ইউজার লগইন

এত সুখের পৃথিবী ছেড়ে যেতে মন চায় না

আজ ফেব্রোয়ারী ০২, আমার জন্মদিন। তবে আমার সত্যিকার জন্মদিন আমার মনে নেই।আপনারা হয়ত আকাশ থেকে পড়বেন এটা আবার কেমন কথা নিজের জন্মদিন জানে না। আমরা আট ভাইবোন, তদুপরি আমরা গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আমাদের গ্রামে কারও জন্মদিন পালন করা হতো না। কিন্তু এ নিয়ে আমাদের কারও মাথাব্যাথা কোনদিন ছিল না। আজকের মত ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটিকর্পোরেশনের কোন বাধ্যবাদকতা তো ছিলই না।
তবু এস এস সি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনের সময় হেড স্যার চঞ্চল কুমার কুন্ডু যখন জানতে চাইলেন, আমি পরদিন মার কাছ থেকে বাংলা সনের যে তারিখটা স্যারকে প্রদান করলাম,তা দিলে আমি যখন এস এস সি পাশ করব তখন আমার বয়স হবে প্রায় সতের বছর। আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্যার আজ পৃথিবীতে নেই,উনি আজকের দিনটি আমার জন্মদিন নির্ধারন করলেন যাতে এস এস সি পাশ করলে আমার বয়স হবে পনের বছর। আর সত্যিকার জন্মদিনটি চর্চা বহির্ভূত থাকার ফলে এক সময় তা স্মৃতি থেকে হাড়িয়ে যায়।
আমার মেয়ে সম্ভবত ছয় সাত বছর বয়সে ওর এক জন্মদিনে আমাকে জিজ্ঞেস করে আব্বু তোমার জন্মদিন কবে? আমি বললাম, বাবা আমি জানি না,তবে এস,এস,সি সনদ পত্র অনুযায়ী তা ফেব্রোয়ারী,০২,১৯৬৭ খ্রীঃ। কিন্তু আমার জন্মদিন আমার কখনও মনে থাকে না। ছেলে মেয়েদের জন্মদিনও মাঝে মাঝে ভুলে যাই। তাই ইউস করতে পারি না। বার দুয়েক এমন হওয়ার পর মেয়ে একবার ভীষন মন খারাপ করে। পরে ছেলে মেয়ের জন্মদিন কাছাকাছি এলে, ওদের মা আমাকে আগেই জানিয়ে রাখে। আমি মোবাইলে রিমান্ডারে ইনপোট করে রেখে দেই যাতে ছেলে মেয়ের হাত পা ধরে তাদের কান্না থামাতে না হয়।
আমার মেয়ে জানার পর থেকে আমার জন্মদিনটি কিভাবে মনে রাখে জানি না। আমি যখন দেশের বাইরে ছিলাম ঠিকই জন্মদিনের তারিখে রাত বারটার সময় এস এম এস চলে আসত এবং তা প্রতিটি জন্মদিনেই। প্রায় প্রতিটি জন্মদিনে আমার মেয়ের এস এম এস পাবার পর মনে হতো সনদ পত্র মোতাবেক আজ আমার জন্মদিন।
গত বছর ২০১৩ খ্রীঃ রাত ১০টার দিকে ঘুমাতে যাই,ভোরে ভেড়ামারা যাব। সাবষ্টেশনের কাজ চলছে। সরকারি হাই অফিসিয়ালরা প্রজেক্ট ভিজিটে আসবেন তাই যেতে হবে,সাথে যাবেন ডাইরেক্টার এন, জি সাহা। তাই সকাল সকাল ঘুমাতে যাওয়া।
ছেলেমেয়ে দুজন এক সাথে কাচুমাচু ভংগিতে এসে হাজির, আমার সাথে ওদের বন্ধুত্বের চেয়েও বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও কেন যেন মনে হয় আমাকে ওরা ভয়ও পায়। কি ব্যাপার বাবারা? ছেলে বলল আজ রাত বারটার পর ফেব্রোয়ারী,০২ খ্রীঃ।
ও তাই।
হ্যাঁ আব্বু আমরা তোমাকে ইউস করব। আমরা কেক কিনে এনেছি।
জিজ্ঞেস করলাম টাকা কোথায় পেলে?
আমরা টিফিনের পয়সা থেকে বাঁচিয়ে কিনেছে।
আমার গায়ে কে যেন পিন বা কিছু দিয়ে আঘাত করল। প্রায় লাফ দিয়ে উঠে ভাইবোনকে জড়িয়ে ধরলাম। অনেক ক্ষন ধরে ছিলাম, ওদের আড়ালে চোখ মুছলাম। এ কোন কষ্টের আঁখি জল নয়, এ যে চরম পাওয়া, চরম তৃপ্তির অশ্রু। এক এক বিন্দু চোখের পানির মুল্য একটি পৃথিবীর বিনিময়েও কি পাওয়া যাবে? বারটার পর কেক কাটতে গেলে অনেক রাত হয়ে যাবে। তাই তখনই ওরা সব অয়োজন করল। কেক কাটা হল, ভিডিও করা হল। আমার (৪৬+২) প্রথম জন্মদিন কেক কেটে পালন করল আমার সন্তানেরা।
আমি জানুয়ারী ৩০,২০১৪খ্রীঃ বৃহস্পতিবার ঢাকা যাই। শুক্রবার থেকে শনিবারে প্রজেক্টে চলে আসব। শুক্রবার রাতে শুয়ে পড়েছি, এমন সময় ছেলে এসে অসহায় ভাবে জিজ্ঞেস করছে,
আব্বু তুমি কি কালই চলে যাবে?
হ্যাঁ বাবা। কালই যাব, কেন বলত?
আগামী পরশু দুই তারিখ, তোমার জন্মদিন।
তরিৎ হিসেব কষলাম। প্রজেক্টের কাজ যা তাতে থাকার কোন সুযোগ নেই, তবু একদিন মেনেজ করা যাবে, কিন্তু বিশ্ব ইজতেমার জন্য আমি রোববারও যেতে পারব না। যেতে যেতে সোমবার, তাই বললাম, না বাবা আমাকে যেতে হবে। দেখলাম ছেলের মনটা অনেক খারাপ হয়ে গেল। আমি জানিনা আমি ভূল করেছি কি না! তবে আমেরিকান ও ইউরোপিয়ানদের সাথে কাজ করার জন্যই কিনা জানি না Work first প্রবচনটি আমার মাঝে কাজ করে। সামর্থের মধ্যে যা আছে তাঁর জন্য জবাব দেহি করতে আমার মন কক্ষনও সায় দেয় না। ওঠে ভাইবোন দুজনকে বিষয়টি বুঝালাম। ওরাও অনেকটা বাস্তব বাদী হয়ে উঠেছে। তাই সহজেই বুঝে নিল।
আমি গতকাল দুপুর একটায় প্রজেক্টে এসে পৌছলাম। রাত আটটা পর্যন্ত চলল সাইট অফিস ও হেড অফিসের কাজ। পিডি আশরাফ, ডাইরেক্টার হেলাল স্যার, রাত কয়টা পর্যন্ত অফিস করেন তা উনারাও বলতে পারবেন কি না জানি না। আমাদেরও প্রয়োজনে সেল ফোনে উনাদের সাথে কাজ করতে হয়। চার গেম ব্যাডমিন্টন খেলার পর গোসল করে আবার অফিসে বসেছি, বুঝতে পারছি ঠাণ্ডা লাগছে। তাড়াতাড়ি খেয়ে রুমে ডুকে টিভি অন করলাম। ভাল লাগছে না। নাক কামড়াচ্ছে। হঠাৎ হাঁচির পর হাঁচি। নাক দিয়ে অঝোরে পানি ঝড়ছে। হিস্টাসিন খেলাম। কাজ হচ্ছে না। সরিষার তেল নাকে দিলাম। শুয়ে আরাম পাচ্ছিলাম না। তবুও টিভি ও লাইট অফ করে শুয়ে থাকলাম। টিসু পেপারটা হাতের কাছে রেখেছি,এটার এখন ভীষন প্রয়োজন। কখন বারটা বেজেছে জানি না। মোবাইলে দুটা মেসেজ টোন এল, ধরতে মন চাচ্ছিল না। তবু ও এক সময় দেখলাম একমিনিটের ব্যবধানে দুটি ম্যাসেজ।
ছেলে লিখেছে, Happy birthday abbu.
মেয়ে লিখেছে, Happy birthday papa.
ম্যাসেজ দুটি পাবার পর কোথা থেকে এত শক্তি এল জানি না। নাক দিয়ে পানি ঝড়ছে সে দিকে কোন খেয়াল নেই। পৃথিবীটা এত কষ্টের মাঝেও এত সুখের কেন? ক্ষনিকে অসুস্থতা, এত কষ্টকর জীবনের সব কিছুকে তুচ্ছ করে আমার মাঝে স্বর্গ সুখের আবেশ ছড়িয়ে পড়ল। আর এত সুখময় পৃথিবীটা ছেড়ে চলে যেতে হবে সেটা যেন ভাবতেই মন চাচ্ছে না।
ফেব্রোয়ারী,০২,২০১৪খ্রীঃ

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


পৃথিবীটা এত কষ্টের মাঝেও এত সুখের কেন? ক্ষনিকে অসুস্থতা, এত কষ্টকর জীবনের সব কিছুকে তুচ্ছ করে আমার মাঝে স্বর্গ সুখের আবেশ ছড়িয়ে পড়ল। আর এত সুখময় পৃথিবীটা ছেড়ে চলে যেতে হবে সেটা যেন ভাবতেই মন চাচ্ছে না।

শুভ জন্মদিন হাবীব ভাই (এস এস সি'র সনদ অনুযায়ী হলেও 'জন্মদিন' বলে কথা! Big smile )
আমার জন্মদিন ইংরেজী বছরের প্রথম দিন, অনেক চেষ্টা করেও কাউকে ভুলিয়ে দিতে পারিনা। বাসা, বন্ধু-বান্ধব কিংবা কলিগ। পকেটের বারোটা বাজে Smile তবুও এর মাঝেও আনন্দ আছে, এটাই কম কিসে?
ভাল থাকুন প্রতিদিন, জন্মদিনের মত।

আহসান হাবীব's picture


বন্ধু, এত সুন্দর মন্তব্যের কি জবাব দিব। তাই শুধু ধন্যবাদ। আপনিও ভাল থাকুন। Love

জাকির's picture


শত কথার মধ্যেও এটা এখন মানতে হবে যে, আজ জন্মদিন।
এটা যেভাবেই হোক !
শুভ জন্মদিন।

আহসান হাবীব's picture


ধন্যবাদ শুভ ভাই।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আহসান হাবীব's picture

নিজের সম্পর্কে

তোমার সৃষ্টি তোমারে পুজিতে সেজদায় পড়িছে লুটি
রক্তের বন্যায় প্রাণ বায়ু উবে যায় দেহ হয় কুটিকুটি।।
দেহ কোথা দেহ কোথা এ যে রক্ত মাংসের পুটলি
বাঘ ভাল্লুক নয়রে হতভাগা, ভাইয়ের পাপ মেটাতে
ভাই মেরেছে ভাইকে ছড়রা গুলি।।
মানব সৃষ্টি করেছ তুমি তব ইবাদতের আশে
তব দুনিয়ায় জায়গা নাহি তার সাগরে সাগরে ভাসে।
অনিদ্রা অনাহার দিন যায় মাস যায় সাগরে চলে ফেরাফেরি
যেমন বেড়াল ঈদুর ধরিছে মারব তো জানি, খানিক খেলা করি।।
যেথায় যার জোড় বেশী সেথায় সে ধর্ম বড়
হয় মান, নয়ত দেখেছ দা ছুড়ি তলোয়ার জাহান্নামের পথ ধর।
কেউ গনিমতের মাল, কেউ রাজ্যহীনা এই কি অপরাধ
স্বামী সন্তান সমুখে ইজ্জত নেয় লুটে, লুটেরা অট্টহাসিতে উন্মাদ।
তব সৃষ্টির সেরা জীবে এই যে হানাহানি চলিবে কতকাল।
কে ধরিবে হাল হানিবে সে বান হয়ে মহাকাল।।