ইউজার লগইন

কিসের আকর্ষনে

দুবাই যাবার জন্য যখন টিকিট হাতে পেলাম, মনে হল যেন আকাশ থেকে পড়েছি। বাহরাইন যতবার আসা যাওয়া করেছি গালফ এয়ারই ব্যবহার করেছি। এমনকি প্রথমবার বোয়েসেল থেকে টিকিট কেটে দিয়েছিল যার ব্যয় কোম্পানি বহন করেছিল তাও গালফ এয়ার ছিল। এবারও ভেবেছিলেম তাই হবে এমনকি আমি বলেওছিলাম গালফ এয়ারের কথা। গালফ এয়ার সরাসরি ঢাকা হতে দুবাই যায়। তাই অন্যান্য জিনিসের সাথে হারমোনিয়ামটাও সাথে নিলাম। নিঃসঙ্গ প্রবাসে এটা যে কত বড় বন্ধু তার ব্যবহার যারা জানেন ও প্রবাসী তারাই শুধু অনুধাবন করতে পারেন। এবার যাত্রার কয়েক ঘণ্টা আগে টিকিট পেলাম জি,এম,জি ইয়ার লাইন্সয়ের। ঢাকা টু কলকাতা কলকাতা টু দুবাই। আদম বেপারীর অফিসে বহু চিল্লাচিল্লি করেও যখন কোন লাভ হল না তখন বাধ্য হয়েই এয়ার পোর্টের দিকে রওনা হলাম। তখন বাড়ীর সবার কথা মনে পড়তে লাগল। স্ত্রী সন্তানসহ পরিবারের সকলের নিষেধ অমান্য করেই এবারের প্রবাস যাত্রা। কি করব দীর্ঘ দিন প্রবাসে থেকে দেশের কর্ম পরিবেশে নিজেকে কিছুতেই মানাতে পারছিলেম না। যাদের প্রবাসে থাকার অভ্যাস আছে তারা হয়ত বিষয়টা বুজতে পারবেন।
যা হউক ঢাকা বিমান বন্দরে তেমন কোন অসুবিধা হল না। যথারিতি ইমিগ্রেশন পার হয়ে বিমানে উঠলাম। কোলকাতা বিমান বন্দরে নেমে রিতিমত হতাশ হলাম। এত পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহী বিমান বন্দরের একি চেহারা। যেন বিগত যৌবনা কোন রমণী। মনটা কেন জানি খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু বিপদ যে আমার সামনে অপেক্ষা করছে হয়তবা তাই। ঊড়োজাহাজ বদলাতে হবে অর্থাৎ জি,এম,জি হতে গালফ এয়ার। তাই মালামালও কানেক্টিং বিমানে ঊঠাতে হবে। একে একে সবার বেডিং এল কিন্তু আমার তিনটি লাগেজের একটিরও পাত্তা নেই। হতাশ হয়ে বিমান বন্দরেরে দাদাবাবুদের অবহিত করলাম। দাদাবাবুরা জি,এম,জি অফিসে যোগাযোগ করতে বললেন। জি,এম,জি অফিস কোথায় তাও জানিনা। বিভিন্ন জনের নির্দেশিত কয়েক অফিস ঘোরে জি,এম,জি অফিস যখন পেলাম তখন অফিসে তালা লাগানো দেখে আমার হৃদস্পন্দন বন্ধ হবার ঊপক্রম হল।
এ সময় একজন নিরাপত্তা কর্মীকে ঘটনাটা জানালাম এবং লাগেজের সাথে যে ব্রীফকেস তাতে আমার সকল মূল সনদ পত্র আছে এও জানালাম। আমি ইঞ্জিনিয়ার এবং মূল সনদ ছাড়া দুবাইতে জব করা যায় না এটা বলার পর নিরাপত্তা কর্মীটি বেশ দয়া পরবশ হল মনে হলো। তিনি আমাকে তার অনুসরন করতে বললেন এবং কিছুদুর যাবার পর গালফ এয়ারের দুজন কর্মীর সাথে আমার ব্যপারে কথা বললেন। প্রকৃতপক্ষে একজন যাত্রী কম হওয়াতে ঊনারাও আমাকে খোঁজ করছিলেন। তবে লাগেজ লাপাত্তা হবার বিষয়টা জানার সাথে সাথে ঊনারা ওয়াকিটকিতে কোথায় কোথায় যেন যোগাযোগ করলেন। যোগাযোগ করে জানতে পারলেন যে লন্ডনগামী অন্য একটি গালফ এয়ার এ ভুলবশত আমার মালামাল ঊঠে গেছে। আমার তখন কান্না পায় আর কি? কাঁদো কাঁদো স্বরে বললাম। আমার মালামালের কি হবে? ঊনারা বলবেন সমস্যা নেই, কিছুক্ষনের মধ্যে এসে যাবে। মনে মনে আল্লাহকে ডাকছি, হে আল্লাহ তাই যেন হয়। এর মধ্যে এক দু বার আয়াতুল কুরছিও পড়ে ফেলেছি। যা হোক অল্পক্ষনের মধ্যেই একজন ট্রলিতে মালামাল নিয়ে হাপাতে হাপাতে হাজির হল। বহুত তাকলিফ উঠাকে আপকা সামান লানা পাড়া, দু, কুড়ি বখশিষ মান্তা, অর্থাৎ বহু কষ্ঠে তোমার জিনিসগুলো নিয়ে এলাম, বিশ ডলার বখশিষ দিতে হবে। মালামাল ফেরত পেয়েছি সেটাই অনেক, বিশ ডলার তো নস্যি,সাথে সাথে দিয়ে দিলাম।
এবার পড়লাম আর এক বিপত্তিতে। ঢাকাতে বলা হয়েছিল অতিরিক্ত মালামালের জন্য আর কোন চার্জ করা হবে না তাই সাথে খুব বেশী ডলারও নেইনি, কিন্তু গালফ এয়ার আমার কাছে ১২০ ডলার চার্জ করে বসল। আমার কাছে সব মিলে ১৩০ ডলার ছিল। তা ছাড়া বারবার তাড়া দিচ্ছিল, কারন বিমানের ইতিমধ্যে ছাড়ার সময় পার হয়ে গেছে। ফিলিপিনো লেডিকে বলে কয়ে আমার অবস্থান ব্যখ্যা করাতে ঊনি ১২০ ডলারে আমাকে অব্যাহতি দিলেন।
এবার মালামাল স্ক্যান করার সাথে সাথে সঙ্গে থাকা গালফ এয়ারের দু,জন আমাকে তাড়াতাড়ি বিমানে উঠার জন্য তাড়া দিলেন। মালামাল ঊনারাই নিয়ে চললেন। দেখলাম সামনের দিক থেকে একজন মহিলা ওয়াকিটকি হাতে দ্রুত এগিয়ে এসে বলছেন তাড়াতাড়ি যান, তাড়াতাড়ি। সাথে সাথে ওয়াকিটকিতে ওয়েট এ লিটিল বিট,ওয়েট এ লিটিল বিট, বলতে বলতে আমার পিছু পিছু আসছেন। বিমানের কড়িডোর পার হবার সাথে সাথে শুধু বলবেন যান, ভাল থাকবেন। পলকে ঊনার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখলাম যেন আকাশ সমান স্বস্থি ঊনার চোখে মুখে। মনে হচ্ছিল শরৎ প্রভাতে ঘাসের উপর পড়ে থাকা মুক্তোর মত এক ফোটা চোখের জলও যেন ঊনার চোখের পাতায় চিকচিক করছে। ফিরে সামনের দিকে পা বাড়াতেই একজন এয়ার হোস্টেস আমার হাত ধরে দ্রুত আমার সিটের কাছে নিয়ে বসতে বলার সাথে সাথে সিট বেল্ট বাধার জন্যও তাগিত দিয়ে অন্য আর একজনের কাছে চলে গেলেন ও উনাকেও সিট বেল্ট বাধতে বললেন। এবার বুজতে পারলাম বিমান টেক অফ করছে।
এত ঝক্কি জামেলার পর কিছুটা স্বস্থি নিয়ে বসলাম আবার সেই এয়ার হোস্টেস আমার কাছে এসে যা বললেন, "Little angry, what is the relation with the lady officer, Only for you, this is the first time Gulf Air taking off half an hour late. I did reply,"Bangali”. এয়ার হোস্টেস কিছু বুজতে পারলো কি না বুজলাম না, কিন্তু আমার বুজতে বাকি থাকলো না, শুধু বাঙ্গালী বলেই হাতে থাকা পূর্ণ বা তারও অধিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে আর একজন বাঙ্গালীকে তার জীবনের সর্বস্ব খোয়ানোর হাত থেকে রক্ষা করলেন।
এবার স্বস্থি আবেগে পরিনত হলো, ভদ্র মহিলার মুখটা বার বার মনে পড়তে লাগল, আজও মনে পড়ে, আর যখনি মনে পড়ে তখনই আবেগ তাড়িত হই।
আমরা যারা প্রবাস জীবন কাটাই হতে পারে সেটা এক বছর থেকে ৩০-৪০ বছর। বছরে বা দু বছর পর পর দেশে আসা হয়। যাই হউক না কেন বিমান টেক অফ করার পর, বিমান ঊঠতে থাক্‌ আর মনে হয় শরীরের শিরা ঊপশিরাগুলো আস্তে আস্তে ছিড়ে যাচ্ছে ,দেশে,এমনকি বিমান বন্দরে ফেলে আসা প্রতিটি মুখ বার বার চোখের মনিটরে ভাসতে থাকে, আর এটা চলে গন্তব্যে পৌছার মাস খানেক ধরে। তারপর প্রবাসের প্রচণ্ড বাস্তবতায় কিছুটা ক্ষীন হয় কিন্তু নষ্টালজিয়ার তাড়না প্রতিক্ষন প্রতি মুহুর্ত তাড়িয়ে বেড়ায়। যাবার পর থেকে শুরু হয় মাস গুনা আর যখন আসার সময় হয় তখন দিন গুনা। আসার সময় বিমানে ঊঠলে ৫-৬ ঘণ্টা সময় যেন কাটতেই চায় না। মনে হয় অনন্ত কাল ধরে চলছি।
প্রবাসে কার বাড়ী কোথায় সেটা কোন বিষয় না। বাংলাদেশী মানেই যেন রক্তের কেঊ। আপন যোগ্যতায় সবাই সন্মান পায় কখনও মনে হয় না সে শ্রমিক আমি অফিসার। কত আপন একজন আর একজনের, একের সুখে সুখী, একের দুখে দুঃখী। এটাই মনে হয় প্রাকৃতিক বিধান। আর প্রকৃতিক বিধান বা সৃষ্টিকর্তার বিধান কারও পক্ষেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যেমন সেটা পারেননি আমাকে সাহায্য কারী বোন। কিন্তু আপনার নাম ঠিকানা আমি যেমন জানিনা আপনিও জানেন না আমার নাম ঠিনানা। তবুও আপনাকে হাজার,হাজার সালাম। আল্লাহ আপনাকে ভাল রাখুন।
উত্তরা,ঢাকা,
২৭শে জুলাই,২০১২ইং

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


:')

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


এয়ার হোস্টেস কিছু বুজতে পারলো কি না বুজলাম না, কিন্তু আমার বুজতে বাকি থাকলো না, শুধু বাঙ্গালী বলেই হাতে থাকা পূর্ণ বা তারও অধিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে আর একজন বাঙ্গালীকে তার জীবনের সর্বস্ব খোয়ানোর হাত থেকে রক্ষা করলেন।

আহসান হাবীব's picture


যে দেশের মানুষ এত ভাল,যে দেশটা এত সুন্দর, কেন সে দেশে এত রক্তের হোলি খেলা। আমার অনেক কষ্ট হয়। আমার আংগুল চলে না। আমি লিখতে পারি না।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আহসান হাবীব's picture

নিজের সম্পর্কে

তোমার সৃষ্টি তোমারে পুজিতে সেজদায় পড়িছে লুটি
রক্তের বন্যায় প্রাণ বায়ু উবে যায় দেহ হয় কুটিকুটি।।
দেহ কোথা দেহ কোথা এ যে রক্ত মাংসের পুটলি
বাঘ ভাল্লুক নয়রে হতভাগা, ভাইয়ের পাপ মেটাতে
ভাই মেরেছে ভাইকে ছড়রা গুলি।।
মানব সৃষ্টি করেছ তুমি তব ইবাদতের আশে
তব দুনিয়ায় জায়গা নাহি তার সাগরে সাগরে ভাসে।
অনিদ্রা অনাহার দিন যায় মাস যায় সাগরে চলে ফেরাফেরি
যেমন বেড়াল ঈদুর ধরিছে মারব তো জানি, খানিক খেলা করি।।
যেথায় যার জোড় বেশী সেথায় সে ধর্ম বড়
হয় মান, নয়ত দেখেছ দা ছুড়ি তলোয়ার জাহান্নামের পথ ধর।
কেউ গনিমতের মাল, কেউ রাজ্যহীনা এই কি অপরাধ
স্বামী সন্তান সমুখে ইজ্জত নেয় লুটে, লুটেরা অট্টহাসিতে উন্মাদ।
তব সৃষ্টির সেরা জীবে এই যে হানাহানি চলিবে কতকাল।
কে ধরিবে হাল হানিবে সে বান হয়ে মহাকাল।।