ইউজার লগইন

আমার রাজহাঁস আর স্বপ্নের ঘোড়া!!!

ছোটবেলা থেকেই আমার পশুদের প্রতি একটা আলাদা আকর্ষণ ছিল। নদীর তীরে জেগে উঠা সবুজের সমারোহে ঘেরা আর রাস্তার দু ধারে গাছগাছালি তে ভরা অঁজপাড়া এক গ্রামেই কেটেছে আমার শৈশবকাল। তখন বাবা ঢাকায় থাকতেন, মা আর আপুসহ আমি নানার বাড়িতেই থাকতাম, কারন আমার দাদার বাড়িতে লেখাপড়া করার মত পরিবেশ না থাকায় বাবার এই সিধান্ত, যদিও অনেকে এই সিধান্তটা ঠিক মনে করে নি তখন।

যাক এবার আসল কথায় আসি, নানার বাড়িতে অনেক মোরগ-মুরগী আর গরু থাকলেও ছিল না হাঁস কবুতর ছাগল সহ অন্যানো গৃহপালিত পশু। মানুষের সহজাত স্বভাব যেমন যেটা থাকে না তার প্রতি আকর্ষণ বেশি থাকে, সেটা আমার মধ্যে একটু বেশীই ছিল। আমার এখনো মনে পড়ে সেইদিনের কথা যেদিন রাজহাঁসের জন্য সারাদিন না খেয়ে ছিলাম, ক্লাস থ্রীর ফাইনাল পরীক্ষা শেষে মা সহ খালামনির বাসায় বেড়াতে গেলাম। পরীক্ষার পরের এই দিনগুলো খুব ভালই কাটত, বরাবারের মত মনে খুব আনন্দ। অনেকদিন পর স্কুল থেকে লম্বা ছুটি পেয়েছি।

খালার বাড়িতে এসে এবার হঠাৎ নতুন এক জিনিস দেখেই তো আমি মহাখুশি। আমার সেই মহাখুশির জিনিস ছিল একঝাক রাজহাঁস। কি সুন্দর ছিল দেখতে সেগুলো! আমি খাওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে রাজহাঁসের সাথে খেলায় মগ্ন হয়ে গিয়েছি। হঠাৎ মা এর চিৎকার এ জুয়েল ভাত খাবি না? তাড়াতাড়ি গোসল করে খেতে আয়। মা এর কথামত শান্ত বালকের মত গোসল করতে গেলাম। আমার মাথায় তখন শুধুই রাজহাঁস, চিন্তা করছি কিভাবে মা কে বলব রাজহাঁস কিনে দেয়ার কথা।
ভাবলাম ভাত খাওয়ার পর মা কে বলব। এত তাড়াতাড়ি খাওয়ার চেষ্টা করছি কিন্তু কোনমতেই পারছি না। তারপর এক প্রকার ভাত খাওয়া শেষ না করেই প্লেট এ পানি ঢেলে দিয়ে মা কে বললাম ভাল লাগছে না ,আমি আর খাব না। মা আর কিছু বললো না, কিন্তু মা যে এই অপচয় করাকে অনেক ঘৃনা করে তা আমার ভালই জানা ছিল। খালামনির বাসায় থাকাতে হয়তো মা আর কিছু বলল না।

এবার আমি চিন্তা করছি কিভাবে মা কে খুলে বলি রাজহাঁসের কথা। মা এর আশেপাশে ঘুর ঘুর করতে লাগলাম। সাহস করে বলেই ফেললাম, মা আমার রাজহাঁস লাগবে। মা অনেক ঠাণ্ডা মেজাজের ছিল, কোন উত্তর না দিয়ে না শুনার ভান করল। কিন্তু আমি তো নাছোড়বান্দা, রাজহাঁস আমার লাগবেই। শত চেষ্টায় যখন ব্যর্থ হলাম তখন কান্নাকাটি ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না আমার। অবশেষে মা রাজি হল কিন্তু শর্ত জুড়ে দিলেন, বলল আমি যদি ফাইনাল পরীক্ষায় ফার্স্ট হই তবেই তিনি রাজহাঁস কিনে দিবেন।
কিন্তু রেজাল্ট হতে ঢের দেড়ি, আমার আর তর সইছে না।

এর মাঝেই ঘটে গেল এক অপ্রীতিকর এক ঘটনা। পরের দিন ঘুম থেকে উঠেই রাজহাঁস গুলোর সাথে আবার খেলতে লাগলাম, হঠাৎ একটি রাজহাঁস এসে আমার গায়ে ঠোকর দিল। আমি চিল্লাইয়া এক দৌড়......

খালামনির বাসা থেকে বাড়ি চলে আসলাম। এর কিছুদিন পর রেজাল্ট বের হল। ক্লাস থ্রী থেকে প্রথম স্থান অর্জন করে চতুর্থ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলাম। বাড়ির সবাই অনেক খুশি।
ততদিনে আমি রাজহাঁসের কথা এক প্রকার ভুলেই গেছি। তারপর আর কোনদিন রাজহাঁসের কথা বলি নি মা কে।
এখনো চলতে ফিরতে কোথাও রাজহাঁস দেখলেই দাঁড়িয়ে পরি। মনের সৃতিকোঠায় ভেসে উঠে পনের বছর আগের সেই ঘটনা। ঠোঁটের কোনে কোথা থেকে যেন মুচকি হাসি চলে আসে আমি জানি না।

এ তো গেল রাজহাঁসের কথা। এবার আসি ঘোড়া প্রসঙ্গে, এটা ছিল অনেক হৃদয় বিদারক আমার জন্য।
ঈদের পর নানা বাড়িতে আমার সব খালামনি আর খালুরা চলে আসতো। চার খালুর মধ্যে আমি আর্মি খালু কে খুব পছন্দ করতাম। উনিও আমাকে খুব ভালবাসত। আমি খালুর কাছে ঈদ এ এক আবদার করে বসলাম, বললাম আমার একটা লাল ঘোড়া লাগবে। খালু বলল ঠিক আছে, আমি বাজার থেকে কিনে এনে দিব। আমার তর সইছে না, বারবার খালুকে বলতে লাগলাম কখন এনে দিবে। ঘোড়া নিয়ে রীতিমত তুলকালাম কাণ্ড করতে লাগলাম, শেষমেশ খালু বলল বাবা ঘুমাও আমরা কাল এক সাথে গিয়ে নিয়ে আসব। আমি তো খুশিতে আত্মহারা, কি করব নিজেই বুজতে পারছি না। রাতের খওয়ার পর এক বুক আশা নিয়ে ঘুমাতে গেলাম।

সকাল হল, দেখি খালু লাল একটা ঘোড়া নিয়ে এসেছে, ঘোড়া পেয়ে আমি সে কি খুশি !!!
সবাইকে আমার ঘোড়াটা দেখালাম। ঘোড়াটাকে নিয়ে মনের আনন্দে ঘুরে ফিরে রাতে গোয়াল ঘরে রাখলাম। খালুর উপর বেজায় খুশি আমি।
পরদিন আবার গোয়াল ঘর থেকে ঘোড়া বের করতে গিয়ে আমি তো থ!!! দেখি ঘোড়া নাই। আমি দৌড়াইয়া গিয়া খালুকে বললাম খালু আমার ঘোড়া কই? খালু বলল বাবা কাল তো চোর এসে ঘোড়াটাকে নিয়ে গেছে। আমি তখন আর কিছু বলার ভাষা খুজে পেলাম না।

এতকিছু ঘটনা যে আমি ঘুমের ঘোরে রাতে স্বপ্নে দেখিছিলাম, তা আমি আজ অবধি বুঝি না।
পরদিন ঘুম থেকে উঠে যখন খালুসহ সবাইকে এই কথা বলতে লাগলাম যে আমার ঘোড়া চুরি হয়েছে, তখন সবাই মুচকি মুচকি হাসতেছিল। কিন্তু খালু খুব স্বাভাবিক থাকার কারনে আমি ভেবেছিলাম ঘটনা সত্য, কারন খালু তো আমাকে ঠকাবে না।
আমি খালুকে বললাম তুমি ঘোড়াটা এনে দিলা কিন্তু শয়তান চোরটা ঘোড়াটা নিয়া গেল। এরপর আমি আর ঘোড়ার জন্য আবদার করি নি। স্বপ্ন কি সেটা হয়তো তখন আমি বুজতাম না। আমার কাছে সপ্নটাই সত্যি ছিল। বড় হওয়ার পর অনেক সময় এই গল্পটা বলে খালু অনেক মজা করত। আমিও এক চাপা হাসি দিতাম।

ও গল্পের শুরতে বলেছিলাম আমার বাবা আমাদেরকে নানার বাড়িতে রেখেছিল, যা ছিল তার একান্তই নিজের সিধ্নান্ত। হয়তো তিনিও কোন স্বপ্নে কে বাস্তবে রুপ দেওয়ার জন্য এটা করেছিলেন। আজ যখন বাবাকে কেউ ইঞ্জিনিয়ার ছেলের বাবা বলে ডাকে তখন হয়তো তার বুকটা ভরে যায়।

এখনো আমার কাছে ঘোড়া চুরির সেই সপ্নটা সত্যিই মনে হয়। মাঝে মাঝেই সপ্ন দেখি কিন্তু সবগুলা মনে থাকে না। তবে সব সুন্দর স্বপ্ন যেন সত্যি বাস্তবে পরিণীত হয় স্রষ্টার কাছে এই কামনাই করি ।

পোস্টটি ১২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

জাহিদ জুয়েল's picture

নিজের সম্পর্কে

কেন যে ইঞ্জিনিয়ার হলাম, এইসব রসহীন জীবন খুব তিতা হয়ে গেছে,

ছোটবেলা থেকে সাহিত্যের প্রতি কিসের যে মায়া তা নিজেও জানি না। একটা সময় মনে হয়ত সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করি, কিন্তু তা আর হয়নি। রবি ঠাকুরের ছোট গল্প কিংবা কবিতা করেছে মুগ্ধ সেই ছোটবেলায়, জীবনের অনেকটা পথ অতিক্রম করে এসে আজও দেখছি ঐ একটা জিনিস আজও ভালবাসি হ্রদয়ের গহীন থেকে। তাইতো অসময়ে ছূটে এসেছি প্রিয় এই ব্লগে।