ইউজার লগইন

১৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৩..ভালোবাসা দিবস কিংবা জয়নাল দিপালীদের বিস্মৃতি...

গুম হয়ে যাওয়া লাশসকল প্রতিশোধ নেবে—

বীভত্স কফিনহীন মৃতদেহ রাস্তায় রাস্তায়

মোড়ে মোড়ে

অলিতে গলিতে

অন্ধিতে সন্ধিতে

তোমাদের শান্তিশৃঙ্খলা স্থিতিশীলতার গালে

থাপ্পড় মেরে

অট্টহাসি হেসে উঠবে।

গতকাল ছিলো ১৪ ফেব্রুয়ারী। ভ্যালেন্টাইনস ডে। আমরা দিবসটি পালন করেছি সাড়ম্বরে। শত হাজার টাকার লাল গোলাপের পাপড়ি আর অসংখ্য সুন্দর রোমন্টিক কথার ফুলঝুড়িতে কেটে গেছে আমাদের দৈনন্দিন আরেকটি দিন। বহুবছর আগে অতীতের ধূসর অতলে হারিয়ে যাওয়া জাফর, জয়নাল, দীপালী সাহা, আইয়ুব, ফারুক, কাঞ্চন এই নামগুলো মনে পড়ে কি? মনে পড়ে বাংলাদেশের প্রথম গণ আন্দোলনের কথা? কিংবা, ১৪ ফেব্রয়ারী ১৯৮৩’র আগুনঝরা মধ্য ফাগুনের সকাল, দুপুর, অথবআ স্তব্দ বিকালের নিঃশব্দ ক্ষণগুলো? স্মৃতির ইথারে ভেসে আসে কি সেই ঘোষনা, “আমি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাহায্য ও করুণায় এবং আমাদের মহান দেশপ্রেমিক জনগণের দোয়ায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বুধবার থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সকল ও পূর্ণ ক্ষমতা গ্রহণ করছি এবং ঘোষণা করছি যে গোটা বাংলাদেশ অবিলম্বে সামরিক আইনের আওতায় আসবে। প্রধাণ সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে আমি বাংলাদেশের সকল সশস্ত্র বাহিনীর পূর্ণ ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করছি।”



২৪ মার্চ ‘৮২ সাল। তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদের নেতৃত্বতাধীন উচ্চাভিলাষী কিছু সেনাকর্মকর্তার প্রত্যক্ষ্য মদদে গোটা দেশটা দখল করে নিলো বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। শুরু হলো স্বৈরশাসন। সেই সময়টাকে স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রান্তিকাল বলা যেতে পারে। এক অস্থির শাসনব্যবস্থার দোর্দন্ডপ্রতাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলো সারাদেশের সোচ্চার নাগরিক সমষ্টি। প্রতিবাদী কন্ঠগুলো শব্দের অভাবে নীরবতাকে আশ্রয় করে কাটাচ্ছিলো সময়ের গভীর পরিক্রমা।

যখন সারাদেশে প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ, সামরিক আইনের সমালোচনা মানেই সাত বছরের কারাদন্ড, তখন এরশাদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে ছাত্ররা। প্রথম মিছিল বের করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।

২৩ সেপ্টেম্বর ‘৮২ তারিখ। এরশাদ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ড. মজিদ খান একটি নতুন শিক্ষানীতির প্রস্তাব পেশ করেন। প্রথম শ্রেণী থেকেই আরবি ও দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়। আরেকটি বিতর্কিত বিষয় ছিলো উচ্চশিক্ষা। উচ্চশিক্ষা অর্জনের মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয় মেধা অথবা পঞ্চাশ শতাংশ শিক্ষা-ব্যয়ভার বহনের ক্ষমতা! শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা এই শিক্ষানীতিকে আইউব খানের শরীফ শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের নবায়ন ভিন্ন সংস্করণ হিসেবে আখ্যা দেন।



সারাদেশের ছাত্র ও শিক্ষক সমাজ এই নীতির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেন। শুরু হয় মিছিল প্রতিবাদ।

৮ নভেম্বর ৮২ তারিখ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের লাঠিপেটায় গুরুতর আহত হন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক নুরুল আমিন বেপারীসহ ছাত্র, কর্মচারী ও সাংবাদিক। গ্রেফতার করা হয় ৩০ জনকে। এর প্রতিবাদে পরদিন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়, প্রতিবাদ মিছিল হয়। বন্ধ ঘোষণা করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৪ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় খুললে ১৪টি ছাত্র সংগঠন একযোগে আন্দোলন কর্মসূচী চালায়। ছাত্রদল আর ছাত্রশিবির পৃথক কর্মসূচী পালন করে। একদিকে প্রতিবাদ আন্দোলন আরেকদিনে দমন নিপীড়ন চলতে থাকে। ছাত্ররা ২৯ ডিসেম্বর দাবি দিবস ও ১১ জানুয়ারি সচিবালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান ধর্মঘট কর্মসূচি ঘোষণা করে। কিন্তু তৎকালীন সরকার তাতে একটুও না থেমে ‘৮৩’র জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে দেশের ১৪২টি থানার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় বাধ্যতামূলক আরবি শিক্ষা শুরুর আদেশ দেন। একই সঙ্গে ১১ জানুয়ারির কর্মসূচির বিরুদ্ধে কড়া প্রেসনোট হুমকি দেয়। কিন্তু তাতে ও ছাত্ররা পিছপা না হলে এরশাদ ছাত্রদের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দেয়। ছাত্ররা ৭ জানুয়ারি ‘৮৩র সেই প্রস্তাবিত বৈঠক প্রত্যাখ্যান করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঘোষণা করে- “শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষায় অতিরিক্ত দুইটি বিদেশী ভাষা বাধ্যতামূলক করিয়া মূলত বাংলা ভাষাকেই আঘাত করা হইয়াছে। শিক্ষা সংস্কারের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাজীবনে এক অরাজক ও নৈরাজ্যজনক অবস্থার সৃষ্টি করা হইতেছে এবং শিক্ষাকে উচ্চশ্রেণীর ব্যয়বহুল বিনিয়োগ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলিতেছে। ছাত্রসমাজের উপর চলিতেছে চাপ ও নিপীড়ন। … … … … … …। এই পরিস্থিতিতে সংগ্রাম পরিষদ শিক্ষা, গণতন্ত্র ও মৌল অধিকারসহ শোষণমুক্তির দাবি লইয়া একুশ পালনের আহ্বান জানায়।” বিপরীতে সরকারী প্রেসনোটে বলা হয়- “গত নভেম্বর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যেসব গণবিরোধী ও সমাজবিরোধী ঘটনা ঘটছে সরকার তা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করে আসছেন। … … … … …। সরকার এসব বিপথগামী ব্যক্তি দের ধ্বংসাত্মক পথ পরিত্যাগ করার জন্য হুঁশিয়ার করে দিচ্ছেন। অন্যথায় তাদের গুরুতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।” ১১ জানুয়ারি প্রস্তাবিত তারিখে হাজার হাজার ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশে সমবেত হয়। অপরদিকে অস্ত্রসজ্জিত প্রচুর দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় ও সচিবালয়ের চারপাশে। ব্যাপক সংঘর্ষ এড়াতে ছাত্ররা সচিবালয়ে না গিয়ে শহীদ মিনারে গিয়ে আন্দোলন তীব্রতর করার শপথ গ্রহণ করেন। একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। এরশাদ এবার একুশের চেতনায় আঘাত হানতে শুরু করে। ১১ জানুয়ারির সচিবালয়ে অবস্থান ধর্মঘট কর্মসূচি রদবদল কেন করা হলো এই নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে অসন্তোষ তৈরি হয়। প্রতিবাদে ছাত্ররা ডাকসু অফিস ভাংচুর করে। তবু ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দ শান্তিপূর্ণ পথেই দাবি আদায়ের সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার পথে অবিচল থাকেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ বিরোধী আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়া হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এর বিরোধিতা করলে সংঘর্ষ হয়, আহত হয় অর্ধশত ছাত্র। এই ঘটনার খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এদিকে ছাত্রদের কঠোর মনোভাবে এরশাদ কিছুটা বিচলিত হয়, ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির ব্যাপারে একটি জনমত যাচাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়।



[মিছিল পূর্ব ছাত্রজমায়েত, কলাভবন]



[বাধা দিতে প্রস্তুত পুলিশ]

কিন্তু ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আন্দোলন অব্যাহত রাখে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার ছাত্র ছাত্রী মিছিলসহ স্মারকলিপি পেশ করতে সচিবালয়ের দিকে ধেয়ে যায়। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও এই আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে এবং আন্দোলনে অংশ নেয়।



[এগিয়ে চলছে মিছিল]



[অর্দ্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্দ্ধেক তার নর]



[মিছিল যাতে যেতে না পারে শিক্ষা ভবনে, রাস্তায় ব্যারিকেড]

মিছিলটি যখন হাইকোর্ট এলাকায় পৌঁছেছে তখন মিছিলের ওপর পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে। আগে থেকেই বিপুল সংখ্যক পুলিশ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চল ঘিরে রাখা হয়েছিলো। নিরস্ত্র ছাত্র ছাত্রীদের ওপর পুলিশ লাঠি, টিয়ারগ্যাস, জল কামান ব্যবহার করেই ক্ষান্ত হয়নি, গুলিও চালায়। গোটা এলাকা রণক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়। একসময় ছাত্ররা আশ্রয় নেয় শিশু একাডেমীতে। সেখানে তখন শিশুদের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিলো। পুলিশ সেখানেও ঢুকে যায় অস্ত্রহাতে। কোমলমতি শিশুরাও সেদিন রক্ষা পায়নি এরশাদের পেটোয়া বাহিনীর হাত থেকে।


[বাধা দিলে বাধবে লড়াই, এই লড়াইয়ে জিততে হবে]



[পুলিশ জনতা মুখোমুখি]



[ব্যারিকেড ভেঙ্গে মিছিল এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি]



[বাজা তোর প্রলয় বীষাণ ধ্বংশ নিশান উড়ুক প্রাচী'র প্রাচীর ভেদী]



[মিছিলে পুলিশ গুলি চালাচ্ছে]

প্রায় সারাদিনব্যাপী এই অসম সংঘর্ষে জাফর, জয়নাল, দীপালী সাহা, আইয়ুব, ফারুক, কাঞ্চন প্রমুখ নিহত হন। দশ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়, কিন্তু সরকারি প্রেসনোটে দাবী করা হয় ১ জনের মৃত্যুর কথা। আর আহতের সংখ্যা অগুনতি। গ্রেফতারের সংখ্যাও অগুনতি।


[গুলিতে নিহত সতীর্থের লাশ!]



[এ লাশ আমরা কোথায় রাখবো?]

সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে ও ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করে।



এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে পরদিন, অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতা রাস্তায় নেমে আসে। সংঘর্ষ হয় মিরপুর, আমতলী, তেজগাঁ, বাহাদুরশাহ পার্ক, ইংলিশ রোড, মতিঝিল এবং অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুধু ঢাকাতেই না, আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। পুলিশ গুলি চালায়। চট্টগ্রামে নিহত হন মোজাম্মেলসহ আরো কয়েকজন। যদিও এদিনও সরকারী প্রেসনোটে নিহতের সংখ্যা ১জন দাবী করা হয়। ভীত সন্ত্রস্ত এরশাদ শাহী ঢাকা ও চট্টগ্রামের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করে। জাহাঙ্গীরনগর ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে সারাদেশে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।



এসব খবর যাতে সারাদেশে ছড়াতে না পারে, সেজন্য সংবাদপত্রগুলোতে আরো কড়াকড়িভাবে সেন্সরশীপ আরোপ করা হয়।

১৪ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সারাদেশে প্রচুর গ্রেফতার অভিযান চলে। শীর্ষস্থানীয় প্রচুর ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করে এরশাদ বাহিনী। তবু আন্দোলনকে দমাতে পারেনি।

ব্যাপক ছাত্রগণআন্দোলনের মুখে ১৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে এরশাদ বলতে বাধ্য হয় যে- “জনগণের রায় ছাড়া শিক্ষা সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।” এক সরকারি প্রেসনোটে বলা হয় গ্রেফতারকৃত ১২২১ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

সেবছর সারাদেশে আক্ষরিক অর্থেই শোকাবহ একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হয়। বাংলা ভাষা ও শিক্ষার দাবীতে সারাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়। কিন্তু রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে একুশের কর্মসূচি পালন করা যায়নি।

মজিদ খান প্রস্তাবিত স্বৈরশাসক এরশাদের বিতর্কিত শিক্ষানীতির প্রতিবাদে সামরিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে, লাঠি গুলি টিয়ার গ্যাসকে পরোয়া না করে, গ্রেফতার নির্যাতন হুমকি হত্যার তোয়াক্কা না করে সেই যে মানুষ রাস্তায় নেমেছিলো ‘৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে, সেখান থেকেই মূলত এরশাদ বিরোধী গণআন্দোলনের সূত্রপাত। ‘৮৩র ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখেই এদেশে সামরিক শাসনের ভীত কাঁপিয়ে দেয় সাধারণ নিরস্ত্র ছাত্ররা। ১৯৮৪ সালে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন স্তিমিত করার কৌশল হিসেবে উপজেলা নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন এরশাদ। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছাত্ররা উপজেলা নির্বাচনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। ১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি উপজেলা নির্বাচন বাতিলের দাবিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের একটি মিছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গুলিস্তান অভিমুখে যাওয়ার সময় পুলিশ মিছিলটিকে ট্রাক দিয়ে ধাওয়া করে। পুলিশের ট্রাক ছাত্রদের মিছিলের ওপর তুলে দিয়ে ট্রাকের তলায় পিষ্ট করে হত্যা করে সেলিম ও দেলোয়ারকে। ৮৩’র ১৪ ফেব্রুয়ারির পর মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আবারও ছাত্রদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়। ধীরে ধীরে সার্বিক গণআন্দোলনে রূপ লাভ করে। এবং সবশেষে ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসক এরশাদের পতন ঘটে।

মুক্তিযুদ্ধের পর মধ্য ফেব্রুয়ারির এই আন্দোলনই বাংলাদেশের প্রথম গণ আন্দোলন। যার সমাপ্তি ঘটেছিলো চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে।

আমরা ভুলে যাই সেইসব সূর্য-সন্তানদের। ভালোবাসা কিংবা ভালোবাসা দিবস, কোনটারই বিপক্ষে নই আমি। জীবনকে আমাদের ভালোবাসতেই হয়, জীবনের প্রয়োজনে। কিন্তু, কখনো কখনো মৃত্যুকেও হয়তো ভালোবাসাতে হয়। হয়তো সেটাও জীবনেরই একটা প্রয়োজন। আমাদের হাসি আনন্দ আর বাঁধভাঙা উল্লাস থাকবে। জীবন চলবে তার আপন গতিতে। তবুও, সেই সব বীরদের কথা এমন করে বিস্মৃত হওয়ার অধিকার আমাদের কে দিয়েছে? আমরা এমন করে ভুলে যেতে পারি না আমাদের হাসি আনন্দের জন্য জীবন উৎসর্গকারী জাফর, জয়নাল, দিপালী নূর হোসেন এমন আরো অনেক বন্ধুকে…।

তাই, আসুন, ভালোবাসা দিবসের দিনটিতে আমরা ভালোবাসার অর্ঘ্য দিয়ে ভরিয়ে দেই সেইসব ক্ষণজন্মা সাহসী সন্তানদের অন্তরাত্মার গহীন অন্দর। অন্তত, একবারের জন্য হলেও, এই দিনে তাদের কথা স্মরণ করি বিনম্র শ্রদ্ধায়। হয়তো তাহলে ‘মুক্তিযুদ্ধ না দেখা’ এই প্রজন্মের দায়, কিছুটা হলেও শোধ হবে। সেদিনের সেই বীর যোদ্ধাদের প্রতি রইলো অতলস্পর্শী ভালোবাসা। আমাদের মতো আরো অনেকেই তোমাদের কথা ভুলে যাইনি।

আমরা আছি…। আমরা জেগে আছি তোমাদের সেই নির্ঘুম চোখ নিয়ে। কালের অতন্দ্রপ্রহরী হয়ে। আমরা হেঁটে যাবো তোমাদের সেই রক্তভেজা পথ ধরে….। লাল সেলাম জেনো বীরবন্ধুরা…। স্যালুট তোমাদের….।

কৃতজ্ঞতা:

নজরুল ইসলাম

সচলায়তন

——————-

তথ্য ও ছবি:

# গনআন্দোলন ১৯৮২-৯০, সৈয়দ আবুল মকসুদ

# লেখকের রোজনামচায় চার দশকের রাজনীতি পরিক্রমা প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ ১৯৫৩-৯৩, আব্দুল হক

# দৈনিক ইত্তেফাক

# প্রগতির পরিব্রাজক দল

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


লেখাটি ভাল লেগেছে

স্বপ্নের ফেরীওয়ালা's picture


যেখানে কাগু স্বমহিমায় বিদ্যমান সেখানে কোন মুখে এনাদের স্যালুট জানাই?

অমূল্য জীবন দেয়া জাফর, জয়নাল, দীপালী সাহা, আইয়ুব, ফারুক, কাঞ্চন যেখানেই থাকুক তারা যে আমাদের ধিক্কার দিচ্ছেন সেই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।

সেই সময় স্কুল সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনির্দিষ্টকালের ছুটি দিছিলো, যতটুকু মনে পড়ে। ৩ দিন পরেই স্কুল খুলে যায়, কিন্তু মহা আনন্দে কাটাইছিলাম সেই তিন দিন, ওইটাই লাভ।

~

লীনা দিলরুবা's picture


মূল্যবান লেখা।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রুপালি গিটার's picture

নিজের সম্পর্কে

জনারণ্যের বিশাল এই পৃথিবীতে ভীষণ নির্জন আর একাকী একজন পথিক। প্রতিনিয়ত পথ হাঁটছি জীবনের প্রয়োজনে। অভিনয় করে যাচ্ছি ভালো থাকার। প্রতিনিয়ত শিখছি একটু একটু করে। ভীষণ ছোট্ট একটা জগত আমার। প্রযুক্তির অসাধারণ অগ্রযাত্রা আর বিশ্বায়নের এই যুগে নিজের চরিত্রটাকে বড্ড বেমানান লাগে। তবুও, পথ চলি অবিরাম। নতুন কোন সুন্দর আলো ঝলমলে সোনালী প্রভাতের প্রতিক্ষায়।