবাদী নির্লোভ হতে পারো, তবে হয়তো কোনো একদিন কোনো এক পরী এসে তোমাদেরও ঐরূপ মন্তর শিখিয়ে দিতে পারে। তাহলে কি মজাই না হবে, তাইনা।

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নুশেরা's picture


ছোটবেলায় পড়া নীতিগল্পের আমেজ পেলাম। এগুলোর একটা সহজিয়া আবেদন আছে, সেই টোনটা বজায় রাখা মোটেই সহজ কাজ না। আপনি পেরেছেন, সেজন্য সাধুবাদ। বর্ণনার মধ্যে পেঁচার ডাকটাও মজার বেঁধেছেন।

কিন্তু, দুঃখের কথা হলো, জ্ঞান/ উপলব্ধি/ মেধা/ সাফল্যের বিপরীতে শুধু মুখস্তশক্তিই পরম আরাধ্য হয়ে উঠলো যে! Sad

হাসান রায়হান's picture


প্রথম পাতায় দিলেন না কেন?

ভাস্কর's picture


গল্পটা মজার লাগলো...তয় কনক্লুশানের নীতিবাক্যরে একটু ফোর্স ফিটেড মনে হইছে...

অরিত্র's picture


লেখাটা প্রথম পাতায় নেই কেন?

মীর's picture


লেখা উমদা হৈসে। তবে নুশেরা'পুর মতো আমারও একই প্রশ্ন Big smile

শুধু মুখস্তশক্তিই পরম আরাধ্য হয়ে উঠলো যে

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মাহফুজ's picture

নিজের সম্পর্কে

ভ্রমণ ও বই পড়তে ভালোবাসি। আর ভালোবাসি মাটিকে আর এই মাটির মানুষকে।

সাম্প্রতিক মন্তব্য

mahfuz'র সাম্প্রতিক লেখা