রোগ শোকে পাপ ঝরে পড়ে
রোগ শোকে পাপ ঝরে পড়ে
নভেম্বরের চার তারিখ থেকে পিঠের ব্যথায় ভূগছি। খুলনায় একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে ছিলাম। উনি দেখে ইসিজি করে বলেছিলেন, তেমন কোন সমষ্যা নেই। ওজন বেড়ে গেছে। এখন যে ওজন তা হার্ট এ সমস্যা সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট। আমি সাধারণত ওজন মাপি না। ছোট খাট সমস্যা হলেও ডাক্তারের কাছে যাই না। তাই উনি যে ওজনটা বললেন, তা এর আগে যখন মেপেছিলাম তার চেয়ে আট কেজি বেশী। শুনে রীতিমত আতকে উঠলাম। উনি খাবার কমাতে এবং প্রতিদিন কম পক্ষে একঘণ্টা হাঁটতে বললেন।
আজ ওজন ও স্বাস্থ্য বেশী তাই দুশ্চিন্তা হচ্ছে। কিন্ত এই আমি তৃত্বীয় বর্ষে পড়ার সময়, সন্ধানী রক্ত নিতে রুয়েটে আসে। দু একজন ডাক্তার বাদে সবাই ছিল হবু ডাক্তার, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্র্নি বা শেষ বর্ষের ছাত্র। আমি অতি উৎসাহ নিয়ে গেলাম রক্ত দিতে।উনারা আমার ওজন মেপে বললেন আপনার রক্ত দেয়া যাবে না। আপনার ওজন কম আছে। আমার ভিতর কি যে একটা অনুভুতি হয়েছিল, তা বলতে পারব না, তার উপর আমার চিমটি কাটা বন্ধুদের চিমটির জ্বালায়, যে আমি নিজকে সব সময় বেষ্ট মনে করি, তাও সেদিন ভুলে গিয়েছিলাম।
ডাক্তারের কথা মত খাবার কিছু কমিয়েছি, একঘণ্টা না হলেও প্রতিদিন হাটা হাটি করছি, কিন্তু ব্যথাটা কমছে না।
গত দশ তারিখ থেকে প্রতিদিন বিরামহীন মিটিং সিডিউল থাকাতে ডাক্তার দেখানো আর হয়ে উঠেনি।
আঠা্রোই নভেম্বর ঢাকায় এলাম, কম্পানির অভ্যন্তরীণ মিটিং এ অংশ গ্রহণ করার জন্য। এত ব্যস্ততা, এত কাজ করে যাচ্ছি, বা করতে হচ্ছে,কিন্তু পিঠের ব্যথা বাবাজি যেন আমাকে ভালবেসে ফেলেছেল। সর্বদাই উনি আমার সঙ্গে আছেন। ১৮ তারিখ অর্থাৎ গতকাল মিটিং শেষ হলেও অফিস থেকে বের হবার আগে ডাইরেক্টার আশরাফ স্যার বল্লেন, কাল এসো কিছু কাজ আছে। আমি সম্মতি জানিয়ে অফিস থেকে বের হলাম।
এবার যেন একা পেয়ে ব্যথা বাবাজি আরও একটু বেশী ঘনিষ্ট হবার চেষ্টা করতে লাগলেন।
মেয়ের ফোন এল।
আব্বু তুমি কি শারমিন আপুর বাসায় আসবা।
না বাবা আসতে পারব না, অনেক ক্লান্ত লাগছে।
ফোনটা কেটে দেবার পর মনের কোনে কেমন জানি খচখচ করতে লাগল। গতরাতে জামাই কয়েক বার ফোনে করেছে, মিটিং কখন শেষ হবে, তাই অপারগতা জানিয়েছিলাম। জামাই খুব ভালভাবে নেয়নি বুঝতে পারলেও সম্মতি দেইনি।
এখন সবে সন্ধ্যা ৬টা। তাই যাওয়া যায়।
ফোন দিলাম মেয়েকে, আমার আর এক জেঠোস আমার গিন্নীর অপারেশনের সময় এসেছেন। উনি উনার মেয়ে হিমু, আমার মেয়ে মৌ ও ভাগ্নি অর্থি দুপুরেই শারমিনের বাসায় এসেছে। ছেলে জুনায়েদের জে, এস সি পরীক্ষা চলছে, তাই আসতে পারেনি।
টুকটাক কথা বলতে বলতেই খাবার আসতে লাগল। যত মজাদার আর যত খাবার কি করে লোভ সামলাই। তাও গরু বাবাজিকে পরিহার করলাম। কিন্তু জামাইয়ের পিড়াপিড়িতে এক পিস খেতেই হল।
এত কাসুন্দি লেখার কারন হল, আমি যে এত কিছুর মাঝে আছি, তাও ব্যথা বাবাজিকি আমার সঙ্গ ক্ষনিকের তরেও ছাড়ছেন না।
সকালে ঘুম থেকে উঠার পর ব্যথাটা আরও একটু প্রকট হল।প্রতিদিনই তাই হয়। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, আজ ডাক্তারের কাছে যেতেই হবে। গতরাতে হার্ট স্পেশালিষ্ট আমার স্ত্রীর এক্স কলিগের সাথে কথা হয়েছে, উনি সব শুনে একজন অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞকে দেখাতে বললেন।আমার স্ত্রী বলল, তাদের হাস্পাতেলেই দুজন অর্থোপেডিক স্পেশালিষ্ট ডাক্তার আছেন।তাই আমার স্ত্রীকে সঙ্গী করে চললাম, অর্থোপেডিক ডাক্তারের কাছে।
আমরা সবাই আইন-কানুন নিয়ম শৃঙ্খলার কথা বলি, অন্যে তা ভঙ্গ করলে,চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করি। আজ আমি নিজেই, না আমার স্ত্রী নিয়ম ভঙ্গ করল,আমি তাকে অনুসরণ করলাম।লাইনে কত রোগী দাঁড়িয়ে আছে, অথচ সে সরাসরি ভিতরে ডুকে টিকিট কাটল, ডাক্তারের কাছে যেতে লাইন ধরতে হল না, বরঞ্চ ডাক্তার নার্স ফার্মাসিষ্ট সবাই কত খাতির যত্ন করল।
আমার স্ত্রী যে তাদের কলিগ, তাই এখানে নিয়ম অনিয়ম বলে কিছু নেই।আমার মনে হয় আমরা সবাই আপন আপন বলয়ে, নিজ নিজ প্রয়োজনে এমন নিয়ম ভঙ্গ করে চলছি এবং চলব।
যখন ফিরব, নিচে নেমে দেখি এখনও কত কত রোগী বা রোগীর স্বজনেরা লাইনে দাড়িয়ে আছেন।সুখের বিপরীত অসুখকে সঙ্গী করে কেউ হয়ত সাত সকালে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছে। কেও হয়ত কিছু খেয়ছে, কেউ খায়নি। কারো হয়ত পকেটে টাকা আছে কেউ হয়ত, টিকিটের জন্য প্রয়োজন দশটি টাকাও ধার করে এসেছেন।
যাই হউক, সবাই এই পৃথিবীর আলো বাতাসকে উপভোগ করার জন্য বেঁচে থাকতে চান। আচ্ছা আল্লাহ তায়লা তো রহমানুর রহিম, তার বান্ধা বা সৃষ্টিকে অসীম ভালবাসেন, তবে রোগ শুক না দিয়ে সরাসরি দুনিয়াতে পাঠাতেন আর যদি সরাসরি নিয়ে যেতেন তবে কেমন হত??
আপাত দৃষ্টিতে ভাল হলেও আমার মনে হয় এর মধ্যেও তিনি অনেক রহস্য লুকিয়ে রেখেছেন।হবে হয়ত নইলে যাকে কোনদিন একটি সিগারেট খেতে দেখিনি সে কেন ব্লাড ক্যান্সারে মারা যায়। বাহ্যত অতি পাপি কাউকে সহসাই মরে যেতে দেখি। আবার বাহ্যত যাকে বুজুর্গ দেখি সে কেন দীর্ঘদিন রোগে ভুগে বিছানায় পড়ে কাতরাতে কাতরাতে ভবলীলা সাঙ্গ করে।
নয়ত কোথায় যেন পড়ে ছিলাম, রোগ শোক আল্লাহ্র দান তাতে বান্দার কষ্ট হলেও মাত্রানুযায়ী তার গুনা ঝরে যায়। তাই যদি হয় তবে হে মাবুদ, তোমার এ দানও আমার কাছে পরম আদরণীয়।
নভেম্বর,১৯,২০১৪খ্রীঃ
উত্তরা ,ঢাকা,





আশাকরছি ভাল হয়ে উঠবেন
মন্তব্য করুন