দুই নেত্রী বলবেন কি?
গতকাল(০৫/০১/২০১৪খ্রীঃ) দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন আমার উত্তরার বাসার সামনের রাস্তায় ৩/৪ টি ককটেল ফুটেছে। তাঁর আধ ঘণ্টা আগে আমার স্ত্রী হাসপাতালে যাবার জন্য বের হয়ে গেছে। নইলে কি হতো তা আল্লাই জানেন। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ও যখন বাসা থেকে বের হয় হাসপাতালে না পৌঁছা পর্যন্ত এত টেনশনে থাকি যে বলতে গেলে ক্ষনিক পর পর ফোনে কন্টাক্ট করি। আসার সময় এ্যাম্বুলেন্স ওকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেয় তাই এত টেনশন করি না।
মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয় পুরো সময়টাই বন্ধ, মাথাও নাই মাথার ব্যথাও নাই, তাই আমি ওকে নিয়ে স্বস্থিতেই থাকি।
কিন্তু মেয়েটা আমার বাসায় থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠেছে। ১৬ই ডিসেম্বর বাসা থেকে বান্ধবীদের সাথে ঘুড়তে বের হবে হলে জেদ ধরেছিল কিন্তু দেইনি। অফিসে ভীষণ চাপে ছিলাম। তাই না করাটা একটু জোরেই হয়েছিল। এই প্রথম হালকা ধমক দিলাম মেয়েকে। কাজের মাঝেও স্বস্থি পাছিলাম না। তাই আধ ঘণ্টা পর ওর মাকে ফোন দিলাম, মেয়ের আবেগের আকাশে ঝড়ের ঘনঘনটা না টাইফোন হ্যারিকেনে রূপ নিয়েছে। বুঝলাম অবস্থা অনেক খারাপ, ওর মা আমাক খানিক নসিহত করল। তুমি কোন দিন যা করনি আজ কেন করলে? আমি কি করে ওকে বুঝাই কেন করলাম। যাক মেয়েকে ফোন দিলাম, ধরতে একটু দেরীই করল। কিন্তু কথা নাই কান্নার ফোঁপানি যেন ধীরে ধীরে বয়ে চলা নদীর স্রোত থেকে দুরন্ত খরস্রোতা হয়ে উঠছে। বাবা,বাবা জবাব নাই।
আমার বাবা এইচ এস সি পাশ করার পরই আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যান। আমি এতই হতভাগা যে আমার বাবার মৃত্যুর সময় আমি ছিলাম ঢাকায়, ভর্তি পরীক্ষা নামক যুদ্ধে নিয়োজিত। তাই আমি উনার মৃত্যুর সময় পাশে থাকতে পারি নি। আর বাড়ী আসার আগ পর্যন্ত জানতেই পারিনি ( আমাকে জানতে দেয়নি) বাবা আর নেই। বাবার প্রতি আমার ভালবাসা, বাবা চলে যাবার ৩৩ বছর পরও বেড়েছে বই কমে নি। তাই বাবার স্মৃতি আমার থেকে অন্তত আমার ছেলে মেয়ে পর্যন্ত জাগরুক থাকুক, তাঁর জন্য আমার প্রথম সন্তান মেয়েকে বাবা বলে ডাকি।
অনেকক্ষণ রিং হবার পর জ্বী, বল আব্বু,
আমার সোনামণি, আমার লক্ষ্মী কুটুন, ইত্যাদি কত নামে যে ওকে ছোট সময় ডেকেছি তা কোন সাহিত্য বা কোন ভাষায় নাই।সেই অর্থহীন সাহিত্য অনেকক্ষন আওড়ালাম।
আমি ওকে বললাম, আমার কয়টা মেয়ে বলত?
একটা
আমার কয়টা ছেলে
একটা।
আমার কলিজার দুইটা অংশের একটা না থাকলে আমি বেঁচে থাকবো।
না!
তা হলে তোমার যদি কিছু হয়ে যায় আমি জিন্দা মরে যাব না, হ্যাঁ!
তাহলে, বাবাতো ইচ্ছা করে ধমক দেয়নি, অনিচ্ছায় জোরে হয়ে গেছে, তাই প্রথম বারের মত মাফ করে দেয়া যায় না।
এবার একটু হেসে দিল।
এইতো আমার অন্ধকারআকাশে চাঁদ উঠেছে!
এবার হাসিটা আরও একটু বাড়ল। মেয়ের অভিমান ভাংগানোর পর বললাম বাবার অপরাধের শাস্তি তোমার আম্মুর সাথে মার্কেটে যাবে যা খুশি কিনে নেবে। টাকাতো তোমার কাছেই থাকে যা লাগে নিয়ে যাবে। কিনেছে কি কিনে নাই জানি না। বাবা মায়ের সকল সম্পদ ওদের ওরা এখনই বুঝতে শিখেছে তাই অপব্যয় করতে চায় না। যা প্রয়োজন তাই করে।
আমার ছেলের স্কুলের পাশে পার্ক, পার্কের পরে রাস্তা, রাস্তার পাশেই আমার বাসা। দেশের এ অবস্থার মাঝেও ছেলের স্কুল খোলা ছিল। তাই স্কুলের পড়া, প্রাইভেট ও কোচিং এর জন্য ছেলেটাকে সাড়াদিনই বাসার বাইরে থাকতে হয়। এই অবস্থায় পরীক্ষাও হল। পরীক্ষার পর স্কুলে ক্লাস আরম্ভ না হলেও প্রাইভেট পড়তে ছেলে প্রতিদিনই বাসার বাইরে যায়। আমি ওকে মানা করলাম দেশের অবস্থা ভাল না হওয়া পর্যন্ত বাসার বাইরে যাবার দরকার নাই। কিন্তু একজন কিশোর ছেলে কতক্ষণ বাসায় বন্দি থাকতে পারে। তাই বলল, বাবা বাসার কাছেই সব স্যারদের বাসা দেখে শুনে যাব।তাই রাজি হলাম। যদিও উত্তরা সেক্টরের ভিতর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ ভাল তবু বলা যায় না, কখন কি হয়। গতকাল তাই সত্যি হল পর পর ৩/৪টি ককটেলের বিস্ফোরন ঘটলো বাসার সামনেই। আর আমি গতকাল কড়া নির্দেশ দিয়েছিলাম আজ কোন অবস্থায় বাসার বাইরে যাবে না। আমার কথা মত ও বাইরে যায়নি। তাই ঘটনা ঘটার পর ওরা বলল বাবা তুমি যখন যা বল তাই বেশির ভাগ সময় ঘটে। বাবা তুমি কি করে বুঝতে পার। আমি বাবা এত বুঝি না, তবে এটা বুঝি পড়ার চেয়ে আমার সন্তানের জীবন আমার কাছে অনেক অনেক বেশী মুল্যবান।
এবার নির্বাচনের দিন ও তাঁর আগে দেশে যে সহিংসতা হয়েছে, তা আমার লেখার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। সাবাই আমার চেয়ে বেশী বই কম জানেন না।
কথায় বলে মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়। আমি আমার একটা লেখায় লিখেছিলাম যার শিরোনাম ছিল "বিকাশদের বিকশিত হওয়া আর মির্জা ফখরুলের জেল খাটা”। সেখানে আমি আমাদের উত্তর বংগের জনগন যে কতটা সহজ সরল তাঁর একটি বর্ণনা দিয়েছিলাম।
ধরুন বৃহত্তর দিনাজপুরের দুইজন লোক কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে মারামারিতে লিপ্ত হল। মারামারিতে লিপ্ত হবার আগে হাতে কোন লাঠি বা লৌহ জাতীয় কিছু থাকলে ফেলে দিয়ে কোস্তা কুস্তি লাগবে। তাতে কেউ না কেউ তো হারবেই। তাই যে হারবে বা নিচে পড়ে যাবে সে জয়ীকে বলবে। মারবার চাইস মার কিন্তুক খবরদার কামড় দিবু না। কামড় দিলে অক্ত বাড়াবে, আর অক্ত বাড়ালে তোকও পুলশ ধরিবে মোকও ধরিবে।
আর পাঁচ বছর বি,আই,টি (রুয়েটে) পড়াশুনা করেছি। রাজশাহীর সহজ সরল লোকগুলোকে মামা বলেছেন তো ভাগিনার জন্য অনেক কিছুই পাওয়া বা অর্জন করা সহজ হয়ে যেত। কত রাত বিরাতে শহর থেকে এসেছি। নাই কোন ছিনতাই, বা অন্য কোন রকম সমস্যা। মিনু ভাই, কবির ভাই,রিজবী ভাই, হারুন ভাই, পাপিয়া (আইনজীবী ও সংসদ সদস্য) কতবার বি,আই,টিতে এসেছেন তাঁর কোন হিসেব নেই। কারও মধ্যে কোন রকম অহংকার বা গর্ব চোখে পড়েনি।
বি, আই, টির বাউন্ডারি পার হলেই সাধুর মোড়। ভি সি,আর দেখতে যেতাম হেদায়াত ভাইয়ের ওখানে দল বেঁধে। পয়সা দিয়েছি তবে তা নাম কা ওয়াস্তে।
এখানে দুটি জায়গার নাম উচ্চারন করলেও উত্তরাঞ্চলের সর্বত্রই এমন সহজ সরল লোকদেরই আপনি দেখতে পেতেন। কিন্তু এখন একি পরিবর্তন। আগে নির্বাচন হলে দেশের সর্বত্র মারামারি হানাহানি হলেও এসব অঞ্চলে তা হত না। এবার বৃহত্তর ময়মনসিংহে তেমন হানাহানির কথা শুনিনি। অথচ আগে এ জেলায় সব চেয়ে বেশি হানাহানির ঘটনা ঘটত। যা হউক আমার কথা হল কেন এ নিরীহ লোকগুলো এত হিংস্র হয়ে উঠল। গড়েয়ার মত একটা প্রত্যন্ত অঞ্চল যেখানে সবচেয়ে সহজ সরল লোকের বাস সেখানেও খুন ও নিসংসতার ঘটনা ঘটেছে। ঠাকুর গাও এ প্রবীণ প্রিজাইডিং অফিয়াসারকে হত্যা করা হয়েছে।
কেন এ নিসংসতা দুই নেত্রী জবাব দেবেন কি? কেন আপনারা এক হতে পারেন না। দুইজনের মধ্যে এত গুয়াড়র্তুমি কেন? দেশটা তো আপনাদের পৈত্রিক সম্পত্তি নয়। আজ আমার দেশে যে নির্বাচন হয়ে গেল, তাকে নির্বাচন না বলে অর্বাচীনের নির্বাচন বলাই শ্রেয়।
তবে আমার মনে হয় কোথায় যেন শুনেছিলাম আল্লাহ্ তায়ালা যখন কোন জাতির উপর অসন্তুষ্ট হন তখন সেই জাতির উপর মহিলা শাসন বা বিদেশি শাষন চাপিয়ে দেন। আমার মতে আল্লাহ চাপিয়ে দেন না, আমরা নিজেই চেয়ে নিয়েছি। নইলে বিভিন্ন সময়ে আমরা আমাদের দেশের মস্তিস্ক নিজেরাই কেটে ফেলবো কেন?
৭৫ সালে আমরা বংগবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছি। জেলে চার নেতাকে আমরা নিজেরাই মেরেছি। বিভিন্ন অভ্যুথ্যানে পাল্টা অভ্যুথ্যানে হারিয়েছি খালেদ মোশাররফসহ অসংখ্য দেশ প্রেমিক সেনা অফিসারকে। কর্ণেল তাহেরকে আমরা মেরেছি। কত সেনা বিমান বাহিনীর জোয়ানকে আমার ফাঁসিতে ঝুলিয়েছি। তারপর প্রেসিডেন্ট জিয়াকেও আমরাই মেরেছি, সেই অপরাধে অপরাধী বা বিনা অপরাধী কত সেনা অফিসার মেরেছি। সর্বশেষ আমরা পিলখানা বিদ্রোহে আমাদের দেশের মেধা ও শক্তি হত্যার ষোল কলা পূর্ণ করেছি। তাহলে আমাদের দেশে মহিলা শাষন আসবে না তো কি? নাই দেশে শিয়াল রাজা এই আর কি!
লা ইউ কাল্লিফুল্লাহু নাফসান ইল্লা উছ আহা।( বাকারা, আয়াত -২৮৬)
অর্থঃ আমি কারও উপর সে দায়িত্ব অর্পণ করি না যা সে পালন করতে পারবে না।
তাতে বুঝা যায় আমাদের দেশের দায়িত্ব নেবার মত কোন পুরুষ মানুষ নেই। তাই আপনারা দুই নেত্রীর উপর আমাদের দরিদ্র জনগণের আকুল আবেদন আমাদের আর জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারবেন না। আমাদের দেশের সম্পদ বৃক্ষ নিধন করবেন না। এই মৃত্যুর দায় থেকে এ পৃথিবীতে পার পেলেও তাঁর কাছ থেকে পার পাবেণ কি? আপনারা দুজনই আস্তিক ও মুসলিম আপনারাই ভেবে দেখুন।
বিভিন্ন সময় আমাদের দেশটা বিভিন্ন জাতি গোষ্টি শাষন করেছে। এখন তো আর বিদেশি জাতি গোষ্টি নাই। সরকার বিরুধী দল সবই আমরা। সব দলেই সবার আত্নীয় স্বজন আছেন। বর্তমানে হরতাল অবরুধের নামে যারা বাসে পেট্রোল বোমা মারছেন,ট্রেনের ফিস প্লেট খুলে জাতীয় সম্পদ নষ্ট ও মানুষ হত্যা করছেন, বাড়ি ঘরে আগুন দিচ্ছেন তারা কি কখনও ভেবে দেখেছেন যে বাস বা ট্রেন টি আপনার আক্রমণের শিকার হচ্ছে তাতে আপনার ভাই বোন বা আত্নীয় কেউ থাকতে পারে। আর এ সব বাহনে যারা চলাচল করে সব সাধারন মানুষ। যারা রাজনীতি বুঝে না। নেহাতই পেটের দায়ে বিপদের মুখেও রাস্তায় বের হন। আমার জানা মতে একজন বড় মাপের কোন দলের নেতাও তো আপনাদের জ্বালাও পোড়াওতে মারা যায় নি। আপনারা একটু ভেবে দেখুন। আজ আমার দেশের গরিব কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পেরে রাস্তার ফকির হবাড় জোগাড়। আমার গ্রামের বাড়ীর অনেক বড় বড় কৃষক এ অবস্থায় চোখে অন্দকার দেখছেন।
শেষ করব মরহুম চিত্র পরিচালক খান আতার একটি উক্তি দিয়ে। ওনার একটি ছবি ফ্লপ হবার পর এক টিভি সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়েছিল "আপনার ছবি ফ্লপ হওয়াতে আপনার প্রতিক্রিয়া কি?”
জবাবে উনি বলেছিলেন, রাত যত গভীর, অন্ধাকার বা দীর্ঘ হউক এক সময় না এক সময় পূর্বাকাশে আলোর আঁধার সূর্যের দেখা মিলবেই, যা সাড়া পৃথিবীর অন্ধকার দূর করে দেবে। কিন্তু তা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে"
আমরাও আশা করছি, আমাদের দেশের রাজনীতির আকাশে নতুন সূর্যের আলো উঠবেই, আর তা যত তাড়াতাড়ি হয় ততই মঙ্গল। আল্লাহ আমাদের সহায় হউন।
দিসেম্বর,০৭,২০১৪ খ্রীঃ





ভালো লাগলো পুরো লেখাটি। বাবা-মেয়ের কথোপকথন সবচেয়ে ভালো।
পৃথিবীর সব বাবা মেয়ের স ম্প র্ক ই আমার মনে হয় এমন। মেয়েরা বাবার জন্য বৃদ্ধ বয়সেও কাঁদে। আমার মাকে দেখেছি। কেমন আছেন মীর ভাই?
ভালো আছি আহসান ভাই। আপনার কি অবস্থা?
ভালো আছি আহসান ভাই। আপনার কি খবর?
মীর ভাই, ব্যক্তিগতভাবে আমি ভাল আছি। কোম্পানির দেয়া সকল সুবিধা ভোগ করছি। কিন্তু দেশের এ অবস্থায় নিজের ত ত্বাব ধানে যখন প্রতিদিন বিশাল অংকের অর্থ লোকসান হয় প্রতিদিন রক্তের হোলিখেলা দেখতে হয় তখন কি করে বলি ভাল আছি। পেট্রোল বোমার জ্বলে আমার এক আত্বীয়ও মারা গেছে। যাক, ভাল থাকবেন, সাবধানে থাকবেন।
মন্তব্য করুন