ইউজার লগইন

বুয়েটের বাপ(পর্ব-৩)

আমরা যখন রুয়েটে ভর্তি হই তখন ছেলেদের জন্য ১নং (শহীদ শহিদুল ইসলাম) হল, ২নং (শহীদ আব্দুল হামিদ) হল, মেইন হোস্টেল( শহীদ লেঃ সেলিম) নামে তিনটি হল ছিল। মেয়েদের জন্য তখন কোন আলাদা হল ছিল না। মেয়েরা একটি শিক্ষক কোয়ার্টারে থাকত। আমরা যখন রুয়েটে ৮৫ সিরিজে ভর্তি হই তখন এটা ছিল রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ১৯৮৬ সালে তা বি, আই, টি, রাজশাহী ( বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি, রাজশাহী) এবং ২০০৩ সালে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা রুয়েট নামে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়।
ভর্তি হবার পর কলেজের নিয়ম অনুযায়ী আমরা প্রথম বর্ষের ছাত্রদের ১নং হোষ্টেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ১ম দিন বিকেল বেলা আমার রুমমেট আসাদ ও বেনজীরের সাথে মেইন হোস্টেলে( শহীদ লেঃ শেলিম) যাই। আসাদ ও বেনজীর রাজশাহী নিউ ডিগ্রী কলেজের ছাত্র হওয়াতে নতুন ভর্তি হবার পরও মেইন হোষ্টেলে ওদের অনেক পরিচিত সিনিয়র ভাই ছিলেন। হোষ্টেলে ঢুকে দেয়ালে টাঙ্গানো সুদর্শন এক সিংহ পুরুষের ছবি নজরে এল। রুমমেটদের কাছ থেকে শুধু জানলাম উনি শহীদ লেঃ সেলিম। আমরা গর্বিত যে আমাদের তিনটি হলের নামই তিনজন শহীদ বীর মুক্তি যোদ্ধার নামে যারা এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ছিল। এখন যদিও আরও দুটি হল হয়েছে, একটি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও অন্যটি দেশ রত্ন শেখ হাসিনার নামে নামকরণ করা হয়েছে। আবাসিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আরও একটি হল নির্মানাধীন আছে।
আমাদের এবং দেশের গর্ব তিনজন শহীদের নামে তিনটি হল হলেও আমি শুধু মেইন হোষ্টেলের লেঃ শহীদ সেলিম ভাই সম্পর্কে কিছুটা জানি অন্য দুজন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা নেই। বন্ধুরা কারও জানা থাকলে আমাকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করবেন আশা রাখি।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট সেলিম মোঃ কামরুল হাসান বীর প্রতীক , রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের '৬৭ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ তিনি দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৪ এপ্রিল লালপুর যুদ্ধ থেকে শুরু করে তেলিয়াপাড়া, হরষপুর, মুকুন্দপুর, ফুলগাজী, বেলোনিয়া, আখাউড়া যুদ্ধে তিনি অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দেন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের 'ব্রাভো' কম্পানির এই কমান্ডার। যুদ্ধের পর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বাঙালি সেনা ও মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে নবগঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১ম ব্যাচের কমিশনে তিনি লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ঢাকার বিহারী অধ্যুষিত এলাকা মিরপুরে পরাজিত হানাদার বাহিনী লুকিয়ে ছিল, যাদের হাতে প্রখ্যাত চলচিত্রকার জহির রায়হান নিহত হন। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি, পাকিস্তানি বাহিনীর স্থানীয় দোসরদের হাত থেকে অবরুদ্ধ মিরপুর মুক্ত করতে গিয়ে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এ মিশনে লেফটেন্যান্ট সেলিমসহ মোট ৪১ জন সেনা কর্মকর্তা শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর সম্মানে রুয়েটের ১ম হলেটির নাম তাঁর নামে নামকরণ করা হয়। (উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে সংগৃহীত)।

অত্র বিশব্বিদালয়ের এই তিনজন ছাত্রের শহীদ হবার তথ্য আমরা সকলেই জানি,তবে তখন কার ক্রীড়া শিক্ষক (আমরা তখন শেষ বর্ষে) কোন একটি অনুষ্ঠানে আরও একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কথা বলেছিলেন। সে অত্র বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহীর ছেলে ছিল। তার কবর যতদুর মনে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা প্রচীরের পূর্ব দক্ষিণ কোনায় বলেছিলেন। আমি ফাইনাল পরীক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায়ের লগ্নে প্রশাসনিক ভবনের বারান্দায় বসে তাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলাম,

১৫/০১/১৯৯১ ইং
(জীবন)
তোরা সবাই চলে যাস
এ মতিহার চত্বর ছেড়ে
কিন্তু আমি কোথাও যাব না।
দেবদারু ঘেড়া এ মতিহার চত্বর,
পাশেই বহমান পদ্মার কুলুকুলু ধ্বনি,
বিশুদার ইতালী হোটেলের তাপহীন চা,
সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহ দ্বারে
বৈকালিক সৌন্দর্য আমাকে যে
প্রশান্তি দিয়েছে।
পৃথিবীর অন্য কোথাও পাব
এটা আমার মনে হয় না।
তাই আমি কোথাও যাব না।
কথা কটি বলেছিলেন
আমাদের বড় ভাই রতন(কল্পিত নাম)-
কথা কটি সত্যি হয়েছিল একদিন,
মতিহার চত্বরের মায়া ছেড়ে
তিনি যেতে পারেননি কোনদিন।
ঘাতকের নির্মম বুলেট ছিনিয়ে নিয়েছিল
তার অমূল্য জীবন।
চির নিদ্রায় শায়িত আছেন
তিনি এ মতিহার চত্বরেই
জানিনা আমরা অনেকে।
এখন যখন জানতে পারলাম
শত সহস্র কোটি ছালাম জানাই- আপনাকে।
কারন-
আমাকে জ্ঞান হবার পর থেকে
দেখতে হয়নি
মা বা বোনের ইজ্জত লুন্ঠিত হতে
হয়নি দেখতে
বড় ভাই, বাবা বা কোন শিশুর বুক
ঘাতকের নির্মম বুলেটে বিদীর্ণ হতে
আরও হয়নি দেখতে
কোন অর্ধ নগ্ন যুবা বা যুবতীর
গলিত লাশ শৃগাল কুকুরের খাবারে
এ পরিণত হতে।
এ তো রতন
এবং হাজার হাজার রতন ভাইদেরই
অবদান-
তাই পরিশেষে জানাই
শত কোটি ছালাম
শত কোটি নমস্কার
আর দোয়া মাংগি
হে দয়াময়
তাদের তুমি সন্মানিত কর
তাদের আত্নার তুমি শান্তি দাও।
আমি ২০১০ সাল কাটাখালি পাওয়ার প্লান্ট উদ্বোধন করার সময় দিন দশেকের জন্য রাজশাহী গিয়েছিলাম। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে স্যারের খোঁজ করে জানতে পারি আমাদের প্রিয় ক্রীড়া শিক্ষক আমাদের এ ধরাধামের মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। আমার ইচ্ছা ছিল। রতন ভাই সম্পর্কে আরও কিছু জানার। স্যার আপনি আমাকে লোকাল ক্লাবের পক্ষে ফুটবল খেলতে অনেক জায়গায় পাঠিয়ে আপনি অনেক উপকার করেছিলেন। তখন যদিও বলিনি আজ বলছি। খেলে আমি যে অল্প অর্থ পেতাম, তা আমার অনেক উপকারে আসত। আল্লাহ আপনাকে বেহেশত নসীব করুন। (চলবে)
১৭/০৫/২০১৩ইং

প্রশাসনিক ভবন (রুয়েট)

http://www.amrabondhu.com/ahasan-habib/6277(দ্বিতীয় পর্ব)
http://www.amrabondhu.com/ahasan-habib/6262(প্রথম পর্ব)

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


পড়ছি

আহসান হাবীব's picture


আমার শুভাগ্য

আহসান হাবীব's picture


আমার শুভাগ্য

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আহসান হাবীব's picture

নিজের সম্পর্কে

তোমার সৃষ্টি তোমারে পুজিতে সেজদায় পড়িছে লুটি
রক্তের বন্যায় প্রাণ বায়ু উবে যায় দেহ হয় কুটিকুটি।।
দেহ কোথা দেহ কোথা এ যে রক্ত মাংসের পুটলি
বাঘ ভাল্লুক নয়রে হতভাগা, ভাইয়ের পাপ মেটাতে
ভাই মেরেছে ভাইকে ছড়রা গুলি।।
মানব সৃষ্টি করেছ তুমি তব ইবাদতের আশে
তব দুনিয়ায় জায়গা নাহি তার সাগরে সাগরে ভাসে।
অনিদ্রা অনাহার দিন যায় মাস যায় সাগরে চলে ফেরাফেরি
যেমন বেড়াল ঈদুর ধরিছে মারব তো জানি, খানিক খেলা করি।।
যেথায় যার জোড় বেশী সেথায় সে ধর্ম বড়
হয় মান, নয়ত দেখেছ দা ছুড়ি তলোয়ার জাহান্নামের পথ ধর।
কেউ গনিমতের মাল, কেউ রাজ্যহীনা এই কি অপরাধ
স্বামী সন্তান সমুখে ইজ্জত নেয় লুটে, লুটেরা অট্টহাসিতে উন্মাদ।
তব সৃষ্টির সেরা জীবে এই যে হানাহানি চলিবে কতকাল।
কে ধরিবে হাল হানিবে সে বান হয়ে মহাকাল।।