ইউজার লগইন

বার্থ সাটিফিকেট এবং পররাষ্ট্র মণ্ত্রনালয় সত্যায়িতকরণ অভিজ্ঞতা

বার্থ সার্টিফিকেট কি সেটা আমরা সবাই জানি। বিশেষ করে শিক্ষা সংক্রান্ত কাজে বিদেশে যেতে বা অন্যান্য কাজে বার্থ সার্টিফিকেটের দরকার হয়। বার্থ সার্টিফিকেটটি অবশ্য ইংরেজীতে। শুধু বার্থ সাটিফিকেট হলেই হয় না, পররাষ্ট্র মণ্ত্রনালয় থেকে তা সত্যায়িতও করাতে হয়। আমারও সেরকম কারণেই বার্থ সার্টিফিকেটের দরকার পড়ল। বছর পাচেক আগেও একবার নিয়েছিলাম, আবার দরকার পড়ল। যেহেতু আমি ঢাকার বাসিন্দা, পুরোনো কপিটি সাথে নিয়ে সোজা চলে গেলাম ঢাকা সিটি করপোরেশনে। মনে মনে দুরু দুরু ভয়, শুনেছি সিটি করপোরেশনে অনেক ধান্দাবাজ আছে। এরা অহেতুক মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে, মিথ্যা কথায় অর্থ আত্মসাৎ করে। তবু ঢাকা সিটি করপোরেশন ছাড়া যেহেতু আর কোন উপায় নেই, অতএব যেতেই হল।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের বিশাল গেট দিয়ে ঢুকে সিড়ি বেয়ে খানিকটা উঠতেই দেখলাম রিসিপশন ডেস্ক। ভাবলাম, এখানে জিজ্ঞেস করে নিই, ফরম কোথায় পাওয়া যাবে, কত তলায় এবং কার কাছে ফরম জমা দিতে হবে, কত ফি, হাতে পেতে কতদিন লাগবে। রিসিপশন ডেস্কে সাদা পান্জাবী পড়া, মাথায় টুপি দাড়িওয়ালা একজনকে বসে থাকতে দেখে ভাবলাম, ভালই হল, এই লোক নিশ্চয়ই ধান্দাবাজ হবে না। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই উনি জানালেন, ফরম উনার কাছে আছে, মূল্য ১০টাকা। ফরম পূরণ করে করে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে হবে, আর বার্থ সার্টিফিকেট হাতে পেতে দুই সপ্তাহের মত সময় লাগবে। অথবা আমি তার মাধ্যমে করাতে পারি, উনি চারদিনের মধ্যে করিয়ে দিবেন, উনাকে ৫০০টাকা দেয়া লাগবে। বোঝা হয়ে গেল, এ্ই দাড়িওয়ালা, টুপিওয়ালা পান্জাবী পরিহিত লোকটি সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা হলেও দালাল ছাড়া আর কিছু নন। সামনে অগ্রসর হয়ে দু'একজনকে জিজ্ঞেস করতেই তারা বলল, বার্থ সার্টিফিকেটের জন্য ৯তলা, ১২তলা কিংবা ১৫তলায় যান। ৯তলায় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন শাখা পেলাম। উক্ত শাখার জনৈক ভদ্রলোকের সাথে দেখা করতেই উনি জানালেন, উনি করিয়ে দিতে পারবেন, উনাকে ৪০০টাকা দেয়া লাগবে এবং ৪দিন সময় লাগবে। বাহ্ একতলা থেকে ৯তলায় উঠতেই ১০০টাকা কমে গেল। তাহলে আরো উপরে উঠে দেখি, আরো কত কমে। চলে এলাম, ১২তলার জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন শাখায়। জনৈক ভদ্রলোকের সাথে দেখা করতেই উনি জানালেন, উনি ৩০০টাকা এবং ৪দিন সময় চাইলেন। আরো ১০০টাকা কমল। এবার ১৫তলায় যাওয়া যাক। ১৫তলার জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন শাখার জনৈক ভদ্রলোকের সাথে দেখা হতেই মনে পড়ল, পাঁচ বছর আগে ইনিই ৬০০টাকার বিনিময়ে আমার বার্থ সার্টিফিকেট করিয়ে দিয়েছিলেন। পুরানো কপিতে উনারও স্বাক্ষর আছে। যদিও মূল স্বাক্ষরদাতা ছিলেন, সিটি করপোরেশনের তৎকালীন চীফ হেলথ অফিসার। পূর্বের কপিটি দেখে উনি জানালেন, ২০০টাকা দেয়া লাগবে আর ২দিন সময় লাগবে। আমি বললাম, আগের কপিটি তো আপনারই করা, আমি তো পুরোনো কপিরই আরেকটি কপি চাচ্ছি। তাহলে ২০০টাকা চাচ্ছেন কেন, তাছাড়া আমার একটু জরুরী ভিত্তিতে দরকার। আধঘন্টা ভেবে (আধঘন্টা ধরে কি ভাবলেন, আল্লাগই জানেন) উনি জানালেন, ঠিক আছে, কালকে আসেন, আর টাকা কিছু বাড়িয়ে দিয়েন (২৫০টাকা)। আমি রাজী হয়ে গেলাম। পুরানো কপিটি তার কাছে দিয়ে চলে এলাম। পরদিন বার্থ সার্টিফিকেটটি হাতে পেয়ে মনটা ভাল না হয়ে ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। কারণ মূল স্বাক্ষরদাতা হিসাবে সিটি করপোরেশনের চীফ হেলথ অফিসার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: নাসির উদ্দিনের স্বাক্ষর। প্রথমত: বার্থ সার্টিফিকেটের সবকিছুই ইংরেজীতে হলেও উনার স্বাক্ষরটি বাংলায়। এবং দ্বিতীয়ত, কোনমতেই একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের স্বাক্ষর এমন হতে পারে না (খুবই কাচা হাতের স্বাক্ষর)। আমার অফিসের পিওনও বাংলা এবং ইংরেজীতে এর চেয়ে ভাল স্বাক্ষর করতে পারবে। স্বাক্ষরের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই উক্ত ভদ্রলোক জানালেন, ব্রিগেডিয়ার সাহেব অনেক ব্যস্ত, এসব ছোটখাট ব্যাপারে তার তেমন মাথাব্যথা নেই। চরম ব্যস্ততার ফাঁকে উনি খুবই দ্রুততার সাথে স্বাক্ষর করেন, তাই এমন হয়েছে।

বিরস বদনে সেখান থেকে চলে আসতে হল। এবার পররাষ্ট্র মণ্ত্রনালয় থেকে তা সত্যায়িতকরণ। চলে এলাম, মতিঝিল পাড়ায়, যেখানে অনেকগুলো অনুবাদ কেন্দ্র রয়েছে। বেশ কয়েকটিতে ঢুঁ মারলাম। সকলেই চীফ হেলথ অফিসার ব্রিগেডিয়ার সাহেবের বাংলা স্বাক্ষর এবং স্বাক্ষরের ধরন নিয়ে সন্দীহান প্রকাশ করল। আমিও আমার অসহায়তা তাদের কাছে বর্ণনা করলাম। একটি অনুবাদকেন্দ্রের লোকেরা জানাল, কোন একবার চীফ হেলথ অফিসারের স্বাক্ষরবিহীন বার্থ সার্টিফিকেটও নাকি পররাষ্ট্র মণ্ত্রনালয় সত্যায়িত করেছে। কি করে সম্ভব? Puzzled যাই হোক, পররাষ্ট্র মণ্ত্রনালয় থেকে সত্যায়িত করিয়ে দেয়ার জন্য বিভিন্ন অনুবাদকেন্দ্র ৫০০ থেকে ১০০০টাকা পর্যন্ত চাইল। জানি না কিসের উপর নির্ভর করে টাকার এই তারতম্য। ৫০০টাকা যারা চাইল, তাদের কাছে বার্থ সার্টিফিকেটটি দিয়ে চলে এলাম। পরদিন পররাষ্ট্র মণ্ত্রনালয় কর্তৃক সত্যায়িত বার্থ সার্টিফিকেটও হাতে পেলাম। অ্যাম্বেসীতে জমা দিলাম, তারাও তা গ্রহণ করল। বোধ করি, তারা পররাষ্ট্র মণ্ত্রনালয় কর্তৃক সত্যায়িত কিনা সেটিই ভাল করে দেখল।

সবশেষে নিজেকে প্রশ্ন করলাম:
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা হয়েও ৯, ১২, ১৫তলার সবাই নিজের ধান্দাবাজিতে ব্যস্ত। তাহলে বার্থ সার্টিফিকেট সংগ্রহের অফিসিয়াল উপায় কি? চীফ হেলথ অফিসার যদি এতই ব্যস্ত থাকেন, তাহলে এই দায়িত্বটি উনি অন্য কাউকে দিলেই পারেন। নাকি উনিও কমিশন পান? পররাষ্ট্র মণ্ত্রনালয় কিসের ভিত্তিতে আমার বার্থ সার্টিফিকেট সত্যায়িত করল? ইংরেজী বার্থ সার্টিফিকেটে চীফ হেলথ অফিসারের বাংলা স্বাক্ষর একবারও কি তাদের চোখে পড়ে নি? আমাদের দেশ কি কোনদিনও বদলাবে না? আর কত অধঃপতনের দিকে আমরা যেতে থাকব?
আমাদের এক নেত্রী দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে বলে মিথ্যাচার করছেন, অন্য নেত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশের অলীক স্বপ্নে জনগণকে মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছেন।
সবশেষে আমজনতার একজন হয়ে নিজেই দীর্ঘশ্বাস ফেললাম: আজব দেশের আজব সিটি করপোরেশন এবং আজব তার পররাষ্ট্র মণ্ত্রনালয়!!
বি.দ্র.: ব্যক্তিগত তথ্য গুলো মুছে দিলাম। আশা করি কেউ কিছু মনে করবেন না।

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রাসেল আশরাফ's picture


তারা ভাই এটা কবেকার কাহিনী???

কারন এখন সরকার বাংলাদেশের সব নাগরিকে জন্মনিবন্ধন কার্ড দিয়েছে।আর কারো যদি এর ইংলিশ ভার্সন দরকার হয় তাহলে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অফিস থেকে সংগ্রহ করতে হয়। ক্ষেত্র বিশেষে হয়তো টাকা পয়সা দিতে হয়।

আর পররাষ্ট মন্ত্রনালয়ে সত্যায়িত করে দেয়ার জন্য আলাদা বুথ আছে যে কেও সকালে গিয়ে জমা দিলে বিকালবেলায় সেটি সত্যায়িত করে দেয়।

অনুবাদ কেন্দ্রে টাকা দিয়ে কেন সত্যায়িত করালেন বুঝলাম না।

দূর আকাশের নীল তারা's picture


এটা আগষ্ট ২০১০ এর ঘটনা। জন্মনিবন্ধন কার্ড কে দিচ্ছে? আমার জানা মতে সিটি করপোরেশনই বার্থ সার্টিফিকেট (জন্মনিবন্ধন কার্ড) দেয়ার ক্ষমতা রাখে। বিভিন্ন দেশের (ইউএস, ডাচ) অ্যাম্বেসীতে ওয়ার্ড কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত বার্থ সার্টিফিকেট (জন্মনিবন্ধন কার্ড) গ্রহণ করা হয় না বলেই জানি। পররাষ্ট মন্ত্রনালয়ে বুথ আছে জানি, কিন্তু ভোরবেলা গিয়ে লাইন ধরতে হয়। নিজের ব্যস্ততার কারণে সেটা করতে চাইনি বলেই অনুবাদ কেন্দ্রের শরণাপন্ন হওয়া। ধন্যবাদ।

রাসেল আশরাফ's picture


সবশেষে আমজনতার একজন হয়ে নিজেই দীর্ঘশ্বাস ফেললাম: আজব দেশের আজব সিটি করপোরেশন এবং আজব তার পররাষ্ট্র মণ্ত্রনালয়!!

নিজের সময়ের অভাবে লোকজনরে ঘুষ দিয়ে কাজ করালেন।

তাহলে কেন এই দীর্ঘশ্বাস?????????

দূর আকাশের নীল তারা's picture


সত্যিই হাসালেন রাসেল ভাই। একবারও বুঝলেন না, সিটি করপোরেশনের গিয়ে সময়ের অজুহাত দেয়াটা ছিল কেবল মাত্রই অজুহাত। সবাইই ৪-দিনেই করিয়ে দিতে পারে, শুধুমাত্র টাকার পরিমাণটাই কম-বেশী হয়। কেন হয় জানি না। আরও জানা হয় নি, বার্থ সার্টিফিকেট উঠানোর ঘুষবিহীন পন্থাটি কি? কারণ কেউই ঘুষবিহীন পন্থাটি নিয়ে কথা বলে নি, এবং সিটি করপোরেশনের কোথাও তার উল্লেখও নেই। আর সিটি করপোরেশন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি এমন একটি ব্যবস্থা রাখত যেখানে মানুষের ভোগান্তি হবে না, তাহলে কি কেউ গায়ে পড়ে ঘুষ দিবে?

তানবীরা's picture


তারা ভাইরে বিরাট ওয়েলকু ব্লগে। পোষ্ট বিষয়ে আর কিছু কইলাম না। কানতে কানতে জানে আর কিছুই না। জন্ম থেকে জ্বলছিতো এখন জ্বলাই অভ্যাস হয়ে গেছে। না জ্বললেই বোধহয় খারাপ লাগবে, মিস করবো।

দূর আকাশের নীল তারা's picture


ট্যাংকু ট্যাংকু আপা ... বড় হেছা কতা কইছেণ।

মডারেটর's picture


প্রথম পোস্টই ডুয়েল?

গ. "আমরা বন্ধু" তে শুধু নতুন লেখাই প্রকাশিত হবে। পুরনো লেখা রিপোস্ট করা যাবে না। অন্য কোনো কম্যুনিটি ব্লগে প্রকাশিত লেখা এবিতে প্রকাশ নিষিদ্ধ। এবিতে প্রকাশিত কোন লেখা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে অন্য কোনো কমিউনিটি ব্লগে প্রকাশ করা যাবে না। ব্যক্তিগত ব্লগ এবং পত্রিকা এই নিয়মের আওতার বাইরে।

নীতিমালা অনুযায়ী পোস্ট সরিয়ে দেয়া হলো।

দূর আকাশের নীল তারা's picture


লেখক তো আমি নিজেই। হল্যান্ডে আমার ফ্রেন্ড থাকলে ফিনল্যান্ডে থাকতে পারবে না এটা কোন কথা হল?

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

দূর আকাশের নীল তারা's picture

নিজের সম্পর্কে

মানুষের দু:সময়ে তার পাশে দাড়িয়ে, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে তার সুসময় ফেরার মুহুর্তে চুপিসারে পালিয়ে যাওয়ার মাঝেই একটা তৃপ্তি আছে ...