ইউজার লগইন

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি-৪

যুদ্ধের তীব্রতা যতো বাড়ছে, দেশ স্বাধীনের ক্ষণ যেন ততোই ঘনিয়ে আসছে। পাক হানাদারদের অমানুষিক অত্যাচার-নির্যাতন, গুম-হত্যার মাত্রাও যেন ক্রমে বাড়ছে। এতে দেশের মানুষ কিছুটা বিচলিত হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের কঠোর মনোবল ভাঙতে পারেনি। যুদ্ধকালীন একটি- স্লোগান মনে পড়ছে। খুব সম্ভব স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হতো- ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। দেশকে হানাদার-আলবদর মুক্ত করার যুদ্ধ চলছে ৯ মাস।
দেশব্যাপী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। বুদ্ধিজীবী নিধন ও হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছে হায়েদার দল। মা-বোনদের ইজ্জত-সম্ভ্রমসহ সব কিছু লুটে নিচ্ছে শকুনের দল। এদের রোষানল থেকে মাতৃক্রোড়ের শিশুটিও রক্ষা পায়নি। হায়েনার তীব্র থাবায় কতো মায়ের বুক যে খালি হয়েছে, এর হিসাব নেই। হায়েনার দলের জুলুম-অত্যাচারে বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস ভারী হয়েছে দিন দিন। অবশেষে ৩০ লাখ শহীদ আর অগণিত মা-বোনের সম্ভ্রম-আব্রুর বিনিময়ে এলো স্বাধীনতার মাহেন্দ্র ক্ষণ। এক সময় শোনা গেলো, জেনারেল নিয়াজীর নেতৃত্বে পাক হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের বশ্যতা মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণ করেছে। দেশ স্বাধীনের আনন্দে আত্মহারা হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র উঁচিয়ে উল্লাস করছে। তাদের চোখে মুখে একদিকে জ্বলজ্বল করছে বিজয়ের আনন্দ, অন্যদিকে সহযোদ্ধা আর স্বজন হারানোর বেদনা তাদের তাড়িত করছে। এ আনন্দ-বেদনা নিয়েই আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ীর বেশে গন্তব্যে ফিরছে। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে আমরা পেলাম একটি স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’, জাতি পেলো স্বতন্ত্র একটি পরিচয় ‘বাঙালি’। দেশের আনাচে-কানাচে হলুদ রঙে আঁকা মানচিত্র খঁচিত লাল-সবুজ পতাকা পত পত করে উড়ছে। বর্বর পাক হানাদারদের কুপোকাত করে আমরা বিজয় অর্জন করেছি, পেয়েছি ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ঠিকানা।
সবচেয়ে বড় কথা, একটি দেশ স্বাধীন করতে যেসব অস্ত্রশস্ত্র, যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম বা সৈন্যসামন্ত দরকার তা আমাদের ছিল না। ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো এক অকুতোভয় ও নির্ভীক সংগ্রামী নেতা, ছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনুরিত কবিতা ও গান (শিকল পরা ছল মোদের শিকল পরা ছল, এ শিকল পরে শিকল তোদের করবো রে বিকল’), যা মুক্তিযোদ্ধাদের মনে সাহস জোগাতো। ছিল এম এ জি ওসমানীর মতো মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, জেনারেল জিয়াউর রহমানের মতো সাহসী বীর। আরো ছিল রয়েল বেঙ্গল টাইগারসদৃশ শক্তিধর একদল যোদ্ধা এবং একঝাঁক বালক বয়েসী বিচ্ছু বাহিনী। বলতে গেলে, এজন্যই মাত্র ৯ মাসে (২৬৬ দিনে) আমরা স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছি।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধুর ২৫ মার্চের ঘোষণা পূর্ণাঙ্গ রূপ পেলো ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয়ের মধ্য দিয়ে। যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতাকামী মানুষ যেন আনন্দে আবেগাপ্লুত এবং বাকরুদ্ধ। নিখোঁজ পুত্র-কন্যা, বাবা-মা, ভাইবোন বা স্বজনদের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছে অনেকে। দেশের বুদ্ধিজীবী নিধন আর হত্যাযজ্ঞের প্রমাণ পাওয়া গেলো ঢাকার পিলখানা, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের বধ্যভ‚মিতে অসংখ্য লাশের মধ্য দিয়ে।
আমরা মুক্ত-স্বাধীন। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র একে একে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। দু’একটি রাষ্ট্র আমাদের এ বিজয় মেনে নিতে পারেনি। তাই তারা সমর্থন দিতে কার্পণ্য করলো। অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দু’একটি রাষ্ট্র সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলো। প্রয়াত সঙ্গীতশিল্পী জর্জ হ্যারিসন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সাহায্যার্থে ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামে কনসার্ট করে বিশ্ববাসীর কাছে সাহায্যের পাশাপাশি আমাদের পরিচয় তুলে ধরেছেন। যার ইতিহাস এ প্রজন্মের কারো অজানা নেই।
দেশকে রাজাকার-আলবদর মুক্ত করার শুদ্ধি অভিযান চলছে। ‘একটি-দুটি রাজাকার ধরো, সকাল-বিকাল নাশতা করো’- স্লোগানে চলছে রাজাকার, আলবদর বাহিনীর সদস্যদের সন্ধান। যারা যুদ্ধের সময় বাংলার মেধানিধন ও মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠনে পাক হানাদারদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছিল। শুনতে পেলাম জগন্নাথ সাহা রোড কেল্লার মোড়ের মিয়া সরদারকে (মিয়া মোহাম্মদ) মুক্তিযোদ্ধারা লবণকেচা করেছে। তার এ দুর্গতি অনেকে স্বচক্ষে দেখলেও কারো মনে বিন্দুমাত্র মায়ার উদ্রেক হয়নি। মিয়া সরদার একটি উদাহরণ মাত্র। দেশ স্বাধীনের পর এভাবেই রাজাকার-আলবদর বাহিনীর সদস্যদের শায়েস্তা করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। যুদ্ধকালীন দেখেছি, রাজাকার-আলবদররা সাধারণ মানুষের পোষাপ্রাণী থেকে শুরু করে ধন-সম্পদ লুটপাট করে কীভাবে অগাধ সম্পদের মালিক বনে গেছে।
সময়টা ছিল দেশ স্বাধীনের পর। মেজ বোনের অসুস্থ শ্বশুর (গ্রামে থাকতেন) ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাকে দেখার জন্য মায়ের সাথে আমিও হাসপাতালে গেলাম। তখন গাড়ি-ঘোড়ার এতোটা আধিক্য ছিল না। তাই পায়ে হেঁটেই লালবাগ থেকে সেখানে যাওয়া হয়েছিল। ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে যুদ্ধ-উত্তর দেশের অনেক কিছুই চোখে পড়েছে। যা আজ স্মৃতিবদ্ধ হয়ে আছে। রোগী দেখে বাড়ি ফেরার পথে মিটফোর্ড হাসপাতালের কাছের একটি ডাস্টবিনে তাজা গুলির স্তূপ নজর কাড়লো। শিশুমনে মায়ের অজান্তে পা দিয়ে নাড়া দিতেই ভাঙা কাচে পায়ের আঙুল কেটে গেলো। মা বিষয়টি টের পেলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। পাশেই ছিল একটি পান বিতান, মা সেখান থেকে পানের বোঁটায় একটু চুন নিয়ে কাটা অংশে লাগিয়ে দিলেন। কাটা-ছেঁড়ার জন্য এটা একটি টোটকা চিকিৎসা। আঙুল কাটলেও হাতে করে দু’একটি গুলি নিতে ভুললাম না। পরে ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে বাড়ি পৌঁছলাম। পরে এ রকম হাজার হাজার গুলি দেখেছি ভাঙ্গারী ব্যবসায়ীরা এনে কৌশলে বারুদ (দেখতে সরু শলাকার মতো) বের করে খোসা থেকে তামা, পিতল আর সিসা আলাদা করেছে। গুলির মাথার অংশটি (সিসার তৈরি) দেখতে ছিল অনেকটা রকেটের মতো। স্বর্ণকারের মাধ্যমে এটা দিয়ে অনেকে আংটি বানিয়ে পরেছে। যতদূর মনে পড়ে এ থেকে আমিও বাদ যাইনি।

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

লীনা দিলরুবা's picture


এ পর্বে ব্যক্তিগত স্মৃতির বাইরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু মূল্যায়ণ পেলাম। সেসব নিয়ে কিছু প্রশ্ন-

কাজী নজরুল ইসলামের গান নাকী গণসঙ্গীত আর দেশাত্ত্ববোধক গান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা যুগিয়েছিল?

১)মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানী ভিতু টাইপ এবং পাকিস্তানপন্থী লোক ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
২) জিয়াউর রহমানের পদবী মেজর জেনারেল লিখলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তো তিনি মেজর ছিলেন। মুক্তিযু্দ্ধের সময় একজন সেক্টর কমান্ডার জিয়ার কার্যকলাপও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার ক্ষেত্রে 'তাজউদ্দীন আহমদ' সহ আরো অনেকের কথা উহ্য রেখে এই দুইজনকে মহিমান্বিত করতে দেখে ইতিহাস বিকৃতির আভাস পেলাম।

আহমাদ আলী's picture


লিনা দিলরুবা,
আমার স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি পড়তে গিয়ে আপনার মনে একাধিক প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। এটা স্বাভাবিক। কোনো লেখার সমালোচনা হলে তাতে ভুলভ্রান্তি বা গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। কাজী নজরুল ইসলামের উদ্ধৃতাংশটুকু গণসঙ্গীতের অংশ নিঃসন্দেহে।আমি কিন্তু একে রণসঙ্গীত লেখিনি।যা লিখেছি তা হলো- ‘কাজী নজরুল ইসলামের অনুরিত কবিতা ও গান মুক্তিযোদ্ধাদের মনে সাহস জোগাতো।’

*এম এ জি ওসমানী সম্পর্কিত প্রশ্নে মনে হচ্ছে, আপনি খুব কাছ থেকে তাকে দেখেছেন বা চেনেন (আপনার বয়স সম্পর্কে আমার ধারণা নেই)। ওসমানীকে পাকিস্তানপন্থী বলতে কি আপনি তাকে গোলাম আযমের দলে ফেলতে চাচ্ছেন? তাই যদি হবে- ‘ওসমানীর নামে সিলেটে বিমানবন্দর, ঢাকায় উদ্যান এবং মিলনায়তন হয় কী করে। তাকে আমি যদ্দুর জেনেছি, তিনি ছিলেন চিরকুমার বা অবিবাহিত। তার উত্তরসূরি থাকলে হয়তো আপনার এ উদ্ভট ধারণা সম্পর্কে একটি ব্যাখ্যা দিতে পারতো।

*১৯৭১ সালের চিন্তা থেকে মনের অজান্তে সরে পড়েছিলাম হয়তো, যে কারণে জিয়ার পদবীর ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে। এটা সংশোধন করে নিলাম। জিয়াউর রহমানকে সেক্টর কমান্ডার স্বীকার করলেও তার কার্যকলাপও আপনার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। আপনার ‘প্রশ্নবিদ্ধ’-এর সংজ্ঞা কি?

*স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনে তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এ এইচ এম কামরুজ্জামান, শেখ মনসুর আলীর অবদান অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আমার স্মৃতিচারণে তাদের নাম উল্লেখ না করায় ইতিহাস বিকৃতের আশঙ্কা আপনার- এমন ধারণা আসে কী করে। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস আপনার দৃষ্টিতে কী এতোটাই ঠুনকো। আমার মতো নগণ্য কেউ ইচ্ছা করলেই কী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাল্টে দিতে পারবে, নাকি পেরেছে- এ প্রশ্নটি নিজেকেই করুন।
ধন্যবাদ আপনাকে।

শওকত মাসুম's picture


স্মৃতিকথাই চলুক

আহমাদ আলী's picture


তারপরও চেষ্টা করছি কথা রাখার। ধন্যবাদ।

টুটুল's picture


চলুক

আহমাদ আলী's picture


ধন্যবাদ টুটুল ভাই। চলছেই তো স্মৃতিগাথা...

তানবীরা's picture


স্মৃতিকথা চলুক Laughing out loud

আহমাদ আলী's picture


ধইন্যা পাতা

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আহমাদ আলী's picture

নিজের সম্পর্কে

মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা ও বাচালতা আমার কাছে সবচেয়ে অপন্দনীয় কাজ। ধূমপান, এটাকে তো রীতিমতো ঘৃণার চোখে দেখি।