ছোট চাচা (শেষ পর্ব) তবু নামটা এখনও ঠিক করতে পারিনি।
সারাদিনই গায়ে জ্বর ছিল। বড় হুজুর বলল সিজিনাল জ্বর অনেকের হচ্ছে। রাতে উনি কিছু দোয়া দরূদ পড়ে ফুক দিয়ে বললেন,খেয়ে শুয়ে পড়,ইনশাল্লাহ ছেড়ে যাবে? কিন্তু হারুন কোথা থেকে জানি কিছু টেবলেট নিয়ে এল, পানি দিয়ে খেতে বলল। চাচা জানতে চাইলে বলল, আমি এখানে অনেকদিন থাকি আমার পরিচিত ডাক্তার আছে উনার কাছ থেকে এনেছি। চাচা কত দাম জানতে চাইলে বলল, তুমি আগে সুস্থ হও পড়ে দেখা যাবে। ক্লান্ত শরীরে চাচা ঘুমিয়ে গেলেন। রাতে হঠাৎ চাচার ঘুম ভেঙ্গে গেলে চাচার মনে হল কে যেন চাচার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু ছেলে মানুষের হাত এত নরম হয় কি করে? চাচা ধরতে যাবে এমন সময় হাত সরে গেল। চাচা ডাকলেন হারুন, বল শামছুল তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে। না আমার মাথায় কে হাত বুলাচ্ছিল। কেন আমি? বলে আবার হাত বুলাতে লাগলেন। চাচার বিস্ময় যেন চরমে উঠল। এ হাত তো সে হাত নয়। ওই হাত ছিল ছোট ও নরম আর এ হাত বিশাল থাবা ওয়ালা ও শক্ত। কিন্তু চাচা কিছু না বলে চুপচাপ শুয়ে রইলেন। সকালে ফজরের নামাজ পড়তে চাচার অনেক কষ্ট হলেও উঠতে হল। চার পাঁচদিন পর চাচার জ্বর সেরে গেলেও মনে একটা খচখচানি লেগেই থাকল। কি থেকে কি হচ্ছে। আসলে কে এই হারুন?
দেশ বিভাগের আগে কলকাতা থেকে যে ট্রেন আসত তা মাদ্রাসার পাশে যে ট্রেন স্টেশন আছে,সেখান থেকে কয়লা ভরে আবার সোজা চলে যেত যশোহর। তাই এ রেল ষ্টেশনে একটি আপদ কালীন সাইলো ছিল,কয়লা মজুদ করে রাখার জন্য। একদিন বিকালে চাচা ও হারুন ঘুড়তে ঘুড়তে ঐ সাইলোর কাছে চলে গেল। সাইলোটি নো ম্যান্স লেন্ড থেকে একটু ভিতরে বাংলাদেশের অংশে পড়েছে।পরিত্যক্ত হবার জন্য সাইলোর চারপাশে অনেক আগাছা জন্মে ঘোর জংগলে পরিণত হয়েছে। আর এ আগাছাকে আড়াল করে নিশাচর ব্যবসায়ীরা (রাতে স্মাগ্লিং দিনে ঘুম) দিনের বেলায় এটার চার পাশ নিরাপদ রেষ্ট রুম(পায়খানা) বানিয়েছে। তাছাড়া সাপ বিচ্ছুর ভয় থাকাটাও অবাঞ্চিত কিছু নয়। মাগরিবের সময় ওরা ফিরে এসে নামাজ পড়ে পড়তে বসবে, চাচা বলে উঠল, কত বড় ও কি উঁচা কয়লার ঘরটা দেখলে কেমন ভয় ভয় লাগে। আর চার পাশে যে জঙ্গল তুমি না থাকলে আমি ভয়ে মরেই যেতাম। হারুন বলল দূর পাগলা ভয় কিসের। আমি একাই রাতের বেলাতেও ওখানে যেতে পারব।
বলিস কি, রাতে ওখানে কেউ যায় নাকি? তুই গেলে আর ফিরে আস্তে পারবি না। আমি ওখানে যাব ও ফিরে আসব। বিশ্বাস হয়না। কি করলে বিশ্বাস করবি। চাচা একটি আয়াত বলে বলল, তুই যদি এ আয়াতটি সাইলোর পিছন দিকটায় রাত বারটার পর লিখে আস্তে পারিস তবেই আমি বিশ্বাস করব।
আচ্ছা ঠিক আছে।
চাচা মনে করলেন হয়ত এমনি এমনি বলেছে। নিয়ম অনুযায়ী চাচা ১১টার পর ঘুমিয়ে পড়লেন। ফজর নামাজ পড়তে উঠে দুজনে মসজিদে যাচ্ছে, হারুন বলে উঠল কিরে নামাজের পর যাবি নাকি দেখতে? কোথায় কি দেখতে যাব? কেন তুই যে আয়াতটি বলেছিলি আমি গত রাতে লিখে এসেছি। তুই পাগল না কি? সত্যি সত্যি তুই এ কাজ করেছিস? তবে কি আমি মিথ্যে বলছি। নামাজ শেষে চল দেখে আসবি।
চাচার আর নামাজে মননিবেশ হয় না। কি করে তা সম্ভব, একে তো শত বিপদের আশঙ্কা তার পর অন্ধকার রাতে আরবি আয়াত লেখা, নাহ চাচা আর চিন্তা করতে পারছে না!
আয়াতটি ছিল,
ইয়া মাশারাল জিন্নি ওয়াল ইন্সি ইন্সতাতাতুম আন তানফুযু মিন আক্তারিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি ফান ফুজু লা তানফুযুনা ইল্লা বি সুলতান। ( সুরা-আর- রহমান, আয়াত-৩৩)
অর্থঃ হে জিন ও মানব দল, যদি আসমান ও যমীনের সীমা অতিক্রম করতে সমর্থ হও, তবে তাই কর। কিন্তু তোমরা আমার অনুমোদন ছাড়া তা করতে পারবে না।
নামাজ শেষে চাচাও কৌতূহলী হয়ে উঠল। চল দেখব তুই কেমন লেখা লিখেছিস। খানিক বাদে দুজন কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌছে চাচার বিশ্ময়ের যেন শেষ নাই,জের, যবর, পেশ, তাশদীদ কোন কিছুই বাদ যায়নি। পা আর চলে না, আকাশ পাতাল চিন্তা করতে করতে তারা মাদ্রসায় এসে পৌছাল।
কিছুতেই আর মন বসে না। আজ পড়তে গিয়ে অনেকবার হুজুরের বকা খেতে হয়েছে। বার বার পড়া ভুল করেছে। কি হয়েছে, শরীর খারাপ কি না জানতে চাইল হুজুর। চাচা কোন উত্তর দিলেন না। কিন্তু গোসল খাওয়া কোন কিছুই আর ঠিকমত করতে পারছেন না।
রাতে আর ঘুম আসে না। প্রতিদিন ১১টার সময় ঘুম এসে চাচাকে ঘুমের রাজ্যে নিয়ে গেলেও আজ ঘুম যে কোথায় গেল? উনি ঘুমের ভান করে শুয়ে রইল। রাত ১২টা, অতঃপর একটা, ঘুমহীন আড় চোখে চাচা দেখলেন বিশাল চিনামাটির প্লেটে সারি সারি খাবার যথারিতি আগের মত। হারুন খাচ্ছে, যখন হা করছে মনে হচ্ছে, বিশাল গহ্বরে হাত নয় বেলচা দিয়ে কিছু যেন ঢেলে দেয়া হচ্ছে।পূর্বাবত খাবার শেষে প্লেট ও পানির আঁধার জানালা দিয়ে পাচার করে দিল।
এবার তিনি তার বিছানা পরিপাটি করে ঝেড়ে মশারি খাটিয়ে শুয়ে পড়লেন। চাচা ভাবতেও পারেন নি তার সামনে কি বিস্ময় অপেক্ষা করছে। হারুন শুয়ে কিছু দোয়া দরূদ পড়ে, মশারির ভিতর থেকে প্রায় দশ ফুট দুরে জলন্ত হারকিনটি নিভাতে একটি হাত বাড়িয়ে দিলেন। হারকিন তো নিবে গেল কিন্তু প্রত্যক্ষ দর্শী চাচাজানের জান মনে হয় খাঁচা ছাড়া হবার যোগার। রাতে আর ঘুম হল না। ভোরে ফজরের খনিক আগে সোজা তায়ই বাড়ি। বেয়াই সাবের সাইকেল নিয়ে সোজা বড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।
বড় চাচা সব শুনে অনেকক্ষন কোন কথা বললেন না। তিনি আলেম মানুষ, বিষয়টা উনার বুজতে বাকি রইল না। তাই তিনি কিছু তাবিজ কবজ দিলেন ও দোয়া দরূদ পড়তে বললেন। আর বড় ভাইয়া কে চাচার সাথে রাতে ঘুমাতে বললেন।
মাদ্রাসায় খোঁজ করে হারুনকেও আর পাওয়া গেল না। (শেষ)।।
১৯/০৫/২০১৩ইং





অসাধারন গল্প,খুবই ভালো লাগল।নতুন লেখার অপেক্ষায় থাকলাম।
আমারও অসাধারন ভাল লাগল আপনার অসাধারন মন্তব্যের জন্য। ভাইয়া আমার বয়স ৪-৫ সপ্তাহ আপনাদের মন্তব্য আলোচনা ও সমালোচনা আমাকে ধীরে ধিরে দাঁড়াতে শেখাচ্ছে। ভাল থাকবেন। সাবধানে থাকবেন।
অসাধারন গল্প,খুবই ভালো লাগল।
মন্তব্য করুন