প্রখর সকাল
দিনটা শুরু হচ্ছে ইঁচড়ে পাকা সকাল দিয়ে। এলারম এর শব্দে ভোর হয়। প্রতিদিনের অভ্যাসে টুক টুক হেটে টয়লেটে। পানি ডিস্ট্রিবিউশন এ কোন সমস্যা আছে নির্ঘাত। পানির তাপমাত্রা এই সময়ের তাপমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। হাত মুখে একটু জলুনি অনুভব হচ্ছে। মনে মনে গালি দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। গালি দেয়াটা ঠিক কাজ না, যাকে গালি দেয়া হচ্ছে তার অনুভুতিতে আঘাত আসবে যদি শুনতে পায়। যদিও জানি সে শুনবে না। কিন্তু আমার শিক্ষা আমাকে এই গালি দেয়া থেকে বিরত রাখছে। খুব হাসি পাচ্ছে। আয়নায় এই জলুনি ধরা চেহারায় নিজের অজান্তে ই একটু হাসি ফুটে উঠলো। কাল ই এর একটা হেনস্থা করতে হবে। পানি ব্যবস্থাপনায় যিনি আছেন, তাকে ডেকে এর ব্যখ্যা চাইতে হবে। আর ব্যখ্যা যাই হউক, তার জন্য আমাদের এতো গুলো মানুষের যে সমস্যা হল তার জন্য তাকে মুল্য দিতে হবে। নিজের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হয়ে গেল। দিনে দিনে কেমন হিংস্র হয়ে যাচ্ছে। একটু তে ই বাধ ভেঙ্গে যাচ্ছে।
লৌকিক প্রশান্তি নিয়ে ই নামাজ শেষ করে বাসা থেকে বের হয়ে গেল।। এই উলম্ব গ্রামের বাসিন্দারা যদিও সবাই জিম এ গিয়ে দৌড় ঝাপ করে, এত গুলো বছরে ও এতে অভ্যস্থ হতে পারেনি। । ধির পায়ে লিফট এর দোর গোড়ায় এসে দাড়ায়।চারপাশ জন মানব শুন্য।৪ বাই ২০ ফুট লবিতে নিশব্দতা ভর করে। এখন ও শহর এর মানুষ জেগে উঠেনি। এই উলম্ব গ্রামের এই তলায় মনে হয় খুব কম মানুষ এর ই বাচ্চা আছে। অধিকাংশ মানুষ ই বয়স্ক এবং তারা শহরের ভিতর ই কাজ করে। ভাবতে ভাবতে লিফট চলে এলো দরজায়। এই লিফট কে অনায়াসে খেয়া বলা যায়। দিন নাই রাত নাই উপর-নিচ করছে। এই ঘাট ঐ ঘাট করে মানুষ কে পৌছে দিচ্ছে তার গনতব্যে। আমার খেয়া এখন ১৫ তলার ঘাটে। এখন ই একজন শিশু তার মায়ের হাত ধরে উঠবে এই তরি তে। দরাজা খুলে যেতে ই ষোড়শি মায়ের হাত ধরে ঘুম কাতর চোখে প্রবেশ করলও ছোট শিশু খেয়া। আজ একটু বেশি বেশি ঘুম ঘুম চোখ। অন্য দিন গুলোতে এক টুকরো হাসি উপহার দেয়। মায়ের শক্ত মুখ উপক্ষা করে। ৮ তলা থেকে আরও একজন উঠবে, মাঝ বয়সী। কাধে বেগ, হাতে খাবারের বেগ। সারা মুখ জুড়ে বিরক্তি। তার মাঝে ও এক ধরনের অহংকার আছে। যুদ্ধ জয়ের অহংকার। তার কৌলিন্যের সব টা জুড়ে আছে এক টা অর্জনের প্রশান্তি আর দিনমান কাজের ক্লান্তি। ডিজিটাল পর্দায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে অষ্টম তলা পার হয়ে গেল, কিন্তু কেউ উঠলো না।
বেসমেন্ট এ নামতে ই গাড়ি এসে হাজির। মা মেয়ে উঠে গেল গাড়িতে। আমি ও প্রায় নিরুদ্দেশ যাত্রায় বের হয়ে গেলাম। সামনের গাড়ির পিছনে এক জোড়া চোখ জ্বল জ্বল করে তাকিয়ে আছে।। বুঝতে পারছি আমার দিকে ই তাকিয়ে আছে। ভাবছে, গাড়ি ব্যতীত এই শহরে কেউ বের হয় না। এই অভ্যাসটা যতটা না ইচ্ছায়, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন। এ আবার কোন পাগল। বড় বড় যন্ত্রিক এক জোড়া চোখ উপেক্ষা করে নিজের পথে মনোযোগ দেয়া উত্তম। একটা বেশ ভাব চলে আসে। দুই চার বার হাত উঠা নামা করে শরীর টা কে একটু ঝাকুনি দিয়ে নিয়ে শুরু হল পথ চলা। মনে মনে গুন গুন করা " আমার এই পথ চলাতে ই আনন্দ।" নিজের অজান্তে ই অবাক হয়ে যায় মাঝে মাঝে। হঠাৎ হঠাৎ এমন কিছু সুর বা গান মুখে চলে আসে কোন চিন্তা ও করতে হয় না। পরে মনে করতে হয় আসলে এটা কি তার নিজের, একান্ত নিজের রচনা, নাকি অন্য কারো। অনেক ভেবে বের করে এই গান সে যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তখন তার গানের ক্লাশে শিখেছে। পরে বাসায় ও হয়তো অনেক বার শুনেছে। এই চরিত্র টি মনে হয় সে তার মায়ের কাছে ই পেয়েছে। মা ও এমনি গান গাইতে গাইতে হেটে যেত। । সবাই যখন গাড়ির মডেল বদলাতে ব্যস্ত, মা তখন পায়ে হেটে এখানে ওখানে চলে যাচ্ছে। রিক্সা তার প্রিয় বাহন। এখন আর এই শহরে রিক্সা চলে না। সবাই গাড়িতে ই চলাফেরা করে। নয়তো পাবলিক যান, বাস বা ট্রেন। সব এখন এসি। না হয়ে ও উপায় নেই। এই যে একা একটা সকাল কাটাব, একটু হাঁটব তার কি কোন উপায় আছে? আকাশের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। চকচকে রূপালী হলুদ আকাশ। এই আকাশ দেখে কে বলবে এখন ভোর ৬ টা বাজে। মাটি বলে জিনিস টা হারিয়ে গিয়েছে। এখণকার বাচ্চাদের মাটি দেখাতে নিয়ে যেতে হয় মিউজিয়ামে না হলে সমুদ্র তীরে। আরও কিছুক্ষন পর জুতার সুখতলি দিয়ে ধোঁয়া উঠবে। এই সব পাষণ্ড সকালে কেউ আর এখন হাঁটতে বের হয় না। বের হওয়া উচিৎ ও না। সবাই যার যার এপার্টমেন্ট এর জিম এ ই এই হাটা হাটির কাজটা সেরে ফেলে। শাহিন ই এখন ও বাইরে বের হয়ে হাঁটা হাঁটি করে। বাইরে বের হতে না পারলে কেমন দম বন্ধ লাগতে থাকে।
হাঁটতে হাঁটতে একসময় গুন গুন করে গান গেয়ে উঠে, একটা নিরুদ্দ্যেশ ভাব মনে আনার চেষ্টা করতে থাকে শাহিন। যদিও সে জানে এই যাত্রা নিরুদ্দ্যেশ না। তার তেমন কোন লক্ষ্য নেই যদিও। তাও দেখা যাবে সে এক ই যায়গায় পৌছে যায়। যেতে যেতে দেখা হয়ে যায় তার অচেনা বন্ধুদের সঙ্কা। নিয়ম করে তারা ও প্রতিদিন গাড়ি করে বের হয়। প্রত্যেকের গন্তব্য আলাদা, পথের শুরুতে বা চলতি পথের কোন এক মুহূর্তে চোখে চোখ পড়ে যায়। কেউ কেউ সকালের প্রথম মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে যায়। কারো চোখে লোভ, সে ও হেটে যেতে চায় এমনি। কেউ বা দেখে অদ্ভুত দৃষ্টি ফেলে, কিছুটা অবাক, কিছুটা বিরক্ত। মুহূর্তের বিনিময় বলে যায় অনেক কিছু। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই চোখের টানে ই প্রতিদিন পথে নামা। শাহিন একা নয় এই শহরে; প্রথা, প্রয়োজনীয়তার বেড়া জাল ছিঁড়ে আরও অনেকে নিজের পথে নেমে আসে। মাঝে মাঝে তাদের সাথে ও দেখা হয়ে যায়। ভিন্ন উৎস থেকে বেড়িয়ে, এক ই পথে কিছু দূর হাঁটা, কিছু গল্প।
-আজকের গরম টা দেখেছেন?
একটু হাসি দেয় শাহিন। এই হাসি আরেকটু সাহস দেয় পথিক কে। বলে চলেন
-এমন গরম আমি কক্ষনও দেখি নি। একটু বিরতিতে, নিশ্বাসের শব্দ।
দেখিনি শব্দ টা হয়তো সঠিক নয়। কখন ও অনুভব করি নি। আমার বয়স ৬০, এই ষাট বছরে, এই শহরে এমন গরম, এমন তেজী সূর্য কখন ও দেখিনি। এই শহরে এখন মানুষএর দিন শুরু হয় ৫ টায়, সূর্য মামা আর কি করবে বলুন? তাকে ও তো আমাদের সাথে ই পাল্লা দিতে হয়। সে ও আকাশ ফুঁড়ে বেড়িয়ে পড়ে ৫ টার আগে ই।
শাহিন কি বলবে বুঝতে পারছে না। হাসি মুখে হু হা করে যাচ্ছে, পাশা পাশি হাঁটছে। মানুষটা মনে হয় কথা বলার সঙ্গী পেয়ে যার পর নাই আপ্লুত। কত দিন পর সে কোন রক্ত মাংসের মানুষ পেয়েছে কথা বলার জন্য। এক নাগারে কথা বলে যাচ্ছে।
-এই আলো লুকাবে ই বা কোথায়, বলুন? কোন গাছপালা দেখা যায়?!। কনক্রিটের খাঁচায় বন্দি আমরা। উত্তপ্ত দেয়াল এর ছায়া ও উত্তপ্ত।
এর মাঝে শাহিন এর হাতে ঘড়িতে মিষ্টি একটা চেহারা ভেসে উঠে। শাহিন এর সাথে যোগাযোগ করতে চাচ্ছে। শাহিন এর ইচ্ছে হল না কথা বলে। সে ঘড়ি বন্ধ করে রেখে দিল। সে জানে তার অফিস ঠিক জেনে গিয়েছে, সে এখন কোথায়। সে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছে তাও জানে। তাও তার ইচ্ছে হল না এই যান্ত্রিক জীবনে যেতে। একটু পালিয়ে যেতে চাইল। যদিও এটা ঠিক পালিয়ে যাওয়া না। সে নিজের সাথে ই থাকতে চাইল। কথায় কথায় একটা বাকে চলে আসলো। আরও একটু নিজের কাছে ফিরে আসতে চাইল। ইচ্ছকৃত ই বলল,
-তাহলে আজ যাই। ভাল থাকবেন। দেখা হবে।
-আচমকা কোন এক দিন হয়তো
বললেন পথিক।
শাহিন এখন একা। উল্টা পথ ধরল। হাঁটছে, আরও একটু ধির গতিতে। এই রোদ টা কে ই উপভোগ করার চেষ্টা করছে। সব কিছু কে চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। একে একে হারিয়ে যাচ্ছে গাড়ি, দালান, রাস্তা, শপিং মল, গাড়ির ভিতরের মানুষ, তাদের উৎসুক চোখ। শাহিন হাঁটছে, একটু লু হাওয়া গায়ে এসে চোখে মুখে লাগছে, মাঝে মাঝে ঠাণ্ডা বাতাস। অনেক টা খুব গরমে ফ্রিজ খুললে যেমন ঠাণ্ডা বাতাস তেমন একটা ছটা এসে লাগছে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সেই অনুভূতি। প্রথমে মুখে, ধীরে ধীরে সারা গা জুড়ে বয়ে চলে। ইচ্ছে করে সব বাধন খুলে এই হাওয়ায় ডুবে থাকতে। শির শির সেই হাওয়া। আরও গভিরে অনুভব করে। চার পাশে হালকা কল কল শব্দ। শহিন এক ডিঙ্গি নৌকায় দাড়িয়ে, চারদিকে ঝিরি ঝিরি হাওয়া, নদীর নতুন পানিকে হালকা করে দুলিয়ে দিচ্ছে, হালকা দুলছে তার ডিঙ্গি। ঠাণ্ডা শান্ত টল টলে জল, অথৈ পাথার। শাহিন বেয়ে চলে তার নৌকা নিরুদ্দেশ। সে ভুলে যায়, এই পাষণ্ড গরম, ভুলে যায় এই নিষ্প্রাণ শহর। সে শুধু বেয়ে চলে।
প্রশান্তি রেশ কাটতে না কাটতে ই খেয়া পারে পৌঁছে যায়। তার খেয়া ও প্রস্তুত ছিল, দরজা খুলতে ই ঢুঁকে তার খেয়ায়। এসির বাতাসে বাস্তবে ফিরে আসে। কিছুক্ষন এমনি দাড়িয়ে থাকে লিফট এর ঠিক মাঝে। চার দিকে তার প্রতিবিম্ব তাকে সঙ দিচ্ছে। নিচু গলায় উচ্চারিত হয় “আঠার”। তার গন্তব্য। হাতের ছোট ঘড়িটা চালু করে। ভাবতে থাকে একটু আগের এই অনুভূতি টা সিমুলেট করতে হবে। সে যদিও ঠিক জানে না কিভাবে কোঁথায় তার মস্তিস্ক এই অনুভিতি ধারন করেছে। ছোট বেলা থেকে পৃথিবীর অর্ধেক চষে বেড়িয়েছে, এবা বা পরিবারের সাথে। কোথাও কখনও হয়তো এমন ই ছিল। অনেক অবুভবের ভীরে কোন দিন এই অনুভব ও হয়তো হারিয়ে যাবে। হারিয়ে যাবার আগে ই তাকে এই অনুভব সিমুলেট করে সংরক্ষণ করতে হবে। এমন অসহনীয় জিবনে অনেকের মনে প্রশান্তি এনে দিবে। জিম এ ও একটা রাখা যাবে। আজ ই কাজ শুরু করতে হবে। ভাবতে ভাবতে পৌঁছে যায় নিজের গন্তব্যে।





ভালো লিখছেন। ক্যারি অন।
মন্তব্য করুন